Monday, February 25, 2013

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রশ্নে নিরপেক্ষতা বলে কিছু নাই!

( দৈনিক মানবকন্ঠ, ৩১/১২/২০১২)

বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের এবং মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতা-বিরোধী অপরাধের যে বিচারের প্রক্রিয়া চলছে তা সময়ের পরিক্রমায় ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের সমকালীন ও নিকট-ভবিষ্যতের রাজনীতির অনুঘটক হয়ে উঠছে। আওয়ামীলীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাটাকে উপস্থাপন করছে যতোটা নির্বাচনী-অঙ্গীকারকে পুরণ করার কাজ হিসাবে, ইতিহাসের দায় হিসাবে ততোটা নয়। এবং এ মানবতা-বিরোধী অপরাধের বিচারের সাঁকু বেয়ে আরেকবার ক্ষমতায় বসবার দাবিদার হয়ে উঠবার রাজনীতি ইতোমধ্যেই প্রতিভাত হচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি যথোপযুক্ত রাজনৈতিক এজে-ার অভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টিকে সামনে এনে আওয়ামীলীগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করবার কৌশল হিসাবে মাঠ গরম রাখতে গিয়ে নিজেরাই ক্রমান্বয়ে জামায়াতে ইসলামের সামিয়ানার নিচে চলে যাচ্ছে। আর জামায়াত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে থেকে বিএনপির সরকার বিরোধী আন্দোলনের ফাঁক দিয়ে যুদ্ধাপরাধী ও মুক্তিযুদ্ধে সংঘঠিত মানবতা-বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বদের মুক্তির দাবি নিয়ে মিছিল মিটিং করছে। বাংলাদেশের রাজনীতির আরেক দল, ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চা, জাতীয় পাটি এখন লেফ্ট রাইট আর লেফ্ট রাইট করছে। কোথায় যাবে, কোন দিকে যাকে, কোন দলে যাবে নাকি কোন্দলে যাবে, দিশাহীন ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফাঁকতালে, জনগণের জন্য হঠাৎ গজে উঠা দরদের ডিলারশীপ নিয়ে ড. কামাল হোসেন এবং ডা: বদরুদ্দৌজা চৌধুরী একাট্টা হয়ে আরেকটি রাজনৈতিক জোট করবার চেষ্টা করছেন। নির্বাচনের আগে এরকম মৌসুমি রাজনৈতিক জোট গঠনের নজির বাংলাদেশের নতুন না। অতএব এখানে নতুনত্বের কিছু নাই। বাম ধারার রাজনৈতিক জোট সবসময় ছিলো, এখনও আছে ্এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। যারা কাজের চেয়ে কতা বেশি বলে; প্রয়োগের চেয়ে তত্ত্ব নিয়ে বেশি ব্যস্ত তাকে! সম্প্রতি ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার দাবিতে বাম মোর্চা একদিন হরতালও পালন করেছে। তবে, এই সরকার-সমর্থিত-হরতাল-এর আদৌ কোন প্রয়োজন ছিলো কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে সবচেয়ে সক্রিয়, বলিষ্ঠ এবং জোরালো অবস্থান রয়েছে এ-বাম মোর্চার। সত্যিকার অর্থে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে আওয়ামীলীগের চেয়েও এ-বাম সংগঠনগুলোকে সব সময় অধিকতর সোচ্চার দেখা গেছে।

সর্বসাকুল্যে, বাংলাদেশের রাজনীতিরর মাঠে যেসব দল সক্রিয়ভাবে বিদ্যমান আছে, তন্মধ্যে বিএনপি এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ছাড়া সবাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে, কম কিংবা বেশি, সোচ্চার। অতএব, রাজনীতির ধারা তাহলে নির্ধারিত হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে এবং বিপক্ষে। বিএনপির নেতৃবৃন্দ অনেকটা চামড়া বাঁচানোর জন্য হরহামেশা বলে থাকেন, “বিএনপিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়, তবে তা হতে হবে আন্তর্জাতিক মানদ-ে” কিংবা “বিএনপিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়, তবে বিচারের নামে যে কাউকে হয়রানি করা না-হয়” কিংবা “বিএনপিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়, তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবতি হয়ে কাউকে যেন শাস্তি দেয়া না-হয়”। এই “তবে”র ফাঁকে বিএনপি যে, জামায়াতের পক্ষে সুনির্দিষ্টভাবে রাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছেন, এটা মোটামুটি পরিষ্কার। সম্প্রতি (গত ২৬ ডিসেম্বর) বিএনপি’র প্রধান বেগম খালেদা জিয়া একটি প্রতিবাদ/পথসভায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে মন্তব্য করে যে সরাসরি পক্ষাবলম্বন করেছেন, তা অত্যন্ত হতাশাজনক। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এ কারণে যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সারাদেশের মানুষের মধ্যে যে একটি স্পষ্ট মতৈক্য রয়েছে তিনি সরাসরি তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। আমরা জানি, বিএনপিতেও মুক্তিযোদ্ধা আছেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমা-ার ছিলেন। তাছাড়া বেগম খালেদা জিয়া দুই দুইবার এদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বর্তমানের মহান জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী। তিনি যখন সুনির্দিষ্টভাবে প্রকাশ্যে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অবস্থান করেন, তখন সেটা অত্যন্ত হতাশা-জনক।

শেষান্তে এসে শুরুর বক্তব্যে ফিরে যাই। সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি যুদ্ধাপরাধীদের এবং মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতা-বিরোধী অপরাধের বিচারের উপর ভিত্তি করেই নতুন রূপ নেবে। সেখানে বিএনপিকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়েই তার অবস্থান নিতে হবে। যে জামায়াতের জন্য বিএনপি’র আজকের এ মাসির দরদ সে জামায়ত কিন্তু ক্রান্তিকালে বিএনপিকে বাঁচাবে না কিংবা বাঁচাতে পারবেনা। মানুষের আবেগ, আশা-আকাক্সক্ষা, চাওয়া-চাহিদা এবং মতৈক্যের সাথে ঐক্যমত্য পোষণ করবার মধ্যে রাজনৈতিক ফায়দা-- এটা বিএনপি নেতৃত্ব যত দ্রুত বুঝতে পারবেন, ততোই দেশ ও দশের লাভ। বিএনপি’র তো বটেই। মনে রাখতে হবে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুতে ‘নিরেপক্ষ’ বলে কোন পক্ষ নেই। তাছাড়া, ন্যায় এবং অন্যায়ের মধ্যে নিরপেক্ষ থাকার অন্য অর্থ হচ্ছে অন্যায়ের পক্ষে থাকা। এটাই ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে নিজের অবস্থানকে সমন্বয় করবার রাজনৈতিক দর্শন।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

No comments:

Post a Comment