Monday, February 25, 2013

গণতন্ত্রের চর্চা: দলের বাইরে ও ভেতরে

(দৈনিক মানবকন্ঠ, ১৭/০১/২০১৩)

বিগত ২৯ তারিখ বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের ১৯তম ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামীলীগের সম্মেলন এবং সম্মেলনের মাধ্যমে নির্বাচিত নেতৃত্ব বিশেষ মনোযোগ ও আগ্রহের দাবি রাখে, কেননা বাংলাদেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি এবং গণতান্ত্রিক-রাজনীতিতে আওয়ামীলীগের মতো রাজনৈতিক দলের এবং দলের নেতৃত্বের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ সম্মেলনে আওয়ামীলীগের বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পূনরায় আগামী তিনবছরের জন্য সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। এবং পূর্ণাঙ্গ কমিটি এরই মধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। সকলকে অভিনন্দন। অভিনন্দন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগকেও কেননা মেয়াদান্তে (আওয়ামীলীগের ১৮তম ত্রিবার্ষিক সম্মেলক হয়েছিল ১৯ জুলাই ২০০৯ সালে) নিয়মিতভাবে কাউন্সিলের আয়োজন করা এবং এ-কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব তৈরী করবার সংস্কৃতি প্রকারান্তরে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু যে রাজনৈতিক দল দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করবে, সে রাজনৈতিক দল নিজের মধ্যে কতোটা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা করে সেটা একটা বিরাট জিজ্ঞাসা বটে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাছ-বিচার করলে দেখা যাবে, আওয়ামীলীগের এ-পুরো সম্মেলনটাই একটি নির্দিষ্ট সময়ান্তরে অনুষ্ঠিত কিছু সুনির্দিষ্ট ছকে-বাঁধা এবং সনাতন কিছু রাজনৈতিক এবং দলীয় আচার-অনুষ্ঠান ছাড়া আর কিছুই নয়। বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক।

আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি হয় ৪৭ সদস্যের। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং কোষাধ্যক্ষ তিনজন, একত্রিশ জন বিভিন্ন পদের সম্পাদক (যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক তিনজন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক সাতজনসহ) এবং তেরজন প্রেসিডিমের সদস্য। বিরাট ও আডম্বর আয়োজনের মাধ্যমে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ছয় হাজার কাউন্সিলর, বিশ হাজারের মতো ডেলিগেট্স এবং অন্যান্য অতিথিসহ প্রায় পয়ত্রিশ হাজার মানুষের এ আয়োজন। কিন্তু বিরাট এ আয়োজনের অন্যান্য উদ্দেশ্যের-- যেমন বিগত বছরগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করা, বর্তমান সংগঠনের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা এবং ভবিষ্যতের করণীয় নির্ধারণ করা প্রভৃতি--বাইরে যে মূল উদ্দেশ্য, সেটা হচ্ছে সংগঠনের আগামী নেতৃত্ব নির্বাচন করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, এ বিরাট আয়োজনের মাধ্যমে যে সম্মেলন, সেখানে কোন ধরণের নির্বাচন ছাড়া, কোন ধরণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া এবং কোন ধরণের ভিন্নমত ও ভিন্নসুর ছাড়া বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে পুনরায় যথাক্রমে সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করা হয়। এবং নবনির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সর্বময় ক্ষমতা প্রদান কার হয় কমিটির অন্যান্য পয়তাল্লিশটি সদস্যদেরকে নির্বাচিত করে কমিটি সম্পূর্ণ করার জন্য। এটা যেমন একদিকে দলের মধ্যেই গণতান্ত্রিক অনুশীলনের অভাবকে প্রতিভাত করে তেমনি জবঢ়ৎবংবহঃধঃরড়হ ড়ভ ঃযব চবড়ঢ়ষব'ং ঙৎফবৎ (জচঙ)- বা জনপ্রতিনিধিত্বশীল আইন-এরও সুনির্দিষ্ট লঙ্ঘণ বটে। কেননা আওয়ামীলীগ একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসাবে পিআরও-র ধারা মানতে বাধ্য। এছাড়াও আওয়ামীলীগের সাংগঠিক যে গঠনতন্ত্র (যা নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া হয়েছে), সেখানে কাউন্সিলরা “অন্যান্য পদগুলো সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী নির্বাচন করবে”--এধরের মেনডেট আদৌ দিতে পারেন কিনা সেটা সুনির্দিষ্ট নয়। ফলে, এ ধরণের প্রক্রিয়ায় দলের নেতৃত্ব নির্বাচন একদিকে যেমন পিআরও-র ধারা লঙ্ঘণ, অন্যদিকে দলের সাংগঠনিক গঠনতন্ত্রেরও এক অর্থে বরখেলাপ। যে প্রক্রিয়ায় দলের নতুন নেতৃত্ব গঠন করা হয়েছে, তাতে ছয়হাজার কাউন্সিলরের কোন ভূমিকাই নাই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বিভিন্ন জেলা কমিটি, উপজেলা কমিটি, ইউনিয়ন পর্যায়ের হাজার হাজার কাউন্সিলর এবং ডেলিগেট্সের একটা চমৎকার নগর-ভোজন এবং কেন্দ্রীয়ভাবে আয়োজিত দলের পিকনিক পার্টিতে অংশ নেয়া ছাড়া আর কোন কার্যকর ভূমিকা নাই। বিগত কাউন্সিল গুলোতেও তাই হয়েছিলো এবং ভবিষ্যতেও এর অন্যথা হবে--এরকম আশা করবার কোন সুনির্দিষ্ট কারণ নাই। অন্তত যতদিন শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া ঁেবচে আছেন ততদিন আওয়ামীলীগ এবং বিএনপির কাউন্সিরদের পিকনিক করা ছাড়া আর কোন ভূমিকা থাকবে না। একবারে নৈরাশ্যবাদীরাও এর বাইরে কিছু আশা করেন বলে মনে হয়না।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে গণতন্ত্র কোথায় রক্ষিত হল? সংগঠনের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা হল কই? তখনই প্রশ্ন আসে, যে সংগঠনের ভেতরেই গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিমালাগুলোর কোন চর্চা নাই, সে সংগঠন দেশে কীভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে? যে সংগঠনের নেতৃত্ব একটি সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়না, সে নেতৃত্ব দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় কীভাবে নেতৃত্ব দেবে? প্রশ্ন এখানে নয় যে, শেখ হাসিনা কেন সভাপতি নির্বাচিত হলেন? বরঞ্চ প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হলেন? সে প্রক্রিয়াটা গণতান্ত্রিক হওয়াই বাঞ্চনীয়। এ কথা নিন্দুকেরাও স্বীকার করবেন যে, বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভাপতি হওয়ার জন্য এবং আওয়ামীলীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী, এবং বিরাট সাংগঠিক কাঠামোর সংগঠনকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য শেখ হাসিনার কোন বিকল্প নাই। বিগত সময়ে শেখ হাসিনা তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে তা প্রমাণ করেছেন। কিন্তু সেটা যদি কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হত, তাঁর মান ও মর্যাদা অধিকতর বৃদ্ধি পেত। কিংবা আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যান্য পদগুলোতে যদি সরাসরি ভোটাভুটির মাধ্যমের সাধারণ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ, সহ-সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক ও প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হত, তাহলে দলের তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃবৃন্দের মধ্যে যেমন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সঞ্চারিত হতো, দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের মধ্যেও তেমন করে একটি সাংগঠনিক দায়িত্বশীলতার জন্ম নিত। এ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও নেতৃত-নির্বাচনের ক্ষেত্রে তৃণমূলের নেতৃত্বকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়ার মধ্যদিয়ে প্রকারান্তরে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ধারাকেই প্রণোদিত করা হত। বাংলাদেশের রাজনীতির চরিত্র-নির্ধারক বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের মত বড় রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে অর্থাৎ সংগঠনের অভ্যন্তরে যত বেশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, পরমতসহিঞ্চুতাএবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা করবে, দেশের রাজনীতি এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি তত বেশি পরিশুদ্ধ হবে। আর দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিশুদ্ধ হলেই, দেশের রাজনীতিতে সত্যিকার গণতান্ত্রিক-সংস্কৃতির চর্চা হবে।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

No comments:

Post a Comment