Monday, February 25, 2013

ক্ষমতার রাজনীতি ও আত্মমর্যাদাবোধের প্রশ্ন!

(দৈনিক ভোরের কাগজ, ০৭/০২/২০১৩)

কোন লেখকের কোন্ লেখা কী পরিমাণ সেনসেশন তৈরী করতে পারে, তা নির্ভর করে খোদ লেখকের বাজার-দর, লেখার গুণমান, পাঠক-শ্রেণীর ক্যাটেগরি, বাজার-কাটতি, বিপনণ ও বিজ্ঞাপনের ওপর। কিন্তু কোন কোন লেখা এসব হিসাব-নিকাশের বাটখারার বাইরে গিয়ে ‘সুপার হিট’ করে চতুর্দিকে হইচই ফেলে দেয়। অমর একুশে বইমেলাকে কেন্দ্র করে অসংখ্য নবীন-প্রবীণের আসন্ন লেখা ও প্রকাশনা নিয়ে যে পরিমাণ হইচই হওয়ার কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি হইচই হচ্ছে একজন নন-লেখকের একটি লেখা নিয়ে যা ওয়াশিংটন-টাইমস-এ জানুয়ারীর ৩০ তারিখ ছাপা হয়েছে। কারণ তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির চরম ক্ষমতাধর প্রধান দুই নেত্রীর একজন; বিএনপির সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। রাজনৈতিক ময়দানের কথা যদি বাদও দিই, এ লেখাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যগুলোতে রীতিমত সুনামি বয়ে যাচ্ছে; বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোকে প্রতিদিন গড়পড়তা (বর্তমান নিবন্ধটিসহ) ২০ থেকে ২৫ টি সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় ছাপা হচ্ছে; এ লেখা বাংলাদেশের প্রথম সারির (প্রচার সংখ্যা বিচারে!) সকল সংবাদপত্রে পুনমূর্দ্রণ করেছে; কোন কোন ইংরেজী সংবাদপত্র হুবহু ইংরেজীতেই ছেপেছে আবার বাংলা সংবাদপত্রগুলো বাংলায় অনুবাদ করে ছেপেছে। প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলোর টকশোতে রীতিমত ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এমনটি এ লেখা নিয়ে বাংলাদেশের মহান জাতীয় সংসদে গত ৩১ জানুয়ারী তারিখে অনির্ধারিত দুইঘন্টা আলোচনা হয়েছে। এরকম সেনসেশন তৈরী করা কোন লেখা নিকট অতীতে বাংলাদেশে আর হয়েছে বলে মনে পড়ছে না। অমর একুশের বইমেলার এতো লেখকের এতো লেখা বেগম খালেদার জিয়ার একটি লেখার কাছে বিশেষ করে সেনসেশন তৈরীর মাপকাঠিতে ম্লান হয়ে গেছে। কেন? কী এমন আছে এ লেখাতে? কেন এ বেহুদা সেনসেশন?

এ লেখার মূল বিষয়গুলোর সারাংশ এবং সার ও অংশ হচ্ছে অনেকটা এরকম; (১) এদেশটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার দখল করে নিয়েছে, (২) এদেশে গণতন্ত্র বলে কিছু নাই, যা কিছু ছিল সেটাও এখন ‘নাই’ হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণায় কাঁদছে, (৩) একাত্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের বন্ধু ছিলো (!) কিন্তু বাংলাদেশের এ-অবস্থায় সে বন্ধুত্বের দায় মেটাচ্ছেনা কেনো?, (৪) এ সরকার দুর্নীতিগ্রস্থ তাই বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতুর জন্য প্রতিশ্রুত অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করে দিয়েছে, (৫) আমেরকিার পেয়ারের লোক ড. ইউনূসের মতো একজন নোবেল পুরুস্কার প্রাপ্ত ব্যক্তিকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পথ থেকে সরিয়ে দিয়েছে এ সরকার বিরাট গুনাহ’র কাজ করেছে, (৬) জাতিক (আন্তর্জাতিক নয়!) ট্রাইবুনালের মাধ্যমে শেখহাসিনার সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে এদেশের রাজনীতিবিদ এবং তাদের সহযোগীদের মৃত্যুদ- দিচ্ছে, (৭) এ-সরকার কতৃক বালিত করে দেয়া ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা’ পুনরোদ্ধারের জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমেছে কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার তার তোয়াক্কা করছে না, (৮) আমেরিকাকে পাস কাটিয়ে এদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের রাস্তা অন্যদিকে (রাশিয়ার দিকে) মাপা হচ্ছে, (৯) অতএব, আমেরিকার নেতৃত্বে, আপনার দোসর গ্রেট বৃটেনকে সাথে নিয়ে, অন্যান্য আরো যত সাঙ্গপাঙ্গ আছে তাদের নিয়ে তাড়াতাড়ি আসেন আর বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে উদ্ধার করেন। একটা স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিদ্যমান সংসদের বিরোধী দলের নেত্রী-- যিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দুইবার এদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন-- কীভাবে ওয়াশিংটন টাইম্সের মতো পত্রিকায় এরকম একটি লেখা লিখতে পারেন তার নানান ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। আমি সেদিকে যাবো না। এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করবার জন্য এদেশে অসংখ্য কলাম লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, পেশাপদার সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী আছেন। আমি শুধু এটুকু বলবো, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসাবে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর, বিদ্যমান সংসদের একজন বিরোধী দলীয় নেত্রীর এবং এদেশের কোটি মানুষের সমর্থনপুষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের একজন প্রধান নেত্রী এধরনের আত্মমর্যাদাহীন ভিখেরীয়ানায় আমি ভীষণ পরিমাণ গ্লানি বোধ করেছি। আমার আত্মসম্মানে ভীষণভাবে আঘাত লেগেছে। পুনরায় ক্ষমতায় যাওয়ার বেপরোয়া আবেগের বশবর্তী হয়ে কিংবা ক্ষমতা-লাভের অন্ধমোহে বেগম খালেদা জিয়ার এরকম একটি অদূরদর্শী পদক্ষেপের জন্য আমি মনে করি দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-জাত-লিঙ্গ-বয়স নির্বিশেষে যে কোন আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মানুষের অন্তরে সামান্য হলেও আঘাত লাগার কথা। যারা বেগম খালেদা জিয়াকে এরকম একটি চিঠি লিখতে পরামর্শ দিয়েছেন, চিঠির কনটেন্ট, কনটেক্সট, লিখল ও ভাষা-সংশোধন করবার কাজে সহায়তা করেছেন, তাদের হয়তো আত্মমর্যাদাবোধ না-থাকতে পারে কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার সেটা থাকা উচিত ছিলো বলে আমি মনে করি। কেননা, বেগম খালেদা জিয়া এখন আর কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। বেগম খালেদা জিয়া এখন আর একক কোন সত্তা নন, তিনি একটি সমষ্টিক সত্তার প্রতিনিধি। তাই, তাঁর যে কোন পদক্ষেপ তাঁর যতোটা না ব্যক্তিগত ক্ষতি কিংবা লাভালাভের বিষয় জড়িত, ততোধিক সমষ্টিগত লাভ ও কিংবা ক্ষতির প্রশ্ন জড়িত। মোটাদাগে রাষ্ট্রনীতির প্রশ্নও জড়িত। রাজনীতিবিদদের ভুলের মাসুল গুনতে হয়, এদেশের সাধারণ আম-জনতাকে। ইতিহাসে সে নজির অহরহ পাওয়া যাবে। তাই, ক্ষমতার বেপরোয়া কামড়া-কামড়ির কারণে মান-সম্মানবোধের ধারণা এদেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে ক্রমান্বয়ে লোপ পেলেও, এদেশের মানুষের আত্মমর্যাদাবোধ এবং আত্মসম্মানবোধ এখনও টনটনে। আর আম-জনতার সেই আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদাবোধের প্রতি যথাযথ সম্মান জানানো এদেশের রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক দায়িত্ব।

এটা সত্য যে, বেগম খালেদা জিয়ার এ লেখা নিয়ে বাংলাদেশে বেসুমার হইচই হচ্ছে। সবাই যখন এটাকে ’কলাম’ হিসাবে বাজার করছে, তখন অধ্যাপক আমেনা মহসিন ‘একাত্তর’ টিভির একটি টকশোতে (০১/০২/২০১৩) এ লেখাকে বলেছেন ‘চিঠি’। সংবাদপত্রে চাপানোর জন্য লেখা একটি ‘ব্যক্তিগত চিঠি’। আমার নিজের কাছে মনে হয়েছে এটি একটি ব্যক্তিগত ‘আহাজারি-নামা’ কিংবা একজন ক্ষমতা-কাতর মানুষের ‘বিলাপ-পত্র’ যা ক্ষমতায় যাওয়ার নানান তরিকার প্রায়োগিক কৌশিল হিসাবে বিশ্ব-মরুব্বীদের কাছে ধর্ণা দেয়ার রাজনৈতিক সাংস্কতির অংশ হিসাবে একটি ‘ফরিয়াদ-নামা’ পাঠানো হয়েছে, প্রধানত বিশ্বমোড়ল অবামা হুজুরের সহি পানি পড়া পাওয়ার অশেষ বাসনায়। এ-চিঠি কেন্দ্রীক আলোচনায় সমালোচনার তীর প্রধানত বেগম খালেদা জিয়ার দিকে ছোঁড়া হলেও, এখানে মনে রাখতে হবে যে, ঘরের ঘটনা কথা ‘আলগা’ লোকের কাছে নালিশ করবার মধ্যে নিজেরই মান-ইজ্জ্বত পাতলা হওয়ার বিষয়টি জড়িত-- এ সাধারণ সত্যটি রাজনীতিবিদরা বোঝেন না, তা কিন্তু নয়। বিষয়টি আসলে অন্য জায়গা অর্থাৎ যাকে এদেশের সাধারণ মানুষ ‘আলগা’ লোক মনে করেন, তাকেই আমাদের নেতা-নেত্রীরা ‘আপন’ মনে করছেন। এটাই, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ক্ষমতার পালাবদলের রাজনীতির ব্যকরণ। তবে, চিঠি লেখার ঘটনাটি কেবল বেগম খালেদা জিয়ার একার ‘পাপ’ নয় যে এটা নিয়ে বিস্তর চেচামেচি করে সে ‘পাপ’ সবাই মিলে সাফ করতে হবে। এটা বরঞ্চ এদেশের রাজনীতিবিদদের বিদেশ-তোষন নীতি, আমেরিকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মোড়লত্বের কাছে নিজেকে সমর্পন করবার নীতি ও রাজনীতিবিদদের রজানৈতিক-দেউলিয়াপনাকে সবার সামনে সুচারুভাবে অবমুক্ত করে; যা বিকার-বিহীন ভাবে লোক-দেখানো দেশপ্রেমের ফাঁকা বুলির নিছে সর্বদা ঢাকা পড়ে থাকে। বেগম খালেদা জিয়া নিজে এ লেখার মাধ্যমে সে অসুন্দর সত্যটিকেই অবমুক্ত করেছেন। সে বিবেচনায় বেগম খালেদা জিয়ার একটি ধন্যবাদ পাওয়া উচিত!

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

No comments:

Post a Comment