Monday, February 25, 2013

এশিয়া এনার্জি, ‘ফুলবাড়ী’র প্রতিরোধ ও জীবনের সৌন্দর্য

(দৈনিক যুগান্তর ১১/০২/২০১৩)

প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ইতিহাস মূলত: মানুষের ‘মানুষ’ হিসাবে পুনর্জন্মের ইতিহাস। মানুষের সত্যিকার মানুষ হয়ে উঠবার ইতিহাস। মানুষ প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ভেতর দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করে, নিজের জান, মাল, ভিটা, বসত, দেশ এবং কালকে রক্ষার জন্য শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়ায় এবং অসীম মানবিক-শক্তি দিয়ে শত্রুকে পরাজিত করে ইতিহাসের জন্ম দেয়। জন্ম দেয় নতুন সময়ের, নতুন করে জন্ম দেয় ‘মানুষ’ নিজেকেই। তাই, যেখানে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ঘটনা সংঘটিত হয়, সেখানে সৃষ্টি হয় ইতিহাসের নতুন ‘জন্মভূমি’। বাংলাদেশের ‘ফুলবাড়ী’ এখন প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আন্দোলনের ইতিহাসে সেরকম একটি নতুন ‘তীর্থভূমি’। সমকালীন ঘটনা-প্রবাহের ভেতর দিয়ে দেশ ও দশের স্বার্থ রক্ষার তাগিদে, রাজনৈতিক-দুবৃত্তায়ন থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষায়, অর্থনৈতিক-শোষণ ও শ্রেণী-বৈষম্য বিলোপের বাসনায় যথাক্রমের ‘তাহিরী স্কোয়ার’, ‘অকুপায়-ওয়াল স্ট্রিট’ কিংবা দিল্লীর ‘জন্তর-মন্তর’ প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ইতিহাসে যেমন নতুন ‘মেটাফোর’ সংযুক্ত করেছে, ‘ফুলবাড়ী’ও তেমনি প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আন্দোলনের ইতিহাসে আরেকটি নতুন উজ্জ্বল-সংযুক্তি। নিজের জীবন, ভূমি, পরিবেশ এবং প্রজন্মের ভবিষ্যৎ রক্ষায় মানুষের স্বতস্ফুর্ত প্রতিরোধের এক উজ্জ্বল নজির ‘ফুলবাড়ী’। তাই, ‘ফুলবাড়ী’ এখন আর বিশেষ কারো গ্রামের বাড়ি নয়। ঔ বিশেষ এলাকায় জন্ম নেয়া মানুষের একার ‘দ্যাশের বাড়ি’ নয়। ‘ফুলবাড়ী’ এখন এদেশের গরীব, মেহনতি, শ্রমজীবী, অধিকার-বঞ্চিত, নির্যাতিত, নিপিড়ীত এবং সমাজের চোখে নিম্নবর্গের মানুষের ‘জন্মভূমি’। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও বহুজাতিক কোম্পানির আগ্রাসন বিরোধী আন্দোলনের নতুন তীর্থভূমি। এদেশের সংবেদনশীল, দেশপ্রেমিক, বিপ্লবী ও সমাজের-পরিবর্তন-কামী জনগোষ্ঠীর জন্মভূমি। তাই, আমারও আজ ‘দ্যাশে’র বাড়ি ‘ফুলবাড়ী’!  

২০০৬ সালে জনরোষের ধাওয়া খেয়েও শিক্ষা হয়নি এশিয়া এনার্জির। ২০০৬ সালে ২৬ থেকে ৩০ আগষ্ট ফুলবাড়ীতে যে গণবিক্ষোভ হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন সরকার আন্দোলনকারীদের সাথে তথা স্থানীয় জনগণের সাথে একটি সমঝোতায় আসতে বাধ্যহয় এবং এশিয়া এনার্জি ফুলবাড়ী থেকে বিতাড়িত হয়। তখন একটি ছয়দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলো এবং তৎকালীন সরকার তথা রাষ্ট্র জনগণের তরফ থেকে দেয়া সেই ছয় দফা নির্শতভাবে মেনে নিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সম্পাদিত তিরিশ বছরের উন্মুক্ত কয়লা উত্তোলন চুক্তি বাতিল করা হবে, বাংলাদেশে এশিয়া এনার্জির কাজ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হবে, আর কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনন করা হবেনা, ভবিষ্যতে কোন্ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হবে, সেটা স্থানীয় জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই করা হবে। অথচ রাষ্ট্র জনগণের সাথে বেঈমানি করে এদেশের কিছু সুবিধাবাদি ও অর্থলিপ্সু তথাকথিত সুশীলদের সহায়তায় এশিয়া এনার্জিকে আবার ফুলবাড়ীতে প্রবেশ ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আর এশিয়া এনার্জির জায়গা থেকে এটা একটি ‘অবশ্য-করণীয়’ হয়ে উঠেছে, কেননা তারা ইতোমধ্যে ল-নের শেয়ার বাজারে বাংলাদেশের ফুলবাড়ীর কয়লা খনির নামে শেয়ার ছেড়ে মোট অংকের টাকা তুলে নিয়েছে। আর বাংলাদেশ-রাষ্ট্র এশিয়া এনার্জির এ-ভোয়ামি ও জালিয়াতিকে জায়েজ করবার জন্য জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সেই ধাওয়া-খাওয়া এশিয়া এনার্জিকেই পুনরায় ফুলবাড়ীতে প্রত্যাবর্তনের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। তাই, ফুলবাড়ীর মানুষের এ লড়াই কেবল এশিয়া এনার্জিও বিরুদ্ধে নয়; এ লড়াই একদিকে যেমন বহুজাতিক কোম্পানির কাছে বিক্রি হওয়া এদেশের কতিপয় সুশীলদের বিরুদ্ধে, অন্যদিকে জনগণের সাথে রাষ্ট্রের বেঈমানির বিরুদ্ধে।

আগেই বলেছি, জালিয়াতি করে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে এই এশিয়া এনার্জি ল-নের শেয়ার বাজারে বাংলাদেশের ফুলবাড়ীর কয়লা খনি দেখিয়ে শেয়ার বিক্রি করে। আর সে শেয়ার বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থে প্রতিপালিত হচ্ছে এশিয়া এনার্জি ও গ্লোবাল কোল ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) গ্যারী এন লাই, এশিয়া এনার্জির অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ এবং ‘কনসাল্ট্যান্ট’ নামক এক প্রজাতির দেশীয় দোসর। সাথে রয়েছে রাষ্ট্রীয় পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা। ফলে, গ্যারী এন লাই গং এদেশীয় দোসরদের সহায়তায় পুনরায় নানান ছল-চাতুরির আশ্রয় নিয়ে পুনরায় ফুলবাড়ীতে প্রবেশের মওকা খোঁজার তালে লেগে আছে। এদেশের ‘কনসাল্ট্যান্ট’ নামধারী টাকার বিনিময়ে বিক্রি হওয়া চরমভাবে আত্মপর, অর্থলোভী, দেশের স্বার্থবিরোধী কিছু শিক্ষিত ভদ্রলোকের মাথা সহজে কেনা যায় দেখে এশিয়া এনার্জি হয়তো ভেবেছে চরম শীতাক্রান্ত ফুলবাড়ীর ‘গরীব’ মানুষকে এ-শীতের মৌসুমে কিছু শীতবস্ত্র এবং কিছু টাকার লোভ দেখিয়ে বহুজাতিক কোম্পানির বিষাক্ত হাত তাদের মাথার ওপর বুলিয়ে দিয়ে কাজ হাসিল করা যাবে। এদেশের কিছু ‘পপুলার আইকন’কে ফুলবাড়ীর মানুষের সাথে এশিয়া এনার্জির সম্পর্ক তৈরী কিংবা এদেশের জনগণকে এশিয়া এনার্জির গুণগান গাওয়ার জন্য ইতোমধ্যে ভাড়া করা হয়েছে। কিন্তু এশিয়া এনার্জির কর্তাব্যক্তিরা ২০০৬ সালের ‘দৌঁড়’ খাওয়ার পরও এটা এখনও বুঝতে পারেনি যে, এদেশের কিছু কিছু শিক্ষিত ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর মাথা টাকা দিয়ে যত সহজে কেনা যায়, এদেশের গরীব মানুষের মাথা তত সহজে কেনা যায় না। কেননা, এদেশের গরীব মানুষের মাথা, দেহ, মগজ ও বিবেক খাঁটি মাটি দিয়ে তৈরী। তাই, মাটির ইজ্জ্বত, মাটির মান ও মাটির সুরক্ষার জন্য এদের মাথা কোন কিছুর বিনিময়ে বিক্রি হয় না। নিজের আত্মসম্মান রক্ষা, জান-মালের হেফাজত এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বসত-ভিটার নিশ্চয়তার জন্য এদেশের গরীব, মেহনতি ও শ্রমজীবী মানুষরা যে নিজেদের জীবন দিতে পারে সেটা ফুলবাড়ীর মানুষ এর আগেও প্রমাণ করেছে। নিজেদের জমি তাদের কাছে জীবনের চেয়েও বড়; এটা ফুলবাড়ীর মানুষ আবার প্রমাণ করলো গত ২৯ জানুয়ারী।

এশিয়া এনার্জির সিইও কিছু শীত-কম্বল নিয়ে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, পার্বতীপুর, নবাবগঞ্জ ও বিরামপুর এলাকায় বিতরণ করবে, এশিয়া এনার্জির পক্ষে কিছু পাবলিসিটি করবে এবং এ-দেশীয় কিছু দোসরদের সহায়তায় ও কিছু স্থানীয় দালালের সক্রিয়তায় নিজেদের অস্তিত্ব ফুলবাড়ীর মানুষের কাছে আবার জানান দেবে। ‘উন্নয়নের’ জোয়ারে এলাকাকে ভাসিয়ে দেয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেবে! আর গরীব মানুষের কাছে সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে নিজেরা ‘মহৎ’ ও ‘অবতার’ হিসাবে নাজিল হবে। সে মোতাবেক স্থানীয় প্রশাসনের সাথে বৈঠক করেছেন। কিন্তু এশিয়া এনার্জির আগমনের খবর ফুলবাড়ী, নবাবপুর, বিরামপুর ও পার্বতীপুরে পৌঁছানো সাথে সাথে হাজার হাজার বয়স-নির্বিশেষে নারী ও পুরুষ সদলবলে ‘যার যা-কিছু আছে’ তা নিয়ে রাস্তায় বেড়িয়ে পড়ে। ‘গ্যারি লাই যেখানে, প্রতিরোধ সেখানে’ শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরী করে। ইতোমধ্যে ‘বানের পানির লাহান’ মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় চলে আসতে থাকে। ফুলবাড়ি, বিরামপুর, পার্বতীপুর, নবাবপুর, দিনাজপুরের বিভিন্ন স্থানে যেমন নিমতলা মোড় বাসষ্ট্যান্ড, ঢাকা মোড়, খানপুর, পোড়াগ্রাম, রতনপুর, লক্ষিপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় সভা সমাবেশ শুরু হয়ে যায় এশিয়া এনার্জিকে প্রতিরোধ করবার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে। দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের সাথে মিটিং করে গ্যারি লাই আর বের হতে পারে না। জনগণের রুদ্ররোষ দেখে গ্যারি লাই কোন রকমে পালিয়ে ফুলিবাড়ী ছেড়ে চলে যায়। প্রকৃতপক্ষে, পালিয়ে আসা ছাড়া জান বাঁচানোর আর কোন পথ তখন খোলা ছিলো না। এশিয়া এনার্জির সিইও এ ‘দৌঁড়’ দেশবিরোধী এ-চক্রের সাথে যারা জড়িত তাদের সকলের জন্য একটি বিরাট ‘ম্যাসেজ’। এদেশের খেটে খাওয়া, শ্রমজীবী, গরীব ও মেহনতি মানুষ নিজের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য, আত্মসম্মান উঁচিয়ে রাখার জন্য এবং দেশ ও দশের প্রতি পরম দায়িত্বশীলতা থেকে ‘প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের’ নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে জানে। যে দেশের মানুষ মুখের ভাষার জন্য জীবন দিতে পারে, ফুলবাড়ীর মানুষ সে চেতনার সত্যিকার উত্তরাধিকার বহন করে তাদের অস্তিত্বে, মজ্জায়, রক্তে ও শোণিতে। যে দেশের মানুষ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম মাতৃভূমির জন্য হাসিমুখের শত্রুর ছোড়া বুলেট বুকে ধারণ করতে পারে, সে দেশের মানুষ নিজের ভিটা-মাটি রক্ষার জন্য পুনরায় জীবন দিতে পারে। আর যে মানুষ দেশ ও দশের জন্য জীবন দিতে পারে, সে মানুষ প্রয়োজন হলে জীবন নিতেও পারে। সুতরাং মানুষের এ সীমাহীন মানবিক-শক্তির বিরুদ্ধে গিয়ে, মানুষের জান-মাল রক্ষার তীব্র আকাক্সক্ষার বিরুদ্ধে গিয়ে, মানুষের বিপুল বিল্পবী চেতনার বিরুদ্ধে গিয়ে, মানুষের জন্য সত্যিকার কোন ভালো ফল বয়ে আনা সম্ভব নয়। এ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সত্যটি একটি নির্দিষ্ট সময়-ক্রমের জন্য এদেশের রাষ্ট্র-ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আসা শাসক-শ্রেণী যতদ্রুত বুঝতে পারবে, ততই মঙ্গল। পরিশেষে, প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের একটি উদ্ধৃতি দিতে চাই। তিনি গত ২৯ জানুয়ারীর ফুলবাড়ী তাৎক্ষনিকভাবে সংগঠিত গণবিদ্রোহ নিয়ে সামাজিক-যোগাযোগে লিখেছেন, ‘মানুষ যখন মানুষ হয়ে উঠে, তখন স্বাধীনতা, আত্ম-সম্মান আর সমষ্টির প্রতি দায়িত্ববোধের কাছে টাকা পয়সা কিংবা বৈষয়িক-সুবিধা তুচ্ছ হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ তখন হয়ে উঠে অসাধারণ। এই মানুষদের ভয় বা লোভ দেখিয়ে কাবু করা যায় না। যারা কিছু টাকার লোভে দাসত্ব-বরণ করে, নিজেদের মাথা ও সম্মান বিক্রি করে এবং দেশের সর্বনাশ করতে দ্বিধা করেনা, তারা জীবনের এ সৌন্দর্য কোনদিন বুঝবে না’।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

No comments:

Post a Comment