Tuesday, February 26, 2013

ইতিহাসের যোগসন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ

(দৈনিক ভোরের কাগজ, ২৭.০২.২০১৩)

কাদের মোল্লার ফাঁসি ও অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে দেশের আপামর জনসাধারণের বিপুল গণসমর্থন নিয়ে গড়ে উঠা শাহবাগের ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির খুঁটি ধরে একটা শক্ত ঝাঁকুনি দিয়েছে। সে ঝাঁকুনিতেই কেউ কেউ সজোরে ধাক্কা খেলেও কেউ কেউ পড়েছে চরম অস্তিত্বের সংকটে এবং তন্মধ্যে একাত্তরে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতা বিরোধী-অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি অন্যতম। কেননা, গণজাগরণ মঞ্চের মূল দাবিই হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের এবং একাত্তরে মানবতা বিরোধী অপরাধীদের আন্তর্জাতিক ট্রাবুনালের মাধ্যমে বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা। ফলে, জামায়াতের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আর বিএনপি তো রীতিমতে কিংকর্বব্যবিমূঢ় হয়ে হিতাহীত জ্ঞান হারিয়ে বসেছে। তাই, তারা একবার জামায়াতের পক্ষ নেয়, আবার ওলামা মাশায়াকদের পক্ষ নেয়, একদিকে গণজাগরণ মঞ্চকে সাধুবাদ জানায় অন্যদিকে চিল্লচিল্লি করে বলে ‘এটা আওয়ামীলীগের সাজানো নাটক’। আর আওয়ামীলীগ তার নিরলসভাবে চেষ্টা নিরন্তর অব্যাহত রেখেছে, কীভাবে গণজাগরণ মঞ্চের রাজনৈতিক ফলাফলকে নিজের গোলায় ভরতে পারে। কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চের মূল দাবি আওয়ামীলীগ কিংবা বিএনপির বিরুদ্ধে সরাসরি না-গেলেও জামায়াত-শিবির তাদের সরাসরি নিশানা। কেননা, একাত্তরে মানবতাবিরোধী জঘন্য যুদ্ধাপরাধ করেও এদেশের রাজনীতিবিদদের সুবিধাবাদি চরিত্রের কারণে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার লড়াইয়ের অনৈতিক প্রতিযোগিতার ফাঁক দিয়ে জামায়াত আদরে-আবদারে এদেশে রাজনৈতিক ময়দানে একটি জায়গা করে নিয়েছে। এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মভীরুতাকে কাজে লাগিয়ে ইসলামের শামিয়ানা ব্যবহার করে জামায়াতের রাজনীতি ফুলে ফেঁপে উঠেছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সাথে নির্বাচনী জোট করে এবং ২০০১ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে মন্ত্রীত্ব পেয়ে জামায়াত রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হয়ে উঠে। ফলে, জামায়াতের বিরুদ্ধে শক্ত রাজনৈতিক অবস্থান নেয়া যখন আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নৈতিক অবস্থান থেকে কমজোর হয়ে পড়েছে, তখন এদেশের নতুন প্রজন্মের তরুণতুর্কীরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে এবং একাত্তরের রাজাকার-আলবদর বাহিনী জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিতে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তৈরী করেছে গণজাগরণ মঞ্চ। তাই, এ গণজাগরণ মঞ্চকে কেন্দ্র করে গোটা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেভাবে মানুষের স্বতষ্ফুর্ত সম্মিলন ও সংহতির জোয়ার উঠেছে, তাতে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি নতুন পাটাতন তৈরী হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। তাই, জামায়াত তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছে। নানান নামে ও বেনামে নানান ছল-চাতুরির আশ্রয়ে জামায়াত তার অস্তিত্ব রক্ষা করবার জন্য ইতোমধ্যে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এবং তাই ‘জামায়াত মরণ-কামড় দেবে’ বলে ঘোষণা দিয়েছে--এ মর্মে পত্রিকান্তরে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

জামায়াত তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে মোকাবেলা করবার রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে ব্লগারদের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্মের অবমাননার মিথ্যা অজুহাত এনে একধরণের মৌলবাদি আবহ তৈরী করার চেষ্ট করছে। ‘রাসুলের বিরুদ্ধে আপত্তিকর বক্তব্য দেয়া’, ‘কোরআন-হাদিসের অবমাননা’, ‘নাস্তিকদের সমাবেশ’ প্রভৃতি মিথ্যা প্রপাগা-া তৈরী করে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে এক ধরনের ধর্মীয় উন্মদনা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। জামায়াতের সেই পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল গণজাগরণ মঞ্চকেও মোকাবেলা করবার কৌশল হিসাবে প্রয়োগ করার অপচেষ্টা করছে। ‘মরলে শহীদ, বাচলে গাজী’ বলে কওমী মাদ্রায় পড়–য়ার শিক্ষার্থীদের জেহাদের ত্যাজে উত্তেজিত করছে। তারই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে সম্প্রতি সমমনা ইসলামী সংগঠন ও ওলামা-মাশায়েকের নামে সারা দেশের সহিংস তা-ব চালানো হয়েছে। দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে, বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন জায়গায় গণজাগরণ মঞ্চ ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি শহীদ মিনারে হামলা করাসহ জাতীয় পতাকা পোড়ানোর মতো ঘটনা ঘটিয়ে সারা দেশে একটি ত্রাসের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। চট্টগ্রামে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ শ্লোগান দেয়া হয়েছে বলে পত্রিকান্তরে খবর প্রকাশিত হয়েছে। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরু থেকেই ছিল অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ এবং সৃজনশীল। দেশব্যাপী দাড়িয়ে তিন মিনিট নিরবতা পালন, মোমবাতি জ্বালিয়ে সংহতি প্রকাশ, একাত্তরের শহীদদের উদ্দেশ্যে বেলুন উড়ানো কিংবা পতাকা মিছিল প্রভৃতি অত্যন্ত সৃজনশীল কর্মসূচির মাধ্যমে গণজাগরণ মঞ্চ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি জানিয়ে আসছে। এবং এ দাবির স্বপক্ষে ব্যাপক জনমত তৈরী করেছে। আবৃত্তি, গান, নাচ, নানান চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে তরুণপ্রজন্মের মুক্তিসেনানীরা নিজেদের দাবির জানান দিচ্ছে। এ গণজাগরণ শঞ্চ এক অর্থে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির স্বপক্ষে গোটা দেশের অধিকাংশ মানুষকে এক কাতারে এনে শামিল করেছে। অথচ, এ গণজাগরণ মঞ্চকে মোকাবেলা করবার নামে মিথ্যা ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে দেশব্যাপি একটা ব্যাপক সহিংসতা ঘটানো হলো এবং একটা ভীতিকর অবস্থার অবতারনা করা হলো। একদিকে শান্তিপূর্ণ ও সৃজনশীল পন্থায় নিজেদের দাবি প্রকাশের রুচিশীল অনুশীলন অন্যদিকে মিথ্যা ধর্মীয় উন্মত্ততায় সহিংস জ্বালাও-পোড়াও। একদিকে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি অন্যদিকে যদ্ধাপরাধীদের রক্ষার উচ্ছৃংখলতা। একদিকে গোটা দেশের অধিকাংশ মানুষের পূর্ণ সমর্থন, অন্যদিকে কতিপয় যুদ্ধাপরাধী ও তাদের অন্ধ সমর্থক। একদিকে ইতিহাসের দায় মুক্তির আবেগ ও আকুলতা অন্যদিকে নতুন করে সহিংসতার ইতিহাস সৃষ্টির দৌড়ঝাঁপ। এখন জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কোন দিকে যাবে।

ধর্মীয় সংগঠনের ব্যানারে দেশব্যাপি জামায়াত-শিবির যে ভয়াবহ ও নারকীয় তা-ব চালিয়েছে, তা দেখে অনেকে দেখি বেশ রেগে, আবেগে আর ক্ষোভে জ্বলছে; আর পরম দেশপ্রেমের বোধ থেকে ভীষণ পরিমাণ কষ্ট পাচ্ছে। তাই, বিগত ৫ ফেব্রুয়ারি থকে শাহবাগে টানা দিনরাত চব্বিশ ঘন্টার আন্দোলনের কিছুটা বিরতি দিলেও, মানুষ দলে দলে আবার সেই শাহবাগেই হাজির হলো। দলে দলে মানুষ প্রতিরোধ, প্রেরণা আর প্রাণের চত্বর শাহবাগে আবার মিলিত হলো। কষ্টে, দুঃখে আর ক্ষোভে সবাই একদিকে যেমন ব্যদনার্ত, অন্যদিকে তেমনি জাগরণের নতুন প্রেরণায় নতুন করে উজ্জীবীত। কিন্ত আমি মনে করি, এরকম একটা ঘটনার খুবই দরকার ছিলো। দেশের মানুষের কাছে এদের মুখোশ নতুন করে উন্মোচনের দরকার ছিলো। এটা জানা খুবই জরুরি যে, কারা জাতীয় পতাকা পোড়ায়, কারা শহীদ মিনারে হামলা করে, কারা ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ শ্লোগান দেয় ও অন্তরে সে দর্শন ধারণ করে, কারা গণজাগরণ-মঞ্চে অগ্নিসংযোগ করে, কারা মসজিদকে নিজেদের সন্ত্রাসী হামলার আস্তানা বানায়। যদিও এসব (কু)কীর্তি সবারই কম-বেশি জানা কিন্তু সে জানাজানির মধ্যে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি মার্কা প্রতিপক্ষকে উপস্থাপনার একটা রাজনীতি ছিল কিংবা সত্যকে সেভাবে উপস্থাপনা করবার একটা অনুশীলণ ছিল। কিন্তু এখন তো সেটা নাই। এখনে একটি পক্ষ হচ্ছে এদেশের শ্রেণী-বয়স-লিঙ্গ-জাত-পাত-ধর্ম-বর্ণ-পেশা-নিরপেক্ষ গণমানুষের আবেগে ও সত্যিকার দেশপ্রেমের সমাবেশ ‘শাহবাগ’, অন্যটি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ও তাদের স্বার্থান্ধ কতিপয় সমর্থক। এখন, জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যারা জাতীয় পতাকা পোড়ায় তাদের পক্ষে যাবে, নাকি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ তারুণ্যের গণজাগরণের পক্ষে যাবে। জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা ‘শহীদ মিনারের সাথে থাকবে’ নাকি ‘শহীদ মিনারে যারা হামলা করে’ তাদের পক্ষে যাবে। হিসাব একেবারেই সোজা। এ-ঘটনা দেশ, দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস এবং গণমানুষের পক্ষ ও প্রতিপক্ষের সীমারেখা আরো ষ্পষ্ট করেছে। সুতরাং এ ভেদ-রেখায় আরো জরুরিভাবে দেখার বিষয় হচ্ছে সরকার কার পক্ষ নেয়। তাই, রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি অনুধাবনের জন্য এ সময়টা পরিণত হয়েছে ইতিহাসের সত্যিকার যোগ-সন্ধিক্ষণে। গণজাগরণ মঞ্চকে কেন্দ্র করেই এবং এর সত্যিকার পক্ষ-বিপক্ষকে কেন্দ্র করেই নির্মিত হবে আগামী দিনের বাংলাদেশের রাজনৈতিক পাটাতন। লিখিত হবে, তারুণ্যের জাগরণের ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠা এবং তৃণমূলের মানুষের বিপুল সমর্থন ও অংশগ্রহণে গণআন্দোলনের মর্যাদা পাওয়া ‘সামাজিক বিপ্লবের’ নতুন ইতিহাস। আমরা এখন সেই ইতিহাসের যোগসন্ধিক্ষণে বসবাস করছি। পার করছি নতুন ইতিহাসের জন্মযন্ত্রণার সোনালী সকাল।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

No comments:

Post a Comment