Monday, February 25, 2013

পার্বত্য চট্টগ্রাম: প্রতিমন্ত্রীর (কা-)জ্ঞান!

(দৈনিক মানবকন্ঠ, ৩০/০১/২০১৩)

ক্ষমতা ও আত্মপরিচয়ের সম্পর্ক বিপ্রতীপ। বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষমতা মানুষকে তার নিজের পরিচয় ভুলিয়ে দেয়। ক্ষমতার গরমে মানুষের কোন হিতাহীত জ্ঞান থাকে না। রাজনৈতিক ক্ষমতা তাই পদ ও পদবীতে নয়, চিন্তা ও চেতনায় সংক্রমিত হয়। ফলে, মানুষ নিজের আত্মপরিচয় ভুলে যায়। এর একটি নগদ নজির পাওয়া যায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বাবু দীপংকর তালুকদারের বক্তব্যে। গত ২৩ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সহযোগিতায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কতৃক আয়োজিত “জাতিগত সংখ্যা-লঘু সংক্রান্ত আইএলও-র সদন” শিরোনামে আয়োজিত এক সেমিনারে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, পার্বত্য ভুমি কমিশনের কার্যকারিতা, পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি আদিবাসী নির্যাতন নিয়ে তিনি যে-সব মন্তব্য করেছেন, আমি রীতিমত চিনতে পারছিলাম না বাবু দীপংকর তালুকদার কি আদৌ পাহাড়ি আদিবাসী কেউ? তিনি কি নিজের আত্মপরিচয় ভুলে গেছেন? নাকি তিনি তার পাহাড়ি আদিবাসী হিসাবে নিজের আত্মপরিচয় পাল্টে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাধর মন্ত্রীতে পরিণত হয়েছেন? তখনই, ক্ষমতা ও আত্মপরিচয়ের বিপ্রতীপ সম্পর্কের হাইপোথেসিস সত্য প্রমাণিত হয়। পার্বত্য-চুক্তি বাস্তবায়নের এটিও একটি অন্যতম কারণ যে, শিক্ষিত কিন্তু দলীয় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী পাহাড়ি আদিবাসীরা নিজেদের আত্মপরিচয় ভুলে, পাহাড়ি আদিবাসীদের নিত্যদিনের বঞ্চনা ও গঞ্জনার প্রতি বিমুখ হয়ে, দলীয় রাজনীতির দাসে পরিণত হন। ক্ষমতার দেমাগে নিজের আত্মপরিচয় ভুলে যান। নিজের জাতিসত্তার আবেগ ও অনুভূতি এবং অপ্রাপ্তি ও নিত্য-নির্যাতনের কথা না-বলে, রাষ্ট্রের ভাষায় কথা বলেন; যে রাষ্ট্র দশকের পর দশক ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি দমন-পীড়ন ও জবরদস্তি-মূলক শাসন জারি রেখেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ‘শন্তিচুক্তি’ নামে পরিচিত ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ‘পার্বত্য-চুক্তি’ বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় আসা বিভিন্ন সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে ইঁদুর-বিড়াল খেলা খেলেছে প্রায় পনের বছর। কিন্তু এ-খেলার কোন গ্রহণযোগ্য ও ইতিবাচক ফলাফল নাই। বহু আহাজারি, বহু বিলাপ এবং বহু ধরণের প্রলাপ হয়েছে, কাজের কাজ খুব একটা কিছু হয়নি। ১৯৯৭ সালের আগে এবং পরে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ পাহাড়ি আদিবাসীদের জীবনের তেমন কোন গুণগত পরিবর্তন হয়নি। রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়টি এখনও সুদূর পরাহত। আত্মমর্যাদা নিয়ে মানুষ হিসাবে বেঁেচ থাকার নূন্যতম আকাক্সক্ষাটাও টালমাটাল। পার্বত্যচুক্তি স্বাক্ষরের পরও খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, লুন্ঠন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কম হয়নি। তথাপি পাহাড়ের আদিবাসী মানুষ এখনও আশা করছে যদি শান্তিচুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়, তাহলে কিছুটা হলেও মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারবে। পার্বত্যভূমি কমিশন নিয়ে অনেক র্সাকাস হয়েছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এ-সেমিনারেই মত প্রকাশ করা হয় যে, ‘ভূমি কমিশন গত তিনবছরে একবিন্দুও আগাতে পারেনি’ অথচ, প্রতিমন্ত্রী বললেন, ‘পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংস্কার নিয়ে ভূমি ও আইন মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। তবে, আইনের কিছু ধারা সংশোধন না-করেও সমঝোতার ভিত্তিতে আইনটিকের কার্যকর করা সম্ভব। কিন্তু এ-বিষয়ে কোন পক্ষই ছাড় দিচ্ছেন না’। কোন পক্ষ ছাড় দেবে? পাহাড়ি আদিবাসীরা ছাড় দেবে? কেন? আমার জায়গা থেকে আমাকে তুলে দেবেন, আর সমঝোতার ভিত্তিতে আইন করে অন্যকে সে জায়গায় থাকার বন্দোবস্ত করে দেবেন, আর আমি ছাড় দেবো? বাবু দীপংকর তালুকদার কার স্বার্থে কাজ করেন? কার জন্য কাজ করেন? তিনি কী একজন আদৌ পাহাড়ি আদিবাসী? আমি তখন তাঁর পরিচয় ভুল করে বসি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ঐ একই সভাতেই যখন বলেন ‘শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে যত কথা বলা হয়, বাস্তবে কাজ ততটা হয়নি’। আর প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার অনেক কিছু করেছে’। এ প্রতিমন্ত্রী কী সত্যিই পাহাড়ি আদিবাসী কোন জাতিসত্তার মানুষ? আমার আবার ভ্রম হয়। আমি রীতিমত কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে যাই, যখন দেখি পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী নারী-ধর্ষণ ও নারী-নির্যাতনের ঘটনা আশংকাজনক হারে বেড়ে গেলেও-- যা বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে-- তিনি ক্রমবর্ধমান আদিবাসী নারী-ধর্ষণের ঘটনাকে জায়েজ করার জন্য এর পক্ষে বক্তব্য দেন। তিনি বললেন, ‘সারা বিশ্বে পারভারশন (যৌন বিকৃতি) বেড়ে গেছে। তাই, ধর্ষণের সংখ্যা বেড়েছে। আলাদা করে পাহাড়ি মেয়েদের ওপর নির্যাতন বাড়েনি’ (প্রথম আলো, ২৪/০১/২০১৩)। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিমন্ত্রী হিসাবে এবং পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর একজন হয়েও পাহাড়ে সংঘটিত ক্রমবর্ধমান নারী-ধর্ষণের স্বপক্ষে কীভাবে তিনি সাফাই গাইলেন? আসলে বাবু দীপংকর তালুকদার নিশ্চয় ভুলে গেছেন, তিনিও একজন পাহাড়ি আদিবাসী। ক্ষমতার তেজ জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়েছে বাবু দীপংকর তালুকদারের আত্মপরিচয়। রাজনৈতিক ক্ষমতা এমন সর্বনাশা খাদক যা কেবল মানুষের মানবিক গুণাবলী, আবেগ ও বিবেককেই সুস্বাদু খাদ্য বানায়-না, মানুষের নিজের আত্মপরিচয়কেও গোগ্রাসে গিলে খায়। বাবু দীপংকর তালুকদার, আয়নার একবার নিজের চেহারাটা দেখে নেবেন; তারপর নিজেকে জিজ্ঞেস করবেন, আপনি কি সত্যিই পাহাড়ি আদিবাসী নাকি সেটেলার বাঙালি?

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

No comments:

Post a Comment