Monday, February 25, 2013

শাহবাগের আগুনে জ্বলে-পোড়ে যাক চার-দশকের পাপ

(দৈনিক যুগান্তর, ২৪/০২/২০১৩)

তরুণরা যখন জাগে তখন জীবনের অন্তর্নিহিত তাগিদ ও আবেগ নিয়ে জাগে। তরুণরা যখন জাগে, তখন অন্যকে জাগিয়েই জাগে। তরুণরা যখন সত্যিকার অর্থে জাগে, তখন তারুণ্যের এ জাগরণের সাথে নতুন করে জেগে উঠে সমাজ, সময় ও সমকালের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ। এ-ক্ষোভ তখন জীবন-জাগানিয়া বিক্ষোভের আকারণ ধারণ করে নির্মাণ করে সমাজের নতুন পাঠাতন। তারুণ্যের এ-জাগরণের মধ্য দিয়ে সমাজের সনাতন অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানগুলোর গুণগত রূপান্তরের ভেতর দিয়ে জেগে উঠে নতুন সমাজ। এ-জাগরণ নির্মাণ করে মানুষের সত্যিকার ‘মানুষ’ হয়ে উঠবার নতুন ইতিহাস। ‘শাহবাগ’ আজ তারুণ্যের এ-বিপুল-জাগরণী শক্তি নিয়ে জেগে উঠবার জন্মভূমি। ‘শাহবাগ’ আজ জীবনের, দর্শনের ও আদর্শের আগুনে জ্বলে উঠবার অগ্নিভূমি। ‘শাহবাগ’ আজ মানুষের ‘মানুষ’ হিসাবে পুনর্জন্মের মাতৃভূমি। তাই, মানুষের এ জেগে ও জ্বলে উঠবার, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের, ক্ষোভ ও বিক্ষোভের কিংবা বিদ্রোহ ও বিপ্লবের ইতিহাসে ‘শাহবাগ’-এর নাম সংযুক্ত হবে নতুন উচ্চতায়। ‘শাহবাগ’ যেমন জন্ম দিয়েছে তরুণ-প্রজন্মের আবেগ, ক্ষোভ ও বিক্ষোভকে, তরুণ প্রজন্মের জ্বলে উঠবার এ প্রজ্জ্বল ইতিহাস বিপ্রতীপে জন্ম দিয়েছে ‘শাহবাগ’কে। ‘নতুন প্রজন্মের এ-জেগে উঠা’ এবং ‘শাহবাগের এই যে ইতিহাস হয়ে উঠা’ উভয় ঘটনা’ই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী, যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিকে ভরকেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। অতএব, তারুণ্যের এ জাগরণ কিংবা ‘শাহবাগে’র এ ইতিহাস হয়ে উঠবার সাথে সাথে ইতিহাসের পরিশুদ্ধির প্রশ্ন্ও এখানে সমানভাবে জড়িত। যে জাগরণ কোন জাতিকে ইতিহাসের দায় থেকে মুক্তি দেয়, মুক্তিযুদ্ধের অমীমাংসিত এজেন্ডার মীমাংসার প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে, যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিকে জনপ্রিয়তার মানদন্ডে ন্যায্যাতা দেয় এবং সবধরণের রাজনৈতিক ছল-চাতুরির ঊর্ধে¦ উঠে সত্যিকার দেশপ্রেমের দর্শনে গোটা দেশের মানুষকে জাগিয়ে তুলতে পারে, সেটা তখন কেবল আর ইতিহাসের সীমায় আটকে থাকেনা; সেটা হয়ে উঠে ইতিহাসের অধিক কিছু। কালের ডাকে জন্ম নিয়েও সে ইতিহাস ভ্রমণ করে কালান্তরে। সমকালের রচনা হলেও সে ইতিহাস হয়ে উঠে মহাকালের প্রেরণা। তাই ‘শাহবাগ’ এখন আর কেবল সমকালের যন্ত্রণা নয়, এটা এখন মহাকালের মন্ত্রণা। ‘শাহবাগ’ এখন আর ইতিহাস নয়, ইতিহাসের ইতিহাস হয়ে উঠবার ইতিহাস। মানুষের জেগে উঠবার ইতিহাসের ইতিহাস।  

‘শাহবাগ’-এর বিদ্রোহ ও বিক্ষোভের আগুণ ছড়িয়ে গেলো সবখানে। নতুন প্রজন্মের কমিটমেন্ট এবং দেশপ্রেমের জোয়ারের কাছে আজ ভেসে গেছে আইন-আদালত জটিল হিসাব-নিকাশ, নীতিহীন-রাজনীতি, রাজনীতির কূটনীতি, সকল প্রকার মৌলবাদ, মধ্যবৃত্তীয় নিরপেক্ষতার সুবিধাবাদ, শ্রেণী-বয়স-লিঙ্গ-জাতি-বর্ণ-ধর্মের কুটিল ভেদাভেদ, সকল ধরণের ইহজাগতিক-ভন্ডামি এবং দেশের প্রশ্নে নির্লিপ্ত থাকবার সুবিধাবাদি-অনুশীলন। আজ নতুন প্রজন্মের ক্ষোভ, ক্রোধ, বিক্ষোভ ও বিপ্লবের আগুণ ছড়িয়ে পড়ছে কেন্দ্র থেকে প্রান্তে; আর প্রান্ত থেকে অণু-প্রান্তে। প্রান্তের সে আগুণ পুনরায় তাপ দিচ্ছে কেন্দ্রকে। সে তাপে কেন্দ্র আরো জ্বলে উঠছে দ্বিগুণ ত্যাজে। একে বলে তারুণ্যের জাগরণ। একে বলে জীবনের জাগরণ। জীবন যখন জাগে, তখন ইতিহাসের জন্ম-যন্ত্রণা শুরু হয়। বাংলাদেশের মানুষ এখন নতুন ইতিহাসের জন্ম-যন্ত্রণা দেখছে। তাই, সমাজের শৃঙ্খল ভাঙার এ জোয়ারকে কোন কিছু দিয়ে দাবিয়ে রাখা যাবেনা। কেননা, এ জোয়ার ইতিহাস সৃষ্টির জোয়ার। এ জোয়ার সময়ের মহাকাব্যে রচনা করে নতুন বিপ্লবের কাব্য। এ দেশের জন্মের শত্রু, একাত্তরের রাজাকার, পাকিস্তানের দোসর, লুন্ঠনকারী, মা-বোনের ইজ্জত হরণকারী, গণহত্যাকারীদের জায়গা এ তরুণ প্রজেন্মের কাছে নাই। আর যারা এতোদিন এদের লালন-পালন-ভরণ-পোষন করেছে, তাদের জন্যও এটি একটি বিরাট বার্তা। তাই, আদি পাপের প্রায়শ্চিত্য করবার সময় এটা। আদিপাপের কাফ্ফারা দেবার সময় এটা। অন্যথায়, তার রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে অত্যন্ত চড়া দামে। ‘রাজনৈতিক চাতুরতায় লোক-দেখানো দেশপ্রেম’ কিংবা ‘নির্বাচনী-জোট করবার গোপন বাসনায় সুবিধাবাদি নিরবতা’--কোনাটাতেই আজ কাজ হবে না। জনগণ আজ জেগেছে। তরুণ প্রজন্মের তারুণ্যের জাগরণের ভেতর দিয়ে জেগেছে মানুষের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা দেশপ্রেম। মানুষের ভেতর জেগেছে মানুষ। জন-আকাঙ্ক্ষা, গণদাবি এবং আম-জনতার আবেগকে সম্মান কববার সময় এটা। তাই, ‘বানের পানির লাহান’ মানুষ যোগ দিচ্ছে ‘শাহবাগে’ কিংবা এদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষ সৃষ্টি করছে এক একটি নতুন ‘শাহবাগ’। এভাবেই গোটা দেশ যেন একটি বিরাগ ‘শাহবাগ’ হয়ে উঠেছে। ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যার মধ্য দিয়ে সে আগুনে ঢালা হয়েছে ঘি। ফলে, রাজীবের মৃত্যুর শোকের ভেতর দিয়ে দ্বিগুণ শক্তিতে বলিয়ান হয়ে শাহবাগ আজ ক্ষোভে-বিক্ষোভে অধিকতর ত্যাজে জ্বলে উঠছে এদেশের আনাচে কানাচে। ‘এরকম বাংলাদেশ কখনও দেখেনি কেউ।’  

তারুণ্যের এ-জাগরণ আরো একটি বিষয় দিবালোকের মত সাফ করেছে। এদেশের গণতন্ত্র, দেশপ্রেম, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ইতিহাস শেষ বিচারে এদেশের তরুণদের হাতেই সত্যিকার নিরাপদ। রাজনীতিবিদরা গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ইতিহাসের ‘ডিলারশীপ’ নিয়ে বিগত চার দশকে খুচরা হিসাবে বেচা-বিক্রি করে নিজেদের আখের গুছিয়েছে। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের পায়তারায় কিংবা ক্ষমতার অন্ধমোহে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের সাথে রাষ্ট্র-ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা করেছে। তাই, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জঘণ্য মানবতা-বিরোধী অপরাধ করার পরও এদেশের রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতার কারণে স্বাধীনতা-বিরোধী চক্র এদেশের আলো-বাতাসে ফুলে-ফেঁপে কাল-সাপের রূপ ধারণ করেছে। ‘শাহবাগের’ প্রজন্ম আজ জেগে উঠেছে। যুদ্ধাপরাধীদের এবং একাত্তরে সংঘটিত মানবতা-বিরোধী অপরাধীদের আর কেউ বাঁচাতে পারবে না। তাই, ‘শাহবাগের’ এ-ইতিহাসের গলায় যেন কেউ কোন দলীয় মালা না-পরাতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তারুণ্যের এ জাগরণকে এবং এ-জাগরণের ফসলকে কেউ যেন রাজনৈতিক গোলায় না-ভরে ফেলে। ‘শাহবাগ’ বিপ্লবের ফসল যেন শেষ পর্যন্ত জনগণের গোলায় যায়, সেদিকেও সকলকে সজাগ থাকতে হবে।  

‘শাহবাগ’ গণ-আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ‘হিসাব’ একেবারেই সোজা হয়ে উঠেছে। ‘যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই’-- যারা এ দাবির পক্ষে আছেন তারা ‘হ্যাঁ’ বলুন আর যারা এ দাবির বিপক্ষে আছেন তারা ‘না’ বলুন। হিসাব নিকাশ পরিষ্কার। কোন ছলচাঁতুরি নাই। কোন ভান কিংবা ভনিতা নাই। সকল মুখোশ আজ খুলে পড়ুক। সকল ধোঁয়াশা আজ সাফ হয়ে যাক। ইতিহাস আজ মুক্তি পাক। জাতি আজ কলঙ্কমুক্ত হোক। জাতি আজ কুলাঙ্গারমুক্ত হোক। আজ যে আগুণ ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে, সে আগুণে জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাক সমাজের সকল শ্রেণী-বৈষম্য, জাত-পাতের সকল সমাজ-নির্মিত ভেদাভেদ। জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাক সমাজের সকল জীর্ণতা, হীনতা এবং মূঢ়তা। ‘শাহবাগের’ আগুণ আজ জ্বলে উঠুক গ্রামে, গঞ্জে, পাড়ায়, মহল্লায়, চিন্তা ও চেতনার অলিতে-গলিতে। এ-আগুণ জ্বলুক বিবেকে, মগজে, শোণিতে। জ্বলে-পোড়ে যাক, চর-দশকের পাপ। 

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

No comments:

Post a Comment