Monday, February 25, 2013

‘ছোটলোকে’র লাশ বনাম ‘বড়লোকে’র রাষ্ট্র!

(দৈনিক যুগান্তর, ২৯/০১/২০১৩)

সন্দেহাতীতভাবেই, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে যে কটি শিল্পের অভাবনীয় বিকাশ ঘটেছে, তন্মধ্যে তৈরী পোষাক শিল্প অন্যতম। কিন্তু এদেশের তৈরী পোষাক শিল্পের বিকাশ ও বিস্তার লাশের মিছিলে নতুন লাশের নিত্য-নতুন সংযুক্তির সমান্তরালে বেড়ে উঠেছে। গার্মেন্ট্সের ভেতরে আগুণে পোড়া লাশ, বিদ্যুতের শর্ট সার্কিটে আটকে যাওয়া লাশ, দেয়ালের নিচে চাপা পড়া লাশ, হুড়োহুড়ির মধ্যে পায়ে দলিত হওয়া লাশ, জীবন-বাচাঁনোর চেষ্টায় চ্যাপ্টা হওয়া লাশ, বন্ধ শেকলের ভেতরে দম-বন্ধ হওয়া লাশ, কিংবা পেটের দায়ে রাস্তায় নেমে পুলিশের গুলি খাওয়া লাশ। এভাবেই লাশের মিছিলে যুক্ত হচ্ছে নতুন লাশ, আর তৈরী পোষাক শিল্পের তর তর করে বিকাশ ঘটছে! মালিক শ্রেণীর বিকাশ ঘটছে। একটির জায়গায় দুটি কারখানা হচ্ছে। ফলে, লাশের মিছিলে দু’টি লাশের জায়গায় সামিল হচ্ছে চারটি লাশ। গত ২৬ জানুয়ারী তৈরী পোষাক শিল্পের এ লাশের মিছিলে সামিল হয়েছে আরো সাতটি লাশ। মুত্যু-যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে লাশের নিথর দেহ যখন শান্ত, তখন সহকর্মী ও আত্মীয়ের আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠে মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকা। ‘স্মার্ট’ করাখানার সাত নারী শ্রমিকের লাশ বিলাপ করছিল সিকদার মেডিকেলের বারান্দায়। মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের আত্মনাদ কিংবা সিকদার মেডিকেলের বারান্দার বিলাপ, আমাদের তৈরী পোষাক শিল্পের বিকাশের জয়গান করে! কত শত শ্রমিকের লাশের ওপর দিয়ে ফুলে ফেঁপে উঠেছে এ তৈরী পোষাক শিল্প, ‘স্মার্ট’ গার্মেন্টের এ-ঘটনা আমাদের আরো একবার সেটা চোখে আগুল দিয়ে মনে করিয়ে দেয়। এদেশের কত কোটিপতির কত অট্টলিকা কত শ্রমিকের লাশের-কংক্রিটে বানানো তার কোন হিসাব নাই। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ তৈরী পোষাক শিল্প রপ্তানি-কারক দেশ হিসাবে যখন বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হয়, এবং দ্বিতীয় হওয়ার কৃতিত্বে এদেশের নেতা-নেতৃরা যখন গৌরবের ঁেঢকুর তোলেন, কিংবা বিজিএমইএ-এর কর্তাব্যক্তিরা যখন সোনারগাঁর বলরুমে বসে ‘কুল’ কিংবা ‘হট’ ওয়াটার পান করে সেটা উৎযাপন করেন, তখন এ-পোষাক শিল্পের শ্রমিকদের লাশের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। রাষ্ট্র তখন ‘ক্ষতি পুরণের’ সেই পুরোনো কীর্তন গায়। একের পর এক গার্মেন্ট্সে আগুণ লাগছে, একের এক মানুষ পুড়ে কয়লা হচ্ছে, লাশের পাশে শুয়ে পড়ছে নতুন লাশ আর ‘ক্ষতিপুরণ’ দিয়ে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব সারছে। এদিকে আমরা, এদেশের জনগণ, ‘সরকার কিংবা রাষ্ট্র তো ক্ষতি পুরণ দিচ্ছে’- এ ‘বুঝ’ নিয়ে নির্বিরোধ শান্ত থাকি। নিজের আখের-গোছানোর কাজে ব্যস্ত থাকি! ফলে, ‘লাশেরও আবার ক্ষতিপূরণ হয়’, এ রাষ্ট্রীয় ‘ডিসকোর্স’ তখন সামাজিক ন্যায্যতা পায়। আর ‘ক্ষতি-পুরণের’ এ রাষ্ট্রীয় ডিসকোর্স ন্যায্যতা পায় বলেই, তাজরিন ফ্যাশনের পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া ১১২ শ্রমিকের লাশের গন্ধ বাতাস থেকে সরে যাওয়ার আগেই ‘স্মার্ট’ গার্মেন্ট্সের সাত শ্রমিকের লাশ নতুন করে সামিল হল। ‘স্মার্ট’ গার্মেন্ট্সের আগে তাজরিন ফ্যাশন, তারও আগে হামীম গার্মেন্ট্স, তার আগে ‘গরিব এ- গরিব’ গার্মেন্ট্স, তার আগে কেটিএস... কিংবা তারও আগে...। একটি সূত্র অনুযায়ী এ পর্যন্ত গামেন্ট্স শিল্পে লাশের মিছিলে যুক্ত হয়েছে প্রায় ১৫০০ লাশ। আর, লাশের মিছিলে অব্যাহত সংযুক্তির ধারাবাহিকতায় যুক্ত হবে হয়তো নতুন কোন গার্মেন্ট্সের নতুন কোন লাশ। এভাবেই চলছে আর এভাবেই চলবে; কেননা আমরা সেভাবেই চলতে দিচ্ছি!

পোষাক কারখানায় আগুণ লাগার ঘটনায় পোঁড়ে কিংবা বাঁচতে গিয়ে মরে যাওয়ার ঘটনা রাষ্ট্র কীভাবে সামাল দেয়, তার একটি কাঠামোগত-কৌশল দাঁড়িয়ে গেছে। আগুণ লাগার পরে যখন একটার পর একটা লাশ বিল্ডিংয়ের ভেতর থেকে বেরুতে থাকে, তখন সরকারের একজন বা একাধিক মন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রী সৈন্য-সামন্ত নিয়ে এলাকা পরিদর্শন করবেন, যারা আহত তাদের দ্রুত চিকিৎকার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেবেন, আর যারা মরে লাশ হয়ে গেছে তাদের ক্ষতি পূরণ দেয়ার আশ্বাস কিংবা প্রতিশ্রুতি দেবেন, ঘটনা সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাস দেবেন, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে বলে একটা রাজনৈতিক বক্তৃতা দেবেন, পরবর্তীতে একটা তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং সে তদন্ত কমিটি কী রিপোর্ট দেয় (আদৌ কোন রিপোর্ট দেয় কিনা!!) এবং তার ভিত্তিতে কী কী কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হলো সেটা আর জানা যায় না। এভাবে একটা লাশের গতি করতে করতে নতুন লাশের সারি তৈরী হয় কিন্তু রাষ্ট্র সেই পুরোনো কীর্তন নতুন করে গায়। এ হচ্ছে, পোষাক শিল্প, লাশের মিছিল ও রাষ্ট্রের কীর্তনের আন্ত-সম্পর্ক ও (অ)কার্যকর যোগাযোগ। এখানেও তার অন্যথা হয়নি। আগুণ লাগার পরে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী পুলিশের আইজিসহ ঘটনাস্থলে হাজির হলেন, ‘তিনি আহত এবং নিহতের স্বজনদের সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, অগ্নিকা-ের ঘটনা তদন্ত করে দেখা হবে। মালিকের গাফিলতি থাকলে সরকার ব্যবস্থা নেবে’ (ইত্তেফাক ২৭/০১/২০১৩)। ইতোমধ্যে ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে নিহতদের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে লাশ-প্রতি ২০ হাজার টাকা করে ক্ষতি পূরণ দেবার ঘোষণা করা হয়েছে। বিজিএমইএ-ও সাধারণত একটা ক্ষতি পুরণ দেয় নিজিদের চামড়া বাঁচানোর জন্য কিন্তু এ-ক্ষেত্রে সেটাও ঘটেনি। কেননা, বিজিএমইএ-এর ক্রাইসিস ম্যানেজম্যান্টের প্রধান জানান ‘কারখানাটি এখনও বিজিএমইএ-র সদস্য নয়।’ অতএব, বিজিএমইএ-র কোন দায়-দায়িত্ব নাই। এটাই হচ্ছে, তৈরী পোষাক করাখানায় আগুণে পোড়া কিংবা আগুণ লাগায় সংঘটিত মৃত্যু-পরবর্তী হয়ে থাকা রুটিন-ওয়ার্ক। আর এটাই হচ্ছে, তৈরী পোষাক কারখানার লাশ-ব্যবস্থাপনার রাষ্ট্রীয় ডিসকোর্স। এ ক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রীর পিএসকে আরো করিতকর্মা দেখা গেলো। তিনি, ময়নাতদন্ত ছাড়াই ‘হার্ট-এ্যাটাকে মৃত্যু’র সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা করে দেয়ার আশ্বাসে লাশ দ্রুত দাফন করানোর পরামর্শ (!) দিয়ে দ্রুত ‘আপদ’ বিদায়ের ব্যবস্থা করে দিচ্ছিলেন। মৃত্যুর পরেও ‘ছোট লোক’দের সাথে ‘ছোট লোকের’ মতো আচরণ। কিন্তু আমরা এটা বেমালুম ভুলে যাই যে, এ ‘ছোট লোকদের’ লাশের স্তুপের ওপর দিয়েই ‘বড়লোক’দের বড়লোকিয়ানা তৈরী হয়। এ ‘ছোট লোক’দের লাশের মিছিলে নতুন লাশের অব্যাহত সামিল হওয়ার ভেতর দিয়েই তৈরী পোষাক রপ্তানি কারক দেশ হিসাবে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারের ক্রমবর্ধমান উন্নতি এ লাশের স্তুপের ওপর দিয়েই তৈরী হয়।

অথচ, একের পর এক গার্মেন্টসে আগুণ লাগছে, একের পর এক শ্রমিকের মৃত্যু হচ্ছে, একের পর এক লাশের স্তুপ তৈরী হচ্ছে, কারও কোন বিকার নাই। প্রিন্ট ও ইটেক্ট্রনিক্স মিড়িয়া ঘটনার দিন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ঘটনা ফলাও করে প্রকাশ করে, পরের দিন ফলোআপ আইটেম হিসাবে থাকে, তৃতীয় দিন কোন কোন মিড়িয়ার শেষ ফলোআপ দেয় কিন্তু এর পরের দিন মিড়িয়া থেকে সেটা হারিয়ে যায়। কিছুদিন পর আবার আরেক কারখানায় আগুণ লাগে; সাথে লাশের সারি তৈরী হয় আর মিড়িয়া আবার ক্যামেরা হাতে দৌঁড়াদৌড়ি শুরু করে এবং একই ষ্টাইলে ঘটনা কাভার করে এবং যথারীতি ‘কাভারেজ’ থেকে হারিয়ে যায়। কিছু বাম-সংগঠন কয়েকদিন প্রতিবাদ সমাবেশ করে কিংবা নিহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে ছোট-খাটে মিছিল-মিটিং করে। তারপর, সব ঠা-া হয়ে যায়। এদিকে নিহতের পরিবার নিহতের শোকে সরাজীবন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আর জীবনের ঘানি টানতে পরিবারের নতুন কোন সদস্যকে আবার মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। সে হয়তো অন্য কোনদিন লাশ হয়ে ফিরবে! এভাবেই লাশের মিছিলে যুক্ত হবে নতুন লাশ, আর রাষ্ট্রর প্রবৃদ্ধি পাবে। লাশের মিছিলে যুক্ত হবে নতুন লাশ, আর তৈরী পোষাক রপ্তানি-কারক দেশ হিসাব বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় থেকে প্রথমের দিকে ধাবিত হবে। লাশের পরে যুক্ত হবে নতুন লাশ, আর এদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বার অবারিত ও উন্মুক্ত হবে। লাশের পর যুক্ত হবে নতুন লাশ, আর মালিক ও ধনীক শ্রেণী আরো ধনী হয়ে উঠবে। এভাবে ‘ছোট লোকদের’ জীবন আর কত ‘লাশে’ পরিণত হলে, বাংলাদেশ একটি সত্যিকার ‘বড়লোকদের’ রাষ্ট্র হয়ে উঠবে?

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

No comments:

Post a Comment