Monday, February 25, 2013

(অ)রাজনৈতিক আন্দোলনের রাজনৈতিক বার্তা

(দৈনিক সমকাল, ১৪/০২/২০১৩)

বিগত পাঁচ ফেব্রুয়ারী থেকে শাহবাগে যে গণ-আন্দোলন চলছে সেটাকে অনেকে অরাজনৈতিক আন্দোলন হিসাবে উপস্থাপন করছেন। এটা সত্যি যে, এ আন্দোলনের একটা নিদর্লীয় অবয়ব রয়েছে কিন্তু তার অর্থ এটা অরাজনৈতিক নয়। বরং আমি বলবো, শাহবাগে যে গণ-আন্দোলন চলছে, এর চাইতে বড় কোন রাজনৈতিক আন্দোলন নিকট ইতিহাসে বাংলাদেশের ঘটে নাই। অনেকে এটাকে নতুন মুক্তিযুদ্ধ কিংবা নতুন প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধ হিসাবে প্রতীকায়ন করছেন। অনেকে এটাকে তুলনায় সমান্তরাল করছেন বাহান্ন, চুয়ান্ন, একাত্তর এবং নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের সাথে। কেউ কেউ-বা এটাকে বলার চেষ্টা করছেন মিশরের ‘তাহিরী স্কোয়ারে’র গণ-বিপ্লবের সাথে। যার সাথেই তুলনা করা হোক না কেন, নিঃসন্দেহে এটি একটি সার্বজনীন এবং সর্বাংশে রাজনৈতিক গণ-আন্দোলন। তবে, এটা আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি মার্কা দলীয় রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। এটা এদেশের নতুন প্রজন্মের নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমের তীব্র চেতনা থেকে উঠে আসা, তৃণমূলের মানুষের স্বাধীনতার চেতনাবোধ থেকে উত্লে উঠা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে এদেশের গণ-মানুষের মধ্যে পুঞ্জিভূত ক্রোধ ও ক্ষোভ থেকে উঠে আসা স্বতস্ফুর্ত গণ-আন্দোলন। তবে, শেষ বিচারে এটি প্রবলভাবে একটি রাজনৈতিক আন্দোলন এবং তাই, এর রয়েছে একটি সুদূর প্রসারী রাজনৈতিক তাৎপর্য। সত্যিকার অর্থে আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনীতি কীভাবে চলবে, কিংবা রাজনীতিকে কীভাবে চলতে হবে, সেটার একটি রাজনৈতিক দর্শন ও রূপরেখা এ শাহবাগ আন্দোলেনের ভেতর দিয়ে তৈরী হয়ে যাচ্ছে। তাই, এ আন্দোলনের মধ্যে রয়েছে এদেশের রাজনীতি, রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং রাজনীতির ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা।

একটি বিষয় প্রথমেই সাফ করে নেয়া জরুরি। যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনীত ছয়টি অভিযোগের মধ্যে গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুন্ঠনসহ পাঁচটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ার পরও তাকে সর্বোাচ্চ শাস্তি না-দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়ার কারণে ক্ষুদ্ধ এদেশের অনেক মানুষের মধ্যে ‘ব্লগার এবং নেটওয়ার্ক একটিভিষ্ট’রা কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে জমায়েত হয়ে এ আন্দোলনের সূত্রপাত করলেও, এটা এখন আর যেমন কেবল ‘ব্লগার আর অনলাইন এক্টিভিষ্টদের’ আন্দোলন নয়, তেমনি কেবল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতেই এ আন্দোলনের নিশানা সীমাবদ্ধ নাই। গত আট তারিখের মহাসমাবেশে শাহবাগের এ আন্দোলন থেকে যে সব ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তন্মধ্যে অন্যতম দাবিগুলো হচ্ছে; কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীদেরকে বিচারের আওতায় আনা এবং তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা, এদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা, এবং জামায়াতের তত্ত্বাবধানে/পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সকল প্রতিষ্ঠানকে সামাজিকভাবে বয়কট করা। সুতরাং শাহবাগের গণ-আন্দোলনের প্রাথমিক রাজনৈতিক তাৎপর্য হচ্ছে, একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত ‘যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে’র বিচারের প্রশ্নটিই বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

শাহবাগ আন্দোলনের আরেকটি অন্যতম তাৎপর্য হচ্ছে, এটি এদেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এক অভাবনীয় সাড়া ফেলে দিয়ে সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের চেতায় আলোড়িত ও আন্দোলিত করে তুলেছে। বসয়-লিঙ্গ-জাত-পাত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে একই এজেন্ডায় একই চেতনায় একই ভাবাদর্শে একটি প্লাটফর্মে একত্রিত করেছে। প্রাথমিকভাবে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে ঢাকায় এ-আন্দোলনের সূত্রপাত হলে এটা ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, রংপুরসহ সারা বাংলাদেশের জেলা-উপজেলা শহরগুলোতেও। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গোটা দেশের মানুষ, জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক-মতাদর্শী কিছু মানুষ এবং কিছু কট্টরপন্থী বিএনপির নেতা-কর্মী ছাড়া, আজ একই রব তুলছে ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই, যুদ্ধপারাধীদের ফাঁসি চাই’। কেন ‘কিছু ব্লগার আর অনলাইন এক্টিভিষ্টদের’ শাহবাগের জমায়েত সারা বাংলাদেশের মানুষকে এভাবে আন্দোলিত করেছে? কেন শাহবাগ আজ ‘ইতিহাস’ হয়ে উঠেছে? এখানেই রাজনীতিবিদদের এবং বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দের শিক্ষা নেয়ার ‘বার্তা’ নিহিত আছে। কেননা, যে আন্দোলন দেশের সর্বস্তরের মানুষের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে, যে আন্দোলন গণমানুষের আবেগকে ধারণ করে, যে দাবির মধ্যে দেশের অধিকাংশ মানুষের চাওয়া-চাহিদার প্রতিফলন ঘটে, সেখানে মানুষ সাড়া দেবেই। ক্ষমতায় যাওয়ার অন্ধমোহে গণসম্পৃক্ততাহীন রাজনৈতিক কর্মসূচির দিয়ে সত্যিকার কোন গণ-আন্দোলন তৈরী করা যায় না। শাহবাগের আন্দোলনের যে তীব্রতা, তার ভেতর দিয়ে এ সাধারণ সত্যটি দিবালোকের মত পরিষ্কার হয়। 

শাহবাগের আন্দোলন আরও একটি বার্তা অত্যন্ত জোরালো ভাবে সামনে নিয়ে আসে। বর্তমানের দেশে একাত্তরের ‘যুদ্ধাপরাধ এবং মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতা-বিরোধী অপরাধে’র যে বিচার চলছে, সেটাই বাংলাদেশের সমকালীন ও নিকট-ভবিষ্যতের রাজনীতির সত্যিকার নির্ধারক হয়ে উঠবে। আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাটাকে উপস্থাপন করছে যতটা নির্বাচনী-অঙ্গীকার পুরণ করার কাজ হিসাবে, ইতিহাসের দায় হিসাবে ততটা নয়। এবং এ যুদ্ধাপরাধ ও মানবতা-বিরোধী অপরাধের বিচারের সাঁকু বেয়ে আরেকবার ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি ইতোমধ্যেই প্রতিভাত হচ্ছে। কিন্তু শাহবাগ-আন্দোলন থেকে আওয়ামী লীগকেও বুঝে নিতে হবে যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা কেবল নির্বাচনী মেনিফেষ্টোর একটি ওয়াদা পূরণ করবার ব্যাপার নয়। এটা এদেশের মানুষের একটি প্রাণের দাবি। এদেশের তরুণ ও যুব সমাজের তীব্র আকাক্সক্ষা জায়গা। এদেশের গণমানুষের তীব্র আবেগের জায়গা, যা শাহবাগের গণজোয়ারকে একটি সার্বজনীন ও গণভিত্তি দিয়েছে। আওয়ামী লীগ বর্তমানে ক্ষমতায় আছে এবং সেজন্যই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রশ্নে আওয়ামী লীগের ভূমিকা এবং কার্যকর পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে আওয়ামী লীগের আগামী দিনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। তাই, যে কোন ধরণের চালাকি কিংবা আপোষ করবার চিন্তা-ভাবনা আওয়ামী লীগের রাজনীতির জন্য একটি বিরাট বিপর্যয় নিয়ে আসবে।

অন্যদিকে বিএনপি আওয়ামীলীগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করবার কৌশল হিসাবে এবং আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার নির্বাচনী পরিকল্পনার অংশ হিসাবে এতদিন জামায়াতকে বগলে নিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম রাখার চেষ্টা করেছে। নিজের অজান্তেই বিএনপি নির্বাচনী-রাজনীতির হিসাব-নিকাশের মারপ্যাঁচে নিজেরাই ক্রমান্বয়ে জামায়াতের সামিয়ানার নিচে চলে যাচ্ছে। আর জামায়াত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে থেকে বিএনপির সরকার বিরোধী আন্দোলনের ফাঁক দিয়ে যুদ্ধাপরাধী ও মুক্তিযুদ্ধে সংঘঠিত মানবতা-বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বদের মুক্তির দাবি নিয়ে মিছিল মিটিং করেছে। কিন্তু শাহবাগের আন্দোলন এবং শাহবাগের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা দেশব্যাপি যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে বিএনপি নতুন করে তার আগামী দিনের রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রশ্ন সারাদেশে যে অভূতপূর্ব গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে জামায়াতের সঙ্গ না-ছাড়লে বিএনপিকে অনেক চড়া-দামে এর রাজনৈতিক-মূল্য পরিশোধ করতে হবে। শাহবাগের আন্দোলন থেকে এটিই বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা।

সবকিছু সংশ্লেষণ করলে মোটা দাগে শাহবাগের আন্দোলন একটিই বার্তা দেয়; বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতির ধারা নির্ধারিত হবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে এবং বিপক্ষে। বিএনপির নেতৃবৃন্দ এতদিন অনেকটা চামড়া বাঁচানোর জন্য বলেছেন, “বিএনপিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়, তবে তা হতে হবে আন্তর্জাতিক মানদ-ে” কিংবা “বিএনপিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়, তবে বিচারের নামে যে কাউকে হয়রানি করা না-হয়” কিংবা “বিএনপিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়, তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবতি হয়ে কাউকে যেন শাস্তি দেয়া না-হয়”। এই “তবে”র ফাঁকে বিএনপি যে, জামায়াতের পক্ষে সুনির্দিষ্টভাবে রাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছেন, সেটা জনগণের কাছে মোটামুটি পরিষ্কার। এটা সত্য যে, বিএনপিতেও মুক্তিযোদ্ধা আছেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমা-ার ছিলেন। তাছাড়া বেগম খালেদা জিয়া দুই দুইবার এদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বর্তমানের মহান জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী। তাই, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এ কারণে যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সারাদেশের মানুষের মধ্যে যে একটি দৃশ্যমান মতৈক্য তৈরী হয়েছে, বিএনপি এখনও ইনিয়ে-বিনিয়ে প্রকাশ্যে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষেই অবস্থান নিচ্ছে।

শাহবাগ আন্দোলনের ফলে সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুদ্ধাপরাধীদের এবং মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতা-বিরোধী অপরাধের বিচারের পক্ষে সারা বাংলাদেশের মানুষের একটি সুষ্পষ্ট মতৈক্য তৈরী হয়েছে। সেখানে কোন ধরণের রাজনৈতিক চালাকি বা নির্বাচনী ছল-চাতুরির আশ্রয় না-নিয়ে ক্ষমতাসীন দল হিসাবে এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব-প্রদানকারী দল হিসাবে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় জন-আকাক্সক্ষার প্রতি সম্মান দেখিয়ে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে এদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করে জাতিকে ইতিহাসের দায় থেকে মুক্ত করা। আর বাংলাদেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের একটি হিসাবে এবং মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডারের হাতে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল হিসাবে বিএনপির উচিত কোন ধরণের ভান-ভনিতা না-করে যতদ্রুত সম্ভব জামায়াতের সঙ্গ ছেড়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে জনগণের কাতারে এসে শামিল হওয়া। একটি রাজনৈতিক দল হিসাবে সত্যিকার জন-আকাক্সক্ষাকে ধারণ করবার এটাই একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক উপায়। যে জামায়াতের জন্য বিএনপি’র আজকের এ মাসির দরদ সে জামায়ত কিন্তু ক্রান্তিকালে বিএনপিকে বাঁচাবে না কিংবা বাঁচাতে পারবেনা। মানুষের আবেগ, আশা-আকাক্সক্ষা, চাওয়া-চাহিদা এবং মতৈক্যের সাথে ঐক্যমত্য পোষণ করবার মধ্যেই রাজনৈতিক ফায়দা-- শাহবাগের কথিত (অ)রাজনৈতিক বিপ্লব এ রাজনৈতিক বার্তাটিই সবার সামনে দিবালোকের মত আরও একবার বিরাট-বিপুল গণজোয়ারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করে নিজেই ‘ইতিহাস’ হয়ে উঠছে।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

No comments:

Post a Comment