Monday, February 25, 2013

‘মরিচের গুড়া’ ও ‘তরল গ্যাসের’ একটা হিসাব-নিকাশ জরুরি!

(দৈনিক যুগান্তর, ২২/০১/২০১৩)

বলা হয়, ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদ-’ আর শিক্ষক ‘মানুষ গড়ার কারিগর’। জাতির মেরুদ- কোথায় লুকিয়ে আছে তা অদ্যাবধি অনাবিস্কৃত থাকার কারণেই হোক কিংবা অধিকাংশ মানুষের মেরুদ-হীন থাকবার নিত্য-অনুশীলন থেকেই হোক, ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদ-’- এ প্রবাদ এখনও বাজারে জারি আছে। আর ‘কারিগর’ সমাজের নি¤œবিত্ত-শ্রেণির একধরণের পেশাজীবী-চরিত্র ধারণ করলেও ‘শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর’ এখনও সমাজে কিছুটা সম্মানের সাথে উচ্চারিত হয়। শিক্ষক সমাজ এ ‘প্রবাদ’ নিজের প্রয়োজনেই দাবি করে আর অ-শিক্ষক (যারা শিক্ষক নয়) সমাজ জীবনের কোন-না-কোন সময় এ শিক্ষক-সমাজের কাছেই অল্প-বিস্তর পাঠ নিয়েছিল বলে এ-প্রবাদ বাক্য পুরোপুরি ‘মনে’ না-নিলেও এখনও কিছুটা ‘মানে’। তবে, গত বেশ কিছুদিন ধরে, দেশের আট হাজার স্কুলকে এমপিও ভুক্ত করার দাবিতে নন-এমপিও ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী ফোরামের ব্যানারে শিক্ষকরা যে আন্দোলন করেছেন এবং রাষ্ট্রযন্ত্র তাঁদের সাথে যে আচরণ করেছে তাতে একদিকে ‘জাতির মেরুদ-’ বলে যে শিক্ষাকে তকমা দেয়া হয়, সেটাকে একদিকে যেমন মিথ্যা প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে (অর্থাৎ জাতির মেরুদ- এখন অন্য কিছু; অর্থ, প্রতিপত্তি, অস্ত্রবাজি, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ইত্যাদি), অন্যদিকে শিক্ষক-সমাজ যে একটা ‘কারিগর’ শ্রেণি (অর্থাৎ ‘নি¤œবিত্তের পেশাজীবী শ্রেণি!) সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। নানান তামাসার পরে, অবশেষে গত ১৯ তারিখ শিক্ষামন্ত্রীর সাথে ‘ফলপ্রসু’ আলোচনা সাপেক্ষে আন্দোলনরত-শিক্ষকরা আগামী তিন মাসের জন্য আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করেছেন। কিন্তু এ আলোচনার আগে গত বারদিন ধরে শিক্ষকদের আন্দোলনকে দমন করবার জন্য পুলিশ যে আচরণ করেছে, সে বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। আর এদিকে ‘নিরীহ’ শিক্ষকরা শিক্ষামন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন এ-স্বান্তনা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। কত অল্পতেই সবকিছু সব হিসাব-নিকাশ চুকে যায়! কেননা, এরা হচ্ছেন ‘নিরীহ’ শিক্ষক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষামন্ত্রী এ বৈঠকটা আগে করলেন না কেনো? নাছোড় বান্দা এ শিক্ষকদের দৃঢ়তার কারণে? নাকি দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বলে? যে কোন ন্যায্যাতার সমাধান করতে, সবসময় দেয়ালে পিঠ টেকতে হবে কেন? কেন আমরা দেয়ালে পিঠ ঠেকার আগে একটু নড়চড়া করি না?

শিক্ষামন্ত্রীর সাথে শিক্ষকদের আলোচনা আগে, এ-আন্দোলনের সাথে বার দিন সরকার ও রাষ্ট্র যেভাবে আচরণ করছে এবং আমরা যারা শহুরে সুবিধাবাদি ও চতুর নাগরিক-মধ্যবিত্ত শিক্ষকদের নির্যাতিত হওয়ার সে-করুণ দৃশ্য দেখে নির্বিরোধ-মজা পেয়েছি, তাতে ‘শিক্ষা যে একটি জাতির মেরুদ-’ সেটা যেমন ‘মিথে’ (পুরাণ কাহিনী) পরিণত হয়েছে কিংবা ‘শিক্ষক যে মানুষ গড়ার কারিগর’, এ কারিগর-শ্রেণীও তেমনি একটি মেট্রোাপলিন ‘তামাসা’য় পরিণত হয়েছেন। শহীদ মিনার, প্রেসক্লাব, সোহরাওয়ার্দির মাঠ কিংবা মানবাধিকার কমিশনের উঠোন সব জায়গায় তাঁরা অপাঁঙতেয়। এদেশের রাজা বাদশা’দের কারাবরণের প্রতিবাদে কিংবা রাজকুমারদের দুনীর্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিবাদে দেশ ব্যাপি সারাদিন সহিংস হরতাল হয় অর্থাৎ গোটা দেশ দখল করে রাখা যায়, আর নিজেদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য যখন এদেশের নন-এমপিও-ভুক্ত শিক্ষক-সমাজ একটি শান্তিপূর্ণ ও অহিংস কর্মসূচি পালন করবার জন্য শহীদ মিনারকে বেঁচে নেয়, তখন তাদের উপর মরিচের গুড়া ছিটিয়ে দেয়া হয়। অনন্যোপায় হয়ে যখন তাঁরা, সোহরাওয়ার্দির মাঠে জমায়েত হন তখন, তাঁদেরকে তরল গ্যাস মারা হয়। তাঁদের মাইক কেড়ে নেয়া হয়। লাটি পেটা করা হয়। তখন ‘মেরুদ-’ আর মেরুদ- থাকেনা, সেটা মেরুদ-ের ‘পূরাণে’ পরিণত হন। তখন জাতির গঠনের কারিগর আর কারিগর থাকেন না, জাতির তামাসা’য় পরিণত হন। কেন? কেন এ অত্যাচার-নীপিড়ন? তাঁদের পেছনে কোন রথি, মহারথি হাই-প্রোফাইল নেতা নাই, এজন্য? নাকি তাঁদের নেতৃবৃন্দ আওয়ামীলীগ কিংবা বিএনপির তথা শাসক শ্রেণির কোন হুমড়া-চোমড়া নেতা গোছের কেউ নন, এজন্য? বিশ্বব্যাপি প্রতিবাদ জানানোর বিষয়টিকে ‘অধিকার’ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। রাইট টু প্রোটেষ্ট। ‘তাহিরী স্কোয়ার’, ‘অকুপায়-ওয়াল স্ট্রিট’ কিংবা দিল্লীর ‘জন্তর-মন্তর’ প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ইতিহাসে নতুন মেটাফোর সংযুক্ত করেছে। অথচ, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যারা বেতন-বিহীন ভাবে বছরের পর বছর এদেশের কৃষক, শ্রমিক, মজদুর জনতার ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করে তোলার কাজে নিজেদের সময়, শ্রম, মেধা ও জীবন বিলিয়ে দিচ্ছেন, তাদেরকে এমপিওভুক্ত করবার ন্যায্য দাবি নিয়ে যখন রাজধানীতে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেন, তখন তাদের ভাগ্যে জোটে মরিচের গুড়া, তরল গ্যাস কিংবা কাঁদানে গ্যাস। এ কাঁদানে গ্যাসের জ্বালায় যখন জাতি গড়ার এ-কারিগররা কাঁদেন, তখন রাষ্ট্রযন্ত্র হাসেন। শিক্ষকের অশ্রু দিয়ে যখন রাজপথ ভিঁজে যাচ্ছে তখন আমাদের বিবেক এতটুকু কাঁপে না! শিক্ষায় সরকারের সফলতার জয়গান তখন সোহরাওয়ার্দির মাঠে করুণ আর্তনাদ করে। একটা বৈঠক করে একটু ‘আশ্বাস’ দেয়া, তাতেই এই শিক্ষকরা এ-নির্দয় রাজধানী ছেড়ে নিজ নিজ অঞ্চলে চলে যায়, যেখানে ‘মাষ্টার মসাই’-কে এখনও দ্বিতীয় জন্মদাতার সম্মান দেয়া হয়। কিন্তু ‘মরিচের গুড়া‘ ও ‘তরল গ্যাসের’ তো একটা হিসাব নিকাশ দরকার। কার নির্দেশে এবং কেন, শিক্ষকদের সাথে এমন আচরণ করা হল?

আন্দোলনরত শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আট হাজার স্কুলের প্রায় লক্ষাধিক শিক্ষককে এমপিও-ভুক্ত করা সরকারের জন্য কঠিন কোন কাজ না। সরকার অতিসম্প্রতি একটা বিরাট সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করার প্রক্রিয়ায় এমপিওভুক্ত করেছে। সে প্রক্রিয়ায় অন্যান্যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও এমপিও ভুক্ত করা যায়। এবং এ নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরও তাই দাবি যে, অন্তত এতটুকু আশ্বাস দেয়া হোক যে, পর্যায়ক্রমে তাদেরকেও এমপিওভুক্ত করা হবে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আট হাজার স্কুলের প্রায় একলক্ষ শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করলে সরকারকে বছরে খরচ করতে হবে বাড়তি আটশ কোটি টাকা। যে দেশে একলক্ষ সত্তর হাজার কোটি টাকার বাজেট হয়, সেখানে শিক্ষার পেছনে বাড়তি আটশ কোটি টাকা ব্যয় করা যাবে না, এটা কোন যুক্তির কথা নয়। যে দেশ এক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনতে পারে কিন্তু শিক্ষার পেছনে বছরে আটশ কোটি টাকা খরচ করতে পারেনা, এটা মিথ্যাচার। যে দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা হরদম লুপাট হয়, সেখানে আটশ কোটি টাকা শিক্ষার পেছনে খরচ করা যাবে না, এটা অগ্রহণযোগ্য। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় পনের লক্ষ শিক্ষার্থী পড়াশুনা করে। তাদের শিক্ষার দায় ও দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে, যে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হবে সেটা তো জনগণেরই টাকা। সুতরাং সরকারের টাকা নাই, এ অজুহাতে আন্দোলনরত শিক্ষকদের দাবি পূরণ তো দূরের কথা, উল্টো শিক্ষকদের যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, তা অত্যন্ত বেদনা-দায়ক। দাবি প্রকাশের অধিকার কিংবা ন্যায্যা দাবি আদায়ের জন্য প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের অধিকার থেকে শিক্ষকদের বঞ্চিত করবার কোন নৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার সরকার ও রাষ্ট্রের নাই। শিক্ষা মন্ত্রীর আশ্বাসে শিক্ষকরা আন্দোলন স্থগিত করেছেন কিন্তু এর আগে বারদিন তাঁদের সাথে যে আচরণ করা হয়েছে, তার একটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। কার নির্দেশে, কারা এবং কেন শিক্ষকদের সাথে এমন আচরণ করেছে, তার একটা সত্যিকার তদন্ত হওয়া দরকার। সে দাবিটা কোন পক্ষ থেকেই উঠেনি। অথচ উঠা উচিত। কেননা এখানে শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান প্রদানের বিষয়টি যেমন জরুরি, পাশাপাশি প্রতিবাদ ও ন্যায্য-দাবি আদায়ের আন্দোলনের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এর একটি সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত এই জন্য যে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ যেন কারো ‘রাইট টু প্রটেষ্ট’-কে ‘মরিচের গুড়া’, ‘তরল গ্যাস’ কিংবা ‘জল-কামান’ দিয়ে অপমান না-করে।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

No comments:

Post a Comment