Monday, February 25, 2013

জয় বাংলা ও জয় ‘শাহবাগ’

(দৈনিক ভোরের কাগজ, ১৫/০২/২০১৩)

মানুষের ইতিহাসে বীরত্বের মহাকাব্য লেখা হয় সমকালের জাগরণের ইতিবৃত্ত দিয়ে। তখন সেটা সমকালের জাগরণ হয়েও চড়ে বেড়ায় মহাকালে। কালের জাগরণ হয়েও সেটা বিচরণ করে কালান্তরে। একাডেমিক পরিভাষায় তার নামায়ণ হয় ‘ইতিহাস’। তাই, মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিকাশের ইতিহাস হচ্ছে মূলতঃ মানুষের ‘প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে’র ইতিহাস। আর প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ইতিহাস হচ্ছে মূলতঃ মানুষের ‘জাগরণের’ ইতিহাস। মানুষ যখন জাগে, তখন জাগে ‘সমকাল’। জাগে ইতিহাস। কেননা এ-জাগরণের ভেতর দিয়েই জন্ম হয় ‘ইতিহাস’। মানুষের সত্যিকার ‘মানুষ’ হয়ে উঠবার ইতিহাস। মানুষ প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ভেতর দিয়ে জন্ম দেয় নতুন সময়ের, নতুন সমাজের এবং নতুন চিন্তার। নতুন করে জন্ম দেয় ‘মানুষ’ নিজেকেই। তাই, যেখানে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ঘটনা সংঘটিত হয়, সেটা তখন হয়ে উঠে নতুন ইতিহাসের নতুন ‘জন্মভূমি’। সমকালীন ঘটনা-প্রবাহের ভেতর দিয়ে দেশ ও দশের স্বার্থ রক্ষার তাগিদে, রাজনৈতিক-দুবৃত্তায়ন থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষায়, অর্থনৈতিক-শোষণ ও শ্রেণী-বৈষম্য বিলোপের বাসনায় যথাক্রমের ‘তাহিরী স্কোয়ার’, ‘অকুপায়-ওয়াল স্ট্রিট’ কিংবা দিল্লীর ‘জন্তর-মন্তর’ প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ইতিহাসে যেমন নতুন মেটাফোর সংযুক্ত করেছে, বাংলাদেশের ‘শাহবাগ’ও আজ মানুষের জাগরণের ইতিহাসের নতুন মেটাফোর। কিংবা ‘শাহবাগ’ আজ খুদ নিজেই এক ‘ইতিহাস’। এক মহাজাগরণের ইতিহাস। বিপুল সম্ভাবনাময় ও অকোতভয় তারুণ্যের জ্বলে উঠবার ইতিহাস। এদেশের তারুণ্যের দেশপ্রেমের তীব্রতার ইতিহাস। বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করবার এবং তা মোকাবেলা করবার তারুণ্যের সক্ষমতার ইতিহাস। ‘শাহবাগ’ আজ সত্যিকার অর্থে ইতিহাসের এক পরিশুদ্ধির ইতিহাস। একাত্তর সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গড়ে উঠা ‘শাহবাগ-বিপ্লব’ চারদশকের পাপ সাফ করবার প্রেরণা এবং কমিটমেন্টের ইতিহাস। বাংলাদেশের তারুণ্যের বাঁধভাঙা দেশপ্রেম ও যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির প্রশ্নে হার না-মানা সংগ্রামের ইতিহাস।

যে কোন বিচারেই, শাহবাগ-বিপ্লবের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি করছে নতুন ইতিহাস। বাংলাদেশ জন্ম দিচ্ছে নতুন বীরত্ব-গাঁথা। কাদের মোল্লার ফাঁসিসহ সকল যুদ্ধপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে যে গণ-আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল গত ৫ ফেব্রুয়ারী, সেটা তার ক্রমবর্ধমান বিস্তার ও সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতায় ক্রমান্বয়ে পরিণত হয়েছে গণ-জোয়ারে। সেটা ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানী থেকে বিভাগে, বিভাগ থেকে মফস্বলে, শহরতলী থেকে গ্রামে এবং গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। কেন্দ্র থেকে এ-বিপ্লবের আগুণ ছড়িয়ে পড়েছে প্রান্তে। প্রান্ত আরও অধিক উত্তেজনায় জ্বলে উঠে উল্টো তাপ দিচ্ছে কেন্দ্রকে। কেন্দ্র প্রান্তের সেই ফিরতি তাপে জ্বলে উঠছে দ্বিগুন ত্যাজে। নিজে জ্বলে উঠা এবং অন্যকে জ্বালানোর ভেতর দিয়ে তৈরী হচ্ছে কেন্দ্র ও প্রান্তের এক বিরল আদর্শিক যোগাযোগ। আর সে যোগাযোগের সূত্র ধরেই বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে জন্ম নিচ্ছে একটি একটি করে নতুন ‘শাহবাগ’। তখন ‘শাহবাগ’ আর রাজধানীর শাহবাগে থাকে না। ছড়িয়ে পড়ে গোটা বাংলাদেশে। যেন গোটা বাংলাদেশই একটি বিরাট শাহবাগ। আন্দোলন, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের উত্তাল ‘শাহবাগ’। এভাবে তারুণ্যের ‘শাহবাগ’ হয়ে উঠছে তারুণ্যের বাংলাদেশ। তারুণ্যের এ তীব্র জোয়ারের ঢেউ এভাবে সারা বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব গণ-জাগরণ সৃষ্টি করেছে। সবার মুখে একটাই দাবি ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই’। আকাশে বাতাসে গগণবিদারী সুরেলা, কিন্তু ঝাঁঝাঁলো, শ্লোগানে প্রকম্পিত আজ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। সুরমা থেকে পাটুরিয়া। একই আওয়াজ, একই শ্লোগান, একই দাবি। ‘যুদ্ধপরাধীদের বিচার চাই, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই’। এভাবেই সৃষ্টি হচ্ছে নতুন ইতিহাস। উত্তর-প্রজন্ম বাহান্ন, চুয়ান্ন, ঊনসত্তর, একাত্তর, নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের ইতিহাসের পাশাপাশি ‘দুইহাজার তের’কে একটি নতুন মাত্রায় এবং নতুন উচ্চতায় স্মারণ করবে পূর্ব-প্রজন্মের গৌরোবজ্জ্¦ল গণ-আন্দোলন ও গণ-জাগরণের ইতিহাস হিসাবে। এটাই শাহবাগের ইতিহাস হয়ে উঠবার ইতিহাস।

শুরু থেকেই শাহবাগের এ গণ-আন্দোলন একটি গড়পড়তা মার্কা-মারা কোন ধরণের দলীয়-চরিত্রের লেবাসের বাইরে একটি সত্যিকার গণ-আন্দোলন হিসাবে তার স্বতন্ত্র চরিত্র জারি রেখেছে। ফলে, দলে দলে মানুষ দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-জাত-পাত-বয়স-লিঙ্গ নির্বিশেষে সামিল হচ্ছে এ-নির্দলীয় আন্দোলনের ডাকে। তারুণ্যের এ-ডাকে সাড়া দিয়েছে এদেশের সকল শ্রেণীর সকল পেশার এবং সকল স্তরের মানুষ। ফলে, সত্যিকার গণ-আন্দোলন বলতে যেটা বোঝায় ‘শাহবাগ’ তার একটি নগদ, জ্বলন্ত এবং চলমান উদাহারণ। আর তারুণ্যের এ ষ্পর্ধা ও সৎ-সাহস আছে বলেই তারা ঘোষণা করতে পারে ‘কোন দলীয় রাজনীতিবিদদের এখানে বক্তব্য দিতে দেয়া হবে না’। ফলে, শাহবাগের এ-আন্দোলন একটি সত্যিকার গণ-আন্দোলনের চরিত্র ও মর্যাদা পেয়েছে। এদেশের গণ-মানুষ তাই, শাহবাগের আন্দোলনকে নিজের আন্দোলন হিসাবে মনে, মননে এবং মগজে ধারণ করে সদলবলে সামিল হচ্ছে তারুণ্যের মিছিলে। ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠবার দুর্বার আহ্বানে মানুষ সামিল হচ্ছে ইতিহাসের কাতারে।

শাহবাগ স্কোয়ারে তারণ্যের এ জ্বলে উঠা আরে একটি পরিষ্কার বার্তা দেয়। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অপরাধীরা জামায়াত-শিবিরের নামে এদেশে রাজনৈতিকভাবে পূনর্বাসিত হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে এদেশের রাজনীতিবিদরা। ইতিহাস স্বাক্ষী, এদেশের রাজনীতিবিদরাই রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের পায়তারায় কিংবা ক্ষমতার অন্ধমোহে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের সাথে রাষ্ট্র-ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা করেছে। তাই, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জঘণ্য মানবতা-বিরোধী অপরাধ করার পরও এদেশের রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতার কারণে স্বাধীনতা-বিরোধী চক্র এদেশের আলো-বাতাসে ফুলে-ফেপে কাল-সাপের রূপ ধারণ করেছে। ফলে, ‘শাহবাগের তারুণ্য’ তাদের গণ-আন্দোলনকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কোন ধরণের দলীয ছায়া থেকে নিজেদেরকে সচেতনভাবে বিরত রেখেছে। এর মধ্য দিয়ে এ বার্তাটিই ষ্পষ্ট হয় যে, এদেশে জামায়াতকে নিয়ে রাজনীতি করবার দিন শেষ। কেননা, একাত্তরের পরে বিশেষ করে পচাঁত্তরের পরে যারাই ক্ষমতায় এসেছে কোন-না-কোন ভাবে তারা জাতায়াতকে তথা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী এবং মানবতা বিরোধী অপরাধীদেরকে লালন-পালন-পোষন-তোষন করেছে। সুতরাং একাত্তর-উত্তর চার দশকের পাপ এ ‘শাহবাগের তারুণ্য’ সাফ করবার যে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে যুদ্ধপরাধীদের বিচার প্রশ্নে আন্দোলন শুরু করেছিলে গুটি কয়েক ‘ব্লগার ও নেটওয়ার্ক একটিভিষ্ট’ সেটা এখন বাংলাদেশের গণ-মানুষের সার্বজনীন এবং স্বতস্ফুর্ত আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। গণ-মানুষের আন্দোলনের রূপ ধারণ করেছে বলেই, এ আন্দোলন ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে। সুতরাং এ-আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান বিস্তার ও ব্যাপকতা মূলতঃ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জামায়াত-তোষন নীতির বিরুদ্ধেও একধরণের গণ-অনাস্থাকে প্রতিভাত করে। শাহবাগ-বিপ্লবের এ বার্তা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যত দ্রুত বুঝতে পারবে ততই তাদের লাভ। আর এ চতুর অ’বুঝ’রা দ্রুত বুঝতে পারলেই শেষ বিচারে লাভের গুড় খাবে দেশ ও দেশের মানুষ।

শাহবাগের আন্দোলন আবার নতুন করে প্রমাণ করলো, শেষ পর্যন্ত তারণ্যই ভরসা। সমাজকে জোরে ঝাঁকুনি দেয়ার জন্য তারুণ্যের জেগে উঠবার কোন বিকল্প নাই। নানা তরিকার রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের মার-প্যাঁচে কিংবা নির্বাচনের সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এদেশের রাজনীতিবিদরা যে দেশের মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, জন-আকাক্সক্ষা এবং গণ-আবেগকে রাজনীতির ময়দানে হরদম কেনাবেচা করতে পারে, তার সুযোগেই একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী এবং মানবতা-বিরোধী অপরাধীরা পার পেয়ে বাড় বেড়ে আজকে খোদ এদেশের রাষ্ট্র-ব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জ করছে। তাই, এদেশের তারুণ্য সব ধরণের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যিকার দেশপ্রেমের আবেগ নিয়ে জ্বলে উঠতে পারে। আর এদেশের তারণ্য সত্যিকার দেশপ্রেমের বারুদে জ্বলে উঠতে পারে বলেই ‘শাহবাগ’র জন্ম হয়। জন্ম হয় সত্যিকার গণ-আন্দোলন। নতুন করে লিখিত হয় সমকালের ইতিহাস। নতুন করে রচিত তারুণ্যে কীর্তন-নামা। নতুন করে জন্ম নেয় মহাকালের বোরাকে চড়ার সমাকালের বিপ্লবী মহাকাব্য। জয় বাংলা। জয় শাহবাগ।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

No comments:

Post a Comment