Tuesday, March 12, 2013

পুলিশের শরীরে আসলে ‘মার’ খায় রাষ্ট্র!

[দৈনিক ভোরের কাগজ, ১৩/০৩/২০১৩]

খুলনায় জামায়াতের ছিনিয়ে নেয়া আসামী ধরতে গিয়ে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারের গুলিতে পুলিশ কনষ্টেবল মফিজুল ইসলামের মৃত্যুর মধ্যদিয়ে সম্প্রতি পুলিশের নিয়মিত মৃত্যু ও লাশের সারিতে যুক্ত হয়েছে আরো একটি নতুন লাশ। এর আগে শাহবাগের সিসি ক্যামেরা অপারেটরের লাশসহ বিগত কয়েকদিনের হরতালের সহিংসতায়, হরতালের পূর্বের ঘটনা এবং হরতাল-উত্তর নানান ঘটনা-দুর্ঘটনায় সংবাদপত্রের হিসাব-অনুযায়ী এ পর্যন্ত নয়জন পুলিশের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ যখন সহিংসতা ঠেকানোর জন্য কিংবা সাধারণ নাগরিকের জীবন বাঁচানোর জন্য গুলি করে তখন তাকে আমরা ‘গণহত্যা’ বলে চিৎকার শুরু করি কিন্তু পুলিশ যখন অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যু বরণ করে কিংবা পুলিশকে যখন নির্বিচারে হত্যা করা হয় তখন আমাদের মুখে কোন শব্দ বের হয়না। আমাদের মানবাধিকার সংগঠনগুলো এবং মানবাধিকার কর্মীরা তখন কোন আওয়াজ দেননা। কারণ, তাদের হিসাব-নিকাশে পুলিশ কোন মানুষ না! পুলিশের কোন মানবাধিকার নাই! এটা অত্যন্ত লজ্জার এং পরিতাপের ব্যাপার। কেননা আমরা ভুলে যাই যে, পুলিশও আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো মানুষ। তাদেরও পরিবার, আত্মীয়-পরিজন ও সন্তান-সন্ততি আছে। পুলিশও আমার আপনার মতো সুখে হাসে, দুঃখে কাঁদে এবং আনন্দে উদ্বেলিত হয়। অথচ, এ পুলিশের মৃত্যু কিংবা পুলিশ হত্যা মানবাধিকারের হিসাবের খাতায় স্থান পায়না।

হতে পারে, বাংলাদেশের পুলিশের বিরুদ্ধে এন্তার নালিশ আছে। বিশেষ করে সংবাদপত্রের নিয়মিত প্রতিবেদন, টেলিভিশনের সংবাদ-বিষয় (নিউজ-আইটেম), বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের মাসিক কিংবা বার্ষিক প্রতিবেদন, এ্যামনেষ্টি ইণ্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের প্রতিবেদন এবং মানুষের নিত্যদিনের যাপিত-জীবনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এদেশের পুলিশ সম্পর্কে যে গণ-ধারণা (পাবলিক-পারসেপ্শান) দাঁড়ায়, তা অত্যন্ত নেতিবাচক। এ গণ-ধারণাকে শব্দবন্ধ করলে যা দাঁড়ায়, তা হচ্ছে; পুলিশ হচ্ছে দুনীর্তিবাজ, ঘুষখোর, পুলিশকে বিড়ি দিয়ে বেচা-কেনা করা যায়, আইনের বরখেলাপ-কারী, আইনের প্রয়োগের নামে অপগ্রয়োগকারী, বিচার-বিহর্ভূত হত্যাকারী, আসামী পুলিশের সামনে ঘুরে বেড়ায় আর ফরিয়াদি জান নিয়ে দৌঁড়ায়, বাঘে ছুঁলে নয়-ঘা আর পুলিশ ছুঁলে আঠার-ঘা, পুলিশ হচ্ছে যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তার লাঠিয়াল বাহিনী, পেটোয়াবাহিনী ইত্যাদি। এরকম নানান কিসিমের নালিশের দীর্ঘ তালিকা দিয়ে বলা যায় পুলিশের ‘খারাপের’ কোন সীমা পরিসীমা নাই! সম্প্রতি পুলিশের এ-দীর্ঘ দুর্নামের সাথে সংযুক্ত হয়েছে ‘মরিচের গুড়া’ ও ‘তরল গ্যাস’ ব্যবহারকারী হিসাবে নামক নতুন বিশেষণ। পুলিশ যখন আইন-শৃংখলা রক্ষার নামে সাধারণ মানুষকে নাজেহাল করে বা বিরোধী দলের কিংবা যে কোন ন্যায়-সংগত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আন্দোলনকে মোকাবেলা করবার তরিকা হিসাবে প্রতিবাদকারীদের লাঠি-পেটা করে, দমন-পীড়ন চালায়, জল-কামান কিংবা টিয়ার-গ্যাস ছুঁড়ে প্রতিবাদ-প্রতিরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে কিংবা দাঙ্গা পুলিশ যখন রাস্তায় বেড়দক লাঠিপেটা করে তখন আমার পুলিশের আচরণের ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রের চরিত্রকে উপলব্ধি করবার চেষ্টা করি। পুলিশের আচরণের ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদি, দমনমূলক, আতিপত্যবাদি, জুলুমবাজ এবং পরমত-অসহিঞ্চু একটা চরিত্র খাঁড়া করানোর চেষ্টা করি। এবং এ-পুলিশকে রাষ্ট্রের প্রতীক হিসাবে ধারণায়ন করে পুলিশী নির্যাতনের বিরোধীতা ও সমালোচনা করতে গিয়ে রাষ্ট্রকে ‘এক-হাত’ নিই। ‘রাষ্ট্র’ এবং তার চৌদ্দগোষ্ঠীকে রীতিমত তুলাধুনা করি। সে-তত্ত্ব মোতাবেক চিন্তার-বিপ্রতীপ বিন্দুকে গিয়ে পুলিশকে নির্বিচারে পেটানোর ঘটনাকে যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তবে তার একটি অত্যন্ত গুরুতর অর্থ তৈরী হয়। অর্থাৎ পুলিশ যদি রাষ্ট্রের প্রতীক হয়, তখন ‘পুলিশকে পেটানো’র অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্রকে পেটানো। তাই, তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিত উভয় দিক থেকেই এটার যথাযথ উপলব্ধি অত্যন্ত জরুরি যে, পুলিশকে পেটানোর ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রকে ‘রাম-ধুলাই’ দেবার একটা রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছানো হচ্ছে কিনা। কেননা, শাহবাগের গণআন্দোলন শুরু হওয়ার আগে থেকেই আমরা লক্ষ করেছি, ‘আন্তর্জাতিক ট্রাইবুন্যাল বাতিলের দাবিতে’ এবং যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ‘জাতায়াতের নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে’ জামায়াত-শিবির দেশব্যাপি যে তা-ব চালিয়েছে, তাতে পুলিশকে বেদড়ক বেটানো হয়েছে। এদেশের সংবেদনশীল মানুষ জামায়াত-শিবিরের হাতে পুলিশের এ-মার খাওয়া দেখে আহত হয়েছে, কেননা পুলিশ তো কারো প্রতিপক্ষ নয়। পুলিশ মুলত রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে, পুলিশকে বেদড়ক পেটানো কিংবা পুলিশকে হত্যা করা, রাষ্ট্রকে একধরনের বার্তা দেয়ার সামিল।

যদি আমরা এ তাত্ত্বিক কাঠামোর ভেতর দিয়ে জামায়াত-শিবির কতৃক গত বেশ কিছুদিন ধরে পুলিশের ওপর হামলা, নির্বিচারে রাস্তায় পুলিশকে পেটানো এবং পুলিশ ফাঁড়ি থেকে পুলিশকে বের করে কুপিয়ে হত্যা করা প্রভৃতি ঘটনাকে বিশ্লেষণ করি, তবে এর একটি ভয়ংকর অর্থ দাঁড়ায়। জামায়াত-শিবির যে এজেণ্ডাকে সামনে নিয়ে সহিংস প্রক্রিয়ায় মাঠে নেমেছে এবং ‘ঝি’ কে মেরে ‘বউ’ কে শেখানোর তরিকায় পুলিশকে পিটিয়ে রাষ্ট্রকে যে বার্তা দিচ্ছে সেটা একেবারে দিবালোকের মত পরিষ্কার। তাদের স্বঘোষিত বার্তা হচ্ছে, একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে গ্রেফতার করা জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে যে একটার পর একটা রায় দেয়া হচ্ছে সেটা বাস্তাবায়ন করতে দেয়া হবেনা। মূলত: বাচ্চু রাজাকার, কাদের মোল্লা এবং সাঈদীর রায় হওয়ার পর, অন্যান্য নেতাদের শাস্তি কী হতে পারে তার সম্ভাব্য-অনুমান থেকে জামায়াত-শিবির রীতিমত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র স্বাধীনতার চারদশক পরে একাত্তরে সংঘটিত জঘন্য মানবতা-বিরোধী অপরাধের বিচার করছে এবং এ-বিচারের পক্ষে, জামাত-শিবিরের কতিপয় নেতা-কমী-সমর্থক ছাড়া, এদেশের অধিকাংশ মানুষের সমর্থনে ইতোমধ্যে একটি ব্যাপক জনমত তৈরী হয়েছে। শাহবাগের গণআন্দোলনের দাবির সাথে এদেশের শ্রেণী-নির্বিশেষ মানুষের বিপুল সম্পৃক্ততা, সংহতি এবং সমর্থন সেটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার করে। সেই জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সন্দেহজনক এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আটক করা জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মুক্তির দাবি করা এবং সে দাবি বাস্তাবায়নের অংশ হিসাবে পুলিশকে পিটিয়ে হত্যা করা অর্থাৎ রাষ্ট্রের প্রতীককে আঘাত করা নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর বিষয়। তাই, পুলিশ যখন রাস্তায় মার খায়, সেটা আসলে পুলিশ খায় না, পুলিশের শরীরে উন্মুক্ত রাস্তায় মার খায় ‘রাষ্ট্র’। পুলিশ যখন গুলি খায়, তখন গুলি খায় ‘রাষ্ট্র’। তাও আবার পেঠানোর কিংবা খুনীর ভূমিকায় মুক্তিযদ্ধের বিরোধী শক্তি জামায়াত ও শিবির আর যে আবদারে রাষ্ট্রের গায়ে আঘাত করা হচ্ছে সেটা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের দায়ে আটককৃতদের মুক্তি!!!

রাষ্ট্রকে এভাবে রাস্তায় বেদড়ক মার খেতে কিংবা খুন হতে দেখার মধ্যে ব্যক্তিগত আরাম বোধ করবার সঙ্গত কোন কারণ নাই কিংবা নির্বিবোধ মজা দেখার মধ্যে কোন বাহাদুরী নাই, কেননা এটা এক অর্থে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির সমষ্টিগত মার খাওয়া। রাষ্ট্র যখন নির্যাতন করে তখন আমরা গলা ফাটাই আর রাষ্ট্রকে যখন নির্যাতন করে তখন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাই, এটা তো কোন যুক্তির কথা নয়। এটা মনে রাখা জরুরি যে, সরকার যারই বা যে দলেরই হোক না কেন রাষ্ট্র কিন্তু সকলের। তাই, সকলের রাষ্ট্রকে কতিপয় লোক পেটাবে কিংবা খুন করবে, তাও একটি অন্যায্য, অন্যায়, ধৃষ্টতা-মূলক, অগ্রহণযোগ্য এবং গণবিরোধী দাবিতে, এটা মেনে নেয়া যায় না। তাই, পুলিশ যেমন রাষ্ট্রের পক্ষে আমাদের জানমালের হেফাজতে নিয়োজিত তেমনি জামায়াত-শিবিরের হাত থেকে পুলিশকে বাঁচানোও আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব কেননা এখানে পুলিশকে বাঁচানোর মমার্থ হচ্ছে রাষ্ট্রকে হেফাজত করা।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

1 comment:

  1. স্যার পুলিশকে মারা হত্যা করা কখনই সমর্থন যোগ্য নয় কিন্তু পুলিশের কি উচিৎ রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যাবহার হওয়ার।
    আমি মনে করি রাষ্ট্রই পুলিশ কে জনগনের একাংশের বিরুদ্ধে দাড়া করিয়ে দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার বিরোধী দলে যেই/যারাই থাকুক না কেন তাদেরও জন সমর্থন আছে। সরকারী দলের যে কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধীতা/সমালোচনা করার অধীকার আছে গনতান্ত্রিক দেশ হিসাবে। এখন সমালোচনা / বিরোধিতা করতে বাধা দেয়ার জন্য পুলিশ কে ব্যবহার করা হলে স্বাভাবিক ভাবে ক্ষোবের বহিঃপ্রকাশ পুলিশ এর উপর দিয়েই যাবে।
    আমি মনে করি যারাই ক্ষমতায় থাকে তারাই ক্ষমতার অপব্যবহার করে। আর সবচেয়ে খারাপ দিক হল সরকারী দল কখনই বিরোধী দলের কোনো দাবী ততক্ষন পর্যন্ত এড়িয়ে যায় যতক্ষন বিরোধী দল শান্তি পূর্ন কর্মসূচী দেয়। দেশে শান্তি নষ্ট হলেই সরকারি দল নরে চরে বসে বাইরের চাপে। এ সংস্কৃতি যতদিন না বদলাবে পুলিশ বনাম বিরোধী দল এর সমর্থক, অবস্থা থাকবেই।
    পুলিশ কে মানুষ সম্মান করে না কেন? কারন রাজনৈতিক অপব্যাবহার। আমরা জানি আজকে আমার বাসায় বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ক্যাডার অবশ্যই সরকারী দলের চাদা বা অন্য যে কোনো কারনে উতপাত করলে পুলিশ আমাকে সহায়তা করবেনা।
    সম্প্রতি রানা প্লাজার পাশের ভবনের মালিক কে সাংবাদিক রা জিজ্ঞেস করলে বলে আমি রানার বিরুদ্ধে কিছু বলবনা, কারন কালকে রানা থেকে আমাকে কে বাচাবে? তাহলে পুলিশ এত বুলেট, টিয়ার শেল, গ্রেফতারের পরেও মানুষ কাকে ভয় পায়? রুট লেভেল এ মানুষের পুলিশ এর প্রতি আস্থা নাই। যে দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলে ধাক্কা দিয়া বিল্ডিং ফেলে দিছে, সে দেশে আবার মানব অধীকার !!! !!!!!

    ReplyDelete