Saturday, April 13, 2013

ইতিহাসের অভিজ্ঞতা নতুন ইতিহাস সৃষ্টির জন্য জরুরি

[দৈনিক ভোরের কাগজ, ১২/০৪/২০১৩]
বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির ক্যানভাস বেশ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের নানান উপসর্গ, অনুসর্গ, অনুঘটক, ক্রীড়নক এবং নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা, গুরুত্ব, দাপট এবং আধিপত্য অতিদ্রুত এক কোর্ট থেকে অন্য কোর্টে চালান হচ্ছে। ফলে, রাজনীতি যেহেতু অর্থনীতি ও সমাজ-জীবনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে, সেহেতু রাজনীতির এ-দ্রুত পরিবর্তন-প্রবণতা সমাজের নানান অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানুগুলোতেও এক ধরনের টেনশন তৈরী করছে। সব মিলিয়ে বেশ, ডাইনামিক সময়ের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ তার দিন গুজার করছে।
তবে, কয়েকজন ব্লগারদেরকে গ্রেফতারের সূত্র ধরে সাইবার-দুনিয়ার প্রতিক্রিয়া, হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ/সমাবেশ, তার সাথে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির একাত্মতা প্রকাশ, হেফাজতের তের দফা দাবিনামা, এবং বর্তমান সরকারের ক্রমপরিবর্তনশীল আচরণ সব মিলিয়ে এই রাজনৈতিক ‘ডাইনামিজমের’ জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, হেফাজতের আন্দোলনকে সামাল দিতে গিয়ে শাহবাগ আন্দোলনের ব্যাপারে সরকারের বিপ্রতীপ ভূমিকার কারণে, শাহবাগের আন্দোলনকারী এবং তাদের নিঃশর্ত সমর্থনকারীরা নানান কর্ণার থেকে নানা মুখী তীর্যক বাক্যবাণে আক্রান্ত ও জর্জরিত হচ্ছে। সেটা খুব অস্বাভাবিকও কিছু নয়। কেননা, শাহবাগ আন্দোলনের শুরু থেকেই বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের নিঃশর্ত সমর্থন কারও কারও মনে এমন সন্দেহের উঁকি দিয়েছিলো যে, শাহবাগ আন্দোলন মনে হয় সরকারের প্রত্যক্ষ ইঙ্গিতে চলছে। বিএনপি তো রীতিমতো রুটিন করে বলতে শরু করেছিল যে, ‘শাহবাগের গণআন্দোলন মূলতঃ আওয়ামী লীগের সাজানো নাটক।’ কিন্তু হঠাৎ করে সরকারের এ “সখি থেকে সতিন” হয়ে উঠ্বার উপসর্গ ও অনুসর্গ স্বাভাবিক হিসাব-নিকাশের নিক্তিকে মাপা না-যাওয়ায় নানান কথা বলা শুরু হয়ে গেছে। এমন কী, যারা শাহবাগের শুভাকাক্সক্ষী এবং শাহবাগের আবেগের সাথে শুরু থেকে ছিলেন, তারাও নানা অষ্পষ্টতার এবং আশাহতের বেদনা দিয়ে দিনতিপাত করছেন। আর যারা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেও যারা শাহবাগের আন্দোলন এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা নানা সমালোচনায় লিপ্ত ছিলেন, তাদের যেন মেঘ না-চাইতেই জল পাওয়ার মত অবস্থা। “বলেছিলাম না, আওয়ামী লীগের কোন চরিত্র নাই। জামায়াতের সাথে তলে তলে লাইন মারে। শাহবাগীদের সমর্থনের কলা দেখিয়ে নির্বাচনী বৈতরনী পার হওয়ার ধান্দা করেছিলো। শাহবাগীদেরকেও আওয়ামীলীগ ভোট ব্যাংক হিসাবে আমলে নিয়েছিলো। আসলে, আওয়ামী লীগ সমর্থন দেয় নাই, সুযোগ নিয়েছিলো। এখন নিশ্চয় মোহ ভেঙেছে।”- এ জাতীয় বক্তব্য এখন ফেইসবুকে, টুইটারে আর বিভিন্ন ব্লগের অসংখ্য ষ্ট্যাটাসে পাওয়া যাবে। অনেকে বলছেন “শাহবাগীরা এখন কী পেলেন। মাঝখান দিয়ে কিছু ব্লগারের জেল আর বাকী অনেকে জেলে যাওয়ার সম্ভাবনা দিয়ে দিনতিপাত করছেন। শাহবাগীদের কী দিলো এ সরকার। ধোঁকা।”

কিন্তু আমি বলবো, শাহবাগের সংগঠক এবং তাদের নিঃস্বার্থ সমর্থনকারীরা কোন কিছু প্রাপ্তির প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে নামেন নাই। দেশকে অকৃত্রিম ভালোবাসার টানে ইতিহাসের দায় মুক্তির ডাকে যুগের যন্ত্রণা বুকে ধারণ করে তারা রাস্তায় নেমেছে এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমবেত হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে। ক্ষমতার হালুয়া-রুটির ভাগ-বাটোয়ার হিস্যা নিতে নয়। তাই, যেহেতু সরকারের কাছে কোন কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা ছিলো না সেহেতু না-পাওয়ার বেদনাও নাই। তাই বলে, সরকারের সাম্প্রতিক ভূমিকায় বিলাপ করবারও কিছু নাই। কেননা, বুর্জোয়া রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় শাসক শ্রেণী কখনই জনগণের আবেগ এবং আকাক্সক্ষার পাশে থাকেনা। তাছাড়া, “রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ” কিংবা “রাষ্ট্র হচ্ছে জনগণের” এসব ভাববাদি দার্শনিকতা কাগজের কথা কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে রাষ্ট্র সবসময় জনগণের বিপক্ষের শক্তি। যুগে যুগে সাধারণ গণমানুষের আন্দোলনের ইতিহাস সে স্বাক্ষ্য বহন করে। কেননা ক্ষমতার কেন্দ্রী-করণের ভেতর দিয়ে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং একবিংশ শতাব্দীর চলমান সময়ে রাষ্ট্র কেবল শাসক শ্রেণীর স্বার্থকে রক্ষার জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে। তাছাড়া, রাষ্ট্র নিজ থেকেই জনগণকে মুখে তুলে কিছু খাইয়ে দেয়না। ইতিহাসের কোন কালে রাষ্ট্র জনগণের পাশে কিংবা জন-আকাঙ্ক্ষার পাশে স্ব-উদ্যোগে এসে দাঁড়িয়েছে, সে রকম কোন নজির নাই। জনগণই তার বিপ্লব-বিদ্রোহ কিংবা প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আন্দোলনের ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রকে তার করণীয় করতে বাধ্য করেছে। শাহবাগ রাষ্ট্র এবং জনগণের এ দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের ব্যকরণে জনগণের পক্ষের শক্তি হিসাবে কালের একটি বিশেষ সময়ে হাজির হয়েছে। এবং আমরা যারা দেশকে অন্তরের গভীর থেকে ভালোবাসি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মতাদর্শের অঙ্গ হিসাবে লালন করি এবং একটি ধর্ম-নিরপেক্ষ-সাম্যবাদি সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি, তারা শাহবাগ আন্দোলনের ভেতরে নিজের অন্তরের অকথিক বক্তব্যের অনুরণন দেখতে পেয়েছি। তাই, আমরা শাহবাগের সাথে সর্বান্তকরণে শামিল হয়েছি এবং শাহবাগকে অন্তরের গভীর মমতায় ধারণ করেছি। সুতরাং সরকারের হঠাৎ করে উল্টে যাওয়ার সাথে সাথে শাহবাগের আন্দোলন নিয়ে হা-হুতাশ করে বিলাপ করবার ন্যায্য কোন কারণ নাই। বরঞ্চ এখানে দু’টি বিষয় ষ্পষ্ট হয়েছে যা হওয়াটা জরুরি ছিলো। প্রথমত বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থায় জন-আকাক্সক্ষা যে সব-সময় রাষ্ট্র কতৃক অনাদৃত হয়, সেই ঐতিহাসিক ও দার্শনিক সত্যটি ‘শাহবাগ গণআন্দোল ও সরকারের আচরণের ভেতর দিয়ে’ নতুন করে আমাদের সামনে এসে হাজির হয়েছে। দ্বিতীয়ত মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি হিসাবে জারি থাকা আওয়ামী লীগ যে প্রয়োজনে নিজের অস্তিত্বের সাথে আপস করতে পারে, ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নেও দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থের উর্ধ্বে উঠতে পারেনা, সেটা নতুন করে প্রমাণিত হয়েছে। গণজাগরণের সাথে, এদেশের প্রগতিশীল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লালিত নতুন প্রজন্মের আবেগকে অসম্মান করবার ফল যে ভালো হয়না, সেটা অনাগত ইতিহাসের বিলাপে ভেতর দিয়ে লিখিত হবে। কিন্তু সমস্যা এখানেই যে, যখন উপলব্ধির সময় হাজির হবে, তখন ইতিহাসের সময় পার হয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের দুঃখটা এখানেই যে, তিরিশ লক্ষ শহীদের দীর্ঘশ্বাস এবং দু’লক্ষ মা-বোনের বেদনাময় আত্মচিৎকারের অভিশাপ আমাদের আরো অনেকটা সময় বয়ে বেড়াতে হবে।
এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যে শক্তি এবং সে শক্তি কীভাবে একটি স্বতস্ফুর্ত গণআন্দোলন জন্ম দিতে পারে, সেটা শাহবাগ আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ইতিহাসে ইতোমধ্যে উজ্জ্বল উদাহারণ হিসাবে দাপটের সাথে জায়গা করে নিয়েছে। শাহবাগের জন্ম, শাহবাগের গণআন্দোলনের বিস্তার, হেফাজতের ইসলামের আবির্ভাব এবং শাহবাগ ও হেফাজতের ইসলামকে হ্যান্ডেল করবার বিষয়ে সরকারের ‘ইউ-টার্ন’ পলিসি ইতিহাসের বিশেষ বাঁকে এসে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্দীপ্ত এদেশের নতুন প্রজন্মের ভাবনা ও বিশ্বাসের রাজনৈতিক পরিশুদ্ধির জন্য জরুরি ছিলো। সমাজের গণমানুষের আকাঙ্কা বাস্তবায়নের লড়াইয়ের প্রধান এবং প্রাথমিক কাজ হচ্ছে শত্রু-মিত্র নির্ধারণ করা। অতিসাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনা-প্রবাহের ভেতর দিয়ে মূলতঃ নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা, একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা, নারীর ক্ষমতায়ন ও একটি প্রাগ্রসর সমাজ-ভাবনার শত্রু ও মিত্রের ভেদ রেখা নতুন করে উন্মোচিত হয়েছে। এটা আগামীর যে কোন গণআন্দোলনের জন্য পুঁজি হিসাবে জমা থাক। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা নতুন ইতিহাস সৃষ্টির জন্য একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাত্ত।  

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

No comments:

Post a Comment