Saturday, April 13, 2013

রাজনীতির অতি-গতি বনাম সমাজের দুর্গতি

[দৈনিক ইত্তেফাক, ১৪/০৪/২০১৩]
সমাজ ও রাজনীতি পরষ্পরের অনুষঙ্গ। ফলে, সমাজ যেমন রাজনীতির বাইরের কিছু নয়, রাজনীতিও সামাজিক রীতি-নীতি ও বিধি-ব্যবস্থার বিযুক্ত কিছু নয়। তাই, রাজনীতি যেমন সমাজের গুণগত পরিবর্তনে অনুঘটকের কাজ করে, তেমনি সমাজও রাজনীতির চরিত্র, এজে-া এবং প্রক্রিয়া নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। এভাবেই রাজনীতির ভেতর দিয়ে সমাজ এগিয়ে যায় কিংবা পিছিয়ে যায় আবার সমাজের ইতিবাচক বিকাশের ভেতর দিয়ে রাজনীতির উৎকর্ষায়ণ ঘটে। এই পারষ্পরিক মিথষ্ক্রিয়ায় দু’টো দু’টোর চলক এবং চালকের ভূমিকা নিয়ে চালিত হয়। কিন্তু অবস্থা, এজেন্ডা এবং কার্যকারণ ভেদে, একটা অতি গতি অন্যটার দুর্গতিরও কারণ হতে পারে। সম্প্রতি বাংলাদেশে সংঘটিত কিংবা চলমান রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের ভেতর দিয়ে এদেশের সমাজ-জীবনে একটি বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে এবং সেটা অদ্যাবধি জারি আছে। এবার ভূমিকার সদর থেকে আলোচনার অন্দরমহলে যাওয়া যাক।

সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক গতিশীলতার দেশ পৃথিবীতে বিরল। রাজনীতির ময়দানে এজেণ্ডা, খেলোয়াড় এবং দর্শকের চরিত্র, চিন্তা, ভূমিকা ও সমর্থনের র‌্যাডিক্যাল পরিবর্তনের এতো বৈচিত্র নিকট অতীতের সীমানায় দেখা যায় না। ফলে, যেহেতু রাজনীতির আবহাওয়ায় সকাল-বিকাল ঋতু পরিবর্তিত হয়, সেহেতু সাধারণ মানুষের পক্ষে রীতিমত মুশকিল হয়ে উঠে নিজের রাজনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক নিশানা এবং রাজনৈতিক কেবলা ঠিক করা। সকল রাজনৈতিক পক্ষ নিজের স্বপক্ষে জনসমর্থনের দাবি করলেও জনগণ আদৌ কোন পক্ষকে সমর্থন করে কিনা সেটা মাপ-ঝোঁক করবার সর্বজন গ্রাহ্য কোন ব্যারোমিটার বাংলাদেশে অদ্যাবধি ব্যবহৃত হয়নি। মাঝে মাঝে বিভিন্ন সংবাদপত্রের মাধ্যমে জনমত জরিপের একটা হিড়িক পড়ে তাও নির্বাচন-কেন্দ্রীক। যদিও তাতে নানান হিসাব-নিকাশের হেরফের থাকে কিন্তু এসকল জরিপের ভেতর দিয়ে জনমতের একটা আলামত পাওয়া যায়। তাই, রাজনীতির ময়দানের সাম্প্রতিক সময়ের এতো দ্রুত পরিবর্তনের সাথে মানুষ নিজেকে কতোটা খাপ খাওয়াতে পারছে এবং রাজনীতির গতি প্রকৃতির উপলব্দির জায়গা থেকে নিজের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সমর্থন কতোটা চিন্তা-জাত হয়ে নিতে পারছে, সেটা একটি বিরাট জিজ্ঞাসা।

যদিও রাজনীতির সকল পক্ষই জনসমর্থনের দাবিদার কিন্তু বাস্তবতা প্রকৃতার্থে ভিন্ন। যারা সরাসরি দলীয় রাজনীতি করেন, তাদের কথা আলাদা কেননা তাদের সমর্থনের মোহনা এবং রাজনৈতিক অবস্থানের কেবলা “প্রি-ডিফাইন্ড” বা পূর্ব নির্ধারিত। তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সবধরণের ভালোমন্দ বিবেচনাবোধের উর্ধ্বে। নিঃশর্ত দলীয় আনুগত্যই তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ধের মাপকাঠি। কিন্তু যারা কোন দলীয় রাজনীতি করেন না কিংবা রাজনৈতিক সমর্থন এবং কোন রাজনৈতিক ইস্যুতে যাদের অবস্থান পূর্বনির্ধারিত নয় কিন্তু দেশের চলমান রাজনীতির গতিপ্রবাহের ওপর সচেতন মনোযোগ রেখে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ঠিক করেন, তাদের জন্য দেশের রাজনীতির ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে সকাল-বিকাল লেফ্ট-রাইট করা কিছুটা কষ্টকর। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে/বন্ধে জামায়াতের উন্মত্ততা, কাদের মোল্লার অসন্তুষজনক রায়, এদেশের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশের উদ্যোগে ও নেতৃত্বে গণজাগরণ মঞ্চের জন্ম, গোটা দেশব্যাপি সমাজের বিপুল একটা অংশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক জাগরণ, গণজাগরণ মঞ্চকে মোকাবেলা করবার তরিকা হিসাবে আস্তিক-নাস্তিকের বেহুদা বিতর্ক, হেফাজতে ইসলামের ঝড়ো আগমন এবং নির্গমণ, তের দফার নামে কিছু “প্রিমিটিভ ডিমান্ড”, এবং এ তের-দফাকে কেন্দ্র করে সমাজের মধ্যে জেগে উঠা ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরোধ, বিএনপির অর্থহীন গণ-হরতাল, সর্বশেষ মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতার প্রভৃতি হচ্ছে অতি সাম্প্রতিক কালে এদেশে সংঘঠিত রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের পরম্পরা। সব মিলিয়ে ঝড়ের গতিতে প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলো কিংবা সংবাদপত্রের লিড-আইটেম পরিবর্তনের প্রতিযোগিতায় দেশের রাজনৈতিতে তুমুল গতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু রাজনীতির এ অতি-গতিশীলতা যে দেশের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে যে চরম দুর্গতি বয়ে নিয় আসছে, সেটা আমাদের সবকিছুকে অতি রাজনীতিকীকরণের বহুল চর্চিত প্রবণতা কারণে লোকচক্ষুর আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি, উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প-কারখানা, সাধারণ শ্রমজীবী গণমানুষের নিত্যদিনের আয়-রোজগার ও স্বাভাবিক জীবন ব্যবস্থার যে নিয়মিত-গতিশীলতা সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক অতি-গতিশীলতা তাকে ক্রমান্বয়ে মন্থর করে দিচ্ছে। কিন্তু সেদিকে কি কারো নজর আছে? কী সরকারি দল, কী বিরোধী দল! আমাদের কি এখন সেদিকে একটু নজর দেয়া উচিত নয়?

অনেকেই বলে থাকেন, বিগত কয়েক মাসে দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরী হয়েছে, সেটা মূলত গণজাগরণ শঞ্চকে কেন্দ্র করেই। একথার মধ্যে সত্যতা থাকলেও, গণজাগরণ মঞ্চের কারণে রাজনৈতিক নৈরাজ্য ও অস্তিরতা তৈরী হয়েছে, একথা সত্য নয়। কোন কিছুকে “কেন্দ্র” করে হওয়া আর “কারণে” হওয়া এক কথা নয়। এটা উদোর পিন্ডি বুঁদোর ঘাড়ে চাপানো চেষ্টা। একথা সত্য যে, একাত্তরের একটি অমীমাংসিত বিষয়ের ফয়সালার অংশ হিসাবে এদেশের এক বিপুল জনগোষ্ঠীর সমর্থন নিয়ে গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষ থেকে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করা হয়েছে, ইতিহাসের দায়মুক্তির প্রশ্নে সেটার যথেষ্ট ন্যায্যতা রয়েছে। কিন্তু অবশ্যই সেটা স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হতে হবে এবং সে প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চকে মোকাবেলা করবার নানান রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে বিগত কিছুদিন ধরে দেশে যে একটি অস্বাভাবিক অবস্থা তৈরী করা হয়েছে, সেটা অত্যন্ত অনাকাক্সিক্ষত। কেননা, সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে দেশ ও দশের নিরাপদ জীবন-যাপনের যে স্বাভাবিক গতিশীলতা সেটাকে অটুট রাখবার চিন্তা সংযুক্ত থাকা বাঞ্চনীয়। কিন্তু সেটা ঘটেনি। সারাদেশে একটা রাজনীতি রাজনীতি খেলা শুরু হয়ে গেছে। এদেশের সাধারণ মানুষের জীবন-যাপন ব্যবস্থার নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে কারও কোন ধরনের উদ্বেগ নাই। তাই, রাজনীতির মাঠের সকল খেলোয়াড়রা এবার রাজনীতি রাজনীতি খেলা বন্ধ করেন। গণজাগরণ মঞ্চ শুরু থেকেই নানা সৃজনশীল কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের আন্দোলনের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখছিলো এবং একটা পর্যায়ে সেটা অনিয়মিত করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চালিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলো। কিন্তু নানান রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে গনজাগরণ মঞ্চকে মোকাবেলা করবার চেষ্টার প্রতিক্রিয়া হিসাবে গণজাগরণ মঞ্চও নতুন কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত হয়। সেটাও অনেকের কাছে অনাকাক্সিক্ষতই ছিলো। তাই, গণজাগরণ মঞ্চকে দলীয় রাজনীতির ফ্রেইমওয়ার্কে ভোটের রাজনীতির সাথে মিশিয়ে, পক্ষে কিংবা বিপক্ষে, আর খিঁচুড়ি না-পাকানোতেই সবার মঙ্গল। গণজাগরণ মঞ্চের রাজনীতি মহান মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতি। একাত্তরের চেতনার পুনরুদ্ধারের রাজনীতি। এটাকে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপির কিংবা চৌদ্দ বনাম আঠার দলের ভোটের রাজনীতির মারপ্যাচেঁ ফেলে আর টানাটানি না-করার মধ্যেই রাজনীতি এবং সমাজ উভয়ের জন্যই কল্যাণকর। গণজাগরণ মঞ্চকে তার স্বতন্ত্র চরিত্র নিয়ে নিজের মতো চলতে দেন। গণজাগরণ মঞ্চ যদি নিজের মতো করে চলতে পারে, সমাজের স্বাভাবিক গতিশীলতার কোন ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা না। রাজনীতিবিদরা বরঞ্চ সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন করে কীভাবে গতিশীলতা আনা যায় তা নিয়ে নতুন কোন রাজনীতি শুরু করেন। কেননা, অতি রাজনীতির অতি গতিশীলতা সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্গতির পরিবৃদ্ধি ঘটায়। কারণ বাংলাদেশের মতো দেশে রাজনীতির অতি-গতি আর সমাজের দুর্গতি “চলে যুগলে, বগলে বগলে”।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

No comments:

Post a Comment