Saturday, May 11, 2013

রাষ্ট্রের সাথে বোঁঝাপড়াটা জরুরি!

[দৈনিক যুগান্তর, ০৩/০৫/২০১৩]

রাষ্ট্রের সাথে একটা হিসাব-নিকাশ জরুরি হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র আসলে কার? রাষ্ট্রের দায়িত্ব কী? রাষ্ট্রের করণীয় কী? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব ও এর প্রয়োগ দু’টোর মুখোমুখি রাষ্ট্রকে একবার দাঁড় করানো দরকার। কিংবা সব ধরনের তাত্ত্বিকতা এবং দার্শনিকতার বাইরে মানুষের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রকে কিছু সাধারণ জিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করানো জরুরি। সাভারের রানা প্লাজা ধ্বসে পড়ার ঘটনায় রাষ্ট্রের ভূমিকা কী? কিংবা রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হওয়া উচিত ছিল? বা ঘটনার ‘প্রাক’ এবং ‘উত্তর’ উভয়কালে রাষ্ট্রে দায়িত্ব কী ছিল? রাষ্ট্র সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে কিনা? ইত্যাকার নানান জিজ্ঞাসার সওয়াল-জবাব জরুরি। এবং তার একটা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য ফয়সালা হওয়াটাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এভাবে একের পর এক পোশাক কারখানা ধ্বসে পড়বে, একের পর এক পোশাক কারখানায় আগুন লাগবে, আর শ্রমিকের পর শ্রমিক জীবন দেবে, শ্রমিকের পর শ্রমিক লাশ হবে, লাশের সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে কিন্তু তার কোন দৃশ্যমান, গ্রহণযোগ্য এবং যথাযথ বিচার হবেনা। এভাবে তো চলতে পারেনা। একথা স্বীকার্য যে, দেশের সামগ্রিক উন্নতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য শিল্পায়ন জরুরি। তৈরী পোষাক শিল্প দেশের অর্থনীতিতে একটি বিরাট ভূমিকা রাখছে। রপ্তানি আয় বৃদ্ধিকে ব্যাপকভাবে সহায়তা করছে। কিন্তু সেটা নিশ্চয় শ্রমিকের লাশের বিনিময়ে নয়। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চয় মানুষের লাশের বিপরীতে নয়। তাই, এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রকে ঠিক করতে হবে রাষ্ট্র কার পাশে দাঁড়াবে। পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া লাশের পাশে নাকি শ্রমিক-শোষনের মেশিন লোটেরা পুঁজিপতির পাশে। দেয়ালে চাপা পড়া শ্রমিকের লাশের কাতারে নাকি চাপা দেয়া মালিকের কাতারে। এ বোঝাপড়াটা খুবই জরুরি হয়ে উঠেছে।

সাভারের রানা প্লাজা ধ্বসের ধ্বংসাবশেষ থেকে জীবিত কিংবা মৃত শ্রমিককে উদ্ধার করবার অপারেশনের প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে। যাবতীয় উদ্ধারকার্যে রাষ্ট্রের কৃতিত্ব কতটুকু সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তবে, আমরা দেখেছি রাষ্ট্রের সাথে সমাজ সমান্তরালে পাল্লা দিয়ে উদ্ধারকার্যে যোগ দিয়েছে। রাষ্ট্র যা কিছু করেছে তার স্বীয় কর্তব্য ও দায়িত্ব থেকে করেছে আর সমাজ এগিয়ে এসেছে তার সামাজিক ও মানবিক তাগিদ থেকে। সামগ্রিক উদ্ধারকার্যে রাষ্ট্র এবং সমাজের অংশীদারিত্ব এবং দায়িত্ব-তাগিদের ফারাক উপলব্ধি করাটাও এখানে জরুরি। উদ্ধারকার্যের প্রথম পর্যায় শেষে, এখন ভারি যন্ত্রপাতি দিয়ে ‘প্রাণে’র চেয়ে মূলত ‘লাশ’ খোঁজার পর্ব শুরু হয়েছে। ডগ-স্কোয়ার্ড নামানো হয়েছে। গন্ধ শুকে শুকে লাশ বের করছে ডগ-স্কোয়ার্ড। বিদেশী ‘ডগ’ এখন দেশী লাশ খোঁজার কাজে নেমেছে। কেননা, এখন আর জীবিত কোন মানুষ রানা প্লাজা থেকে বের হচ্ছেনা। এবং একেবারে অলৌকিক কিছু না-ঘটলে নতুন প্রাণ বের হওয়ার সম্ভাবনাও তেমন দেখা যাচ্ছেনা। এর মধ্য দিয়ে মূলত জীবিত-মানুষের জন্য উৎগ্রীবতার পাশাপাশি লাশের সংখ্যা গুণার কাজও শেষ হয়ে যাচ্ছে। কত মানুষ এখনো মিসিং আছে তা নিয়ে সংখ্যার রাজনীতি চলছে। দোষা-দোষীর খেলা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। তবে, সংবাদপত্রের পাতায় কিংবা টেলিভিশনের পর্যায় লাশ গুণার কাজ করতে করতে যারা নিজের প্রেসার উঠা-নামার ব্যবস্থা করছিলেন আপাতত তাদের প্রেসার স্থিতিশীল হয়েছে। কিন্তু লাশ গুণার কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আমাদের যুগপৎ মধ্যবিত্তীয় নাগরিক হা-হুতাশ এবং সুশীল কিংবা প্রগতিশীলতার দায়িত্ব দুটোই শেষ হয়েছে--এটা মনে করবার কোন কারণ নাই। তাজরিন ফ্যাশনের হিসাব নিকাশ এখনো শেষ হয়নি। স্মার্ট গার্মেন্টেসের লাশের গন্ধ এখনও বাতাসে ঘোরপাক খাচ্ছে। তারও আগের অসংখ্য শ্রমিকের লাশের কোন বোঁঝাপড়াই এখনও শেষ হয় নাই। তাই, রানা প্লাজার হিসাব-নিকাশ এখনো পুরোটাই বাকি আছে। প্রতিটি লাশের, প্রত্যেক শ্রমিকের জীবনের, কেটে যাওয়া প্রতিটি হাতের, লটকে যাওয়া প্রতিটি পায়ের, প্রতি ফোটা রক্তের হিসাব-নিকাশ বাকি আছে। যে শ্রমিকের লাশ ও রক্তের উপর দাঁড়িয়ে এদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ঘটে, সে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আদায় করবার সময় এখন। যে শ্রমিকের লাশের উপর দাঁড়িয়ে এদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ে, তার ন্যায্য দেনা-পাওনার হিসাব-নিকাশ জরুরি। রাষ্ট্র কিংবা সমাজের ওপর তলার মানুষ এদেশের শ্রমজীবি কিংবা নিচতলার মানুষকে বিপদের সময় সাহায্য, সমবেদনা কিংবা দান-খয়রাত করে। আমরা তাতেই বিগলিত হই। কিন্তু এ দান-খয়রাতের ভেতর দিয়ে শ্রমিকের নিয়মিত লাশ হয়ে যাওয়ার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়না। প্রকারান্তরে, এ দান-খয়রাতের ভেতর দিয়ে খোদ রাষ্ট্র, তথাকথিত সুশীল এবং মালিক শ্রেণী নিজেদের মহতিপনার প্রবৃদ্ধি ঘটায়, দানবীর-অবতার হয়ে উঠবার পপুলার-পুঁজি তৈরী করে নির্বাচনী ক্যানভাসে রঙ লাগায় কিংবা মেকি-মানবতাবাদিতার প্রজেকশন করে দিলদার হিসাবে আইকন হওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু শ্রমিকের ন্যায্য দাবিকে তারা কখনও আমলে নেননা। তাই, এখন সময় এসেছে, শ্রমিকের আবেগ, আকাক্সক্ষা ও দাবি-দাওয়ার পাশে দাঁড়ানোর। প্রতিটি লাশের, রক্তের প্রতিটি ফোটার হিসাব-নিকাশ কড়য়-গ-ায় বুঝে নেয়া সময় এসেছে। এখন সমাজের দায়িত্ব হচ্ছে শ্রমিকের পাশে অবস্থান নিয়ে রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়ানো যাতে রাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘদিনের বকেয়া বোঁঝাপড়া সেরে নেয়া যায়।

সাহায্য ও সহযোগিতার নামে রাষ্ট্রও মূলত দান-খয়রাতের খুবই সাধারণ সূত্র অনুরসণ করে। অতীত ইতিহাস এ স্বাক্ষ্য দেয় যে, রাষ্ট্র এসব সাহায্য ও সহযোগিতার নামে মালিক শ্রেণীকে আড়াল করবার একধরনের আনুষ্ঠানিকতা করে। অতীত ইতিহাস এবং আমাদের অভিজ্ঞাতা বলে শেষ বিচারে রাষ্ট্র শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষ না-নিয়ে মালিকেরই পক্ষাবলম্বন করে। কেননা, রাষ্ট্র নিজেই একটা মালিকের চরিত্র ধারণ করেছে। রাষ্ট্রযন্ত্র যারা চালায় তারা মালিক শ্রেণীর প্রতিনিধি কিংবা খোদ মালিক শ্রেণী। রাষ্ট্রের যাবতীয় সিদ্ধান্ত যেখানে নেয়া হয়, সেখানে মালিক শ্রেণীর আধিপত্য, দাপট এবং প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। কারখানার যন্ত্র শ্রমিক চালায় কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র চালায় মালিক শ্রেণী। তাই, লাশের মিছিলে যুক্ত হয় নতুন লাশ। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় লাশের মাছিল। কিন্তু মালিক শ্রেণী থাকে বহাল তবিয়তে। তাই, রাষ্ট্রের সাথে বোঁঝাপড়াটা জরুরি। আর যদি, এ বোঁঝাপড়া সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য সমঝোতার ভিত্তিতে ফয়সালা না-হয়, তাহলে কারখানার শ্রমিকের পোষাক তৈরী-যন্ত্র চালানোর হাত যে রাষ্ট্রযন্ত্রও চালাতে জানে, সেটা প্রমাণ করবার সময় এবং ইতিহাস দুটোয় এখন সামনে এসে হাজির হয়ে। শ্রমিক কতৃক রাষ্ট্রযন্ত্র চালানো বিষয়টি ইতিহাসে গৌরবান্বিত নজির হিসাবে হাজির আছে। অতএব, রাষ্ট্রকে তার অবস্থান সাফ করতে হবে। অন্যথায়, মজদুর শ্রেণী একদিন রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেবে। এ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে, মনে রাখতে হবে সেদিন বেশি দুরে নয়। কেননা সমাজের এবং ইতিহাসের রূপান্তরের শেষ ধাপ হচ্ছে শ্রমজীবি মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

No comments:

Post a Comment