Saturday, May 11, 2013

ব্যক্তির শাস্তিই যথেষ্ট নয়, চাই ব্যবস্থার রূপান্তর

[দৈনিক ইত্তেফাক, ০৪/০৫/২০১৩]

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তৈরী পোশাক শিল্পের বিপুল বিকাশ মূলতঃ শ্রমিক শ্রেণীর লাশ এবং রক্তের উপর ভর করেই গড়ে উঠেছে। ফলে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, তৈরী পোশাক শিল্পের পরিবৃদ্ধি এবং শ্রমিকের লাশের সংখ্যাতাত্ত্বিক প্রবৃদ্ধি কার্যত সমান্তরালে বেড়ে উঠেছে। পোশাক কারখানার ভেতরে আগুণে পোড়া লাশ, বিদ্যুতের শর্ট সার্কিটে আটকে যাওয়া লাশ, কারখানার ভবন ধ্বসে পড়া দেয়ালের নিচে চাপা পড়া লাশ, হুড়োহুড়ি করে জীবন বাঁচাতে গিয়ে পায়ে তলায় দলিত হওয়া লাশ, জীবন-বাচাঁনোর চেষ্টায় চ্যাপ্টা হওয়া লাশ, বন্ধ শেকলের ভেতরে দম-বন্ধ হওয়া লাশ, কিংবা পেটের দায়ে রাস্তায় নেমে পুলিশের গুলি খাওয়া লাশ। এভাবেই লাশের মিছিলে যুক্ত হয়েছে নতুন লাশ, আর তৈরী পোষাক শিল্পের ক্রমান্বয়ে বিকাশ ঘটে! মালিক শ্রেণীর বিকাশ ঘটছে। পোশাক কারখানার সংখ্যা বেড়েছে। সাথে সাথে বেড়েছে শ্রমিকের লাশের সংখ্যা। সম্প্রতি রানা-প্লাজা ধ্বসে পড়ায় সেখানে অবস্থিত পাঁচটি গার্মেন্টেসের শত শত শ্রমিকের মৃত্যু তৈরী পোশাক শিল্পের উত্তর উত্তর সমৃদ্ধি ও বিকাশের কুৎসিত রূপকে আমাদের সামনে আরে একবার নতুন করে উন্মোচিত করেছে। দেয়ালের নিছে চাপা পড়ে মুত্যু-যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে লাশের নিথর দেহ হয়ে বের হয়ে এসেছে এককের পর এক লাশ। দশ, বিশ, পঞ্চাশ, একশ, পাঁচ শত, এক হাজার (নিখোঁজ সহ) লাশ। আরো হাজার শ্রমিক আহত। শত শ্রমিক পুঙ্গু। হাত নাই, পা নাই। জীবন, প্রাণ, হাত, পা সব খেয়ে নিয়েছে তৈরী পোশাক শিল্পের রাক্ষুসে উন্নয়ন। লাশের পর লাশ যখন সাভারের অধরচন্দ্র্র হাইস্কুল মাঠে প্রদর্শিত হচ্ছিল, আমাদের তৈরী পোষাক শিল্প তখন বিকাশের জয়গান করছিল! কত শত শ্রমিকের লাশের ওপর দিয়ে ফুলে ফেঁপে উঠেছে এ তৈরী পোষাক শিল্প, ‘রানা প্লাজার’ ঘটনা আমাদের আরো একবার সেটা চোখে আঙুল দিয়ে মনে করিয়ে দেয়। এদেশের কত কোটিপতির কত অট্টলিকা কত শ্রমিকের লাশের-কংক্রিটে বানানো, কত শ্রমিকের রক্তের সিমেন্টে বানাবো; তার কোন হিসাব নাই। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ তৈরী পোষাক শিল্প রপ্তানি-কারক দেশ হিসাবে যখন বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হয়, এবং দ্বিতীয় হওয়ার কৃতিত্বে এদেশের নেতা-নেতৃরা যখন গৌরবের ঁেঢকুর তোলেন, কিংবা বিজিএমইএ-এর কর্তাব্যক্তিরা যখন পাঁচতারকা হোটেলে বসে সেটা উৎযাপন করেন, তখন এ-পোষাক শিল্পের শ্রমিকদের লাশের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। রাষ্ট্র তখন ‘ক্ষতি পুরণের’ সেই বহু পুরোনো কীর্তন গায়। একের পর এক গার্মেন্ট্সে আগুণ লাগছে, একের এক মানুষ পুড়ে কয়লা হচ্ছে, একের পর এক ভবন ধ্বসে পড়ছে, শ্রমিকের জীবন চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে, লাশের পাশে শুয়ে পড়ছে নতুন লাশ আর ‘ক্ষতিপুরণ’ দিয়ে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব সারছে। এদিকে আমরা, এদেশের জনগণ, ইলেক্সট্রনিক্স মিড়িয়ার লাইভ-টেলিকাষ্ট দেখি আর সুবিধাবাদি মধ্যবিত্তীয় হা-হুতাশ ছেড়ে কিংবা দীর্ঘশ্বাসের নিঃশ্বাস চেড়ে নিজেদের ধান্দায় মনোনিবেশ করি। ফলে, ‘সাহায্য, সহযোগিতা, ক্ষতিপূরণ’ প্রভৃতির মাধ্যমে শ্রমিকের লাশ-ব্যবস্থাপনার এ রাষ্ট্রীয় ‘ডিসকোর্স’ তখন সামাজিক ন্যায্যতা পায়। আর এ রাষ্ট্রীয় ডিসকোর্স ন্যায্যতা পায় বলেই, তাজরিন ফ্যাশনের পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া ১১২ শ্রমিকের লাশের গন্ধ বাতাস থেকে সরে যাওয়ার আগেই আশুলিয়ায় ‘স্মার্ট’ গার্মেন্ট্সের সাত শ্রমিকের লাশ নতুন করে সামিল হয়। আর স্মার্ট গার্মেন্টেসের লাশের গন্ধ বাতাস থেকে সরে না-যাওয়ার আগেই রানা প্লাজার ধ্বসের ঘটনায় চ্যাপ্টা হয়ে যায় এদেশের শত শত শ্রমিকের জীবন, স্বপ্ন ও সংসার। ‘স্মার্ট’ গার্মেন্ট্সের আগে তাজরিন ফ্যাশন, তারও আগে হামীম গার্মেন্ট্স, তার আগে ‘গরিব এ- গরিব’ গার্মেন্ট্স, তার আগে কেটিএস... কিংবা তারও আগে...। এভাবে, লাশের মিছিলে অব্যাহতভাবে অদূর ভবিষ্যতে যুক্ত হবে হয়তো নতুন কোন পোশাক কারখানার নতুন কোন লাশ। এভাবেই চলছে আর এভাবেই চলবে। কেননা এ রাষ্ট্র হচ্ছে মালিকের। আর শ্রমিকের লাশের মধ্যেই মালিকের উত্থান। শ্রমিকের লাশের স্তুপের উপরই বেড়ে উঠে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। শ্রমিকের লাশের মধ্যেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ভা-ার সমৃদ্ধ হয়। জয় তৈরী পোশাক শিল্প! জয় মালিক শ্রেণী! জয় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি!

রানা প্লাজার মালিক রানাকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে চতুর্দিকে। সরকার তাকে গ্রেফতার করেছে, ফলে দাবির জোর কমজোর হয়ে উঠেছে। কিন্তু রানা প্লাজার রানাকে গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তির দাবি করবার মধ্য দিয়ে মূলতঃ পুরো বিষয়টিকে একটি হালকা ‘দাবি-দাওয়ার রাজনীতি’তে ফেলে দেয়া হয়েছে। কেননা, ব্যক্তির শাস্তির দাবির মধ্য দিয়ে মূলতঃ ব্যবস্থার অপরাধ, কাঠামোগত-গাফিলতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়-দায়িত্বকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। কেননা, একজন রানার শাস্তি হওয়ার ভেতর দিয়ে শ্রমিকের জীবনের কোন নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়না। তাই, জোর দাবি তুলতে হবে গোটা তৈরী পোশাক-শিল্প ব্যবস্থা, উৎপাদন, উৎপাদন-সম্পর্ক, উৎপাদন কাঠামো এবং ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে। সে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যে ব্যবস্থা মালিকের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষা দেয় কিন্তু শ্রমিকের জীবনের নূন্যতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনা। দাবি তুলতে হবে সে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যে ব্যবস্থায় মালিককে লাখপতি থেকে কোটিপতি করে তোলে কিন্তু শ্রমিকের জীবন ক্রমান্বয়ে দুর্বিসহ করে তোলে। দাবি তুলতে হবে সে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা মালিককে শ্রম শোষণের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় কিন্তু শ্রমিকের জন্য তার ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করেনা। তাই, রানা প্লাজার এ ভয়াবহ ধ্বসের মধ্য দিয়ে তৈরী পোশাক শিল্পের গোটা ব্যবস্থা, ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিকের জীবনের যে করুণ চিত্র আমাদের সামনে নতুন করে অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং করুণভাবে উন্মোচিত হয়েছে, তার সূত্র ধরে পুরো পোষাক শিল্পের একটা গুণগত পরিবর্তনের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কার্যকরভাবে সামনে নিয়ে আসতে হবে। একটা সত্যিকার শ্রমিক-বান্ধব তৈরী পোশাক শিল্পের জন্য বিদ্যমান ব্যবস্থার একটা রূপান্তর দরকার। কেননা, এত শত শ্রমিকের মৃত্যু পুরো তৈরী পোশাক শিল্পকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর নতুন তাগিদ সৃষ্টি করেছে। গোটা ব্যবস্থার এমন রূপান্তরের দাবি তুলেতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোন শ্রমিককে লাশ হতে না-হয়। যাতে আর কোন শ্রমিককে আগুনে পোড়ে কয়লা হতে না-হয়। যাতে আর কোন শ্রমিককে দেয়াল চাপায় পিষ্ট হতে না-হয়।

নিহত এবং আহতদের পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কেবল সরকারী সাহায্য-সহযোগিতার ভেতর দিয়ে বেঁচে যাওয়া শ্রমিকের জীবনের কোন গুণগত পরিবর্তন হয়না। কিছুদিন হয়তো পেটে-ভাতে চলা যায় কিন্তু সত্যিকার দীর্ঘমেয়াদি কোন সমাধানে পৌঁছানো যায় না। তাই, গোটা সমাজকে আজ শ্রমিকের পাশে দাঁড়াতে হবে। শ্রমিকদের সাথে সবাইকে সমস্বয়ে আওয়াজ দিতে হতে তৈরী পোশাক শিল্পের গোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। অন্যথায়, আজকের আহত শ্রমিক তার জীবনের ঘানি টানতে পরিবারের নতুন কোন সদস্যকে আবার তৈরী পোষাক শিল্পে পাঠাবে। আবার, মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে। সে হয়তো অন্য কোনদিন লাশ হয়ে ফিরবে! এভাবেই লাশের মিছিলে যুক্ত হবে নতুন লাশ, আর রাষ্ট্রর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিবৃদ্ধি ঘটবে। লাশের মিছিলে যুক্ত হবে নতুন লাশ, আর তৈরী পোষাক রপ্তানি-কারক দেশ হিসাব বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় থেকে প্রথমের দিকে ধাবিত হবে। লাশের পরে যুক্ত হবে নতুন লাশ, আর এদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বার অবারিত ও উন্মুক্ত হবে। রাষ্ট্র মালিক শ্রেণী স্বার্থ দেখবে কেননা রাষ্ট্র খোদ নিজেই মালিকের চরিত্র ধারণ করেছে। সুতরাং রাষ্ট্র হয়ে যাবে মালিকের আর শ্রমিক নিয়মিত পরিণত হবে লাশে, এটা আর চলতে দেয়া যায় না। তাই, আজ সকলের সমন্বিত প্রতিরোধের মুখে তৈরী পোশাক শিল্পের পুরো ব্যবস্থাটিকেই পাল্টাতে রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে হবে। তবেই, রাষ্ট্র মালিকের না-হয়ে শ্রমিকের হয়ে উঠবে। আর রাষ্ট্র যদি সত্যিই শ্রমিক-বান্ধব হয়, তবেই ব্যবস্থার রূপান্তর ঘটবে। তখন মালিকও জনগণের কাতারে এসে শামিল হবে। তখনই, শ্রমিকের জীবনের সত্যিকার নিরাপত্তা বিধান করা সম্ভব হবে।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

No comments:

Post a Comment