Thursday, July 4, 2013

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি : দুটি প্রতিক্রিয়ার উত্তর

[দৈনিক ভোরের কাগজ, ২৮/০৬/২০১৩]

বিগত ২০ মার্চ দৈনিক ভোরের কাগজের বর্ষপূর্তি সংখ্যায় “পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি : দেড় দশকের কীর্তন” শিরোনামে প্রকাশিত আমার একটি লেখার প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিগত ১৭ জুন “পার্বত্য পরিস্থিতির ভুল বয়ান এবং একজন নির্বাক লক্ষণ সেন” এবং ২১ জুন “পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি : দেড় দশকের কীর্তন নয়” শিরোনামে যথাক্রমে লে. কর্নেল আব্দুল্লাহ আল ইউসুফ, পিএসপি, জি এবং লে. কর্নেল মোঃ শরীফুল ইসলাম পিএসপির দুটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এ প্রতিক্রিয়ার পরে মূল লেখার লেখক হিসেবে আবার অবস্থান ব্যাখ্যা করাটা আমার তরফে যুগপৎ দায়িত্ব এবং দায় হয়ে ওঠে। তাছাড়া একটা অন্তর্গত তাগিদও অনুভব করছিলাম কিছু ভুল বোঝাবুঝির অবসান করবার সৎ বাসনায়। সেই দায়িত্ববোধই এ লেখার প্রেরণা এবং প্রণোদনা।

প্রথমেই ধন্যবাদ জানাচ্ছি লেখকদ্বয়কে আমার লেখার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবার জন্য। কেননা, মত এবং প্রতিমতের ভেতর দিয়েই একটি ‘ডায়ালগে’র জন্ম হয় যাতে পাঠক দুটি কম্পিটিং আইডিয়াকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে নিজের বিবেক-বুদ্ধির বিবেচনায় সত্যটুকু গ্রহণ করবার স্পেস পেয়ে থাকেন। এবং সেটা বিষয়বস্তুর ‘বিষয়’ ও ‘বস্তু’ দুটোকেই অধিকতর গভীরভাবে উপলব্ধি করবার ক্ষেত্রে জরুরি হয়ে ওঠে। প্রথমেই তিনটি বিষয় সাফ করে নিই। এক, প্রতিক্রিয়ার উত্তরে এ লেখা কোনোভাবেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিয়ে কিংবা সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে কোনো ধরনের বিতর্ক তৈরি করা বা বিতর্কে জড়ানো নয়। দুই, প্রতিক্রিয়া প্রদানকারীর ভিন্নমতের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই আমার অবস্থান পরিষ্কার করা কিন্তু কোনো বিবেচনাতেই প্রতিক্রিয়া প্রদানকারীর বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নেয়া নয় কেননা যে কোনো ভিন্নমতের প্রতি আমি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল। তিন, এদেশের একজন সচেতন এবং সংবেদনশীল নাগরিক হিসেবে সেনাবাহিনীর নানান গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা নিয়ে আমিও গর্ব করি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকায় আমিও গৌরব বোধ করি। দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবেলায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সম্প্রতি রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় উদ্ধারকার্যে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সেনাবাহিনীর প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের কল্পিত গল্প তৈরি করবার কোনো উদ্দেশ্য এবং ইচ্ছা আমার কখনই ছিল না এবং বর্তমানেও নেই।

দুই. লেখার এ অংশে আমি “পার্বত্য চট্টগ্রামের ভুল বয়ান এবং একজন নির্বাক লক্ষণ সেন” লেখাটি সম্পর্কে আমার অবস্থান ব্যাখ্যা করবো। লেখক তার প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের শ্লেষ, বিদ্রƒপ, স্যাটায়ার ব্যবহার করে আমার বক্তব্যের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছেন, আমি অত্যন্ত সচেতনভাবে সেই পথ পরিহার করলাম, কেননা সেটা আমার কাজ নয়। তাই, আমি “লাইন বাই লাইন” বিশ্লেষণ কিংবা ব্যাখ্যা না-করে কয়েকটি মূল জায়গা ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করছি যা পুরো লেখাটিকে উপলব্ধির ক্ষেত্রে যথার্থভাবে সাহায্য করবে বলে আমি মনে করি। লেখক চুক্তি-পরবর্তী পনেরো বছরের জায়গায় বারো বছরের গবেষণায় পুরো চিত্র না পাওয়ার সম্ভাবনা, কালেভদ্রে কোনো খ-িত এলাকা পরিদর্শন এবং চুক্তি-পূর্ববর্তী সময়ের তথ্য জানতে সেকেন্ডারি সোর্স বা গৌণ সূত্রের ব্যবহার, গবেষণার কল্পনাপ্রবণতা প্রভৃতি লেখকের ভাষায় “সীমাবদ্ধতা” উল্লেখ করে আমার গবেষণার বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। লেখকের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে, আমার সত্যিকার প্রফেশনাল গবেষণার বয়স হয়তো বারো বছর কিন্তু পাবর্ত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে আমার সম্পর্ক দুই দশকেরও অধিক। কেননা, আমি যে বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েট করি সে বছর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তারও আগে, সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা করবার সুবাদে পার্বত্য চট্টগ্রামের তখনকার বিদ্যমান পরিস্থিতির সঙ্গে আমি নিবিড়ভাবে পরিচিত ছিলাম। শুধু তাই নয়। বৃহত্তর চট্টগ্রামে আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। ফলে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিবর্তিত ইতিহাসের হাত ধরেই আমি বেড়ে উঠেছি। তাই, আমার বুদ্ধিবৃত্তিক মেচিউরিটি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিবর্তিত ইতিহাসের সমান্তরালে বেড়ে উঠেছে। আর আমি কালেভদ্রে বেড়াতে যাওয়া সেসব ভাড়াটে কিংবা পাইকারি গবেষকের দলভুক্ত কেউ নই। লেখকের সদয় জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে, আমার পিএইচডি গবেষণার সময় আমি প্রায় দেড় বছরেরও অধিক সময় (২০০৫ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে) পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গভীর জঙ্গলে বসবাস করেছি। নগর জীবনের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার বাইরে বিদ্যুৎহীন গভীর অরণ্যে বছরের পর বছর বসবাস করে মাঠকর্ম করেছি। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী খুমি, খেয়াং, লুসাই, পাঙখোয়া, ম্রোদের সঙ্গে বছরের পর বছর বসবাস করেছি। তাদের ভাষা শিখেছি। তাদের সঙ্গে জুমচাষ করেছি। তাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে তাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না, আশা-আকাক্সক্ষা এবং বঞ্চনা-গঞ্জনা তাদেরই একজন হয়ে দেখার চেষ্টা করেছি। একডেমিক ভাষায় একে বলা হয় “পার্টিসিপেন্ট অবজারভেশন”। নিজের অজ্ঞিতার চেয়ে বস্তুনিষ্ঠ কোনো তথ্য নেই। আর গৌণ সূত্রের কথা বলছেন? আমি জাপান সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে জাপানের বিখ্যাত কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেছি। ব্রিটিশ সরকারের অত্যন্ত মর্যাদাকর “ব্রিটিশ একাডেমি ভিজিটিং ফেলোশিফ” নিয়ে ইংল্যান্ডের নাম করা সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা করেছি। যেখানে ব্রিটিশ আমলের সমস্ত দলিল-দস্তাবেজসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সব ধরনের ঔপনিবেশিক তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করেছি। দিল্লির স্কুল অব ইকোনমিক্সে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষেণা করেছি দেশ-বিভাগের সময় এবং পাকিস্তান আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থান কোথায় ছিল সেসব বিষয়-আশয় নিয়ে। বর্তমানে জার্মান সরকারের প্রেস্টিজিয়াস ফেলোশিপ নিয়ে “হামবোল্ড ভিজিটিং ফেলো” হিসেবে জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করছি “শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যায়ন”, “রাষ্ট্র ও প্রান্তের সম্পর্ক”, “আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং বঞ্চনার ইতিবৃত্ত” নিয়ে। এসব স্কলারশিপ এবং ফেলোশিপ আমার গবেষণার বস্তুনিষ্ঠতার জন্যই দেয়া হয়েছে। তাছাড়া, “রাউটলেজ” কিংবা “সেজ পাবলিকেশন” থেকে প্রকাশিত বিশ্ববিখ্যাত জার্নালে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আমার গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে আমার গবেষণার বস্তুনিষ্ঠতার জন্যই। এরপরও যদি, লেখকের মনে হয়ে থাকে আমার গবেষণা বস্তুনিষ্ঠ নয়, সেটা মনে করবার পূর্ণ অধিকার লেখকের আছে এবং তার সেই ভিন্ন অবস্থানের প্রতি আমার পূর্ণ শ্রদ্ধা আছে।

যে তিনটি ঘটনার বিবরণ দিয়েছি, এগুলো আমার অসংখ্য অভিজ্ঞতার কিছু সামান্য প্রজেকশান। চাঁদের গাড়িতে পাহাড়িদের সঙ্গে কিভাবে আচরণ করা হয়, বান্দরবানে প্রবেশের পথে চেকপয়েন্টগুলোতে চেক করার নামে পাহাড়িদের কিভাবে নাজেহাল করা হয় প্রভৃতি আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বয়ান কোনো “লক্ষণ সেনের ভুল বয়ান নয়”। এখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইমেজ ক্ষুণœ করবার কোনো উদ্দেশ্য এবং কোনো ধরনের ইচ্ছা আমার ছিল না এবং নেই। নদীপথে চেকের ঘটনাটা আমি বলিনি “ধর্ষণের চাঞ্চল্যকর কাহিনী”। এটা নিতান্তই ভুল পাঠ কেননা আমি এখানে কোনো ধর্ষণের ঘটনার বিবরণ দেইনি। পাঠকের সুবিধার্থে আমি মূল লেখার উদ্ধৃতি করছি। “বাঙালিদের বোটের ভেতরে বসতে বলা হলো (অর্থাৎ এদের চেক না করলেও চলবে), কিন্তু পাহাড়িরা ততোক্ষণ রোদ্রেই দাঁড়িয়ে থাকলো। চেক করার লোক যখন আসলো তিনি সবাইকে চেক করলেন। বিশেষ করে পাহাড়ি মেয়েদের শরীর চেক করা হলো বেশ ভালোমতো। তিনি হাত দিয়ে ভালোমতো চেক করে দেখলেন গোপন কোনো স্থানে মারাত্মক কোনো অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে কিনা! চেক করা শেষে সবাই যখন বোটের ভেতরে প্রবেশ করলো, পাহাড়ি একটা মেয়ে তখন গোপনে কাঁদছিল আর বহুকষ্টে চোখের পানি লুকানোর চেষ্টা করছিল। এরকম অসংখ্য মেয়ের চোখে পানি সাঙ্গু নদীর জলের সঙ্গে মিশে আছে। এ লুকানো চোখের পানির অর্থ উপলব্ধি না করে, কেবল চুক্তি করে কী পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আনা সম্ভব?” এখানে “কল্পনা” করে “গল্প ফাঁদার” কোনো ব্যাপার নেই। যে ঘটনার আমি নিজে সাক্ষী, সে ঘটনা কল্পনা করে তৈরি করতে হবে কেন? এ ধরনের ঘটনা যে পার্বত্য চট্টগ্রামে ঘটে তার অসংখ্য সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। এরকম আরো একটি নমুনা দিচ্ছি। কাপেং ফাউন্ডেশন কর্তৃক ২০১৩ সালে প্রকাশিত “Human Rights Reports 2012 on Indigenous People in Bangladesh”-এর ১৪০ পৃষ্ঠা থেকে একটা উদ্ধৃতি দিচ্ছি। “On 4 December 2012 a Jumma woman was sexually harassed by a soldier of Naniarchar zone while military forces were distributing winter clothes…inside Naniarchar zone headquarters under Naniarchar upazila in Rangamati hill district… Ms. Rita Chakma (23) …from Morachengi village of Sabekhyong union… also came to collect winter clothes there. At that time, a duty soldier of military forces in civil dress of that zone touched her breast while distributing clothes then & there she slapped him…. However, the army of Naniarchar zone did not take any action against the alleged soldier…”। এরকম অনেক ঘটনা পার্বত্য চট্টগ্রামে ঘটে, আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে একটি মাত্র ঘটনার বিবরণ দিয়েছি। এখানে কল্পনার ফানুস উড়ানোর কিছু নেই। বরঞ্চ বিব্রতকর সত্যের একাডেমিক উপস্থাপনা আছে। তাছাড়া, আমি এরকম ঘটনায় কী ভূমিকা নিয়েছিলাম তা নিয়ে লেখক প্রশ্ন করেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে আমার দীর্ঘদিনের অবস্থানকালে অনেক ঘটনা নিয়ে আমি আমার জায়গা থেকে অবশ্যই অবস্থান নিয়েছিলাম। কিন্তু সেটা সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে আত্মপ্রচারের মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই।

তাছাড়া, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী সাধারণ ও প্রান্তিক পাহাড়িরা অনেক বিশ্বাস এবং আস্থা থেকে তাদের অনেক আনন্দ-বেদনার অভিজ্ঞতা আমার সঙ্গে শেয়ার করেছেন, সেটা একজন দায়িত্ববান এবং গবেষণার প্রতি একজন “নিষ্ঠাবান” এবং “সৎ” গবেষক হিসেবে আমি “পাবলিক” করে দিতে পারি না। নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণার কিছু সুনির্দিষ্ট এথিক্স আছে, যা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে আমি পালন করি। প্রথম প্রতিক্রিয়ার উত্তরে শুধু এতোটুকু বলবো, লেখক পাহাড়ে সেনাবাহিনীর সদস্যদের যে আত্মত্যাগ এবং কষ্ট-সহিষ্ণুতার বিবরণ দিয়েছেন তার সঙ্গে আমার দ্বিমত করবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু এটা মুদ্রার একটা দিক। মুদ্রা অন্য আরেকটা দিক আছে। সেই “দিকটা”ই পার্বত্য চট্টগ্রামে কতো কী করছে তার একটা তালিকা “ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং গ্রুপ ফর ইন্ডিজেনাস এফিয়ার্স” ২০১২ সালে প্রকাশ করেছে যেখানে ২০০৪ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত কিভাবে মিলিটারি কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে তার উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, ১৫ জনকে হত্যা, ৩১ জনকে আহত, ২ জনকে ধর্ষণ, ১৬ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা, ৩২টি লুণ্ঠনের ঘটনা, ৫টি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া, ৭টি মন্দির ভাঙচুর, ৪৬৪ জনকে গ্রেপ্তার, ৩৭৪ জনকে টর্চার, ১৫৪ জনকে প্রহার, ১৭টি পবিত্রতানাশের ঘটনা, ৮৫টি নাজেহালের ঘটনা, ২৮৫টি উচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে বলে এ রিপোর্টে প্রকাশ করা হয়েছে। (সূত্র : Militarization of the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh, IGWIA report-14, Netherlands, 2012, page: 15)। এ রকম অনেক সূত্র উল্লেখ করে, অনেক ফ্যাক্টস হাজির করা সম্ভব। কিন্তু আমার মতো মাঠপর্যায়ের গবেষকরা দ্বিতীয় সূত্রের চেয়ে প্রথম সূত্রকে বা নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে উপলব্ধ ঘটনাকেই প্রাধান্য দেন। তাই, মুদ্রার যে আরেকটা দিক আছে, সেটাকেও যদি আমরা একটু দায়িত্ব নিয়ে দেখি, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যাবে। পরিশেষে লেখকের সঙ্গে একমত হয়ে সুর মিলিয়ে বলতে চাই, আমিও “বিভেদ নয়, সাম্যের কথা বলতে চাই”।

তিন. “পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি : দেড় দশকের কীর্তন নয়” লেখাটি নিয়ে খুব বেশি কিছু বলবার নেই। লেখক প্রথমেই একটি ভুল পাঠ দিয়ে শুরু করেছেন। আমি লিখেছি “‘চুক্তি’ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় কিনা তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী ‘শান্তি ও সংঘর্ষ’ শাস্ত্রে তুমুল বিতর্ক চলছে” আর লেখক লিখেছেন “লেখক [অর্থাৎ আমি] শুরুতেই প্রশ্ন করেছেন চুক্তি করেই শান্তি আনা যায় কিনা?ৃতাই যারা প্রশ্ন করেন চুক্তির মাধ্যমে শান্তি আনা যায় কিনা আমি তাদের আন্তরিকতা এবং যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করতে চাই”। বিচারের ভার পাঠকের হাতে দিলাম। এ প্রতিক্রিয়ায় লেখক ব্যক্তিগতভাবে আমাকে নানান ভাষায় আক্রমণ করেছেন (যেমন “ভাড়াটে বুদ্ধিজীবী”, “সামন্তবাদী”, “সুবিধাবাদী”, “কাপুরুষ” প্রভৃতি) যার উত্তর দেয়ার কোনো প্রয়োজন আমি বোধ করছি না। আমি কেবল লেখকের কয়েকটি ভুল ধারণা ভাঙানোর জন্য নিজের অবস্থানটা পরিষ্কার করতে চাই। যে তিনটি ঘটনার কথা আমি আমার মূল লেখায় উল্লেখ করেছি, তার ব্যাখ্যা আমি আগের অনুচ্ছেদে দিয়েছি। তাছাড়া, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সেনাবাহিনীর যে ত্যাগ এবং পরিশ্রম তা নিয়েও আমার দ্বিমতের কিছু নেই সেটাও আমি আগের অনুচ্ছেদে উল্লেখ করেছি। আমি কেবল মুদ্রার আরেক পিঠ দেখার অনুরোধ করেছি। গবেষণার বস্তুনিষ্ঠতা নিয়েও আমি আমার বক্তব্য আমি দিয়েছি। এখানে লেখক বলার চেষ্টা করেছেন, আমার গবেষণার ফান্ডিং আছে চাঁদাবাজদের কাছ থেকে অর্থাৎ আমার গবেষণার পৃষ্ঠপোষকরা চাঁদাবাজ। আর এ চাঁদাবাজদের টাকায় গবেষণা করে আমি মূলত রুটি-রুজির ব্যবস্থা করি। আমি অত্যন্ত বিনয়ে সঙ্গে বলতে চাই যে, লেখক নিতান্ত ভুল জায়গায় “নক” করেছেন। আমি বাংলাদেশের একটি পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করি। আমার রুটি-রুজির টাকা আসে এদেশের সাধারণ মানুষের শ্রমের-ঘামের পয়সা থেকে। আর পাবলিকের টাকায় আমার রুটি-রোজগারের ব্যবস্থা হয় বলেই সমাজ, রাষ্ট্র এবং সাধারণ মানুষের প্রতি পূর্ণ-কমিটমেন্ট থেকে গবেষণা করি।

লেখকের সদয় জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে, আমার পেশাগত জীবনে আমি কেনোদিন দেশী কিংবা বিদেশী কোনো কনসালটেন্সি ফার্মের হয়ে টাকার জন্য কোনো ফরমায়েশি এবং প্রেসক্রাইভড গবেষণা করিনি। আমার পেশাগত জীবনে টাকা বানানোর জন্য এনজিওর কাজ বা দাতাগোষ্ঠীর টাকায় গবেষণা করিনি। আর আমি কেন সুশীল সমাজ, তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনা করেছি? কারণ আমি অনেক সুশীল সমাজের প্রতিনিধিকে কিংবা তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের দেখেছি তারা দাতাতের (নাকি ম“দাতাদের!) টাকায়, ঢাকায় বসে বড় বড় সবক দেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিত্যদিনের দুঃখ-কষ্ট ও বঞ্চনার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তাছাড়া লেখক, আমি লেখার শেষে কেন ফর্মুলা দিইনি, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। লেখকের সদয় জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে, সিরিয়াস কোনো একাডেমিক গবেষণায় কোনো প্রেসক্রিপশন দেয়া হয় না। বিষয় এবং বস্তুর অনুপুঙ্খ ব্যাখ্যা, বিবরণ এবং বিশ্লেষণ দেয়া (যাকে একাডেমিক পরিভাষায় বলা হয় “নিবিড় বিবরণ” বা “থিক- ডেসক্রিপশন”) হয়, প্রেসক্রিপশন দেয়া নয়। পৃথিবীর কোনো ভালো মাপের এথনোগ্রাফিক গবেষণার শেষে কোনো প্রেসক্রিপশন পাওয়া যাবে না। বরঞ্চ এ ধরনের গবেষণা সমাজের বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের জন্য পলিসি-মেকাররা কাজে লাগাতে পারেন।

লেখক সন্দেহ পোষণ করেছেন আমার দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অগাধ বিশ্বাস এবং দেশের জন্য ভালোবাসা আছে কিনা। চেনা বামুনের পৈতা লাগে না। বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এই দৈনিক ভোরের কাগজেই আমি কমসেকম ৫০-১০০টি লেখা লিখেছি। তাছাড়া, বাংলাদেশের প্রায় সকল প্রথম শ্রেণীর প্রগতিশীল সংবাদপত্রে আমি দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে লেখালেখি করছি, সেখানেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। তাই, দেশের প্রতি আমার ভালোবাসা পরীক্ষিত কেননা তিরিশ লাখ শহীদের উত্তরাধিকার আমি আমার অস্থি, মজ্জা এবং রক্তে ধারণ করি। লেখককে শুধু বিনয়ের সঙ্গে মনে করিয়ে দিতে চাই, এদেশকে স্বাধীন করতে গিয়ে নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে যে লাখ লাখ মানুষ আত্মদান করেছেন তন্মধ্যে সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি ফোর্সের লোকজন পেলেও তিরিশ লাখ শহীদের বেশির ভাগ আমার মতোই সাধারণ মানুষ ছিলেন। আমি আমার মধ্যে তাদের উত্তরাধিকার বহন করি।

পরিশষে বলবো, সমালোচনাকে পজিটিবলি দেখার মধ্যেই আমাদের সকলের কল্যাণ নিহীত। যেমন আমি দুজন সম্মানিত প্রতিক্রিয়া প্রদানকারীর মতামতকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে আমার কোনো ভুলত্রুটি আছে কিনা সেটা চিন্তা করছি। তাই, ভিন্নমতকে বিরুদ্ধমত হিসেবে না-নিয়ে, স্বমতের সহযোগী মত হিসেবে ভাববার চেষ্টা করছি। কেননা, ভিন্নমতকে প্রতিপক্ষমত হিসেবে ব্যাখ্যা করবার মধ্যে দিয়ে মূলত মত ও ভিন্নমত উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেননা, সবাক সমালোচক নির্বাক প্রশংসাবাদীর চেয়ে শ্রেয় এবং হিতকামী বন্ধু। তাই, হিতকামী বন্ধুর ভাবনা কখনো বন্ধুর হয় না।

[ড. রাহমান নাসির উদ্দিন : সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসেবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।]

No comments:

Post a Comment