Sunday, July 28, 2013

রয়েল বেবি নিয়ে হুজুগের রাজনৈতিক অর্থনীতি

[বিডিনিউজ২৪.কম, ২৫/০৭/২০১৩]

ব্রিটেনের রয়েল বেবিকে নিয়ে তাতাম দুনিয়া যে মাত্রার মাতামাতি করছে, তাতে আমার একজন সহকর্মী (জার্মান প্রফেসর ও সামাজিক নৃবিজ্ঞানী) বললেন, "একই সময়ে পৃথিবীতে আরও অসংখ্য বেবির জন্ম হয়েছে। ক্ষুধা, অপুষ্টি, রোগ-ব্যাধি এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কারণে অসংখ্য বেবির মৃত্যু হয়েছে। তাদের নিয়ে কোন ধরনের মাতামাতি নাই। বিশ্বমিডিয়াও তাদের কোন খবর নাই। কিন্তু রয়েল বেবিকে নিয়ে এতো উন্মাদনা কেন? কারণ এ বেবি হচ্ছে একটা 'মনার্কিয়াল বেবি'; আমরা আসলে নিজের অজান্তেই এক ধরনের মনার্কিয়াল-দাসত্বপনায় বাস করি।"

বাংলাদেশের সংবাদপত্রে রয়েল বেবিকে নিয়ে যে মাত্রার সংবাদ, প্রতিবেদন, ছবি এবং ফিচার ছাপা হয়েছে, তাতে আমি ‘ক্যাপটিভ-মাইন্ড’, ‘মনোজাগতিক-ঔপনিবেশ’, ‘উপনিবেশিক-দাসত্বপনা’ এবং ‘মিডিয়ার সেনসেশন-ফোবিয়া’ প্রভৃতি বিষয় নিয়ে নতুন করে ভাবছি।  কেননা পৃথিবীর ইতিহাস কেবল ইউরোপের আলোকায়নের ইতিহাস নয়, অ-ইউরোপের অন্ধকারেরও ইতিহাস। ইতিহাসের এ দ্বান্দ্বিক ফ্রেমওয়ার্কের ভেতর দিয়েই রয়েল বেবির জন্ম এবং তার জন্ম-উদযাপনের মাত্রা ও প্রবণতা অনুধাবন জরুরি। সে রকম একটি বিশ্লেষণের জায়গা থেকে রয়েল বেবি, রয়েল বেবির জন্মকেন্দ্রিক উন্মাদনা, মিডিয়ার ভূমিকা এবং কর্পোরেট দুনিয়ার মনার্কিয়াল-মার্কেটিংকে দেখার চেষ্টা এ নিবন্ধের কেন্দ্রীয় মনোযোগ।


প্রথমেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে শুরু করি। কেননা তথ্য জানাটা জরুরি তত্ত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করার জন্য। অন্যভাবে বলা যায়, একটি মজবুত বিশ্লেষণ দাঁড় করার জন্য যথাযথ তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রয়েল বেবির আগমন উদযাপনকে উন্মাদনা বলা যায় কিনা তা এ উদযাপনের মাত্রা, ব্যাপ্তি ও চরিত্র দেখে অনুমান করা যায়।

এ জন্ম উদযাপন করার জন্য রয়্যাল ফোর্স আর্টিলারির আয়োজনে লন্ডনের গ্রিনপার্কে একচল্লিশবার তোপধ্বনি করা হয়। আর আর্মি রিজার্ভ রেজিমেন্ট লন্ডন টাওয়ারে তোপধ্বনি করে বাষট্টিবার। তাছাড়া গোটা লল্ডনের ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানগুলোকে নীল (ছেলে হলে নীল আর মেয়ে হলে গোলাপি) আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়। ট্রাফালগার স্কোয়ার রাঙানো হয় নীলরঙে। ‘লন্ডন আই’ ঢেকে দেওয়া হয় ব্রিটেনের জাতীয় পতাকা দিয়ে। বিটি টাওয়ার ঝলমল আলোয় রাঙিয়ে দিয়ে ‘ইটস এ বেবি বয়’ লিখে সার্কেল তৈরি করা হয়। টেমস নদীর ওপারে টাওয়ার ব্রিজও নীলরঙে রাঙিয়ে রয়েল বেবিকে স্বাগত জানানোর ব্যবস্থা ছিল। এছাড়া ন্যাশনাল গ্যালারি এবং ব্ল্যাকপুল টাওয়ারও ছিল নীলরঙে রাঙানো। কেবল লন্ডনেই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য অনেক ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থাপনাগুলো বর্ণিল রঙে রাঙিয়ে রয়েল বেবির আগমনকে স্বাগত জানানো হয়। যেমন, নায়াগ্রা জলপ্রপাত, টরেন্টোর সিএন টাওয়ার, অটোয়ার পার্লামেন্ট ও পিস টাওয়ার, নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস-চার্জ বিমানবন্দর, অকল্যান্ডের ট্যুরিষ্ট জোন প্রভৃতি স্থানে ছিল ব্যাপক আলোকসজ্জার আয়োজন।

একটি শিশুর জন্ম কেন্দ্র করে সারা দুনিয়ায় যে মাতম উঠেছে এটা কীসের আলামত? সেটা কি কেবলই ব্রিটেনের একজন ভবিষ্যত রাজার আগমন উদযাপন না এটা কেবলই হুজুগে-উচ্ছ্বাস? নাকি এর একটি রাজনৈতিক অর্থনীতি আছে যেটি গভীরভাবে চিন্তা করার প্রয়োজন রয়েছে?

মূলত রয়েল বেবির জন্ম নিয়ে সারা দুনিয়াতেই দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বমিডিয়ায় নানা সংবাদ, প্রতিবেদন এবং ফিচার ছাপা হয়েছে। কিন্তু সে বেবি ছেলে না মেয়ে হবে, সেটা জন্মের আগমুহূর্তেও কেউ জানতে পারেনি। এ না-জানার কারণেই, রয়েল বেবি ছেলে না মেয়ে তা নিয়ে ৫০ হাজার লোক বাজিতে অংশ নিয়েছে। বেটিং হাইজের তথ্য অনুযায়ী বেশিরভাবে বাজিকর মেয়ে হওয়ার পক্ষে বাজি ধরেছে। প্রায় দুই মিলিয়ন পাউন্ডের বাজির খেলা হয়েছে। আল্ট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে যেখানে জন্মের অনেক আগেই বেবির জেন্ডার জানা সম্ভব সেখানে অবাধ তথ্যপ্রবাহের কথিত এ স্বর্ণযুগেও কেউ তা জানতে পারেনি! বিষয়টি একটু ক্রিটিক্যালি দেখলেই এটা দিবালোকের মতো ষ্পষ্ট হয় যে, সনাতন মনার্কি-ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে তার জৌলুসপূর্ণ ‘রয়েল’ ইমেজ জারি রেখে, মানুষের মনোযোগের একটি ভরকেন্দ্র হিসেবে সেটাকে বাণিজ্যিক উপাত্তে রূপান্তর করার এটি একটি নমুনা মাত্র।

এবার রয়েল বেবির নিউজ-হিটিং নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিই। ডাচেস অব কেমব্রিজকে লন্ডনের সেন্ট মেরি হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে বিবিসির ওয়েবসাইটে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৯.৪ মিলিয়ন লোক ভিজিট করেছে; তার মধ্যে কেবল ব্রিটেনেই হিট করেছে প্রায় ১০.৮ মিলিয়ন। হসপিটালের সম্মুখদরজা দিয়ে যখন কেট এবং উইলিয়াম রয়েল বেবিকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন তখন দু মিনিট ধরে চ্যানেল থ্রিতে লাইভ দেখেছে ৭ মিলিয়ন দর্শক, আইটিভিতে দেখেছে ৭.৫ মিলিয়ন এবং বিবিসিতে প্রায় ৭.১৬ মিলিয়ন। অন্যান্য টিভিতেও মিলিয়ন মিলিয়ন দর্শক এ নিউজ সাবস্ক্রাইব করেছে। অনুমান করা যায়, ‘মনার্কিয়াল এক্সিসটেন্স’ কীভাবে কেবল কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডকেই প্রমোট করে না, মিডিয়ার সর্বগ্রাসী আগ্রাসানেও প্রকারান্তরে ফুয়েল সরবরাহ করে। আর এ সংবাদ প্রচারের সুবাদে ব্রিটেনের প্রধান প্রধান টিভি চ্যানেলগুলো কেবল বিজ্ঞাপন বাবদ আয় করেছে মিলিয়ন ডলার। বাদবাকি বিশ্বের কীর্তন না-হয় না করলাম।

রয়েল বেবির অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক মূল্য নিয়েও বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। কিছু তথ্য দিয়ে নিই চূড়ান্ত আলোচনায় যাওয়ার আগে। অর্থনীতিবিদরা মতপ্রকাশ করেছেন যে, রয়েল বেবির জন্ম ব্রিটেনের অস্থির অর্থনীতিতে প্রায় ৩৭৬ মিলিয়ন ডলার কিংবা ২৪০ মিলিয়ন পাউন্ড যোগান দেবে। তার মধ্যে বেবির জন্ম সেলিব্রেট করার জন্য প্রায় ৯৭ মিলিয়ন ডলারের পানীয় (অ্যলকোহল) বিক্রি হবে এবং ৩৯ মিলিয়ন ডলারের খাওয়া-দাওয়া হবে। উপহার কেনাকাটা হবে ৬৭ মিলিয়ন ডলারের। ইতোমধ্যে লন্ডনসহ সারা বিশ্বের শেয়ার বাজারে চাঙাভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অর্থাৎ ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, রয়েল বেবির জন্ম ব্রিটেনের পুরো অর্থনীতিতে একটা বিরাট ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এসব তথ্য থেকেই বোঝা যায় যে মনার্কি টিকিয়ে রাখার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করা সম্ভব।

তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে নিবন্ধের শুরুতেই যে ভাবনা উপস্থাপিত হয়েছে তার একটি যথাযথ উপসংহার টানা সম্ভব। যেমন, ইউরোপকে বিশ্বব্যাপী আধুনিক, গণতান্ত্রিক, উদার, বাকস্বাধীনতার, মানবাধিকারের ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মডেল হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। অনুন্নত, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলো নিজেদের মধ্যকার দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থনীতি, বহুমাত্রিক রাজনৈতিক সংকট, গণতন্ত্রের নানা সীমাবদ্ধতা, মানবাধিকারের হরদম লঙ্ঘন এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার অপর্যাপ্ততা বিষয়ক হা-হুতাশ থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে ইউরোপের উদহারণ দিয়ে থাকে। তাছাড়া প্রাচ্যের অনেক দেশের তথাকথিত সুশীলরা সনাতন জীবনব্যবস্থার বিপরীতে, সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিপ্রতীপে ইউরোপের আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাপনার নজির টানেন। কিন্তু খোদ ইউরোপেই উদার ও নব্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আবরণে যে এক বিরাট রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে– অন্তত মানুষের মনোজগতে তো বটেই– বসবাস করছে সেটা আমরা কদাচিৎ উপলব্ধি করি। হল্যান্ড, বেলজিয়াম, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন এবং ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের প্রতি মানুষ, সমাজ এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার আবেগ, আনুগত্যপনা ও উন্মাদনা– গোটা ইউরোপের যে উদার, গণতান্ত্রিক, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী এবং মুক্ত জীবন-ভাবনা ও তার সামাজিক সম্মতিজাত প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাপনার ইমেজ বিশ্বব্যাপী জারি আছে– তার সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। ব্রিটেনের রয়েল বেবির জন্ম, জন্ম-উদযাপনের উন্মাদনা এবং যেসব রিচুয়াল পালন করা হচ্ছে, তা এ বক্তব্যের যথার্থতা প্রমাণ করে। অর্থাৎ ‘সারফেসে’ আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি, অভ্যন্তরে তলে তলে খেলছে আন্তর্জাতিক কর্পোরেট পুঁজির মনার্কিয়াল-মার্কেটিং-এর একটি যুৎসই সিস্টেম যা প্রকারান্তের পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার স্বার্থে ইউরোপে ‘রয়েলইজম’ বা ‘সনাতন-মনার্কি’ জিইয়ে রাখার যে একটি রাজনৈতিক অর্থনীতি কিংবা অর্থনৈতিক রাজনীতি সেটার হাইপোথেসিসকে ন্যায্যতা দেয়। আর বিশ্বব্যাপী সর্বগ্রাসী মিডিয়া আন্তর্জাতিক কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের সে এজেন্ডা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বাজারে জারি রাখে। কেননা মিডিয়ার ‘ভোক্তা’ হিসাবে জনরুচি ও জনভাবনার মনোজগৎ তৈরি করার ক্ষেত্রে মিডিয়া আন্তর্জাতিক কর্পোরেট প্রকল্পের কলাবরেটরের কাজ করে। মিডিয়া কর্তৃক উৎপাদিত সংবাদের ভোক্তা হিসাবে মানুষ বিশ্বব্যাপী কর্পোরেট এজেন্ডা সাবস্ক্রাইব করে। আর বাংলাদেশের মিডিয়া আন্তর্জাতিক এ সাবস্ক্রিপসনকে লোকালি পুনরুৎপাদন (রিপ্রডিউস) করে। কেননা, মিডিয়ার ব্যাপক ও বেপরোয়া বিস্তারের যুগে ভোক্তার রুচি ও চাহিদা আর কোনো বিবেচনাতেই ‘লোকাল’ নেই, সেটা ক্রমান্বয়ে ‘গ্লোবাল’ হয়ে উঠেছে। ফলে রয়েল বেবির সংবাদ, প্রতিবেদন, ছবি এবং ফিচার বাংলাদেশের মিডিয়ায়ও সমান তালে ও সমান্তরালে রিফ্লেক্টেট হয়েছে।

যে কোনো বেবির জন্ম আমরা স্বাগত জানাই। তবে ব্রিটেনের রাজপ্রাসাদের নতুন শিশুকে স্বাগত জানানোর এ উন্মাদনায় বাংলাদেশের কোনো বস্তিতে জন্ম নেওয়া কিংবা পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্ম নেওয়া নন-রয়েল বেবিদেরও স্বাগত জানানো মানুষ হিসেবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কেননা যার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং কর্পোরেট মূল্য আছে তাকে যদি আমরা স্বাগত জানাই, আর যার দৃশ্যত ও আপাত সেরকম কোনো মূল্য নেই তাকে স্বাগত না-জানাই– তবে আমরাও অজান্তেই সে কর্পোরেট সংস্কৃতির অংশ হয়ে যাই। তাই রয়েল বেবির পাশাপাশি একই সময়ে জন্ম নেয়া সকল বেবিকে আমাদের পৃথিবীতে স্বাগতম।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। 

No comments:

Post a Comment