Monday, October 14, 2013

গণতন্ত্র, নির্বাচন ও রাজনীতি

[দৈনিক ইত্তেফাক ১২/১০/২০১৩]
শাসনব্যবস্থার অধিকতর গ্রহণযোগ্য মডেল হিসাবে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে ন্যায্যতা পেলেও, বাংলাদেশের রাজনীতির গেড়াকলে পড়ে 'গণতন্ত্র' একটা বিকট রূপ ধারণ করেছে। গণতন্ত্রের নানান তাত্ত্বিক অর্থ এবং একাডেমিক ব্যাখ্যা থাকা সত্ত্বেও গণতন্ত্র সাধারণ গণমানুষের নিত্যদিনের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে পরিস্থিতি এবং পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে নিজেই নিজের অর্থ উত্পাদন করে। আমজনতার বোঝাবুঝিতে গণতন্ত্রের মমার্থ হচ্ছে জনগণের শাসন। জনগণ আবার শাসক হয় কীভাবে? জনগণ তো সবসময়ই শাসিত শ্রেণি? অন্যের দ্বারা শাসিত হওয়াই জনগণের নিয়তি। কিন্তু এটাই গণতন্ত্রের আসল মমার্থ যে, জনগণ নিজেই নিজের শাসক আবার নিজেই নিজের অধীনে শাসিত। গণতন্ত্রের এ ঐতিহাসিক সৌন্দর্য, মাধুর্য এবং ব্যবস্থাপনা হিসেবে এর যে ফলপ্রসূ প্রয়োগ তা সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় গণমানুষের বৃহত্তর কল্যাণ সাধন করে বলেই, গণতন্ত্র এখনও পৃথিবীর দেশে দেশে একটি সফল রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসাবে আরাধ্য। কেননা, একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণই নিজেদের মধ্য থেকে তাকে শাসন করবার জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন করে এবং সে নির্বাচিত প্রতিনিধিকে জনগণের সেবা করবার সুযোগ দেয় এ শর্তে যে জনগণ তার কথা শুনবে এবং তাকে মানবে। আর জনগণের প্রতিনিধি জনগণকে শাসন করবার ক্ষমতা পেয়ে জনগণের সেবা করবে এ কৃতজ্ঞতায় যে, জনগণই তাকে নির্বাচন করেছে এবং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছে, জনগণের সেবা করবার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। জনগণের প্রতিনিধি এ দর্শনের ফ্রেমওয়ার্কে জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা আবদ্ধ থাকেন যে, সে জনগণের একজন হয়েও জনগণকে শাসন করবার ক্ষমতা পায় জনগণেরই দয়ায়। তাই, গণতন্ত্র এক অর্থে নিজেই নিজেকে শাসন করা এবং তাই গণতন্ত্রের বিশ্বজনীন রূপ হচ্ছে 'গণমানুষের শাসন'। একই কারণেই গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের মোহ এবং আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত তীব্র। একটি গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাই মানুষের সকল প্রকার সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা যে গণতন্ত্রের চর্চা করি, যে গণতন্ত্রের স্বরূপ দেখি এবং যে কিসিমের গণতন্ত্র দেখি, সেটা গণতন্ত্রের যে সার্বজনীন এবং বিশ্বজনীন ধারণা, তার অনেকটা বিপ্রতীপ বিন্দুতে অবস্থান করে।

বিগত দুই দশকের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র আর পাঁচ বছর পর পর একটি জাতীয় নির্বাচন প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে। অবস্থা এমন একটা পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে, নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র আর গণতন্ত্র মানেই নির্বাচন। এদেশের রাজনীতিবিদ, দলীয় বুদ্ধিজীবী এবং তথাকথিত সুশীল সমাজের লোকজন পাবলিককে মোটামুটি এটা গিলিয়ে ছেড়েছে যে, 'গণতন্ত্র মানে হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর নির্বাচন'। আর আমরা পাবলিকরা এ গণতান্ত্রিক বড়ি খেয়ে মোটামুটি হজম করে নিয়েছি এবং সে মোতাবেক গণতন্ত্রের একটা অর্থ সামনে এনে খাড়া করেছি। আমরা এখন বুঝি, পাঁচ বছর পর পর শাসক শ্রেণির লোকদের হাতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করবার নাম হচ্ছে গণতন্ত্র। আমরা পাবলিকরা রাজনীতিবিদদের এ গণতান্ত্রিক দাওয়াই খেয়ে এবং দলীয় বুদ্ধিজীবী অবিরাম লেকচারের ভেতর দিয়ে বেশ শিক্ষিত হয়ে উঠেছি কেননা আমরা এখন সত্যিকার অর্থেই জানি গণতন্ত্র মানে কী! পাঁচ বছর পর পর একটা করে ভোট দিয়ে একটি নির্দিষ্ট দলকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা হচ্ছে গণতন্ত্র এবং প্রয়োজনে পাঁচ বছর পর আরেক দলকে ক্ষমতায় বসাবো কেননা জনগণই সকল ক্ষমতার উত্স; ক্ষমতা হাতে থাক বা না থাক সংবিধানে তো আছে! রাষ্ট্রের মালিক জনগণ! সুতরাং এ রাষ্ট্রকে লুটপাট করবার দায়িত্ব কাকে দেবে সেটা জনগণ ঠিক করবে! পাবলিক ভোট দিয়ে রাষ্ট্রকে একটি রাজনৈতিক দলকে পাঁচ বছরের জন্য তালুক দেবে আর আগামী পাঁচ বছর জীবনের ঘানি টানতে টানতে হা-পিত্তেস করে করে অপেক্ষা করবে যাতে মেয়াদান্তে আরেকটা ভোট দিতে পারে এবং যাতে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে! গণতন্ত্রের নামে এর চেয়ে নির্মম তামাশা আর হতে পারে না! 

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে 'নির্বাচন একটি পিরিয়ডিক এলিট গেইম'। অর্থাত্ পাঁচ বছর অন্তর অন্তর এদেশের রাজনীতিবিদদের হাতে ক্ষমতার বদল অথবা ক্ষমতা নবায়নের একটা ভোট ভোট খেলার নাম হচ্ছে নির্বাচন। সমাজের অভিজাত শ্রেণির লোকজন সে খেলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং তাদের সমশ্রেণি থেকেই একজন বিজয়ী হন। আমরা পাবলিকরা "আমার ভাই, তোমার ভাই" বলে গলা ফাটাই এবং নানান উত্তেজনায় মগ্ন থেকে সে খেলায় অংশ নিই কিন্তু কখনও জিততে পারি না। কেননা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রনৈতিক পরিকাঠামোয় 'নির্বাচন' নামের এ পিরিয়ডিক গেইমে পাবলিক কেবল অংশ নিতে পারে কিন্তু কখনই জিততে পারে না। সব সময় জিতবে সমাজের অভিজাত শ্রেণির লোকরা। রাজনীতির পরিভাষায় যাদেরকে সমাজের শাসকশ্রেণি নামে ডাকা হয়। তাই, স্বাধীনতার ৪২ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের পার্লামেন্টে কোন রিকশাওয়ালা, কোন কৃষক, কোন কারখানা শ্রমিক, কোন মুচি, কোন কামার, কোন কুমার, কোন জেলে কিংবা কোন পিওন, দারোয়ান, সুইপার নির্বাচিত হয়ে যেতে পারেন নাই কেননা এরা হচ্ছেন 'পাবলিক'। পাবলিক কেবল এলিটদের খেলায় অংশ নেবে কিন্তু কখনও জিততে পারবে না। তাই মহান জাতীয় সংসদের আসন বরাদ্দ আছে এদেশের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত আমলা, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, এনজিওলা, সুশীল সমাজ কিংবা বড়জোর কোন পপুলার নায়ক-নায়িকা বা গায়ক-গায়িকা; মোদ্দাকথা সমাজের উপরতলার মানুষ। সুতরাং 'নির্বাচন' নামে আমাদের যা খাওয়ানো হচ্ছে তা হচ্ছে সমাজের অভিজাত শ্রেণির 'এলিট গেইম' যার মাধ্যমে পাবলিককে শাসন করবার ক্ষমতাকে এক ধরনের আইনগত বৈধতা দেয়া হয় কিংবা ব্যাপক বিনোদনের মাধ্যমে আইনগত বৈধতা নেয়া হয়। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন জাতীয় সংসদের নির্বাচনকে সামনে নিয়ে সরকারি এবং বিরোধী দলের কার্যক্রম দেখলে মনে হয়, এদেশের গণতন্ত্র রক্ষায় দুইদল যেন যুদ্ধে নেমেছে। গণতন্ত্র রক্ষায় বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের অক্লান্ত আহাজারি দেখে মনে হয়, 'গণতন্ত্র' এবার আর পালাবার পথ পাবে না! এ হাস্যকর প্রতিযোগিতা রাজনীতি এবং গণতন্ত্র উভয়কেই প্রকারান্তরে পাবলিকের কাছে একটি যন্ত্রণাময় বিষয়ে পরিণত করেছে। 

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা এখন আর রাজনীতিতে নেই, আছে নির্বাচনে। আওয়ামী লীগ আছে 'নির্বাচন যে কোনভাবেই হোক করতে হবে' আর বিএনপি আছে 'যে কোন মূল্যেই নির্বাচন ঠেকাতে হবে'। তাই, 'নির্বাচনই এখন রাজনীতি' অথবা 'রাজনীতি মানেই নির্বাচন' যেটা গণতন্ত্র রক্ষার নামে বাজারে জারি রাখা হয়েছে। আর নির্বাচনের রাজনীতি মানেই স্রেফ ক্ষমতায় যাওয়া আর না যাওয়ার প্রতিযোগিতা। এখানে গণতন্ত্রের আদৌ কিছু আছে কিনা আমার গুরুতর সন্দেহ আছে অন্তত বাংলাদেশি ব্রান্ডের রাজনীতির বিবেচনায়। এ নির্বাচনের রাজনীতি থেকে গণতন্ত্র কবে যে মুক্তি পাবে?-এখন সেটাই দেখার বিষয়। নির্বাচনের রাজনীতির নামে পাঁচবছরান্তের এলিট-গেইমের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি দিয়ে আর যাই হোক অন্তত 'গণতন্ত্র' হয় না। জনগণের জীবন-মানের সত্যিকার কোন রূপান্তর ঘটে না। তাই, গণতন্ত্র রক্ষার নামে রাজনীতিবিদরা আমাদের প্রতিদিনই হাইকোর্ট দেখাচ্ছে। হাইকোর্ট দেখতে দেখতে পাবলিক এখন ক্লান্ত!

লেখক:সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন

No comments:

Post a Comment