Tuesday, December 31, 2013

মানবতার চাদরে রাজনৈতিক চরিত্র ঢাকার রাজনীতি!

[বিডিনিউজ২৪.কম, ০৯/১২/২০১৩]

[লেখাটি 'জীবিত ম্যান্ডেলা, মৃত ম্যান্ডেলা' শিরোনামে বিডিনিউজ২৪.কম-এর মতামত বিশ্লেষণ পাতায় ০৯/১২/২০১৩ তারিখ ছাপা হয়েছে। কিন্তু এ লেখাটিতে চৌদ্দটি তথ্যসূত্র ছিল, যা প্রকাশিত লেখাটিতে মিসিং হয়ে গেছে। আগ্রহী পাঠকের জন্য তথ্যসূত্রসহ লেখাটি এখানে নোট আকারে পোষ্ট করা হলো।]

চামড়ার রাজনীতি এবং আধিপত্য থেকে আফ্রিকার কালো মানুষের মুক্তিদাতা হিসাবে বিশ্বব্যাপী নেলসন ম্যান্ডেলার যে ভাবমূর্তি তৈরী হয়েছে, সেটা দেশে দেশে রাষ্ট্রের চরিত্র, আমজনতার হাল-অবস্থা, বিশ্বমানবতার বা মানুষের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ফ্রেমওয়ার্কে সময়ের পরিক্রমায় নানান মাত্রা লাভ করেছে। আফ্রিকার দেশে দেশে তো বটেই, বাদবাকি বিশ্বেও নেলসন ম্যান্ডেলার অবস্থান, গ্রহণযোগ্যতা এবং দর্শন নানান মাত্রায় গৃহীত (বা নিগৃহীত !) হয়েছে। তাই, তার পরিচিতি কোন কোন সময় বিশ্বরাজনীতির চরিত্র, নয়া-পুঁজিবাদি বিশ্বের চালক ও চলক, মার্কিন ও তার সহযোগীদের যুদ্ধবাজ পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থের বাটখারায় মাপজোক করে উপস্থাপিত হয়েছে। উপস্থাপনার এ রাজনীতি তাঁর মৃত্যুর পরেও সমান তালে জারি আছে। তাই, নেলসন ম্যান্ডেলাকে একজন মানবতাবাদি, মহান ব্যক্তিত্ব, শান্তির দূত, আত্মত্যাগের মহান আদর্শ, পারসন অব উইজডম, সহনশীলতার উদাহারণ এবং আধুনিক দক্ষিণ আফ্রিকার স্রষ্টা প্রভৃতি বিশেষণের আবরনে ঢেকে দেয়া হচ্ছে। অবশ্যই নানান বিচারে ম্যান্ডেলার ব্যক্তিত্বের এবং কৃতকর্মের নানান বিবেচনায় এসব বিশেষণেরও যথার্থ ন্যায্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু নেলসন ম্যান্ডেলার বিপ্লবী রাজনৈতিক দর্শন কী ছিল, বিশ্বরাজনীতিতে তাঁর অবস্থান কী ছিল, সমাজতান্ত্রিক বনাম পুঁজিবাদি বিশ্বের রাজনীতিকে ম্যান্ডেলা কীভাবে দেখতেন, আমেরিকা-বৃটিশ-ইজরাইল নেক্সাসকে ম্যান্ডেলা কীভাবে সনাক্ত করেছিলেন, যুদ্ধবাজ মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে ম্যান্ডেলা কীভাবে সমালোচনা করেছেন এবং বৈশ্বিক পরিম-লে আন্তঃরাষ্ট্রীয় রাজনীতির অসম সম্পর্ককে ম্যান্ডেলা কীভাবে বিবেচনা করতেন প্রভৃতি বিষয়-আশয় অদ্যাবধি সাম্রাজ্যবাদি পশ্চিমের জন্য যথেষ্ট বিব্রতকর এবং ভীতিকর বলেই, মৃত্যুর পর একজন আজন্ম বিপ্লবী ম্যান্ডেলাকে মানবতার চাদরে ঢেঁকে দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রকে আড়াল করবার একটা সুক্ষ্ম রাজনীতি আমরা লক্ষ করছি। এ নিবন্ধে তার সামান্য খোঁজ-খবর নেয়া চেষ্টা করা হয়েছে।

নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যুর সংবাদে অত্যন্ত স্বাভাবিক কারণেই, এবং প্রত্যাশা মোতাবেকই, তামাম দুনিয়ায় শোকের মাতম উঠেছে। পৃথিবীর দেশে দেশে সাধারণ গণমানুষ তথা নিচতলার মানুষের মধ্যে, নিপীড়িত, নির্যাতিত, বঞ্চিত মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বজন হারানোর বেদনা যেমন ডুঁকরে উঠছে, তেমনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেশে সমাজের উঁচুতলার মানুষের মধ্যেও বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রকাঠামোর ব্যবস্থাপনার সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণিও ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে শোকগাঁথা রচনা করছেন। এমনকি নানান মাত্রায় বর্ণবাদের চেয়ে ভয়াবহ অসম সম্পর্ককে যারা সমাজে নিষ্ঠার সাথে জারি রেখেছে, এবং নিজেদের শ্রেণি স্বার্থের জন্য নানান ছদ্মবেশে বর্ণবাদি রাজনীতির প্রয়োগ করছে, তারাও বর্ণবাদ-বিরোধী এ মহান নেতাকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাচ্ছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট, বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী এবং ইজরাইলের প্রধানমন্ত্রী, যারা ম্যান্ডেলার জীবতাবস্থায় বিশেষ করে তার সক্রিয় বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়কালে ম্যান্ডেলাকে সন্ত্রাসী, কমিউনিষ্ট (গালি অর্থে!), নিকৃষ্ট প্রাণি বলে সকাল বিকাল গালি দিতেন, তারাও বিশেষণের প্রাবল্যে এবং সম্মানের ফুলঝুঁড়িতে তাদের বক্তব্যকে ভরে দিচ্ছেন ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করতে গিয়ে। মৃত্যু মানুষকে মহান করে দেয় কেননা মৃত্যু মানুষকে সবধরনের হিসাব নিকাশের উর্ধ্বে নিয়ে যায়। তাই, মানুষের মৃত্যুর শোকগাঁথা সাধারণত সকল প্রকার ইহজাগতিক স্বার্থের উর্ধ্বে মানুষের মনের গভীর থেকে আপনা-আপনি সঞ্চারিত হয়। কিন্তু মানুষের সার্বজনীন মানবতাবাদের বিপ্রতীপে গিয়ে মার্কিন, বৃটিশ এবং ইজরাইলের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতেও এক ধরনের উপস্থাপনার রাজনীতি লক্ষ করা যায়, যেখানে পুঁজিবাদি বিশ্বের সাথে সমাজতন্ত্রী বিশ্বের, পশ্চিমা বনাম বাদবাকি বিশ্বের অসম সম্পর্ক, প্রভুত্বের ইতিহাস এবং ঔপনিবেশিক মানসিকতার একটা আভাস পাওয়া যায়। সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হচ্ছে, ম্যান্ডেলাকে এসব রাষ্ট্র মৃত্যু-উত্তর কীভাবে, কোন ভাষায় এবং কোন মর্যাদায় সম্মান করছে তার ভেতর দিয়ে সেসব রাষ্ট্রের তথাকথিত মানবতাবাদি এবং উদার গণতান্ত্রিক একটি ইমেজকে বাজারে বিনামূল্যে প্রচার করবার একটা মওকা হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ মৃত্যুর পরও ম্যান্ডেলা মার্কিন-বৃটিশ-ইজরাইল নেক্সাসের উপস্থাপনায় ব্যবহৃত হচ্ছে রাজনেতিক উপাত্ত হিসাবে। বিষয়টা তথ্য প্রমাণসহ ব্যাখ্যা করা যাক।   

নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যুর পরপরই হোয়াইট হাউস থেকে একটি অফিসিয়াল ষ্ট্যাটমেন্ট দেয়া হয় যার প্রথম বাক্য হচ্ছে, ‘আজকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার একজন নিকট বন্ধুকে হারাল’ [১]; অথচ ২০০৮ সাল পর্যন্ত এ নিকট বন্ধু নেলসন ম্যান্ডেলা ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরী করা টেররিষ্টদের তালিকায় [২]; ম্যান্ডেলার প্রতি শোক-বক্তব্য রাখতে গিয়ে আমেরিকার ভাইস-প্রেসিডেন্ট তার বক্তব্যে শেষ করেন ছোট একটি বাক্য দিয়ে তিনি একজন ভাল মানুষ ছিলেন’ [৩]; ম্যান্ডেলাকে ভাল মানুষ হিসাবে আখ্যায়িত করে প্রকারান্তরের নিজেকে একজন ভাল মানুষ হিসাবে জাহির করার রাজনীতি! অথচ ২০০৩ সালে আমেরিকা যখন তার নেতৃত্বের অন্যান্য অক্ষ শক্তি নিয়ে ইরাক আক্রমণ করতে যাচ্ছিল, নেলসন ম্যান্ডেলা তখন তার সমালোচনা করায়, যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট এ ভালো লোক’-টি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘একজন দুশ্চরিত্রের মার্কিন বিরোধী এবং সাদ্দামের একনিষ্ট সাপোর্টারের কাছ থেকে মার্কিন বিরোধীতা নতুন কোন ব্যাপার নয়, কেননা তিনি হচ্ছে একজক দীর্ঘদিনের কমিউনিষ্ট এবং সন্ত্রাসীদের মদদদাতা’ [৪]; ম্যান্ডেলাকে সন্ত্রাসীদের হিসাবে উপস্থাপনার অবিরাম কসরত এখনও মার্কিন মুলুকে অত্যন্ত যত্মের সাথে -- বিশেষ করে রাজনীতিকি এবং একাডেমিক প-িতদের কাছে -- জারি আছে। পিটার বিইনার্ট চমৎকার বলেছেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিক এবং একাডেমিক পণ্ডিতরা নব্বইয়ের দশকের কোল্ড-ওয়ারকে বর্ণনা করেন দুটি শক্তির- একটি হচ্ছে মার্কিন সমর্থিত মুক্তির শক্তি (ফোর্সেস অব ফ্রিডম) এবং অন্যটি হচ্ছে সোভিয়েত সমর্থিত নিষ্ঠুরতার শক্তি (ফোর্সেস অব টাইরানি)- যুদ্ধ হিসাবে। যেখানে ম্যান্ডেলা নিষ্ঠুরতার পক্ষে ছিলেন’ [৫]; কিন্তু সেই নিষ্ঠুরলোকটির মৃত্যুর পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমন দরদি হয়ে উঠেছে যে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার ভাষণে ঘোষণা করেছেন যে, আগামী ৯ ডিসেম্বর সকাল থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত নেলসন ম্যান্ডেলার সম্মানে হোয়াইট হাউজ, সমস্ত সরকারী প্রতিষ্ঠান এবং সেনা-স্থাপনাগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে [৬] । দুশ্চরিত্রের কমিউনিষ্ট’, ‘সন্ত্রাসীএবং সন্ত্রাসীদের মদদদাতার মৃত্যুতে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, যা সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপি সশস্ত্র জেহাতে লিপ্ত, কমিউনিষ্টদের জাত-শত্রুতে পরিণত করা একটি দেশ, কেন তার প্রতি এতো বড় সম্মান দেখাচ্ছে? এখানেই রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত উদার-গণতন্ত্রের গলাবাজি, মানবতাবাদের দোহাইকে জায়েজ করবার এবং মানবতাবাদের চাদর দিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলার অস্তিত্বের যে রাজনৈতিক সত্ত্বা তাকে আঁড়াল করবার সাম্রাজ্যবাদি কূট-কৌশল।

বৃটিশকুলও এ কূটকৌশলের রাজনীতিতে কম পাকাপোক্ত নন। নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করতে গিয়ে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন তো রীতিমত সবাইকে টেক্কা দিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নেলসন ম্যান্ডেলা কেবল আমাদের সময়ের হিরো নন, তিনি সবসময়ের সর্বকালের হিরো’ [৭];  অথচ এ ডেভিড ক্যামেরুনই ১৯৮০ দশকে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন, তখন তার রুমে হ্যাঙ্গ ম্যান্ডেলা’’ বা ম্যান্ডেলাকে ফাঁসিতে ঝোঁলাওশিরোনামে একটি ছবি টাঙিয়ে রাখতেন [৮] , যা নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক মিড়িয়াতে ব্যাপক ঝড় বয়ে যাচ্ছে। নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করতে গিয়ে তাঁকে তার সময়ের নায়ক হিসাবে অভিহিত করায় বিশ্বমিড়িয়ায় ইতোমধ্যে ডেভিড ক্যমেরুনকে হিপোক্রেটহিসাবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। উপমহাদেশের বিখ্যাত সাংবাদিক এম জে আকবর দ্যা সানডে গার্ডিয়ানে’-এ এই হিপোক্রেটের হিপোক্রেসির চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন [৯]; ম্যান্ডেলার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে গিয়ে সাবেক বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার বলেছেন, ‘তিনি ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ কেননা তিনি মানুষের মধ্যকার শ্রেষ্ঠত্বটাকেই বের করে আনতে পেরেছিলেন। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব আপনি তখনি উপলব্ধি করবেন, আপনি যদি তার সাথে বা তার সাহচর্যে থাকবেন [১০]; অথচ ২০০২ সালে ম্যান্ডেলা যখন ওয়ার অন টেররিজমের নামে আফগানিস্তানে মার্কিন-বৃটিশ আক্রমনের সমালোচনা করেন, এ টনি ব্লেয়ারই নেলসন ম্যান্ডেলাকে অর্থাৎ তার ভাষায় একজন শ্রেষ্ঠ মানুষকে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম মানুষ বলে গালি দিয়েছিলেন। এটাই সাম্রাজ্যবাদি রাষ্ট্রনীতির নীতিহীন রাজনীতি। তাদের প্রয়োজনে যেমন তারা কাউকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষবানাতে পারে আবার তাদের প্রয়োজনেই তারা একই মানুষকে পৃথিবীর নিকৃষ্ঠতমানুষ হিসাবে উপস্থাপন করতে পারে। ইরাক, আফগানিস্তান এবং প্যালেষ্টাইনের প্রশ্নে ম্যান্ডেলার অবস্থান র‌্যাডিক্যাল ছিল বলেই ইঙ্গ-মার্কিন শক্তি ম্যান্ডেলাকে নিকৃষ্টতম মানুষহিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন [১১] ।    

ইজরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মন্তব্য আরো চমকপ্রদ। নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ তাঁকে [নেলসন ম্যান্ডেলাকে] মনে রাখবে একটি নতুন দক্ষিণ আফ্রিকার পিতা হিসাবে এবং নৈতিকতার বিচারে একজন শ্রেষ্ঠ মরাল লিডারহিসাবে’ [১২]; এ নিতানিয়াহুই ম্যান্ডোলাকে ইয়াসির আরাফাতের পরে ইজরাইলের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারীতে তার মুক্তির প্রায় দুই সপ্তাহ পর যখন প্যালেষ্টাইনের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাতকে আলিঙ্গন করে ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘ইজরাইল হচ্ছে একটি টেররিষ্ট রাষ্ট্র যারা নিরস্ত্র এবং নিরীহ আরবদেরকে নিষ্ঠুরভাবে জবাই করছে’ '[১৩] , এ নেতানিয়াহুই তখন ম্যান্ডেলাকে ইজরাইলের শক্র হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে কী এমন ঘটেছে যে, ইজরাইলের চিরশত্রু হঠাৎ করে মরাল লিডারেপরিণত হলেন?

এটাই উপস্থাপনার রাজনীতি। মার্কিন-বৃটিশ-ইজরাইলের এ নেক্সাসকে ম্যান্ডেলা যত চমৎকারভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং তাদের সম্মিলিত অন্যায়কে যখন বাদবাকি বিশ্ব অনেকটা মনে না-নিলেও মেনে নেয়ার নীতি নিয়ে রাজনীতি করছিলো, ম্যান্ডেলা তখন উচ্চকন্ঠে তার প্রতিবাদ করেছিলেন এবং বিশ্ববাসীর কাছে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন এ তিন-বলয়ের যৌথ মিথ্যাচার, তিন-এলাইয়েন্টের সাম্রাজ্যবাদি-আধিপত্যবাদি পররাষ্ট্রনীতি এবং এ তিন-মিত্র কতৃক বিশ্বব্যাপি জারি রাখা সাদা বনাম কালোর রাজনীতির হিডেন এজেণ্ডা। ইরাক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে ২০০২ সালে ম্যান্ডেলা বলেন, ‘বুশ এবং ব্লেয়ার কেউই কোন ধরনের প্রমাণ দিতে পারেনি যে ইরাকের কাছে জীবন বিধ্বংসী মারাত্মক কোন অস্ত্র আছে। অথচ আমরা সবাই জানি, ইজরাইলের কাছেই বরঞ্চ এ ধরনের অস্ত্র আছে। কিন্তু আমরা সেটা নিয়ে কোন কথা বলি না। কেন এক দেশের জন্য এক নীতি আর অন্য দেশের বেলায় অন্য নীতি? তার কারণ একটা হচ্ছে ব্ল্যাক আরেকটা হচ্ছে হোয়াইট’ [১৪]; ম্যান্ডেলা এভাইে মার্কিন-বৃটিশ-ইজরাইলের বর্ণবাদি রাজনীতির মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন। কিন্তু আজ যখন ম্যান্ডেলা জীবনের পরপারে পাড়ি দিয়েছেন, তখন তাঁকে উপস্থাপন করা হচ্ছে মহান মানবতাবাদি হিসাবে, সময়ের হিরো, শ্রেষ্ঠ মানুষ কিংবা মরাল লিডার হিসাবে। আর এ আখ্যা দেয়ার ভেতর দিয়ে তাঁকে একধরনের সূফি, দরবেশ কিংবা চার্চের পাদ্রি মার্কা নরমেটিভ, অবজেক্টিভ এবং আ-পলিটিক্যালইমেজ দেয়া হচ্ছে কেননা ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক দর্শনের গুণকীর্তন করা এবং তার রাজনৈতিক দর্শনকে বাঁচিয়ে রাখার চিন্তা করা প্রকারান্তরে মার্কিন-বৃটিশ-ইজরাইলের আধিপত্যবাদি পররাষ্ট্রনীতির জন্য হুমকিকেই জিইয়ে রাখার সমান। অন্যদিকে, এসব অতি মানবীয়, অতি মহান এবং হাইপার-ডোস পারসনালিটি ডিসকোর্স দিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলাকে সম্মান দেখানোর ভেতর দিয়ে মূলত তারা নিজের দেশের--মার্কিন, বৃটিশ এবং ইজরাইল--মানুষের কাছে নিজের উদার-নৈতিক গণতন্ত্রেরযেমন একটি পাবলিসিটির ষ্পেস তৈরী করছেন, অন্যদিকে বিশ্ববাসীর কাছে ম্যান্ডেলাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেখানো মধ্য দিয়ে পশ্চিমা ঘরানার মানবতাবাদের বিশ্ববাজারে নতুন চাহিদা ও কদর তৈরী করছেন। তাই, ম্যান্ডেলাকে অতি মানবীয় ব্যক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠার এই প্রয়াস। এটা মূলত: মানবতার চাদরে ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক সত্তাকে ঢেকে দেয়ার একটা রাজনীতি। ধন্যবাদ ম্যান্ডেলা, জীবতকালে যেমন তুমি এসব পুঁজিবাদি, সা¤্রাজ্যবাদি, আধিপত্যবাদি এবং সাদা-কালোর বর্ণবাদি রাজনীতির বিরুদ্ধে নিজের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ভেতর ভেতর দিয়ে খোদ নিজেকেই এক কালান্তরের কিংবদন্তি করে তুলেছো, তেমনি তুমি তোমার জীবনাবসানের মধ্য দিয়েও সাম্রাজ্যবাদি রাজনীতির যে কদর্য চেহারা তা আরো একবার উন্মোচিত করলে। তাই, জীবিত ম্যান্ডেলার চেয়ে মৃত ম্যান্ডেলা অধিকতর প্রেরণা-সঞ্চারি। নিখিল বিশ্বের শোষিত, বঞ্চিত, মেহনতি মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি জন্য বৈশ্বিক রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ এবং আধিপত্যবাদ বিরোধী যে লড়াই জারি আছে, সে লড়াইয়ে তুমি সবসময় এক অশেষ অনুপ্রেরণার উৎস হিসাবে ছিলে, আছে এবং থাকবে। ম্যান্ডেলা তোমার মৃত্যু আমাদের আরো বিপ্লবী করে তোলে। তাই, তুমি রবে নিরবে হৃদয়ে মম।    

তথ্যসূত্র:
[১]  হোয়াইট হাউসের অফিসিয়াল ওয়েভসাইট থেকে সংগৃহীত। প্রথম বাক্যটি হচ্ছে '‘Today,the United States has lost a close friend…’  পিডিএফ ফাইলে আপলোড করা ষ্ট্যাটমেন্ট। আগ্রহীরা হোয়াইট হাউজের ওয়েভসাইট ভিজিট করতে পারেন।
[২] “Nelson Mandelaremoved from US terror list”, The Daily Telegraph, 02 Jul 2008.[http://www.telegraph.co.uk/news/worldnews/africaandindianocean/southafrica/2233256/Nelson-Mandela-removed-from-US-terror-list.html]
[৩] Statement by the Vice President on the Death of NelsonMandela
[৫] Peter Beinart, “Don’tSanitize Nelson Mandela: He’s Honored Now, But Was Hated Then”, The Daily Beast, December 5, 2013, [Source:http://www.thedailybeast.com/articles/2013/12/05/don-t-sanitize-nelson-mandela-he-s-honored-now-but-was-hated-then.html]
[৭] David Cameron,Nelson Mandela: David Cameron pays tribute to 'hero', BBC December 5, 2013.[http://www.bbc.co.uk/news/uk-25248712]
[৯] M J Akber,Disciples of a deeper faith, The Sunday Guardian, December 07, 2013 [Source:http://www.sunday-guardian.com/analysis/disciples-of-a-deeper-faith]
[১০] Tony Blair,Mandela brought out the best in people', BBC, December 06, 2013. [Source: http://www.bbc.co.uk/news/world-25251984.]
[১১] Mehdi Hasan, “Lest We Forget, on Iraq, Afghanistan andIsrael, Mandela Was a Radical”HUFF PostPolitics, United Kingdom, December 07, [Source:http://www.huffingtonpost.co.uk/mehdi-hasan/nelson-mandela-iraq-israel_b_4396638.html?utm_source=Alert-blogger&utm_medium=email&utm_campaign=Email%2BNotifications]
[১২] The DailyHaaretz, December 06, 2013, [Source:http://www.haaretz.com/news/world/1.562059]
[১৩] The Global NewsJewish Source, October 25, 1990. [Source:http://www.jta.org/1990/10/25/archive/mandela-angers-australian-jews-with-fresh-anti-israel-rhetoric]
[১৪] “Mandela warnsBush on racism”, The Guardian,September 13, 2002. [Source:http://www.theguardian.com/world/2002/sep/13/iraq.nelsonmandela]| 

ডিসেম্বর ০৮, ২০১৩, জার্মানি। 
[প্রকাশিত: ০৯/১২/২০১৩, বিডিনিউজ২৪.কম]


No comments:

Post a Comment