Tuesday, February 26, 2013

ইতিহাসের যোগসন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ

(দৈনিক ভোরের কাগজ, ২৭.০২.২০১৩)

কাদের মোল্লার ফাঁসি ও অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে দেশের আপামর জনসাধারণের বিপুল গণসমর্থন নিয়ে গড়ে উঠা শাহবাগের ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির খুঁটি ধরে একটা শক্ত ঝাঁকুনি দিয়েছে। সে ঝাঁকুনিতেই কেউ কেউ সজোরে ধাক্কা খেলেও কেউ কেউ পড়েছে চরম অস্তিত্বের সংকটে এবং তন্মধ্যে একাত্তরে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতা বিরোধী-অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি অন্যতম। কেননা, গণজাগরণ মঞ্চের মূল দাবিই হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের এবং একাত্তরে মানবতা বিরোধী অপরাধীদের আন্তর্জাতিক ট্রাবুনালের মাধ্যমে বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা। ফলে, জামায়াতের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আর বিএনপি তো রীতিমতে কিংকর্বব্যবিমূঢ় হয়ে হিতাহীত জ্ঞান হারিয়ে বসেছে। তাই, তারা একবার জামায়াতের পক্ষ নেয়, আবার ওলামা মাশায়াকদের পক্ষ নেয়, একদিকে গণজাগরণ মঞ্চকে সাধুবাদ জানায় অন্যদিকে চিল্লচিল্লি করে বলে ‘এটা আওয়ামীলীগের সাজানো নাটক’। আর আওয়ামীলীগ তার নিরলসভাবে চেষ্টা নিরন্তর অব্যাহত রেখেছে, কীভাবে গণজাগরণ মঞ্চের রাজনৈতিক ফলাফলকে নিজের গোলায় ভরতে পারে। কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চের মূল দাবি আওয়ামীলীগ কিংবা বিএনপির বিরুদ্ধে সরাসরি না-গেলেও জামায়াত-শিবির তাদের সরাসরি নিশানা। কেননা, একাত্তরে মানবতাবিরোধী জঘন্য যুদ্ধাপরাধ করেও এদেশের রাজনীতিবিদদের সুবিধাবাদি চরিত্রের কারণে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার লড়াইয়ের অনৈতিক প্রতিযোগিতার ফাঁক দিয়ে জামায়াত আদরে-আবদারে এদেশে রাজনৈতিক ময়দানে একটি জায়গা করে নিয়েছে। এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মভীরুতাকে কাজে লাগিয়ে ইসলামের শামিয়ানা ব্যবহার করে জামায়াতের রাজনীতি ফুলে ফেঁপে উঠেছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সাথে নির্বাচনী জোট করে এবং ২০০১ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে মন্ত্রীত্ব পেয়ে জামায়াত রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হয়ে উঠে। ফলে, জামায়াতের বিরুদ্ধে শক্ত রাজনৈতিক অবস্থান নেয়া যখন আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নৈতিক অবস্থান থেকে কমজোর হয়ে পড়েছে, তখন এদেশের নতুন প্রজন্মের তরুণতুর্কীরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে এবং একাত্তরের রাজাকার-আলবদর বাহিনী জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিতে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তৈরী করেছে গণজাগরণ মঞ্চ। তাই, এ গণজাগরণ মঞ্চকে কেন্দ্র করে গোটা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেভাবে মানুষের স্বতষ্ফুর্ত সম্মিলন ও সংহতির জোয়ার উঠেছে, তাতে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি নতুন পাটাতন তৈরী হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। তাই, জামায়াত তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছে। নানান নামে ও বেনামে নানান ছল-চাতুরির আশ্রয়ে জামায়াত তার অস্তিত্ব রক্ষা করবার জন্য ইতোমধ্যে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এবং তাই ‘জামায়াত মরণ-কামড় দেবে’ বলে ঘোষণা দিয়েছে--এ মর্মে পত্রিকান্তরে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

জামায়াত তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে মোকাবেলা করবার রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে ব্লগারদের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্মের অবমাননার মিথ্যা অজুহাত এনে একধরণের মৌলবাদি আবহ তৈরী করার চেষ্ট করছে। ‘রাসুলের বিরুদ্ধে আপত্তিকর বক্তব্য দেয়া’, ‘কোরআন-হাদিসের অবমাননা’, ‘নাস্তিকদের সমাবেশ’ প্রভৃতি মিথ্যা প্রপাগা-া তৈরী করে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে এক ধরনের ধর্মীয় উন্মদনা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। জামায়াতের সেই পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল গণজাগরণ মঞ্চকেও মোকাবেলা করবার কৌশল হিসাবে প্রয়োগ করার অপচেষ্টা করছে। ‘মরলে শহীদ, বাচলে গাজী’ বলে কওমী মাদ্রায় পড়–য়ার শিক্ষার্থীদের জেহাদের ত্যাজে উত্তেজিত করছে। তারই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে সম্প্রতি সমমনা ইসলামী সংগঠন ও ওলামা-মাশায়েকের নামে সারা দেশের সহিংস তা-ব চালানো হয়েছে। দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে, বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন জায়গায় গণজাগরণ মঞ্চ ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি শহীদ মিনারে হামলা করাসহ জাতীয় পতাকা পোড়ানোর মতো ঘটনা ঘটিয়ে সারা দেশে একটি ত্রাসের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। চট্টগ্রামে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ শ্লোগান দেয়া হয়েছে বলে পত্রিকান্তরে খবর প্রকাশিত হয়েছে। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরু থেকেই ছিল অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ এবং সৃজনশীল। দেশব্যাপী দাড়িয়ে তিন মিনিট নিরবতা পালন, মোমবাতি জ্বালিয়ে সংহতি প্রকাশ, একাত্তরের শহীদদের উদ্দেশ্যে বেলুন উড়ানো কিংবা পতাকা মিছিল প্রভৃতি অত্যন্ত সৃজনশীল কর্মসূচির মাধ্যমে গণজাগরণ মঞ্চ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি জানিয়ে আসছে। এবং এ দাবির স্বপক্ষে ব্যাপক জনমত তৈরী করেছে। আবৃত্তি, গান, নাচ, নানান চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে তরুণপ্রজন্মের মুক্তিসেনানীরা নিজেদের দাবির জানান দিচ্ছে। এ গণজাগরণ শঞ্চ এক অর্থে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির স্বপক্ষে গোটা দেশের অধিকাংশ মানুষকে এক কাতারে এনে শামিল করেছে। অথচ, এ গণজাগরণ মঞ্চকে মোকাবেলা করবার নামে মিথ্যা ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে দেশব্যাপি একটা ব্যাপক সহিংসতা ঘটানো হলো এবং একটা ভীতিকর অবস্থার অবতারনা করা হলো। একদিকে শান্তিপূর্ণ ও সৃজনশীল পন্থায় নিজেদের দাবি প্রকাশের রুচিশীল অনুশীলন অন্যদিকে মিথ্যা ধর্মীয় উন্মত্ততায় সহিংস জ্বালাও-পোড়াও। একদিকে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি অন্যদিকে যদ্ধাপরাধীদের রক্ষার উচ্ছৃংখলতা। একদিকে গোটা দেশের অধিকাংশ মানুষের পূর্ণ সমর্থন, অন্যদিকে কতিপয় যুদ্ধাপরাধী ও তাদের অন্ধ সমর্থক। একদিকে ইতিহাসের দায় মুক্তির আবেগ ও আকুলতা অন্যদিকে নতুন করে সহিংসতার ইতিহাস সৃষ্টির দৌড়ঝাঁপ। এখন জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কোন দিকে যাবে।

ধর্মীয় সংগঠনের ব্যানারে দেশব্যাপি জামায়াত-শিবির যে ভয়াবহ ও নারকীয় তা-ব চালিয়েছে, তা দেখে অনেকে দেখি বেশ রেগে, আবেগে আর ক্ষোভে জ্বলছে; আর পরম দেশপ্রেমের বোধ থেকে ভীষণ পরিমাণ কষ্ট পাচ্ছে। তাই, বিগত ৫ ফেব্রুয়ারি থকে শাহবাগে টানা দিনরাত চব্বিশ ঘন্টার আন্দোলনের কিছুটা বিরতি দিলেও, মানুষ দলে দলে আবার সেই শাহবাগেই হাজির হলো। দলে দলে মানুষ প্রতিরোধ, প্রেরণা আর প্রাণের চত্বর শাহবাগে আবার মিলিত হলো। কষ্টে, দুঃখে আর ক্ষোভে সবাই একদিকে যেমন ব্যদনার্ত, অন্যদিকে তেমনি জাগরণের নতুন প্রেরণায় নতুন করে উজ্জীবীত। কিন্ত আমি মনে করি, এরকম একটা ঘটনার খুবই দরকার ছিলো। দেশের মানুষের কাছে এদের মুখোশ নতুন করে উন্মোচনের দরকার ছিলো। এটা জানা খুবই জরুরি যে, কারা জাতীয় পতাকা পোড়ায়, কারা শহীদ মিনারে হামলা করে, কারা ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ শ্লোগান দেয় ও অন্তরে সে দর্শন ধারণ করে, কারা গণজাগরণ-মঞ্চে অগ্নিসংযোগ করে, কারা মসজিদকে নিজেদের সন্ত্রাসী হামলার আস্তানা বানায়। যদিও এসব (কু)কীর্তি সবারই কম-বেশি জানা কিন্তু সে জানাজানির মধ্যে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি মার্কা প্রতিপক্ষকে উপস্থাপনার একটা রাজনীতি ছিল কিংবা সত্যকে সেভাবে উপস্থাপনা করবার একটা অনুশীলণ ছিল। কিন্তু এখন তো সেটা নাই। এখনে একটি পক্ষ হচ্ছে এদেশের শ্রেণী-বয়স-লিঙ্গ-জাত-পাত-ধর্ম-বর্ণ-পেশা-নিরপেক্ষ গণমানুষের আবেগে ও সত্যিকার দেশপ্রেমের সমাবেশ ‘শাহবাগ’, অন্যটি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ও তাদের স্বার্থান্ধ কতিপয় সমর্থক। এখন, জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যারা জাতীয় পতাকা পোড়ায় তাদের পক্ষে যাবে, নাকি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ তারুণ্যের গণজাগরণের পক্ষে যাবে। জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা ‘শহীদ মিনারের সাথে থাকবে’ নাকি ‘শহীদ মিনারে যারা হামলা করে’ তাদের পক্ষে যাবে। হিসাব একেবারেই সোজা। এ-ঘটনা দেশ, দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস এবং গণমানুষের পক্ষ ও প্রতিপক্ষের সীমারেখা আরো ষ্পষ্ট করেছে। সুতরাং এ ভেদ-রেখায় আরো জরুরিভাবে দেখার বিষয় হচ্ছে সরকার কার পক্ষ নেয়। তাই, রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি অনুধাবনের জন্য এ সময়টা পরিণত হয়েছে ইতিহাসের সত্যিকার যোগ-সন্ধিক্ষণে। গণজাগরণ মঞ্চকে কেন্দ্র করেই এবং এর সত্যিকার পক্ষ-বিপক্ষকে কেন্দ্র করেই নির্মিত হবে আগামী দিনের বাংলাদেশের রাজনৈতিক পাটাতন। লিখিত হবে, তারুণ্যের জাগরণের ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠা এবং তৃণমূলের মানুষের বিপুল সমর্থন ও অংশগ্রহণে গণআন্দোলনের মর্যাদা পাওয়া ‘সামাজিক বিপ্লবের’ নতুন ইতিহাস। আমরা এখন সেই ইতিহাসের যোগসন্ধিক্ষণে বসবাস করছি। পার করছি নতুন ইতিহাসের জন্মযন্ত্রণার সোনালী সকাল।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

Monday, February 25, 2013

এশিয়া এনার্জি, ‘ফুলবাড়ী’র প্রতিরোধ ও জীবনের সৌন্দর্য

(দৈনিক যুগান্তর ১১/০২/২০১৩)

প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ইতিহাস মূলত: মানুষের ‘মানুষ’ হিসাবে পুনর্জন্মের ইতিহাস। মানুষের সত্যিকার মানুষ হয়ে উঠবার ইতিহাস। মানুষ প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ভেতর দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করে, নিজের জান, মাল, ভিটা, বসত, দেশ এবং কালকে রক্ষার জন্য শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়ায় এবং অসীম মানবিক-শক্তি দিয়ে শত্রুকে পরাজিত করে ইতিহাসের জন্ম দেয়। জন্ম দেয় নতুন সময়ের, নতুন করে জন্ম দেয় ‘মানুষ’ নিজেকেই। তাই, যেখানে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ঘটনা সংঘটিত হয়, সেখানে সৃষ্টি হয় ইতিহাসের নতুন ‘জন্মভূমি’। বাংলাদেশের ‘ফুলবাড়ী’ এখন প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আন্দোলনের ইতিহাসে সেরকম একটি নতুন ‘তীর্থভূমি’। সমকালীন ঘটনা-প্রবাহের ভেতর দিয়ে দেশ ও দশের স্বার্থ রক্ষার তাগিদে, রাজনৈতিক-দুবৃত্তায়ন থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষায়, অর্থনৈতিক-শোষণ ও শ্রেণী-বৈষম্য বিলোপের বাসনায় যথাক্রমের ‘তাহিরী স্কোয়ার’, ‘অকুপায়-ওয়াল স্ট্রিট’ কিংবা দিল্লীর ‘জন্তর-মন্তর’ প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ইতিহাসে যেমন নতুন ‘মেটাফোর’ সংযুক্ত করেছে, ‘ফুলবাড়ী’ও তেমনি প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আন্দোলনের ইতিহাসে আরেকটি নতুন উজ্জ্বল-সংযুক্তি। নিজের জীবন, ভূমি, পরিবেশ এবং প্রজন্মের ভবিষ্যৎ রক্ষায় মানুষের স্বতস্ফুর্ত প্রতিরোধের এক উজ্জ্বল নজির ‘ফুলবাড়ী’। তাই, ‘ফুলবাড়ী’ এখন আর বিশেষ কারো গ্রামের বাড়ি নয়। ঔ বিশেষ এলাকায় জন্ম নেয়া মানুষের একার ‘দ্যাশের বাড়ি’ নয়। ‘ফুলবাড়ী’ এখন এদেশের গরীব, মেহনতি, শ্রমজীবী, অধিকার-বঞ্চিত, নির্যাতিত, নিপিড়ীত এবং সমাজের চোখে নিম্নবর্গের মানুষের ‘জন্মভূমি’। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও বহুজাতিক কোম্পানির আগ্রাসন বিরোধী আন্দোলনের নতুন তীর্থভূমি। এদেশের সংবেদনশীল, দেশপ্রেমিক, বিপ্লবী ও সমাজের-পরিবর্তন-কামী জনগোষ্ঠীর জন্মভূমি। তাই, আমারও আজ ‘দ্যাশে’র বাড়ি ‘ফুলবাড়ী’!  

২০০৬ সালে জনরোষের ধাওয়া খেয়েও শিক্ষা হয়নি এশিয়া এনার্জির। ২০০৬ সালে ২৬ থেকে ৩০ আগষ্ট ফুলবাড়ীতে যে গণবিক্ষোভ হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন সরকার আন্দোলনকারীদের সাথে তথা স্থানীয় জনগণের সাথে একটি সমঝোতায় আসতে বাধ্যহয় এবং এশিয়া এনার্জি ফুলবাড়ী থেকে বিতাড়িত হয়। তখন একটি ছয়দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলো এবং তৎকালীন সরকার তথা রাষ্ট্র জনগণের তরফ থেকে দেয়া সেই ছয় দফা নির্শতভাবে মেনে নিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সম্পাদিত তিরিশ বছরের উন্মুক্ত কয়লা উত্তোলন চুক্তি বাতিল করা হবে, বাংলাদেশে এশিয়া এনার্জির কাজ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হবে, আর কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনন করা হবেনা, ভবিষ্যতে কোন্ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হবে, সেটা স্থানীয় জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই করা হবে। অথচ রাষ্ট্র জনগণের সাথে বেঈমানি করে এদেশের কিছু সুবিধাবাদি ও অর্থলিপ্সু তথাকথিত সুশীলদের সহায়তায় এশিয়া এনার্জিকে আবার ফুলবাড়ীতে প্রবেশ ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আর এশিয়া এনার্জির জায়গা থেকে এটা একটি ‘অবশ্য-করণীয়’ হয়ে উঠেছে, কেননা তারা ইতোমধ্যে ল-নের শেয়ার বাজারে বাংলাদেশের ফুলবাড়ীর কয়লা খনির নামে শেয়ার ছেড়ে মোট অংকের টাকা তুলে নিয়েছে। আর বাংলাদেশ-রাষ্ট্র এশিয়া এনার্জির এ-ভোয়ামি ও জালিয়াতিকে জায়েজ করবার জন্য জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সেই ধাওয়া-খাওয়া এশিয়া এনার্জিকেই পুনরায় ফুলবাড়ীতে প্রত্যাবর্তনের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। তাই, ফুলবাড়ীর মানুষের এ লড়াই কেবল এশিয়া এনার্জিও বিরুদ্ধে নয়; এ লড়াই একদিকে যেমন বহুজাতিক কোম্পানির কাছে বিক্রি হওয়া এদেশের কতিপয় সুশীলদের বিরুদ্ধে, অন্যদিকে জনগণের সাথে রাষ্ট্রের বেঈমানির বিরুদ্ধে।

আগেই বলেছি, জালিয়াতি করে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে এই এশিয়া এনার্জি ল-নের শেয়ার বাজারে বাংলাদেশের ফুলবাড়ীর কয়লা খনি দেখিয়ে শেয়ার বিক্রি করে। আর সে শেয়ার বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থে প্রতিপালিত হচ্ছে এশিয়া এনার্জি ও গ্লোবাল কোল ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) গ্যারী এন লাই, এশিয়া এনার্জির অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ এবং ‘কনসাল্ট্যান্ট’ নামক এক প্রজাতির দেশীয় দোসর। সাথে রয়েছে রাষ্ট্রীয় পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা। ফলে, গ্যারী এন লাই গং এদেশীয় দোসরদের সহায়তায় পুনরায় নানান ছল-চাতুরির আশ্রয় নিয়ে পুনরায় ফুলবাড়ীতে প্রবেশের মওকা খোঁজার তালে লেগে আছে। এদেশের ‘কনসাল্ট্যান্ট’ নামধারী টাকার বিনিময়ে বিক্রি হওয়া চরমভাবে আত্মপর, অর্থলোভী, দেশের স্বার্থবিরোধী কিছু শিক্ষিত ভদ্রলোকের মাথা সহজে কেনা যায় দেখে এশিয়া এনার্জি হয়তো ভেবেছে চরম শীতাক্রান্ত ফুলবাড়ীর ‘গরীব’ মানুষকে এ-শীতের মৌসুমে কিছু শীতবস্ত্র এবং কিছু টাকার লোভ দেখিয়ে বহুজাতিক কোম্পানির বিষাক্ত হাত তাদের মাথার ওপর বুলিয়ে দিয়ে কাজ হাসিল করা যাবে। এদেশের কিছু ‘পপুলার আইকন’কে ফুলবাড়ীর মানুষের সাথে এশিয়া এনার্জির সম্পর্ক তৈরী কিংবা এদেশের জনগণকে এশিয়া এনার্জির গুণগান গাওয়ার জন্য ইতোমধ্যে ভাড়া করা হয়েছে। কিন্তু এশিয়া এনার্জির কর্তাব্যক্তিরা ২০০৬ সালের ‘দৌঁড়’ খাওয়ার পরও এটা এখনও বুঝতে পারেনি যে, এদেশের কিছু কিছু শিক্ষিত ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর মাথা টাকা দিয়ে যত সহজে কেনা যায়, এদেশের গরীব মানুষের মাথা তত সহজে কেনা যায় না। কেননা, এদেশের গরীব মানুষের মাথা, দেহ, মগজ ও বিবেক খাঁটি মাটি দিয়ে তৈরী। তাই, মাটির ইজ্জ্বত, মাটির মান ও মাটির সুরক্ষার জন্য এদের মাথা কোন কিছুর বিনিময়ে বিক্রি হয় না। নিজের আত্মসম্মান রক্ষা, জান-মালের হেফাজত এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বসত-ভিটার নিশ্চয়তার জন্য এদেশের গরীব, মেহনতি ও শ্রমজীবী মানুষরা যে নিজেদের জীবন দিতে পারে সেটা ফুলবাড়ীর মানুষ এর আগেও প্রমাণ করেছে। নিজেদের জমি তাদের কাছে জীবনের চেয়েও বড়; এটা ফুলবাড়ীর মানুষ আবার প্রমাণ করলো গত ২৯ জানুয়ারী।

এশিয়া এনার্জির সিইও কিছু শীত-কম্বল নিয়ে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, পার্বতীপুর, নবাবগঞ্জ ও বিরামপুর এলাকায় বিতরণ করবে, এশিয়া এনার্জির পক্ষে কিছু পাবলিসিটি করবে এবং এ-দেশীয় কিছু দোসরদের সহায়তায় ও কিছু স্থানীয় দালালের সক্রিয়তায় নিজেদের অস্তিত্ব ফুলবাড়ীর মানুষের কাছে আবার জানান দেবে। ‘উন্নয়নের’ জোয়ারে এলাকাকে ভাসিয়ে দেয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেবে! আর গরীব মানুষের কাছে সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে নিজেরা ‘মহৎ’ ও ‘অবতার’ হিসাবে নাজিল হবে। সে মোতাবেক স্থানীয় প্রশাসনের সাথে বৈঠক করেছেন। কিন্তু এশিয়া এনার্জির আগমনের খবর ফুলবাড়ী, নবাবপুর, বিরামপুর ও পার্বতীপুরে পৌঁছানো সাথে সাথে হাজার হাজার বয়স-নির্বিশেষে নারী ও পুরুষ সদলবলে ‘যার যা-কিছু আছে’ তা নিয়ে রাস্তায় বেড়িয়ে পড়ে। ‘গ্যারি লাই যেখানে, প্রতিরোধ সেখানে’ শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরী করে। ইতোমধ্যে ‘বানের পানির লাহান’ মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় চলে আসতে থাকে। ফুলবাড়ি, বিরামপুর, পার্বতীপুর, নবাবপুর, দিনাজপুরের বিভিন্ন স্থানে যেমন নিমতলা মোড় বাসষ্ট্যান্ড, ঢাকা মোড়, খানপুর, পোড়াগ্রাম, রতনপুর, লক্ষিপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় সভা সমাবেশ শুরু হয়ে যায় এশিয়া এনার্জিকে প্রতিরোধ করবার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে। দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের সাথে মিটিং করে গ্যারি লাই আর বের হতে পারে না। জনগণের রুদ্ররোষ দেখে গ্যারি লাই কোন রকমে পালিয়ে ফুলিবাড়ী ছেড়ে চলে যায়। প্রকৃতপক্ষে, পালিয়ে আসা ছাড়া জান বাঁচানোর আর কোন পথ তখন খোলা ছিলো না। এশিয়া এনার্জির সিইও এ ‘দৌঁড়’ দেশবিরোধী এ-চক্রের সাথে যারা জড়িত তাদের সকলের জন্য একটি বিরাট ‘ম্যাসেজ’। এদেশের খেটে খাওয়া, শ্রমজীবী, গরীব ও মেহনতি মানুষ নিজের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য, আত্মসম্মান উঁচিয়ে রাখার জন্য এবং দেশ ও দশের প্রতি পরম দায়িত্বশীলতা থেকে ‘প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের’ নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে জানে। যে দেশের মানুষ মুখের ভাষার জন্য জীবন দিতে পারে, ফুলবাড়ীর মানুষ সে চেতনার সত্যিকার উত্তরাধিকার বহন করে তাদের অস্তিত্বে, মজ্জায়, রক্তে ও শোণিতে। যে দেশের মানুষ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম মাতৃভূমির জন্য হাসিমুখের শত্রুর ছোড়া বুলেট বুকে ধারণ করতে পারে, সে দেশের মানুষ নিজের ভিটা-মাটি রক্ষার জন্য পুনরায় জীবন দিতে পারে। আর যে মানুষ দেশ ও দশের জন্য জীবন দিতে পারে, সে মানুষ প্রয়োজন হলে জীবন নিতেও পারে। সুতরাং মানুষের এ সীমাহীন মানবিক-শক্তির বিরুদ্ধে গিয়ে, মানুষের জান-মাল রক্ষার তীব্র আকাক্সক্ষার বিরুদ্ধে গিয়ে, মানুষের বিপুল বিল্পবী চেতনার বিরুদ্ধে গিয়ে, মানুষের জন্য সত্যিকার কোন ভালো ফল বয়ে আনা সম্ভব নয়। এ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সত্যটি একটি নির্দিষ্ট সময়-ক্রমের জন্য এদেশের রাষ্ট্র-ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আসা শাসক-শ্রেণী যতদ্রুত বুঝতে পারবে, ততই মঙ্গল। পরিশেষে, প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের একটি উদ্ধৃতি দিতে চাই। তিনি গত ২৯ জানুয়ারীর ফুলবাড়ী তাৎক্ষনিকভাবে সংগঠিত গণবিদ্রোহ নিয়ে সামাজিক-যোগাযোগে লিখেছেন, ‘মানুষ যখন মানুষ হয়ে উঠে, তখন স্বাধীনতা, আত্ম-সম্মান আর সমষ্টির প্রতি দায়িত্ববোধের কাছে টাকা পয়সা কিংবা বৈষয়িক-সুবিধা তুচ্ছ হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ তখন হয়ে উঠে অসাধারণ। এই মানুষদের ভয় বা লোভ দেখিয়ে কাবু করা যায় না। যারা কিছু টাকার লোভে দাসত্ব-বরণ করে, নিজেদের মাথা ও সম্মান বিক্রি করে এবং দেশের সর্বনাশ করতে দ্বিধা করেনা, তারা জীবনের এ সৌন্দর্য কোনদিন বুঝবে না’।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

দেশপ্রেমের পুনর্জন্মের বার্তা 'শাহবাগ'

(দৈনিক ইত্তেফাক, ২৫/০২/২০১৩)

সকল আবেগ যেন আজ স্ববেগে মিলেছে শাহবাগে। মুক্তিযুদ্ধের আবেগ, দেশকে ভালোবাসার আবেগ, মানুষকে ভালোবাসার আবেগ, নতুন প্রজন্মের নতুন-ডাককে সম্মান করবার আবেগ এবং যদ্ধাপরাধীদের ঘৃণা করবার আবেগ একত্রে ধাবিত হচ্ছে শাহবাগের মোহনায়। তাই, শাহবাগ আজ আবেগের শাহবাগ। ভালোবাসার শাহবাগ। বিদ্রোহ ও বিক্ষোভের শাহবাগ। যুদ্ধাপরাধীদের ঘৃণা করবার শাহবাগ। দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, এবং নিত্যদিনের বঞ্চনায় পুঞ্জিভুত ক্ষোভ গিয়ে বিক্ষোভে পরিণত হয়েছে শাহবাগে। তাই, কাদের মোল্লাসহ যুদ্ধপরাধীদের বিচারের দাবিতে এ গণজোয়ার সৃষ্টি হলেও, এ প্রতিবাদ-প্রতিরোধর যে চরিত্র ক্রমান্বয়ে দাঁড়াচ্ছে তাতে বিদ্যমান রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এদেশের সাধারণ গণমানুষের সমস্ত ক্ষোভ, ক্রোধ ও বিক্ষোভ একাকার হয়ে যাচ্ছে শাহবাগের আবেগে। তাই তো, ‘রাজনীতিবিদদের কাউকে এখানে বক্তব্য রাখতে দেয়া হবেনা’-বলবার সৎ-সাহস শাহবাগের প্রজন্মের মুখে উচ্চারিত হয়। বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতি এ-প্রতিবাদের স্পৃহা শাহবাগের আন্দোলনকে অধিকতর গণমুখী করে তুলেছে। তাই, নারী-পুরুষ-বয়স-জাত-পাত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শাহবাগে এসে মিশেছে। ‘কোন দলীয় ব্যানার বহন করা যাবেনা’-ঘোষণা শাহবাগের আবেগকে করে তুলেছে নির্দলীয় গণজোয়ারে। তাইতো, নির্দলীয় চরিত্র থাকার পরেও দলে দলে লোক জমা হচ্ছে শাহবাগে। প্রকৃতপক্ষে শাহবাগের এ গণজোয়ার দল কিংবা নির্দলের হিসাব-নিকাশের বহু উর্ধ্বে দেশপ্রেমের আবেগে সঞ্চারিত একটি নতুন ঘরানার মুক্তিসংগ্রামের বিদ্রোহী জমায়েতের রূপ ধারণ করেছে। তাই, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এবং সমকালীন সমাজ-বাস্তবতায় শাহবাগের এ গণজোয়ারের তাৎপর্য অপরিসীম।

শাহবাগের এ গণজোয়রের প্রাথমিক এবং প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তরুণপ্রজন্মের দেশপ্রেমের আপোষহীন তীব্রতা। এদেশের অধিকাংশ মানুষ যখন জীবনযুদ্ধের ঘানি টানতে টানতে প্রতিদিন কোন-না-কোন ভাবে কোন-না-কোন ইস্যুতে জীবনের সাথে আপোষ করে, তখন এদেশের তরুণ প্রজন্ম নতুন করে দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে সময়ের প্রয়োজনে, দেশের প্রয়োজনে, ইতিহাস ও অস্তিত্বের প্রশ্নে সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে হাতে-হাত রেখে মাথা উচুঁ করে মেরুদ- সোজা করে দাঁড়াতে হয়। ছয়টি অপরাধের মধ্যে পাঁচটি অপরাধ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হওয়ার পরও কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় না-দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়ার সিদ্ধান্ত এ তরুণ প্রজন্ম মেনে নিতে পারেনি। তরুণ প্রজন্মের বাঁধ-ভাঙা আবেগ গর্জে উঠেছে। কেননা, এ-রায় এদেশের গণমানুষের আকাক্সক্ষাকে প্রতিফলিত করেনা, এদেশের মানুষের দেশপ্রেমের আবেগকে ধারণ করেনা এবং এদেশের জন্ম-ইতিহাসে সংঘটিত হিংস্রতম বর্বরতাকে পরিহাস করে। তরুণ প্রজন্ম তাই এ-রায় প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদ-মুখর হয়ে উঠে। এর পরের কাহিনী হচ্ছে মহাকালের মহাকাব্যে সমকালের ইতিহাস হয়ে উঠবার কাহিনী। কালান্তরের ইতিহাসে শাহবাগের ক্রমান্বয়ে গৌরবোজ্জ্বল নজির হয়ে উঠবার কাহিনী। শাহবাগের ক্রমান্বয়ে দেশপ্রেমে-উজ্জ্বীবিত মানুষের তীর্থস্থান হয়ে উঠবার কাহিনী।  

এ শাহবাগ গণ-আন্দোলনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর নির্দলীয় কিংবা স্বাধীনতার স্বপক্ষের সর্বদলীয় বা গণ-দলীয় চরিত্র। এদেশের ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি গণবিক্ষোভ, গণজোয়ার এবং প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে কোন-না-কোন রাজনৈতিক দল। ফলে, নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সমষ্ঠিতগত অর্জন গোলায় তুলেছে কোন-না-কোন রাজনৈতিক দল। আর আম-জনতার গোলা সবসময় শূণ্য থেকেছে। এ-শাহবাগ আন্দোলনকে এ-তরুন প্রজন্ম অত্যন্ত সচেতন ভাবে দলীয় রাজনীতির চরিত্র-মুক্ত রেখেছে যাতে সমাজের ভেতর থেকে এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে এ গণজোয়ার এবং তারুণ্যের এ জাগরণী-বিদ্রোহের গলায় যেন কেউ কোন দলের মালা পরাতে না-পারে। ফলশ্রুতিতে, সমকালীন রাজনীতির স্বার্থপর দলীয়করণ এবং দেশপ্রেমহীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি এ-আন্দোলন এক অর্থে একটি তীব্র প্রতিবাদও বটে। সে অর্থে, এ-আন্দোলনের সাথে সাধারণ গণ-মানুষের সম্পৃক্ততা, এদেশের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, পেশাজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, কৃষক, শ্রমিক, মজুর মেহনতি মানুষের স্বতস্ফুর্ত সম্পৃক্ততা বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতি এক ধরণের অনাস্থারই বহিঃপ্রকাশ। বিদ্যামান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি এদেশের আপামর গণমানুষের ক্রমবর্ধমান বিরক্তি ও বিমুখতা দলীয়-রাজনীতির প্রভাব ও ছায়ামুক্ত শাহবাগের গণবিস্ফোরণকে একটি সার্বজনীন ভিত্তি দিয়েছে। ফলে, আট তারিখের মহাসমাবেশে লক্ষাধিক লোকের উপস্থিতি এবং পরবর্তীতে সারাদেশ-ব্যাপী এ-আন্দোলনের সাথে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের গণ-স্পৃক্ততা প্রকারান্তরে বিদ্যমান দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি এক ধরণের অনাস্থারই ‘প্রতীক’।

শাহবাগের এ আন্দোলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হচ্ছে, কাদের মোল্লার ফাঁসি ও অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিকে কেন্দ্র করে এদেশের মানুষের দেশপ্রেমের আবেগকে পুনরায় উজ্জ্বীবিত করা। এদেশের মানুষ এ-দেশটাকে কী পরিমাণ ভালোবাসে সেটা ইতিহাসের পাতায় পাতায় মানুষ তার সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের মাধ্যমে রক্তের অক্ষরে লিখে রেখেছে। বাহান্ন, চুয়ান্ন, উনসত্তর, একাত্তর কিংবা নব্বইয়ের ইতিহাস, এদেশের মানুষের দেশপ্রেম ও দেশপ্রেমের দর্শনে দীক্ষিত হয়ে আত্ম-উৎসর্গ করবার ইতিহাস। আত্মোৎর্সের তালিকায় সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে রাজীব হায়দারের নাম। শাহবাগের আন্দোলন এদেশের মানুষের অন্তরে পুঞ্জিভূত দেশপ্রেমের আবেগকে বিপুল উত্তেজনায়, বিরাট ষ্ফুলিঙ্গে এবং অভাবনীয় তীব্রতায় নতুন করে জাগিয়ে দিয়েছে। তাইতো, শুধু শাহবাগে নয়, এদেশের প্রতিটি বিভাগে, জেলায়, উপজেলায় আজ ‘যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাই’, ‘যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই’ রব উঠেছে। শ্লোগানে শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে এদেশের আকাশ-বাতাস। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া ও সুরমা থেকে পাটুরিয়া একই স্বর ও একই সুর ‘কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই, যদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই’। দল-মত-জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বয়স-লিঙ্গ নির্বিশেষে দেশপ্রেমের আবেগে অনুপ্রাণিত হয়ে, সারা বাংলাদেশ আজ ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই’ ও ‘যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই’ বলে মাতম তুলেছে। শাহবাগের আবেগ আজ আর শাহবাগের স্কোয়ারে সীমাবব্ধ নাই, সে আবেগ ছড়িয়ে পড়েছে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি প্রান্তরে। শাহবাগের আবেগ রূপান্তরিত হয়েছে দেশপ্রেমের আবেগে। আর সে দেশপ্রেমের আবেগ থেকে চারদশকেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না-হওয়ার ক্ষোভ এবং সে-ক্ষোভ ক্রমান্বয়ে বিক্ষোভে পরিণত হয়েছে, যার কিছুটা প্রতিচ্ছবির সমাবেশ আমরা গত পাঁচ তারিখ থেকে শাহবাগের চত্বরে দেখে আসছি।  

শাহবাগের আন্দোলন নতুন প্রজন্মের আবেগের ভেতর দিয়ে মূলত এদেশের মানুষের মধ্যে যে জমাটবাঁধা দেশপ্রেম তারই পুনর্জন্ম দিয়েছে। এদেশের মানুষ তাদের দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসে বলেই তারা যুদ্ধাপরাধী এবং একাত্তরের মানবতা-বিরোধী অপরাধীদেরকে ঘৃণা করে। এবং এ তীব্র-ঘৃণা হচ্ছে দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসার একটা সাধারণ সূত্র। শাহবাগের গণজোয়ার এদেশের মানুষকে নতুন করে দেশকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। শাহবাগ-গণআন্দোলন শিখিয়েছে কীভাবে দেশকে মন থেকে ও প্রাণ থেকে সত্যিকার-ভাবে ভালোবাসতে হয়। শিখিয়েছে কীভাবে ভালোবাসতে হয় দেশের মাটি, মানুষ, ইতিহাস এবং ইতিহাসের পরম্পরাকে। মুক্তির সংগ্রাম কোন সময়ের বেদিমূলে আটকে থাকেনা। তাই, একাত্তর ফিরে আসে দুই হাজার তোরোতে। একাত্তরের চেতনা জাগরণ তুলে শাহবাগের স্কোয়ারে। তাই তো, শুরু হয়েছে নতুন মুক্তিযুদ্ধ। শাহবাগের গণআন্দোলন দেশকে রাজাকারমুক্ত করবার নতুন মুক্তিযুদ্ধ। তাই আজ এদেশের সকল মানুষের প্রত্যাশা, শাহবাগ স্কোয়ারে অভাবনীয় গণজোয়ার ও গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে নতুন মুক্তিযুদ্ধের যে ‘মুখবন্ধ’ লেখা হয়েছে, সে ‘মুখ’ যেন আর ‘বন্ধ’ না-হয়।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

শাহবাগের আগুনে জ্বলে-পোড়ে যাক চার-দশকের পাপ

(দৈনিক যুগান্তর, ২৪/০২/২০১৩)

তরুণরা যখন জাগে তখন জীবনের অন্তর্নিহিত তাগিদ ও আবেগ নিয়ে জাগে। তরুণরা যখন জাগে, তখন অন্যকে জাগিয়েই জাগে। তরুণরা যখন সত্যিকার অর্থে জাগে, তখন তারুণ্যের এ জাগরণের সাথে নতুন করে জেগে উঠে সমাজ, সময় ও সমকালের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ। এ-ক্ষোভ তখন জীবন-জাগানিয়া বিক্ষোভের আকারণ ধারণ করে নির্মাণ করে সমাজের নতুন পাঠাতন। তারুণ্যের এ-জাগরণের মধ্য দিয়ে সমাজের সনাতন অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানগুলোর গুণগত রূপান্তরের ভেতর দিয়ে জেগে উঠে নতুন সমাজ। এ-জাগরণ নির্মাণ করে মানুষের সত্যিকার ‘মানুষ’ হয়ে উঠবার নতুন ইতিহাস। ‘শাহবাগ’ আজ তারুণ্যের এ-বিপুল-জাগরণী শক্তি নিয়ে জেগে উঠবার জন্মভূমি। ‘শাহবাগ’ আজ জীবনের, দর্শনের ও আদর্শের আগুনে জ্বলে উঠবার অগ্নিভূমি। ‘শাহবাগ’ আজ মানুষের ‘মানুষ’ হিসাবে পুনর্জন্মের মাতৃভূমি। তাই, মানুষের এ জেগে ও জ্বলে উঠবার, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের, ক্ষোভ ও বিক্ষোভের কিংবা বিদ্রোহ ও বিপ্লবের ইতিহাসে ‘শাহবাগ’-এর নাম সংযুক্ত হবে নতুন উচ্চতায়। ‘শাহবাগ’ যেমন জন্ম দিয়েছে তরুণ-প্রজন্মের আবেগ, ক্ষোভ ও বিক্ষোভকে, তরুণ প্রজন্মের জ্বলে উঠবার এ প্রজ্জ্বল ইতিহাস বিপ্রতীপে জন্ম দিয়েছে ‘শাহবাগ’কে। ‘নতুন প্রজন্মের এ-জেগে উঠা’ এবং ‘শাহবাগের এই যে ইতিহাস হয়ে উঠা’ উভয় ঘটনা’ই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী, যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিকে ভরকেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। অতএব, তারুণ্যের এ জাগরণ কিংবা ‘শাহবাগে’র এ ইতিহাস হয়ে উঠবার সাথে সাথে ইতিহাসের পরিশুদ্ধির প্রশ্ন্ও এখানে সমানভাবে জড়িত। যে জাগরণ কোন জাতিকে ইতিহাসের দায় থেকে মুক্তি দেয়, মুক্তিযুদ্ধের অমীমাংসিত এজেন্ডার মীমাংসার প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে, যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিকে জনপ্রিয়তার মানদন্ডে ন্যায্যাতা দেয় এবং সবধরণের রাজনৈতিক ছল-চাতুরির ঊর্ধে¦ উঠে সত্যিকার দেশপ্রেমের দর্শনে গোটা দেশের মানুষকে জাগিয়ে তুলতে পারে, সেটা তখন কেবল আর ইতিহাসের সীমায় আটকে থাকেনা; সেটা হয়ে উঠে ইতিহাসের অধিক কিছু। কালের ডাকে জন্ম নিয়েও সে ইতিহাস ভ্রমণ করে কালান্তরে। সমকালের রচনা হলেও সে ইতিহাস হয়ে উঠে মহাকালের প্রেরণা। তাই ‘শাহবাগ’ এখন আর কেবল সমকালের যন্ত্রণা নয়, এটা এখন মহাকালের মন্ত্রণা। ‘শাহবাগ’ এখন আর ইতিহাস নয়, ইতিহাসের ইতিহাস হয়ে উঠবার ইতিহাস। মানুষের জেগে উঠবার ইতিহাসের ইতিহাস।  

‘শাহবাগ’-এর বিদ্রোহ ও বিক্ষোভের আগুণ ছড়িয়ে গেলো সবখানে। নতুন প্রজন্মের কমিটমেন্ট এবং দেশপ্রেমের জোয়ারের কাছে আজ ভেসে গেছে আইন-আদালত জটিল হিসাব-নিকাশ, নীতিহীন-রাজনীতি, রাজনীতির কূটনীতি, সকল প্রকার মৌলবাদ, মধ্যবৃত্তীয় নিরপেক্ষতার সুবিধাবাদ, শ্রেণী-বয়স-লিঙ্গ-জাতি-বর্ণ-ধর্মের কুটিল ভেদাভেদ, সকল ধরণের ইহজাগতিক-ভন্ডামি এবং দেশের প্রশ্নে নির্লিপ্ত থাকবার সুবিধাবাদি-অনুশীলন। আজ নতুন প্রজন্মের ক্ষোভ, ক্রোধ, বিক্ষোভ ও বিপ্লবের আগুণ ছড়িয়ে পড়ছে কেন্দ্র থেকে প্রান্তে; আর প্রান্ত থেকে অণু-প্রান্তে। প্রান্তের সে আগুণ পুনরায় তাপ দিচ্ছে কেন্দ্রকে। সে তাপে কেন্দ্র আরো জ্বলে উঠছে দ্বিগুণ ত্যাজে। একে বলে তারুণ্যের জাগরণ। একে বলে জীবনের জাগরণ। জীবন যখন জাগে, তখন ইতিহাসের জন্ম-যন্ত্রণা শুরু হয়। বাংলাদেশের মানুষ এখন নতুন ইতিহাসের জন্ম-যন্ত্রণা দেখছে। তাই, সমাজের শৃঙ্খল ভাঙার এ জোয়ারকে কোন কিছু দিয়ে দাবিয়ে রাখা যাবেনা। কেননা, এ জোয়ার ইতিহাস সৃষ্টির জোয়ার। এ জোয়ার সময়ের মহাকাব্যে রচনা করে নতুন বিপ্লবের কাব্য। এ দেশের জন্মের শত্রু, একাত্তরের রাজাকার, পাকিস্তানের দোসর, লুন্ঠনকারী, মা-বোনের ইজ্জত হরণকারী, গণহত্যাকারীদের জায়গা এ তরুণ প্রজেন্মের কাছে নাই। আর যারা এতোদিন এদের লালন-পালন-ভরণ-পোষন করেছে, তাদের জন্যও এটি একটি বিরাট বার্তা। তাই, আদি পাপের প্রায়শ্চিত্য করবার সময় এটা। আদিপাপের কাফ্ফারা দেবার সময় এটা। অন্যথায়, তার রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে অত্যন্ত চড়া দামে। ‘রাজনৈতিক চাতুরতায় লোক-দেখানো দেশপ্রেম’ কিংবা ‘নির্বাচনী-জোট করবার গোপন বাসনায় সুবিধাবাদি নিরবতা’--কোনাটাতেই আজ কাজ হবে না। জনগণ আজ জেগেছে। তরুণ প্রজন্মের তারুণ্যের জাগরণের ভেতর দিয়ে জেগেছে মানুষের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা দেশপ্রেম। মানুষের ভেতর জেগেছে মানুষ। জন-আকাঙ্ক্ষা, গণদাবি এবং আম-জনতার আবেগকে সম্মান কববার সময় এটা। তাই, ‘বানের পানির লাহান’ মানুষ যোগ দিচ্ছে ‘শাহবাগে’ কিংবা এদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষ সৃষ্টি করছে এক একটি নতুন ‘শাহবাগ’। এভাবেই গোটা দেশ যেন একটি বিরাগ ‘শাহবাগ’ হয়ে উঠেছে। ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যার মধ্য দিয়ে সে আগুনে ঢালা হয়েছে ঘি। ফলে, রাজীবের মৃত্যুর শোকের ভেতর দিয়ে দ্বিগুণ শক্তিতে বলিয়ান হয়ে শাহবাগ আজ ক্ষোভে-বিক্ষোভে অধিকতর ত্যাজে জ্বলে উঠছে এদেশের আনাচে কানাচে। ‘এরকম বাংলাদেশ কখনও দেখেনি কেউ।’  

তারুণ্যের এ-জাগরণ আরো একটি বিষয় দিবালোকের মত সাফ করেছে। এদেশের গণতন্ত্র, দেশপ্রেম, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ইতিহাস শেষ বিচারে এদেশের তরুণদের হাতেই সত্যিকার নিরাপদ। রাজনীতিবিদরা গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ইতিহাসের ‘ডিলারশীপ’ নিয়ে বিগত চার দশকে খুচরা হিসাবে বেচা-বিক্রি করে নিজেদের আখের গুছিয়েছে। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের পায়তারায় কিংবা ক্ষমতার অন্ধমোহে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের সাথে রাষ্ট্র-ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা করেছে। তাই, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জঘণ্য মানবতা-বিরোধী অপরাধ করার পরও এদেশের রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতার কারণে স্বাধীনতা-বিরোধী চক্র এদেশের আলো-বাতাসে ফুলে-ফেঁপে কাল-সাপের রূপ ধারণ করেছে। ‘শাহবাগের’ প্রজন্ম আজ জেগে উঠেছে। যুদ্ধাপরাধীদের এবং একাত্তরে সংঘটিত মানবতা-বিরোধী অপরাধীদের আর কেউ বাঁচাতে পারবে না। তাই, ‘শাহবাগের’ এ-ইতিহাসের গলায় যেন কেউ কোন দলীয় মালা না-পরাতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তারুণ্যের এ জাগরণকে এবং এ-জাগরণের ফসলকে কেউ যেন রাজনৈতিক গোলায় না-ভরে ফেলে। ‘শাহবাগ’ বিপ্লবের ফসল যেন শেষ পর্যন্ত জনগণের গোলায় যায়, সেদিকেও সকলকে সজাগ থাকতে হবে।  

‘শাহবাগ’ গণ-আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ‘হিসাব’ একেবারেই সোজা হয়ে উঠেছে। ‘যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই’-- যারা এ দাবির পক্ষে আছেন তারা ‘হ্যাঁ’ বলুন আর যারা এ দাবির বিপক্ষে আছেন তারা ‘না’ বলুন। হিসাব নিকাশ পরিষ্কার। কোন ছলচাঁতুরি নাই। কোন ভান কিংবা ভনিতা নাই। সকল মুখোশ আজ খুলে পড়ুক। সকল ধোঁয়াশা আজ সাফ হয়ে যাক। ইতিহাস আজ মুক্তি পাক। জাতি আজ কলঙ্কমুক্ত হোক। জাতি আজ কুলাঙ্গারমুক্ত হোক। আজ যে আগুণ ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে, সে আগুণে জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাক সমাজের সকল শ্রেণী-বৈষম্য, জাত-পাতের সকল সমাজ-নির্মিত ভেদাভেদ। জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাক সমাজের সকল জীর্ণতা, হীনতা এবং মূঢ়তা। ‘শাহবাগের’ আগুণ আজ জ্বলে উঠুক গ্রামে, গঞ্জে, পাড়ায়, মহল্লায়, চিন্তা ও চেতনার অলিতে-গলিতে। এ-আগুণ জ্বলুক বিবেকে, মগজে, শোণিতে। জ্বলে-পোড়ে যাক, চর-দশকের পাপ। 

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

জয় বাংলা ও জয় ‘শাহবাগ’

(দৈনিক ভোরের কাগজ, ১৫/০২/২০১৩)

মানুষের ইতিহাসে বীরত্বের মহাকাব্য লেখা হয় সমকালের জাগরণের ইতিবৃত্ত দিয়ে। তখন সেটা সমকালের জাগরণ হয়েও চড়ে বেড়ায় মহাকালে। কালের জাগরণ হয়েও সেটা বিচরণ করে কালান্তরে। একাডেমিক পরিভাষায় তার নামায়ণ হয় ‘ইতিহাস’। তাই, মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিকাশের ইতিহাস হচ্ছে মূলতঃ মানুষের ‘প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে’র ইতিহাস। আর প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ইতিহাস হচ্ছে মূলতঃ মানুষের ‘জাগরণের’ ইতিহাস। মানুষ যখন জাগে, তখন জাগে ‘সমকাল’। জাগে ইতিহাস। কেননা এ-জাগরণের ভেতর দিয়েই জন্ম হয় ‘ইতিহাস’। মানুষের সত্যিকার ‘মানুষ’ হয়ে উঠবার ইতিহাস। মানুষ প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ভেতর দিয়ে জন্ম দেয় নতুন সময়ের, নতুন সমাজের এবং নতুন চিন্তার। নতুন করে জন্ম দেয় ‘মানুষ’ নিজেকেই। তাই, যেখানে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ঘটনা সংঘটিত হয়, সেটা তখন হয়ে উঠে নতুন ইতিহাসের নতুন ‘জন্মভূমি’। সমকালীন ঘটনা-প্রবাহের ভেতর দিয়ে দেশ ও দশের স্বার্থ রক্ষার তাগিদে, রাজনৈতিক-দুবৃত্তায়ন থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষায়, অর্থনৈতিক-শোষণ ও শ্রেণী-বৈষম্য বিলোপের বাসনায় যথাক্রমের ‘তাহিরী স্কোয়ার’, ‘অকুপায়-ওয়াল স্ট্রিট’ কিংবা দিল্লীর ‘জন্তর-মন্তর’ প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ইতিহাসে যেমন নতুন মেটাফোর সংযুক্ত করেছে, বাংলাদেশের ‘শাহবাগ’ও আজ মানুষের জাগরণের ইতিহাসের নতুন মেটাফোর। কিংবা ‘শাহবাগ’ আজ খুদ নিজেই এক ‘ইতিহাস’। এক মহাজাগরণের ইতিহাস। বিপুল সম্ভাবনাময় ও অকোতভয় তারুণ্যের জ্বলে উঠবার ইতিহাস। এদেশের তারুণ্যের দেশপ্রেমের তীব্রতার ইতিহাস। বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করবার এবং তা মোকাবেলা করবার তারুণ্যের সক্ষমতার ইতিহাস। ‘শাহবাগ’ আজ সত্যিকার অর্থে ইতিহাসের এক পরিশুদ্ধির ইতিহাস। একাত্তর সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গড়ে উঠা ‘শাহবাগ-বিপ্লব’ চারদশকের পাপ সাফ করবার প্রেরণা এবং কমিটমেন্টের ইতিহাস। বাংলাদেশের তারুণ্যের বাঁধভাঙা দেশপ্রেম ও যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির প্রশ্নে হার না-মানা সংগ্রামের ইতিহাস।

যে কোন বিচারেই, শাহবাগ-বিপ্লবের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি করছে নতুন ইতিহাস। বাংলাদেশ জন্ম দিচ্ছে নতুন বীরত্ব-গাঁথা। কাদের মোল্লার ফাঁসিসহ সকল যুদ্ধপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে যে গণ-আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল গত ৫ ফেব্রুয়ারী, সেটা তার ক্রমবর্ধমান বিস্তার ও সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতায় ক্রমান্বয়ে পরিণত হয়েছে গণ-জোয়ারে। সেটা ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানী থেকে বিভাগে, বিভাগ থেকে মফস্বলে, শহরতলী থেকে গ্রামে এবং গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। কেন্দ্র থেকে এ-বিপ্লবের আগুণ ছড়িয়ে পড়েছে প্রান্তে। প্রান্ত আরও অধিক উত্তেজনায় জ্বলে উঠে উল্টো তাপ দিচ্ছে কেন্দ্রকে। কেন্দ্র প্রান্তের সেই ফিরতি তাপে জ্বলে উঠছে দ্বিগুন ত্যাজে। নিজে জ্বলে উঠা এবং অন্যকে জ্বালানোর ভেতর দিয়ে তৈরী হচ্ছে কেন্দ্র ও প্রান্তের এক বিরল আদর্শিক যোগাযোগ। আর সে যোগাযোগের সূত্র ধরেই বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে জন্ম নিচ্ছে একটি একটি করে নতুন ‘শাহবাগ’। তখন ‘শাহবাগ’ আর রাজধানীর শাহবাগে থাকে না। ছড়িয়ে পড়ে গোটা বাংলাদেশে। যেন গোটা বাংলাদেশই একটি বিরাট শাহবাগ। আন্দোলন, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের উত্তাল ‘শাহবাগ’। এভাবে তারুণ্যের ‘শাহবাগ’ হয়ে উঠছে তারুণ্যের বাংলাদেশ। তারুণ্যের এ তীব্র জোয়ারের ঢেউ এভাবে সারা বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব গণ-জাগরণ সৃষ্টি করেছে। সবার মুখে একটাই দাবি ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই’। আকাশে বাতাসে গগণবিদারী সুরেলা, কিন্তু ঝাঁঝাঁলো, শ্লোগানে প্রকম্পিত আজ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। সুরমা থেকে পাটুরিয়া। একই আওয়াজ, একই শ্লোগান, একই দাবি। ‘যুদ্ধপরাধীদের বিচার চাই, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই’। এভাবেই সৃষ্টি হচ্ছে নতুন ইতিহাস। উত্তর-প্রজন্ম বাহান্ন, চুয়ান্ন, ঊনসত্তর, একাত্তর, নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের ইতিহাসের পাশাপাশি ‘দুইহাজার তের’কে একটি নতুন মাত্রায় এবং নতুন উচ্চতায় স্মারণ করবে পূর্ব-প্রজন্মের গৌরোবজ্জ্¦ল গণ-আন্দোলন ও গণ-জাগরণের ইতিহাস হিসাবে। এটাই শাহবাগের ইতিহাস হয়ে উঠবার ইতিহাস।

শুরু থেকেই শাহবাগের এ গণ-আন্দোলন একটি গড়পড়তা মার্কা-মারা কোন ধরণের দলীয়-চরিত্রের লেবাসের বাইরে একটি সত্যিকার গণ-আন্দোলন হিসাবে তার স্বতন্ত্র চরিত্র জারি রেখেছে। ফলে, দলে দলে মানুষ দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-জাত-পাত-বয়স-লিঙ্গ নির্বিশেষে সামিল হচ্ছে এ-নির্দলীয় আন্দোলনের ডাকে। তারুণ্যের এ-ডাকে সাড়া দিয়েছে এদেশের সকল শ্রেণীর সকল পেশার এবং সকল স্তরের মানুষ। ফলে, সত্যিকার গণ-আন্দোলন বলতে যেটা বোঝায় ‘শাহবাগ’ তার একটি নগদ, জ্বলন্ত এবং চলমান উদাহারণ। আর তারুণ্যের এ ষ্পর্ধা ও সৎ-সাহস আছে বলেই তারা ঘোষণা করতে পারে ‘কোন দলীয় রাজনীতিবিদদের এখানে বক্তব্য দিতে দেয়া হবে না’। ফলে, শাহবাগের এ-আন্দোলন একটি সত্যিকার গণ-আন্দোলনের চরিত্র ও মর্যাদা পেয়েছে। এদেশের গণ-মানুষ তাই, শাহবাগের আন্দোলনকে নিজের আন্দোলন হিসাবে মনে, মননে এবং মগজে ধারণ করে সদলবলে সামিল হচ্ছে তারুণ্যের মিছিলে। ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠবার দুর্বার আহ্বানে মানুষ সামিল হচ্ছে ইতিহাসের কাতারে।

শাহবাগ স্কোয়ারে তারণ্যের এ জ্বলে উঠা আরে একটি পরিষ্কার বার্তা দেয়। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অপরাধীরা জামায়াত-শিবিরের নামে এদেশে রাজনৈতিকভাবে পূনর্বাসিত হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে এদেশের রাজনীতিবিদরা। ইতিহাস স্বাক্ষী, এদেশের রাজনীতিবিদরাই রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের পায়তারায় কিংবা ক্ষমতার অন্ধমোহে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের সাথে রাষ্ট্র-ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা করেছে। তাই, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জঘণ্য মানবতা-বিরোধী অপরাধ করার পরও এদেশের রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতার কারণে স্বাধীনতা-বিরোধী চক্র এদেশের আলো-বাতাসে ফুলে-ফেপে কাল-সাপের রূপ ধারণ করেছে। ফলে, ‘শাহবাগের তারুণ্য’ তাদের গণ-আন্দোলনকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কোন ধরণের দলীয ছায়া থেকে নিজেদেরকে সচেতনভাবে বিরত রেখেছে। এর মধ্য দিয়ে এ বার্তাটিই ষ্পষ্ট হয় যে, এদেশে জামায়াতকে নিয়ে রাজনীতি করবার দিন শেষ। কেননা, একাত্তরের পরে বিশেষ করে পচাঁত্তরের পরে যারাই ক্ষমতায় এসেছে কোন-না-কোন ভাবে তারা জাতায়াতকে তথা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী এবং মানবতা বিরোধী অপরাধীদেরকে লালন-পালন-পোষন-তোষন করেছে। সুতরাং একাত্তর-উত্তর চার দশকের পাপ এ ‘শাহবাগের তারুণ্য’ সাফ করবার যে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে যুদ্ধপরাধীদের বিচার প্রশ্নে আন্দোলন শুরু করেছিলে গুটি কয়েক ‘ব্লগার ও নেটওয়ার্ক একটিভিষ্ট’ সেটা এখন বাংলাদেশের গণ-মানুষের সার্বজনীন এবং স্বতস্ফুর্ত আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। গণ-মানুষের আন্দোলনের রূপ ধারণ করেছে বলেই, এ আন্দোলন ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে। সুতরাং এ-আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান বিস্তার ও ব্যাপকতা মূলতঃ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জামায়াত-তোষন নীতির বিরুদ্ধেও একধরণের গণ-অনাস্থাকে প্রতিভাত করে। শাহবাগ-বিপ্লবের এ বার্তা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যত দ্রুত বুঝতে পারবে ততই তাদের লাভ। আর এ চতুর অ’বুঝ’রা দ্রুত বুঝতে পারলেই শেষ বিচারে লাভের গুড় খাবে দেশ ও দেশের মানুষ।

শাহবাগের আন্দোলন আবার নতুন করে প্রমাণ করলো, শেষ পর্যন্ত তারণ্যই ভরসা। সমাজকে জোরে ঝাঁকুনি দেয়ার জন্য তারুণ্যের জেগে উঠবার কোন বিকল্প নাই। নানা তরিকার রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের মার-প্যাঁচে কিংবা নির্বাচনের সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এদেশের রাজনীতিবিদরা যে দেশের মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, জন-আকাক্সক্ষা এবং গণ-আবেগকে রাজনীতির ময়দানে হরদম কেনাবেচা করতে পারে, তার সুযোগেই একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী এবং মানবতা-বিরোধী অপরাধীরা পার পেয়ে বাড় বেড়ে আজকে খোদ এদেশের রাষ্ট্র-ব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জ করছে। তাই, এদেশের তারুণ্য সব ধরণের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যিকার দেশপ্রেমের আবেগ নিয়ে জ্বলে উঠতে পারে। আর এদেশের তারণ্য সত্যিকার দেশপ্রেমের বারুদে জ্বলে উঠতে পারে বলেই ‘শাহবাগ’র জন্ম হয়। জন্ম হয় সত্যিকার গণ-আন্দোলন। নতুন করে লিখিত হয় সমকালের ইতিহাস। নতুন করে রচিত তারুণ্যে কীর্তন-নামা। নতুন করে জন্ম নেয় মহাকালের বোরাকে চড়ার সমাকালের বিপ্লবী মহাকাব্য। জয় বাংলা। জয় শাহবাগ।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

(অ)রাজনৈতিক আন্দোলনের রাজনৈতিক বার্তা

(দৈনিক সমকাল, ১৪/০২/২০১৩)

বিগত পাঁচ ফেব্রুয়ারী থেকে শাহবাগে যে গণ-আন্দোলন চলছে সেটাকে অনেকে অরাজনৈতিক আন্দোলন হিসাবে উপস্থাপন করছেন। এটা সত্যি যে, এ আন্দোলনের একটা নিদর্লীয় অবয়ব রয়েছে কিন্তু তার অর্থ এটা অরাজনৈতিক নয়। বরং আমি বলবো, শাহবাগে যে গণ-আন্দোলন চলছে, এর চাইতে বড় কোন রাজনৈতিক আন্দোলন নিকট ইতিহাসে বাংলাদেশের ঘটে নাই। অনেকে এটাকে নতুন মুক্তিযুদ্ধ কিংবা নতুন প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধ হিসাবে প্রতীকায়ন করছেন। অনেকে এটাকে তুলনায় সমান্তরাল করছেন বাহান্ন, চুয়ান্ন, একাত্তর এবং নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের সাথে। কেউ কেউ-বা এটাকে বলার চেষ্টা করছেন মিশরের ‘তাহিরী স্কোয়ারে’র গণ-বিপ্লবের সাথে। যার সাথেই তুলনা করা হোক না কেন, নিঃসন্দেহে এটি একটি সার্বজনীন এবং সর্বাংশে রাজনৈতিক গণ-আন্দোলন। তবে, এটা আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি মার্কা দলীয় রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। এটা এদেশের নতুন প্রজন্মের নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমের তীব্র চেতনা থেকে উঠে আসা, তৃণমূলের মানুষের স্বাধীনতার চেতনাবোধ থেকে উত্লে উঠা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে এদেশের গণ-মানুষের মধ্যে পুঞ্জিভূত ক্রোধ ও ক্ষোভ থেকে উঠে আসা স্বতস্ফুর্ত গণ-আন্দোলন। তবে, শেষ বিচারে এটি প্রবলভাবে একটি রাজনৈতিক আন্দোলন এবং তাই, এর রয়েছে একটি সুদূর প্রসারী রাজনৈতিক তাৎপর্য। সত্যিকার অর্থে আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনীতি কীভাবে চলবে, কিংবা রাজনীতিকে কীভাবে চলতে হবে, সেটার একটি রাজনৈতিক দর্শন ও রূপরেখা এ শাহবাগ আন্দোলেনের ভেতর দিয়ে তৈরী হয়ে যাচ্ছে। তাই, এ আন্দোলনের মধ্যে রয়েছে এদেশের রাজনীতি, রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং রাজনীতির ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা।

একটি বিষয় প্রথমেই সাফ করে নেয়া জরুরি। যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনীত ছয়টি অভিযোগের মধ্যে গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুন্ঠনসহ পাঁচটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ার পরও তাকে সর্বোাচ্চ শাস্তি না-দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়ার কারণে ক্ষুদ্ধ এদেশের অনেক মানুষের মধ্যে ‘ব্লগার এবং নেটওয়ার্ক একটিভিষ্ট’রা কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে জমায়েত হয়ে এ আন্দোলনের সূত্রপাত করলেও, এটা এখন আর যেমন কেবল ‘ব্লগার আর অনলাইন এক্টিভিষ্টদের’ আন্দোলন নয়, তেমনি কেবল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতেই এ আন্দোলনের নিশানা সীমাবদ্ধ নাই। গত আট তারিখের মহাসমাবেশে শাহবাগের এ আন্দোলন থেকে যে সব ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তন্মধ্যে অন্যতম দাবিগুলো হচ্ছে; কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীদেরকে বিচারের আওতায় আনা এবং তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা, এদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা, এবং জামায়াতের তত্ত্বাবধানে/পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সকল প্রতিষ্ঠানকে সামাজিকভাবে বয়কট করা। সুতরাং শাহবাগের গণ-আন্দোলনের প্রাথমিক রাজনৈতিক তাৎপর্য হচ্ছে, একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত ‘যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে’র বিচারের প্রশ্নটিই বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

শাহবাগ আন্দোলনের আরেকটি অন্যতম তাৎপর্য হচ্ছে, এটি এদেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এক অভাবনীয় সাড়া ফেলে দিয়ে সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের চেতায় আলোড়িত ও আন্দোলিত করে তুলেছে। বসয়-লিঙ্গ-জাত-পাত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে একই এজেন্ডায় একই চেতনায় একই ভাবাদর্শে একটি প্লাটফর্মে একত্রিত করেছে। প্রাথমিকভাবে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে ঢাকায় এ-আন্দোলনের সূত্রপাত হলে এটা ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, রংপুরসহ সারা বাংলাদেশের জেলা-উপজেলা শহরগুলোতেও। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গোটা দেশের মানুষ, জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক-মতাদর্শী কিছু মানুষ এবং কিছু কট্টরপন্থী বিএনপির নেতা-কর্মী ছাড়া, আজ একই রব তুলছে ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই, যুদ্ধপারাধীদের ফাঁসি চাই’। কেন ‘কিছু ব্লগার আর অনলাইন এক্টিভিষ্টদের’ শাহবাগের জমায়েত সারা বাংলাদেশের মানুষকে এভাবে আন্দোলিত করেছে? কেন শাহবাগ আজ ‘ইতিহাস’ হয়ে উঠেছে? এখানেই রাজনীতিবিদদের এবং বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দের শিক্ষা নেয়ার ‘বার্তা’ নিহিত আছে। কেননা, যে আন্দোলন দেশের সর্বস্তরের মানুষের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে, যে আন্দোলন গণমানুষের আবেগকে ধারণ করে, যে দাবির মধ্যে দেশের অধিকাংশ মানুষের চাওয়া-চাহিদার প্রতিফলন ঘটে, সেখানে মানুষ সাড়া দেবেই। ক্ষমতায় যাওয়ার অন্ধমোহে গণসম্পৃক্ততাহীন রাজনৈতিক কর্মসূচির দিয়ে সত্যিকার কোন গণ-আন্দোলন তৈরী করা যায় না। শাহবাগের আন্দোলনের যে তীব্রতা, তার ভেতর দিয়ে এ সাধারণ সত্যটি দিবালোকের মত পরিষ্কার হয়। 

শাহবাগের আন্দোলন আরও একটি বার্তা অত্যন্ত জোরালো ভাবে সামনে নিয়ে আসে। বর্তমানের দেশে একাত্তরের ‘যুদ্ধাপরাধ এবং মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতা-বিরোধী অপরাধে’র যে বিচার চলছে, সেটাই বাংলাদেশের সমকালীন ও নিকট-ভবিষ্যতের রাজনীতির সত্যিকার নির্ধারক হয়ে উঠবে। আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাটাকে উপস্থাপন করছে যতটা নির্বাচনী-অঙ্গীকার পুরণ করার কাজ হিসাবে, ইতিহাসের দায় হিসাবে ততটা নয়। এবং এ যুদ্ধাপরাধ ও মানবতা-বিরোধী অপরাধের বিচারের সাঁকু বেয়ে আরেকবার ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি ইতোমধ্যেই প্রতিভাত হচ্ছে। কিন্তু শাহবাগ-আন্দোলন থেকে আওয়ামী লীগকেও বুঝে নিতে হবে যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা কেবল নির্বাচনী মেনিফেষ্টোর একটি ওয়াদা পূরণ করবার ব্যাপার নয়। এটা এদেশের মানুষের একটি প্রাণের দাবি। এদেশের তরুণ ও যুব সমাজের তীব্র আকাক্সক্ষা জায়গা। এদেশের গণমানুষের তীব্র আবেগের জায়গা, যা শাহবাগের গণজোয়ারকে একটি সার্বজনীন ও গণভিত্তি দিয়েছে। আওয়ামী লীগ বর্তমানে ক্ষমতায় আছে এবং সেজন্যই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রশ্নে আওয়ামী লীগের ভূমিকা এবং কার্যকর পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে আওয়ামী লীগের আগামী দিনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। তাই, যে কোন ধরণের চালাকি কিংবা আপোষ করবার চিন্তা-ভাবনা আওয়ামী লীগের রাজনীতির জন্য একটি বিরাট বিপর্যয় নিয়ে আসবে।

অন্যদিকে বিএনপি আওয়ামীলীগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করবার কৌশল হিসাবে এবং আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার নির্বাচনী পরিকল্পনার অংশ হিসাবে এতদিন জামায়াতকে বগলে নিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম রাখার চেষ্টা করেছে। নিজের অজান্তেই বিএনপি নির্বাচনী-রাজনীতির হিসাব-নিকাশের মারপ্যাঁচে নিজেরাই ক্রমান্বয়ে জামায়াতের সামিয়ানার নিচে চলে যাচ্ছে। আর জামায়াত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে থেকে বিএনপির সরকার বিরোধী আন্দোলনের ফাঁক দিয়ে যুদ্ধাপরাধী ও মুক্তিযুদ্ধে সংঘঠিত মানবতা-বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বদের মুক্তির দাবি নিয়ে মিছিল মিটিং করেছে। কিন্তু শাহবাগের আন্দোলন এবং শাহবাগের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা দেশব্যাপি যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে বিএনপি নতুন করে তার আগামী দিনের রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রশ্ন সারাদেশে যে অভূতপূর্ব গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে জামায়াতের সঙ্গ না-ছাড়লে বিএনপিকে অনেক চড়া-দামে এর রাজনৈতিক-মূল্য পরিশোধ করতে হবে। শাহবাগের আন্দোলন থেকে এটিই বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা।

সবকিছু সংশ্লেষণ করলে মোটা দাগে শাহবাগের আন্দোলন একটিই বার্তা দেয়; বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতির ধারা নির্ধারিত হবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে এবং বিপক্ষে। বিএনপির নেতৃবৃন্দ এতদিন অনেকটা চামড়া বাঁচানোর জন্য বলেছেন, “বিএনপিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়, তবে তা হতে হবে আন্তর্জাতিক মানদ-ে” কিংবা “বিএনপিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়, তবে বিচারের নামে যে কাউকে হয়রানি করা না-হয়” কিংবা “বিএনপিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়, তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবতি হয়ে কাউকে যেন শাস্তি দেয়া না-হয়”। এই “তবে”র ফাঁকে বিএনপি যে, জামায়াতের পক্ষে সুনির্দিষ্টভাবে রাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছেন, সেটা জনগণের কাছে মোটামুটি পরিষ্কার। এটা সত্য যে, বিএনপিতেও মুক্তিযোদ্ধা আছেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমা-ার ছিলেন। তাছাড়া বেগম খালেদা জিয়া দুই দুইবার এদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বর্তমানের মহান জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী। তাই, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এ কারণে যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সারাদেশের মানুষের মধ্যে যে একটি দৃশ্যমান মতৈক্য তৈরী হয়েছে, বিএনপি এখনও ইনিয়ে-বিনিয়ে প্রকাশ্যে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষেই অবস্থান নিচ্ছে।

শাহবাগ আন্দোলনের ফলে সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুদ্ধাপরাধীদের এবং মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতা-বিরোধী অপরাধের বিচারের পক্ষে সারা বাংলাদেশের মানুষের একটি সুষ্পষ্ট মতৈক্য তৈরী হয়েছে। সেখানে কোন ধরণের রাজনৈতিক চালাকি বা নির্বাচনী ছল-চাতুরির আশ্রয় না-নিয়ে ক্ষমতাসীন দল হিসাবে এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব-প্রদানকারী দল হিসাবে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় জন-আকাক্সক্ষার প্রতি সম্মান দেখিয়ে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে এদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করে জাতিকে ইতিহাসের দায় থেকে মুক্ত করা। আর বাংলাদেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের একটি হিসাবে এবং মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডারের হাতে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল হিসাবে বিএনপির উচিত কোন ধরণের ভান-ভনিতা না-করে যতদ্রুত সম্ভব জামায়াতের সঙ্গ ছেড়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে জনগণের কাতারে এসে শামিল হওয়া। একটি রাজনৈতিক দল হিসাবে সত্যিকার জন-আকাক্সক্ষাকে ধারণ করবার এটাই একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক উপায়। যে জামায়াতের জন্য বিএনপি’র আজকের এ মাসির দরদ সে জামায়ত কিন্তু ক্রান্তিকালে বিএনপিকে বাঁচাবে না কিংবা বাঁচাতে পারবেনা। মানুষের আবেগ, আশা-আকাক্সক্ষা, চাওয়া-চাহিদা এবং মতৈক্যের সাথে ঐক্যমত্য পোষণ করবার মধ্যেই রাজনৈতিক ফায়দা-- শাহবাগের কথিত (অ)রাজনৈতিক বিপ্লব এ রাজনৈতিক বার্তাটিই সবার সামনে দিবালোকের মত আরও একবার বিরাট-বিপুল গণজোয়ারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করে নিজেই ‘ইতিহাস’ হয়ে উঠছে।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

ক্ষমতার রাজনীতি ও আত্মমর্যাদাবোধের প্রশ্ন!

(দৈনিক ভোরের কাগজ, ০৭/০২/২০১৩)

কোন লেখকের কোন্ লেখা কী পরিমাণ সেনসেশন তৈরী করতে পারে, তা নির্ভর করে খোদ লেখকের বাজার-দর, লেখার গুণমান, পাঠক-শ্রেণীর ক্যাটেগরি, বাজার-কাটতি, বিপনণ ও বিজ্ঞাপনের ওপর। কিন্তু কোন কোন লেখা এসব হিসাব-নিকাশের বাটখারার বাইরে গিয়ে ‘সুপার হিট’ করে চতুর্দিকে হইচই ফেলে দেয়। অমর একুশে বইমেলাকে কেন্দ্র করে অসংখ্য নবীন-প্রবীণের আসন্ন লেখা ও প্রকাশনা নিয়ে যে পরিমাণ হইচই হওয়ার কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি হইচই হচ্ছে একজন নন-লেখকের একটি লেখা নিয়ে যা ওয়াশিংটন-টাইমস-এ জানুয়ারীর ৩০ তারিখ ছাপা হয়েছে। কারণ তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির চরম ক্ষমতাধর প্রধান দুই নেত্রীর একজন; বিএনপির সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। রাজনৈতিক ময়দানের কথা যদি বাদও দিই, এ লেখাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যগুলোতে রীতিমত সুনামি বয়ে যাচ্ছে; বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোকে প্রতিদিন গড়পড়তা (বর্তমান নিবন্ধটিসহ) ২০ থেকে ২৫ টি সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় ছাপা হচ্ছে; এ লেখা বাংলাদেশের প্রথম সারির (প্রচার সংখ্যা বিচারে!) সকল সংবাদপত্রে পুনমূর্দ্রণ করেছে; কোন কোন ইংরেজী সংবাদপত্র হুবহু ইংরেজীতেই ছেপেছে আবার বাংলা সংবাদপত্রগুলো বাংলায় অনুবাদ করে ছেপেছে। প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলোর টকশোতে রীতিমত ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এমনটি এ লেখা নিয়ে বাংলাদেশের মহান জাতীয় সংসদে গত ৩১ জানুয়ারী তারিখে অনির্ধারিত দুইঘন্টা আলোচনা হয়েছে। এরকম সেনসেশন তৈরী করা কোন লেখা নিকট অতীতে বাংলাদেশে আর হয়েছে বলে মনে পড়ছে না। অমর একুশের বইমেলার এতো লেখকের এতো লেখা বেগম খালেদার জিয়ার একটি লেখার কাছে বিশেষ করে সেনসেশন তৈরীর মাপকাঠিতে ম্লান হয়ে গেছে। কেন? কী এমন আছে এ লেখাতে? কেন এ বেহুদা সেনসেশন?

এ লেখার মূল বিষয়গুলোর সারাংশ এবং সার ও অংশ হচ্ছে অনেকটা এরকম; (১) এদেশটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার দখল করে নিয়েছে, (২) এদেশে গণতন্ত্র বলে কিছু নাই, যা কিছু ছিল সেটাও এখন ‘নাই’ হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণায় কাঁদছে, (৩) একাত্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের বন্ধু ছিলো (!) কিন্তু বাংলাদেশের এ-অবস্থায় সে বন্ধুত্বের দায় মেটাচ্ছেনা কেনো?, (৪) এ সরকার দুর্নীতিগ্রস্থ তাই বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতুর জন্য প্রতিশ্রুত অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করে দিয়েছে, (৫) আমেরকিার পেয়ারের লোক ড. ইউনূসের মতো একজন নোবেল পুরুস্কার প্রাপ্ত ব্যক্তিকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পথ থেকে সরিয়ে দিয়েছে এ সরকার বিরাট গুনাহ’র কাজ করেছে, (৬) জাতিক (আন্তর্জাতিক নয়!) ট্রাইবুনালের মাধ্যমে শেখহাসিনার সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে এদেশের রাজনীতিবিদ এবং তাদের সহযোগীদের মৃত্যুদ- দিচ্ছে, (৭) এ-সরকার কতৃক বালিত করে দেয়া ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা’ পুনরোদ্ধারের জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমেছে কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার তার তোয়াক্কা করছে না, (৮) আমেরিকাকে পাস কাটিয়ে এদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের রাস্তা অন্যদিকে (রাশিয়ার দিকে) মাপা হচ্ছে, (৯) অতএব, আমেরিকার নেতৃত্বে, আপনার দোসর গ্রেট বৃটেনকে সাথে নিয়ে, অন্যান্য আরো যত সাঙ্গপাঙ্গ আছে তাদের নিয়ে তাড়াতাড়ি আসেন আর বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে উদ্ধার করেন। একটা স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিদ্যমান সংসদের বিরোধী দলের নেত্রী-- যিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দুইবার এদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন-- কীভাবে ওয়াশিংটন টাইম্সের মতো পত্রিকায় এরকম একটি লেখা লিখতে পারেন তার নানান ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। আমি সেদিকে যাবো না। এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করবার জন্য এদেশে অসংখ্য কলাম লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, পেশাপদার সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী আছেন। আমি শুধু এটুকু বলবো, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসাবে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর, বিদ্যমান সংসদের একজন বিরোধী দলীয় নেত্রীর এবং এদেশের কোটি মানুষের সমর্থনপুষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের একজন প্রধান নেত্রী এধরনের আত্মমর্যাদাহীন ভিখেরীয়ানায় আমি ভীষণ পরিমাণ গ্লানি বোধ করেছি। আমার আত্মসম্মানে ভীষণভাবে আঘাত লেগেছে। পুনরায় ক্ষমতায় যাওয়ার বেপরোয়া আবেগের বশবর্তী হয়ে কিংবা ক্ষমতা-লাভের অন্ধমোহে বেগম খালেদা জিয়ার এরকম একটি অদূরদর্শী পদক্ষেপের জন্য আমি মনে করি দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-জাত-লিঙ্গ-বয়স নির্বিশেষে যে কোন আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মানুষের অন্তরে সামান্য হলেও আঘাত লাগার কথা। যারা বেগম খালেদা জিয়াকে এরকম একটি চিঠি লিখতে পরামর্শ দিয়েছেন, চিঠির কনটেন্ট, কনটেক্সট, লিখল ও ভাষা-সংশোধন করবার কাজে সহায়তা করেছেন, তাদের হয়তো আত্মমর্যাদাবোধ না-থাকতে পারে কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার সেটা থাকা উচিত ছিলো বলে আমি মনে করি। কেননা, বেগম খালেদা জিয়া এখন আর কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। বেগম খালেদা জিয়া এখন আর একক কোন সত্তা নন, তিনি একটি সমষ্টিক সত্তার প্রতিনিধি। তাই, তাঁর যে কোন পদক্ষেপ তাঁর যতোটা না ব্যক্তিগত ক্ষতি কিংবা লাভালাভের বিষয় জড়িত, ততোধিক সমষ্টিগত লাভ ও কিংবা ক্ষতির প্রশ্ন জড়িত। মোটাদাগে রাষ্ট্রনীতির প্রশ্নও জড়িত। রাজনীতিবিদদের ভুলের মাসুল গুনতে হয়, এদেশের সাধারণ আম-জনতাকে। ইতিহাসে সে নজির অহরহ পাওয়া যাবে। তাই, ক্ষমতার বেপরোয়া কামড়া-কামড়ির কারণে মান-সম্মানবোধের ধারণা এদেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে ক্রমান্বয়ে লোপ পেলেও, এদেশের মানুষের আত্মমর্যাদাবোধ এবং আত্মসম্মানবোধ এখনও টনটনে। আর আম-জনতার সেই আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদাবোধের প্রতি যথাযথ সম্মান জানানো এদেশের রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক দায়িত্ব।

এটা সত্য যে, বেগম খালেদা জিয়ার এ লেখা নিয়ে বাংলাদেশে বেসুমার হইচই হচ্ছে। সবাই যখন এটাকে ’কলাম’ হিসাবে বাজার করছে, তখন অধ্যাপক আমেনা মহসিন ‘একাত্তর’ টিভির একটি টকশোতে (০১/০২/২০১৩) এ লেখাকে বলেছেন ‘চিঠি’। সংবাদপত্রে চাপানোর জন্য লেখা একটি ‘ব্যক্তিগত চিঠি’। আমার নিজের কাছে মনে হয়েছে এটি একটি ব্যক্তিগত ‘আহাজারি-নামা’ কিংবা একজন ক্ষমতা-কাতর মানুষের ‘বিলাপ-পত্র’ যা ক্ষমতায় যাওয়ার নানান তরিকার প্রায়োগিক কৌশিল হিসাবে বিশ্ব-মরুব্বীদের কাছে ধর্ণা দেয়ার রাজনৈতিক সাংস্কতির অংশ হিসাবে একটি ‘ফরিয়াদ-নামা’ পাঠানো হয়েছে, প্রধানত বিশ্বমোড়ল অবামা হুজুরের সহি পানি পড়া পাওয়ার অশেষ বাসনায়। এ-চিঠি কেন্দ্রীক আলোচনায় সমালোচনার তীর প্রধানত বেগম খালেদা জিয়ার দিকে ছোঁড়া হলেও, এখানে মনে রাখতে হবে যে, ঘরের ঘটনা কথা ‘আলগা’ লোকের কাছে নালিশ করবার মধ্যে নিজেরই মান-ইজ্জ্বত পাতলা হওয়ার বিষয়টি জড়িত-- এ সাধারণ সত্যটি রাজনীতিবিদরা বোঝেন না, তা কিন্তু নয়। বিষয়টি আসলে অন্য জায়গা অর্থাৎ যাকে এদেশের সাধারণ মানুষ ‘আলগা’ লোক মনে করেন, তাকেই আমাদের নেতা-নেত্রীরা ‘আপন’ মনে করছেন। এটাই, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ক্ষমতার পালাবদলের রাজনীতির ব্যকরণ। তবে, চিঠি লেখার ঘটনাটি কেবল বেগম খালেদা জিয়ার একার ‘পাপ’ নয় যে এটা নিয়ে বিস্তর চেচামেচি করে সে ‘পাপ’ সবাই মিলে সাফ করতে হবে। এটা বরঞ্চ এদেশের রাজনীতিবিদদের বিদেশ-তোষন নীতি, আমেরিকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মোড়লত্বের কাছে নিজেকে সমর্পন করবার নীতি ও রাজনীতিবিদদের রজানৈতিক-দেউলিয়াপনাকে সবার সামনে সুচারুভাবে অবমুক্ত করে; যা বিকার-বিহীন ভাবে লোক-দেখানো দেশপ্রেমের ফাঁকা বুলির নিছে সর্বদা ঢাকা পড়ে থাকে। বেগম খালেদা জিয়া নিজে এ লেখার মাধ্যমে সে অসুন্দর সত্যটিকেই অবমুক্ত করেছেন। সে বিবেচনায় বেগম খালেদা জিয়ার একটি ধন্যবাদ পাওয়া উচিত!

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম: প্রতিমন্ত্রীর (কা-)জ্ঞান!

(দৈনিক মানবকন্ঠ, ৩০/০১/২০১৩)

ক্ষমতা ও আত্মপরিচয়ের সম্পর্ক বিপ্রতীপ। বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষমতা মানুষকে তার নিজের পরিচয় ভুলিয়ে দেয়। ক্ষমতার গরমে মানুষের কোন হিতাহীত জ্ঞান থাকে না। রাজনৈতিক ক্ষমতা তাই পদ ও পদবীতে নয়, চিন্তা ও চেতনায় সংক্রমিত হয়। ফলে, মানুষ নিজের আত্মপরিচয় ভুলে যায়। এর একটি নগদ নজির পাওয়া যায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বাবু দীপংকর তালুকদারের বক্তব্যে। গত ২৩ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সহযোগিতায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কতৃক আয়োজিত “জাতিগত সংখ্যা-লঘু সংক্রান্ত আইএলও-র সদন” শিরোনামে আয়োজিত এক সেমিনারে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, পার্বত্য ভুমি কমিশনের কার্যকারিতা, পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি আদিবাসী নির্যাতন নিয়ে তিনি যে-সব মন্তব্য করেছেন, আমি রীতিমত চিনতে পারছিলাম না বাবু দীপংকর তালুকদার কি আদৌ পাহাড়ি আদিবাসী কেউ? তিনি কি নিজের আত্মপরিচয় ভুলে গেছেন? নাকি তিনি তার পাহাড়ি আদিবাসী হিসাবে নিজের আত্মপরিচয় পাল্টে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাধর মন্ত্রীতে পরিণত হয়েছেন? তখনই, ক্ষমতা ও আত্মপরিচয়ের বিপ্রতীপ সম্পর্কের হাইপোথেসিস সত্য প্রমাণিত হয়। পার্বত্য-চুক্তি বাস্তবায়নের এটিও একটি অন্যতম কারণ যে, শিক্ষিত কিন্তু দলীয় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী পাহাড়ি আদিবাসীরা নিজেদের আত্মপরিচয় ভুলে, পাহাড়ি আদিবাসীদের নিত্যদিনের বঞ্চনা ও গঞ্জনার প্রতি বিমুখ হয়ে, দলীয় রাজনীতির দাসে পরিণত হন। ক্ষমতার দেমাগে নিজের আত্মপরিচয় ভুলে যান। নিজের জাতিসত্তার আবেগ ও অনুভূতি এবং অপ্রাপ্তি ও নিত্য-নির্যাতনের কথা না-বলে, রাষ্ট্রের ভাষায় কথা বলেন; যে রাষ্ট্র দশকের পর দশক ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি দমন-পীড়ন ও জবরদস্তি-মূলক শাসন জারি রেখেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ‘শন্তিচুক্তি’ নামে পরিচিত ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ‘পার্বত্য-চুক্তি’ বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় আসা বিভিন্ন সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে ইঁদুর-বিড়াল খেলা খেলেছে প্রায় পনের বছর। কিন্তু এ-খেলার কোন গ্রহণযোগ্য ও ইতিবাচক ফলাফল নাই। বহু আহাজারি, বহু বিলাপ এবং বহু ধরণের প্রলাপ হয়েছে, কাজের কাজ খুব একটা কিছু হয়নি। ১৯৯৭ সালের আগে এবং পরে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ পাহাড়ি আদিবাসীদের জীবনের তেমন কোন গুণগত পরিবর্তন হয়নি। রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়টি এখনও সুদূর পরাহত। আত্মমর্যাদা নিয়ে মানুষ হিসাবে বেঁেচ থাকার নূন্যতম আকাক্সক্ষাটাও টালমাটাল। পার্বত্যচুক্তি স্বাক্ষরের পরও খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, লুন্ঠন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কম হয়নি। তথাপি পাহাড়ের আদিবাসী মানুষ এখনও আশা করছে যদি শান্তিচুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়, তাহলে কিছুটা হলেও মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারবে। পার্বত্যভূমি কমিশন নিয়ে অনেক র্সাকাস হয়েছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এ-সেমিনারেই মত প্রকাশ করা হয় যে, ‘ভূমি কমিশন গত তিনবছরে একবিন্দুও আগাতে পারেনি’ অথচ, প্রতিমন্ত্রী বললেন, ‘পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংস্কার নিয়ে ভূমি ও আইন মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। তবে, আইনের কিছু ধারা সংশোধন না-করেও সমঝোতার ভিত্তিতে আইনটিকের কার্যকর করা সম্ভব। কিন্তু এ-বিষয়ে কোন পক্ষই ছাড় দিচ্ছেন না’। কোন পক্ষ ছাড় দেবে? পাহাড়ি আদিবাসীরা ছাড় দেবে? কেন? আমার জায়গা থেকে আমাকে তুলে দেবেন, আর সমঝোতার ভিত্তিতে আইন করে অন্যকে সে জায়গায় থাকার বন্দোবস্ত করে দেবেন, আর আমি ছাড় দেবো? বাবু দীপংকর তালুকদার কার স্বার্থে কাজ করেন? কার জন্য কাজ করেন? তিনি কী একজন আদৌ পাহাড়ি আদিবাসী? আমি তখন তাঁর পরিচয় ভুল করে বসি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ঐ একই সভাতেই যখন বলেন ‘শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে যত কথা বলা হয়, বাস্তবে কাজ ততটা হয়নি’। আর প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার অনেক কিছু করেছে’। এ প্রতিমন্ত্রী কী সত্যিই পাহাড়ি আদিবাসী কোন জাতিসত্তার মানুষ? আমার আবার ভ্রম হয়। আমি রীতিমত কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে যাই, যখন দেখি পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী নারী-ধর্ষণ ও নারী-নির্যাতনের ঘটনা আশংকাজনক হারে বেড়ে গেলেও-- যা বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে-- তিনি ক্রমবর্ধমান আদিবাসী নারী-ধর্ষণের ঘটনাকে জায়েজ করার জন্য এর পক্ষে বক্তব্য দেন। তিনি বললেন, ‘সারা বিশ্বে পারভারশন (যৌন বিকৃতি) বেড়ে গেছে। তাই, ধর্ষণের সংখ্যা বেড়েছে। আলাদা করে পাহাড়ি মেয়েদের ওপর নির্যাতন বাড়েনি’ (প্রথম আলো, ২৪/০১/২০১৩)। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিমন্ত্রী হিসাবে এবং পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর একজন হয়েও পাহাড়ে সংঘটিত ক্রমবর্ধমান নারী-ধর্ষণের স্বপক্ষে কীভাবে তিনি সাফাই গাইলেন? আসলে বাবু দীপংকর তালুকদার নিশ্চয় ভুলে গেছেন, তিনিও একজন পাহাড়ি আদিবাসী। ক্ষমতার তেজ জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়েছে বাবু দীপংকর তালুকদারের আত্মপরিচয়। রাজনৈতিক ক্ষমতা এমন সর্বনাশা খাদক যা কেবল মানুষের মানবিক গুণাবলী, আবেগ ও বিবেককেই সুস্বাদু খাদ্য বানায়-না, মানুষের নিজের আত্মপরিচয়কেও গোগ্রাসে গিলে খায়। বাবু দীপংকর তালুকদার, আয়নার একবার নিজের চেহারাটা দেখে নেবেন; তারপর নিজেকে জিজ্ঞেস করবেন, আপনি কি সত্যিই পাহাড়ি আদিবাসী নাকি সেটেলার বাঙালি?

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

‘ছোটলোকে’র লাশ বনাম ‘বড়লোকে’র রাষ্ট্র!

(দৈনিক যুগান্তর, ২৯/০১/২০১৩)

সন্দেহাতীতভাবেই, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে যে কটি শিল্পের অভাবনীয় বিকাশ ঘটেছে, তন্মধ্যে তৈরী পোষাক শিল্প অন্যতম। কিন্তু এদেশের তৈরী পোষাক শিল্পের বিকাশ ও বিস্তার লাশের মিছিলে নতুন লাশের নিত্য-নতুন সংযুক্তির সমান্তরালে বেড়ে উঠেছে। গার্মেন্ট্সের ভেতরে আগুণে পোড়া লাশ, বিদ্যুতের শর্ট সার্কিটে আটকে যাওয়া লাশ, দেয়ালের নিচে চাপা পড়া লাশ, হুড়োহুড়ির মধ্যে পায়ে দলিত হওয়া লাশ, জীবন-বাচাঁনোর চেষ্টায় চ্যাপ্টা হওয়া লাশ, বন্ধ শেকলের ভেতরে দম-বন্ধ হওয়া লাশ, কিংবা পেটের দায়ে রাস্তায় নেমে পুলিশের গুলি খাওয়া লাশ। এভাবেই লাশের মিছিলে যুক্ত হচ্ছে নতুন লাশ, আর তৈরী পোষাক শিল্পের তর তর করে বিকাশ ঘটছে! মালিক শ্রেণীর বিকাশ ঘটছে। একটির জায়গায় দুটি কারখানা হচ্ছে। ফলে, লাশের মিছিলে দু’টি লাশের জায়গায় সামিল হচ্ছে চারটি লাশ। গত ২৬ জানুয়ারী তৈরী পোষাক শিল্পের এ লাশের মিছিলে সামিল হয়েছে আরো সাতটি লাশ। মুত্যু-যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে লাশের নিথর দেহ যখন শান্ত, তখন সহকর্মী ও আত্মীয়ের আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠে মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকা। ‘স্মার্ট’ করাখানার সাত নারী শ্রমিকের লাশ বিলাপ করছিল সিকদার মেডিকেলের বারান্দায়। মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের আত্মনাদ কিংবা সিকদার মেডিকেলের বারান্দার বিলাপ, আমাদের তৈরী পোষাক শিল্পের বিকাশের জয়গান করে! কত শত শ্রমিকের লাশের ওপর দিয়ে ফুলে ফেঁপে উঠেছে এ তৈরী পোষাক শিল্প, ‘স্মার্ট’ গার্মেন্টের এ-ঘটনা আমাদের আরো একবার সেটা চোখে আগুল দিয়ে মনে করিয়ে দেয়। এদেশের কত কোটিপতির কত অট্টলিকা কত শ্রমিকের লাশের-কংক্রিটে বানানো তার কোন হিসাব নাই। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ তৈরী পোষাক শিল্প রপ্তানি-কারক দেশ হিসাবে যখন বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হয়, এবং দ্বিতীয় হওয়ার কৃতিত্বে এদেশের নেতা-নেতৃরা যখন গৌরবের ঁেঢকুর তোলেন, কিংবা বিজিএমইএ-এর কর্তাব্যক্তিরা যখন সোনারগাঁর বলরুমে বসে ‘কুল’ কিংবা ‘হট’ ওয়াটার পান করে সেটা উৎযাপন করেন, তখন এ-পোষাক শিল্পের শ্রমিকদের লাশের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। রাষ্ট্র তখন ‘ক্ষতি পুরণের’ সেই পুরোনো কীর্তন গায়। একের পর এক গার্মেন্ট্সে আগুণ লাগছে, একের এক মানুষ পুড়ে কয়লা হচ্ছে, লাশের পাশে শুয়ে পড়ছে নতুন লাশ আর ‘ক্ষতিপুরণ’ দিয়ে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব সারছে। এদিকে আমরা, এদেশের জনগণ, ‘সরকার কিংবা রাষ্ট্র তো ক্ষতি পুরণ দিচ্ছে’- এ ‘বুঝ’ নিয়ে নির্বিরোধ শান্ত থাকি। নিজের আখের-গোছানোর কাজে ব্যস্ত থাকি! ফলে, ‘লাশেরও আবার ক্ষতিপূরণ হয়’, এ রাষ্ট্রীয় ‘ডিসকোর্স’ তখন সামাজিক ন্যায্যতা পায়। আর ‘ক্ষতি-পুরণের’ এ রাষ্ট্রীয় ডিসকোর্স ন্যায্যতা পায় বলেই, তাজরিন ফ্যাশনের পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া ১১২ শ্রমিকের লাশের গন্ধ বাতাস থেকে সরে যাওয়ার আগেই ‘স্মার্ট’ গার্মেন্ট্সের সাত শ্রমিকের লাশ নতুন করে সামিল হল। ‘স্মার্ট’ গার্মেন্ট্সের আগে তাজরিন ফ্যাশন, তারও আগে হামীম গার্মেন্ট্স, তার আগে ‘গরিব এ- গরিব’ গার্মেন্ট্স, তার আগে কেটিএস... কিংবা তারও আগে...। একটি সূত্র অনুযায়ী এ পর্যন্ত গামেন্ট্স শিল্পে লাশের মিছিলে যুক্ত হয়েছে প্রায় ১৫০০ লাশ। আর, লাশের মিছিলে অব্যাহত সংযুক্তির ধারাবাহিকতায় যুক্ত হবে হয়তো নতুন কোন গার্মেন্ট্সের নতুন কোন লাশ। এভাবেই চলছে আর এভাবেই চলবে; কেননা আমরা সেভাবেই চলতে দিচ্ছি!

পোষাক কারখানায় আগুণ লাগার ঘটনায় পোঁড়ে কিংবা বাঁচতে গিয়ে মরে যাওয়ার ঘটনা রাষ্ট্র কীভাবে সামাল দেয়, তার একটি কাঠামোগত-কৌশল দাঁড়িয়ে গেছে। আগুণ লাগার পরে যখন একটার পর একটা লাশ বিল্ডিংয়ের ভেতর থেকে বেরুতে থাকে, তখন সরকারের একজন বা একাধিক মন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রী সৈন্য-সামন্ত নিয়ে এলাকা পরিদর্শন করবেন, যারা আহত তাদের দ্রুত চিকিৎকার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেবেন, আর যারা মরে লাশ হয়ে গেছে তাদের ক্ষতি পূরণ দেয়ার আশ্বাস কিংবা প্রতিশ্রুতি দেবেন, ঘটনা সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাস দেবেন, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে বলে একটা রাজনৈতিক বক্তৃতা দেবেন, পরবর্তীতে একটা তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং সে তদন্ত কমিটি কী রিপোর্ট দেয় (আদৌ কোন রিপোর্ট দেয় কিনা!!) এবং তার ভিত্তিতে কী কী কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হলো সেটা আর জানা যায় না। এভাবে একটা লাশের গতি করতে করতে নতুন লাশের সারি তৈরী হয় কিন্তু রাষ্ট্র সেই পুরোনো কীর্তন নতুন করে গায়। এ হচ্ছে, পোষাক শিল্প, লাশের মিছিল ও রাষ্ট্রের কীর্তনের আন্ত-সম্পর্ক ও (অ)কার্যকর যোগাযোগ। এখানেও তার অন্যথা হয়নি। আগুণ লাগার পরে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী পুলিশের আইজিসহ ঘটনাস্থলে হাজির হলেন, ‘তিনি আহত এবং নিহতের স্বজনদের সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, অগ্নিকা-ের ঘটনা তদন্ত করে দেখা হবে। মালিকের গাফিলতি থাকলে সরকার ব্যবস্থা নেবে’ (ইত্তেফাক ২৭/০১/২০১৩)। ইতোমধ্যে ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে নিহতদের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে লাশ-প্রতি ২০ হাজার টাকা করে ক্ষতি পূরণ দেবার ঘোষণা করা হয়েছে। বিজিএমইএ-ও সাধারণত একটা ক্ষতি পুরণ দেয় নিজিদের চামড়া বাঁচানোর জন্য কিন্তু এ-ক্ষেত্রে সেটাও ঘটেনি। কেননা, বিজিএমইএ-এর ক্রাইসিস ম্যানেজম্যান্টের প্রধান জানান ‘কারখানাটি এখনও বিজিএমইএ-র সদস্য নয়।’ অতএব, বিজিএমইএ-র কোন দায়-দায়িত্ব নাই। এটাই হচ্ছে, তৈরী পোষাক করাখানায় আগুণে পোড়া কিংবা আগুণ লাগায় সংঘটিত মৃত্যু-পরবর্তী হয়ে থাকা রুটিন-ওয়ার্ক। আর এটাই হচ্ছে, তৈরী পোষাক কারখানার লাশ-ব্যবস্থাপনার রাষ্ট্রীয় ডিসকোর্স। এ ক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রীর পিএসকে আরো করিতকর্মা দেখা গেলো। তিনি, ময়নাতদন্ত ছাড়াই ‘হার্ট-এ্যাটাকে মৃত্যু’র সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা করে দেয়ার আশ্বাসে লাশ দ্রুত দাফন করানোর পরামর্শ (!) দিয়ে দ্রুত ‘আপদ’ বিদায়ের ব্যবস্থা করে দিচ্ছিলেন। মৃত্যুর পরেও ‘ছোট লোক’দের সাথে ‘ছোট লোকের’ মতো আচরণ। কিন্তু আমরা এটা বেমালুম ভুলে যাই যে, এ ‘ছোট লোকদের’ লাশের স্তুপের ওপর দিয়েই ‘বড়লোক’দের বড়লোকিয়ানা তৈরী হয়। এ ‘ছোট লোক’দের লাশের মিছিলে নতুন লাশের অব্যাহত সামিল হওয়ার ভেতর দিয়েই তৈরী পোষাক রপ্তানি কারক দেশ হিসাবে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারের ক্রমবর্ধমান উন্নতি এ লাশের স্তুপের ওপর দিয়েই তৈরী হয়।

অথচ, একের পর এক গার্মেন্টসে আগুণ লাগছে, একের পর এক শ্রমিকের মৃত্যু হচ্ছে, একের পর এক লাশের স্তুপ তৈরী হচ্ছে, কারও কোন বিকার নাই। প্রিন্ট ও ইটেক্ট্রনিক্স মিড়িয়া ঘটনার দিন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ঘটনা ফলাও করে প্রকাশ করে, পরের দিন ফলোআপ আইটেম হিসাবে থাকে, তৃতীয় দিন কোন কোন মিড়িয়ার শেষ ফলোআপ দেয় কিন্তু এর পরের দিন মিড়িয়া থেকে সেটা হারিয়ে যায়। কিছুদিন পর আবার আরেক কারখানায় আগুণ লাগে; সাথে লাশের সারি তৈরী হয় আর মিড়িয়া আবার ক্যামেরা হাতে দৌঁড়াদৌড়ি শুরু করে এবং একই ষ্টাইলে ঘটনা কাভার করে এবং যথারীতি ‘কাভারেজ’ থেকে হারিয়ে যায়। কিছু বাম-সংগঠন কয়েকদিন প্রতিবাদ সমাবেশ করে কিংবা নিহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে ছোট-খাটে মিছিল-মিটিং করে। তারপর, সব ঠা-া হয়ে যায়। এদিকে নিহতের পরিবার নিহতের শোকে সরাজীবন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আর জীবনের ঘানি টানতে পরিবারের নতুন কোন সদস্যকে আবার মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। সে হয়তো অন্য কোনদিন লাশ হয়ে ফিরবে! এভাবেই লাশের মিছিলে যুক্ত হবে নতুন লাশ, আর রাষ্ট্রর প্রবৃদ্ধি পাবে। লাশের মিছিলে যুক্ত হবে নতুন লাশ, আর তৈরী পোষাক রপ্তানি-কারক দেশ হিসাব বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় থেকে প্রথমের দিকে ধাবিত হবে। লাশের পরে যুক্ত হবে নতুন লাশ, আর এদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বার অবারিত ও উন্মুক্ত হবে। লাশের পর যুক্ত হবে নতুন লাশ, আর মালিক ও ধনীক শ্রেণী আরো ধনী হয়ে উঠবে। এভাবে ‘ছোট লোকদের’ জীবন আর কত ‘লাশে’ পরিণত হলে, বাংলাদেশ একটি সত্যিকার ‘বড়লোকদের’ রাষ্ট্র হয়ে উঠবে?

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

‘মরিচের গুড়া’ ও ‘তরল গ্যাসের’ একটা হিসাব-নিকাশ জরুরি!

(দৈনিক যুগান্তর, ২২/০১/২০১৩)

বলা হয়, ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদ-’ আর শিক্ষক ‘মানুষ গড়ার কারিগর’। জাতির মেরুদ- কোথায় লুকিয়ে আছে তা অদ্যাবধি অনাবিস্কৃত থাকার কারণেই হোক কিংবা অধিকাংশ মানুষের মেরুদ-হীন থাকবার নিত্য-অনুশীলন থেকেই হোক, ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদ-’- এ প্রবাদ এখনও বাজারে জারি আছে। আর ‘কারিগর’ সমাজের নি¤œবিত্ত-শ্রেণির একধরণের পেশাজীবী-চরিত্র ধারণ করলেও ‘শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর’ এখনও সমাজে কিছুটা সম্মানের সাথে উচ্চারিত হয়। শিক্ষক সমাজ এ ‘প্রবাদ’ নিজের প্রয়োজনেই দাবি করে আর অ-শিক্ষক (যারা শিক্ষক নয়) সমাজ জীবনের কোন-না-কোন সময় এ শিক্ষক-সমাজের কাছেই অল্প-বিস্তর পাঠ নিয়েছিল বলে এ-প্রবাদ বাক্য পুরোপুরি ‘মনে’ না-নিলেও এখনও কিছুটা ‘মানে’। তবে, গত বেশ কিছুদিন ধরে, দেশের আট হাজার স্কুলকে এমপিও ভুক্ত করার দাবিতে নন-এমপিও ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী ফোরামের ব্যানারে শিক্ষকরা যে আন্দোলন করেছেন এবং রাষ্ট্রযন্ত্র তাঁদের সাথে যে আচরণ করেছে তাতে একদিকে ‘জাতির মেরুদ-’ বলে যে শিক্ষাকে তকমা দেয়া হয়, সেটাকে একদিকে যেমন মিথ্যা প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে (অর্থাৎ জাতির মেরুদ- এখন অন্য কিছু; অর্থ, প্রতিপত্তি, অস্ত্রবাজি, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ইত্যাদি), অন্যদিকে শিক্ষক-সমাজ যে একটা ‘কারিগর’ শ্রেণি (অর্থাৎ ‘নি¤œবিত্তের পেশাজীবী শ্রেণি!) সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। নানান তামাসার পরে, অবশেষে গত ১৯ তারিখ শিক্ষামন্ত্রীর সাথে ‘ফলপ্রসু’ আলোচনা সাপেক্ষে আন্দোলনরত-শিক্ষকরা আগামী তিন মাসের জন্য আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করেছেন। কিন্তু এ আলোচনার আগে গত বারদিন ধরে শিক্ষকদের আন্দোলনকে দমন করবার জন্য পুলিশ যে আচরণ করেছে, সে বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। আর এদিকে ‘নিরীহ’ শিক্ষকরা শিক্ষামন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন এ-স্বান্তনা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। কত অল্পতেই সবকিছু সব হিসাব-নিকাশ চুকে যায়! কেননা, এরা হচ্ছেন ‘নিরীহ’ শিক্ষক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষামন্ত্রী এ বৈঠকটা আগে করলেন না কেনো? নাছোড় বান্দা এ শিক্ষকদের দৃঢ়তার কারণে? নাকি দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বলে? যে কোন ন্যায্যাতার সমাধান করতে, সবসময় দেয়ালে পিঠ টেকতে হবে কেন? কেন আমরা দেয়ালে পিঠ ঠেকার আগে একটু নড়চড়া করি না?

শিক্ষামন্ত্রীর সাথে শিক্ষকদের আলোচনা আগে, এ-আন্দোলনের সাথে বার দিন সরকার ও রাষ্ট্র যেভাবে আচরণ করছে এবং আমরা যারা শহুরে সুবিধাবাদি ও চতুর নাগরিক-মধ্যবিত্ত শিক্ষকদের নির্যাতিত হওয়ার সে-করুণ দৃশ্য দেখে নির্বিরোধ-মজা পেয়েছি, তাতে ‘শিক্ষা যে একটি জাতির মেরুদ-’ সেটা যেমন ‘মিথে’ (পুরাণ কাহিনী) পরিণত হয়েছে কিংবা ‘শিক্ষক যে মানুষ গড়ার কারিগর’, এ কারিগর-শ্রেণীও তেমনি একটি মেট্রোাপলিন ‘তামাসা’য় পরিণত হয়েছেন। শহীদ মিনার, প্রেসক্লাব, সোহরাওয়ার্দির মাঠ কিংবা মানবাধিকার কমিশনের উঠোন সব জায়গায় তাঁরা অপাঁঙতেয়। এদেশের রাজা বাদশা’দের কারাবরণের প্রতিবাদে কিংবা রাজকুমারদের দুনীর্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিবাদে দেশ ব্যাপি সারাদিন সহিংস হরতাল হয় অর্থাৎ গোটা দেশ দখল করে রাখা যায়, আর নিজেদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য যখন এদেশের নন-এমপিও-ভুক্ত শিক্ষক-সমাজ একটি শান্তিপূর্ণ ও অহিংস কর্মসূচি পালন করবার জন্য শহীদ মিনারকে বেঁচে নেয়, তখন তাদের উপর মরিচের গুড়া ছিটিয়ে দেয়া হয়। অনন্যোপায় হয়ে যখন তাঁরা, সোহরাওয়ার্দির মাঠে জমায়েত হন তখন, তাঁদেরকে তরল গ্যাস মারা হয়। তাঁদের মাইক কেড়ে নেয়া হয়। লাটি পেটা করা হয়। তখন ‘মেরুদ-’ আর মেরুদ- থাকেনা, সেটা মেরুদ-ের ‘পূরাণে’ পরিণত হন। তখন জাতির গঠনের কারিগর আর কারিগর থাকেন না, জাতির তামাসা’য় পরিণত হন। কেন? কেন এ অত্যাচার-নীপিড়ন? তাঁদের পেছনে কোন রথি, মহারথি হাই-প্রোফাইল নেতা নাই, এজন্য? নাকি তাঁদের নেতৃবৃন্দ আওয়ামীলীগ কিংবা বিএনপির তথা শাসক শ্রেণির কোন হুমড়া-চোমড়া নেতা গোছের কেউ নন, এজন্য? বিশ্বব্যাপি প্রতিবাদ জানানোর বিষয়টিকে ‘অধিকার’ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। রাইট টু প্রোটেষ্ট। ‘তাহিরী স্কোয়ার’, ‘অকুপায়-ওয়াল স্ট্রিট’ কিংবা দিল্লীর ‘জন্তর-মন্তর’ প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ইতিহাসে নতুন মেটাফোর সংযুক্ত করেছে। অথচ, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যারা বেতন-বিহীন ভাবে বছরের পর বছর এদেশের কৃষক, শ্রমিক, মজদুর জনতার ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করে তোলার কাজে নিজেদের সময়, শ্রম, মেধা ও জীবন বিলিয়ে দিচ্ছেন, তাদেরকে এমপিওভুক্ত করবার ন্যায্য দাবি নিয়ে যখন রাজধানীতে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেন, তখন তাদের ভাগ্যে জোটে মরিচের গুড়া, তরল গ্যাস কিংবা কাঁদানে গ্যাস। এ কাঁদানে গ্যাসের জ্বালায় যখন জাতি গড়ার এ-কারিগররা কাঁদেন, তখন রাষ্ট্রযন্ত্র হাসেন। শিক্ষকের অশ্রু দিয়ে যখন রাজপথ ভিঁজে যাচ্ছে তখন আমাদের বিবেক এতটুকু কাঁপে না! শিক্ষায় সরকারের সফলতার জয়গান তখন সোহরাওয়ার্দির মাঠে করুণ আর্তনাদ করে। একটা বৈঠক করে একটু ‘আশ্বাস’ দেয়া, তাতেই এই শিক্ষকরা এ-নির্দয় রাজধানী ছেড়ে নিজ নিজ অঞ্চলে চলে যায়, যেখানে ‘মাষ্টার মসাই’-কে এখনও দ্বিতীয় জন্মদাতার সম্মান দেয়া হয়। কিন্তু ‘মরিচের গুড়া‘ ও ‘তরল গ্যাসের’ তো একটা হিসাব নিকাশ দরকার। কার নির্দেশে এবং কেন, শিক্ষকদের সাথে এমন আচরণ করা হল?

আন্দোলনরত শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আট হাজার স্কুলের প্রায় লক্ষাধিক শিক্ষককে এমপিও-ভুক্ত করা সরকারের জন্য কঠিন কোন কাজ না। সরকার অতিসম্প্রতি একটা বিরাট সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করার প্রক্রিয়ায় এমপিওভুক্ত করেছে। সে প্রক্রিয়ায় অন্যান্যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও এমপিও ভুক্ত করা যায়। এবং এ নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরও তাই দাবি যে, অন্তত এতটুকু আশ্বাস দেয়া হোক যে, পর্যায়ক্রমে তাদেরকেও এমপিওভুক্ত করা হবে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আট হাজার স্কুলের প্রায় একলক্ষ শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করলে সরকারকে বছরে খরচ করতে হবে বাড়তি আটশ কোটি টাকা। যে দেশে একলক্ষ সত্তর হাজার কোটি টাকার বাজেট হয়, সেখানে শিক্ষার পেছনে বাড়তি আটশ কোটি টাকা ব্যয় করা যাবে না, এটা কোন যুক্তির কথা নয়। যে দেশ এক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনতে পারে কিন্তু শিক্ষার পেছনে বছরে আটশ কোটি টাকা খরচ করতে পারেনা, এটা মিথ্যাচার। যে দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা হরদম লুপাট হয়, সেখানে আটশ কোটি টাকা শিক্ষার পেছনে খরচ করা যাবে না, এটা অগ্রহণযোগ্য। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় পনের লক্ষ শিক্ষার্থী পড়াশুনা করে। তাদের শিক্ষার দায় ও দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে, যে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হবে সেটা তো জনগণেরই টাকা। সুতরাং সরকারের টাকা নাই, এ অজুহাতে আন্দোলনরত শিক্ষকদের দাবি পূরণ তো দূরের কথা, উল্টো শিক্ষকদের যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, তা অত্যন্ত বেদনা-দায়ক। দাবি প্রকাশের অধিকার কিংবা ন্যায্যা দাবি আদায়ের জন্য প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের অধিকার থেকে শিক্ষকদের বঞ্চিত করবার কোন নৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার সরকার ও রাষ্ট্রের নাই। শিক্ষা মন্ত্রীর আশ্বাসে শিক্ষকরা আন্দোলন স্থগিত করেছেন কিন্তু এর আগে বারদিন তাঁদের সাথে যে আচরণ করা হয়েছে, তার একটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। কার নির্দেশে, কারা এবং কেন শিক্ষকদের সাথে এমন আচরণ করেছে, তার একটা সত্যিকার তদন্ত হওয়া দরকার। সে দাবিটা কোন পক্ষ থেকেই উঠেনি। অথচ উঠা উচিত। কেননা এখানে শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান প্রদানের বিষয়টি যেমন জরুরি, পাশাপাশি প্রতিবাদ ও ন্যায্য-দাবি আদায়ের আন্দোলনের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এর একটি সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত এই জন্য যে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ যেন কারো ‘রাইট টু প্রটেষ্ট’-কে ‘মরিচের গুড়া’, ‘তরল গ্যাস’ কিংবা ‘জল-কামান’ দিয়ে অপমান না-করে।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

গণতন্ত্রের চর্চা: দলের বাইরে ও ভেতরে

(দৈনিক মানবকন্ঠ, ১৭/০১/২০১৩)

বিগত ২৯ তারিখ বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের ১৯তম ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামীলীগের সম্মেলন এবং সম্মেলনের মাধ্যমে নির্বাচিত নেতৃত্ব বিশেষ মনোযোগ ও আগ্রহের দাবি রাখে, কেননা বাংলাদেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি এবং গণতান্ত্রিক-রাজনীতিতে আওয়ামীলীগের মতো রাজনৈতিক দলের এবং দলের নেতৃত্বের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ সম্মেলনে আওয়ামীলীগের বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পূনরায় আগামী তিনবছরের জন্য সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। এবং পূর্ণাঙ্গ কমিটি এরই মধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। সকলকে অভিনন্দন। অভিনন্দন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগকেও কেননা মেয়াদান্তে (আওয়ামীলীগের ১৮তম ত্রিবার্ষিক সম্মেলক হয়েছিল ১৯ জুলাই ২০০৯ সালে) নিয়মিতভাবে কাউন্সিলের আয়োজন করা এবং এ-কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব তৈরী করবার সংস্কৃতি প্রকারান্তরে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু যে রাজনৈতিক দল দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করবে, সে রাজনৈতিক দল নিজের মধ্যে কতোটা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা করে সেটা একটা বিরাট জিজ্ঞাসা বটে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাছ-বিচার করলে দেখা যাবে, আওয়ামীলীগের এ-পুরো সম্মেলনটাই একটি নির্দিষ্ট সময়ান্তরে অনুষ্ঠিত কিছু সুনির্দিষ্ট ছকে-বাঁধা এবং সনাতন কিছু রাজনৈতিক এবং দলীয় আচার-অনুষ্ঠান ছাড়া আর কিছুই নয়। বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক।

আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি হয় ৪৭ সদস্যের। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং কোষাধ্যক্ষ তিনজন, একত্রিশ জন বিভিন্ন পদের সম্পাদক (যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক তিনজন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক সাতজনসহ) এবং তেরজন প্রেসিডিমের সদস্য। বিরাট ও আডম্বর আয়োজনের মাধ্যমে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ছয় হাজার কাউন্সিলর, বিশ হাজারের মতো ডেলিগেট্স এবং অন্যান্য অতিথিসহ প্রায় পয়ত্রিশ হাজার মানুষের এ আয়োজন। কিন্তু বিরাট এ আয়োজনের অন্যান্য উদ্দেশ্যের-- যেমন বিগত বছরগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করা, বর্তমান সংগঠনের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা এবং ভবিষ্যতের করণীয় নির্ধারণ করা প্রভৃতি--বাইরে যে মূল উদ্দেশ্য, সেটা হচ্ছে সংগঠনের আগামী নেতৃত্ব নির্বাচন করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, এ বিরাট আয়োজনের মাধ্যমে যে সম্মেলন, সেখানে কোন ধরণের নির্বাচন ছাড়া, কোন ধরণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া এবং কোন ধরণের ভিন্নমত ও ভিন্নসুর ছাড়া বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে পুনরায় যথাক্রমে সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করা হয়। এবং নবনির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সর্বময় ক্ষমতা প্রদান কার হয় কমিটির অন্যান্য পয়তাল্লিশটি সদস্যদেরকে নির্বাচিত করে কমিটি সম্পূর্ণ করার জন্য। এটা যেমন একদিকে দলের মধ্যেই গণতান্ত্রিক অনুশীলনের অভাবকে প্রতিভাত করে তেমনি জবঢ়ৎবংবহঃধঃরড়হ ড়ভ ঃযব চবড়ঢ়ষব'ং ঙৎফবৎ (জচঙ)- বা জনপ্রতিনিধিত্বশীল আইন-এরও সুনির্দিষ্ট লঙ্ঘণ বটে। কেননা আওয়ামীলীগ একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসাবে পিআরও-র ধারা মানতে বাধ্য। এছাড়াও আওয়ামীলীগের সাংগঠিক যে গঠনতন্ত্র (যা নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া হয়েছে), সেখানে কাউন্সিলরা “অন্যান্য পদগুলো সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী নির্বাচন করবে”--এধরের মেনডেট আদৌ দিতে পারেন কিনা সেটা সুনির্দিষ্ট নয়। ফলে, এ ধরণের প্রক্রিয়ায় দলের নেতৃত্ব নির্বাচন একদিকে যেমন পিআরও-র ধারা লঙ্ঘণ, অন্যদিকে দলের সাংগঠনিক গঠনতন্ত্রেরও এক অর্থে বরখেলাপ। যে প্রক্রিয়ায় দলের নতুন নেতৃত্ব গঠন করা হয়েছে, তাতে ছয়হাজার কাউন্সিলরের কোন ভূমিকাই নাই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বিভিন্ন জেলা কমিটি, উপজেলা কমিটি, ইউনিয়ন পর্যায়ের হাজার হাজার কাউন্সিলর এবং ডেলিগেট্সের একটা চমৎকার নগর-ভোজন এবং কেন্দ্রীয়ভাবে আয়োজিত দলের পিকনিক পার্টিতে অংশ নেয়া ছাড়া আর কোন কার্যকর ভূমিকা নাই। বিগত কাউন্সিল গুলোতেও তাই হয়েছিলো এবং ভবিষ্যতেও এর অন্যথা হবে--এরকম আশা করবার কোন সুনির্দিষ্ট কারণ নাই। অন্তত যতদিন শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া ঁেবচে আছেন ততদিন আওয়ামীলীগ এবং বিএনপির কাউন্সিরদের পিকনিক করা ছাড়া আর কোন ভূমিকা থাকবে না। একবারে নৈরাশ্যবাদীরাও এর বাইরে কিছু আশা করেন বলে মনে হয়না।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে গণতন্ত্র কোথায় রক্ষিত হল? সংগঠনের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা হল কই? তখনই প্রশ্ন আসে, যে সংগঠনের ভেতরেই গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিমালাগুলোর কোন চর্চা নাই, সে সংগঠন দেশে কীভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে? যে সংগঠনের নেতৃত্ব একটি সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়না, সে নেতৃত্ব দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় কীভাবে নেতৃত্ব দেবে? প্রশ্ন এখানে নয় যে, শেখ হাসিনা কেন সভাপতি নির্বাচিত হলেন? বরঞ্চ প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হলেন? সে প্রক্রিয়াটা গণতান্ত্রিক হওয়াই বাঞ্চনীয়। এ কথা নিন্দুকেরাও স্বীকার করবেন যে, বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভাপতি হওয়ার জন্য এবং আওয়ামীলীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী, এবং বিরাট সাংগঠিক কাঠামোর সংগঠনকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য শেখ হাসিনার কোন বিকল্প নাই। বিগত সময়ে শেখ হাসিনা তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে তা প্রমাণ করেছেন। কিন্তু সেটা যদি কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হত, তাঁর মান ও মর্যাদা অধিকতর বৃদ্ধি পেত। কিংবা আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যান্য পদগুলোতে যদি সরাসরি ভোটাভুটির মাধ্যমের সাধারণ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ, সহ-সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক ও প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হত, তাহলে দলের তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃবৃন্দের মধ্যে যেমন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সঞ্চারিত হতো, দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের মধ্যেও তেমন করে একটি সাংগঠনিক দায়িত্বশীলতার জন্ম নিত। এ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও নেতৃত-নির্বাচনের ক্ষেত্রে তৃণমূলের নেতৃত্বকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়ার মধ্যদিয়ে প্রকারান্তরে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ধারাকেই প্রণোদিত করা হত। বাংলাদেশের রাজনীতির চরিত্র-নির্ধারক বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের মত বড় রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে অর্থাৎ সংগঠনের অভ্যন্তরে যত বেশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, পরমতসহিঞ্চুতাএবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা করবে, দেশের রাজনীতি এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি তত বেশি পরিশুদ্ধ হবে। আর দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিশুদ্ধ হলেই, দেশের রাজনীতিতে সত্যিকার গণতান্ত্রিক-সংস্কৃতির চর্চা হবে।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

দিল্লীর গণধর্ষণ, ধর্ষণের প্রতিবাদ ও প্রতিবাদের শ্রেণী চরিত্র!

(দৈনিক যুগান্তর, ১৫/০১/২০১৩)

নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন, নারী-শিক্ষার প্রসার, নারীর সম-অধিকার কিংবা নারীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রভৃতি এজেন্ডা নিয়ে বিস্তর আহাজারি বিগত কয়েক দশক ধরে জোরালো হলেও, এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা দিন দিন বেড়েই চলেছে; কী দেশে কী বিদেশে; কম কিংবা বেশি সবখানে। তবে তার রূপ, চরিত্র এবং ধরণ পাল্টাচ্ছে কিন্তু নিষ্ঠুরতা ও বর্বতার মাত্রার পরিবৃদ্ধি ঘটেছে। নারীর প্রতি সহিংসতার একটি অন্যতম ধরণ হচ্ছে ”ধর্ষণ”। ধর্ষণের নানান অনুষর্গ, প্রেক্ষিত কিংবা কনটেক্সট থাকতে পারে। তবে, ধর্ষণ একজন নারীকে সামাজিকভাবে, পারিবারিকভাবে, নৈতিকভাবে এবং মানসিকভাবে নির্যাতনের একটি অন্যতম কৌশল হিসাবে পুরুষতান্ত্রিক এবং পুরুষ-আধিপত্যবাদি সমাজে সুদীর্ঘকাল ধরে জারি আছে। অন্যের প্রতি প্রতিশোধ নেয়ার জন্য, পারিবারিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য, শক্রপক্ষের মনোবল নষ্ট করার জন্য প্রতিপক্ষের নারীকে ধর্ষণ করবার তরিকা দীর্ঘকাল থেকে সমাজে একটি কার্যকর কৌশল হিসাবে চালু আছে। এ প্রবন্ধে, “ধর্ষণ”-কে একটি কৌশল হিসাবে বিবেচনা না-করে, “ধর্ষণ”কে পুরুষতান্ত্রিক এবং পুরুষ-আধিপত্যবাদি সমাজে নারীর অবস্থানকে উপলব্ধি করবার উপাত্ত হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি, সভ্য, আধুনিক, নারীর-ক্ষমতায়ন, নারীর সম-অধিকার প্রভৃতি গালভার বুলি দিয়ে উপস্থাপন করা “উন্নয়নের ডিসকোর্স”কে কীভাবে তুঁড়ি মেয়ে উড়িয়ে দিতে পারে একটি ধর্ষণের ঘটনা সেটাকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে। সে বিশ্লেষণের ফ্রেমওয়ার্কে, দিল্লীর গণধর্ষণের ঘটনাকে একটি উপাত্ত হিসাবে ধরে ধর্ষণের প্রতিবাদের মধ্যেও অসম-ক্ষমতার সম্পর্ক আছে এবং প্রতিবাদেরও একটি শ্রেণী-চরিত্র আছে, এ-নিবন্ধে তার স্বরূপ উন্মোচনের চেষ্টা করা হয়েছে।

দিল্লীর গণধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো ভারতজুড়ে যে প্রতিবাদের জোয়ার এসেছে, তা অভূতপূর্ব হিসাবে উপস্থাপন করা হলেও, নিকট অতীতে এ-ধরণের গণজোয়ারের নজির আছে। রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের বাইরে এবং রাজনৈতিক এজে-া-বহির্ভূত সমাজের অভ্যন্তরীণ চেতনা থেকে উঠে আসা এ-ধরণের গণআন্দোলন ভারতে নিকট অতীতে আরো দু’বার ঘটেছে। ১৯৯৯ সালে ৩০ এপ্রিল যখন ভারতের বিখ্যাত মডেল জেসিকা লালকে দিল্লীতে খুন করা হয় এবং খুনের আসামি হরিয়ানা থেকে নির্বাচিত পার্লামেন্টের প্রভাবশালী কংগ্রেস-সদস্য বাবু বিনোদ শর্মার ছেলে মানু শর্মাকে বাঁচানোর জন্য রাষ্ট্র, সরকার, আইন, আদালত সব যখন একাট্টা হয়ে কাজ করছিল, তখন দিল্লীর মানুষ এবং দিল্লীর সূত্র ধরে গোটা ভারতে বিরাট এক গণজোয়ার উঠেছিল। সে প্রতিবাদের জের দীর্ঘদিন বলবৎ ছিলো এবং শেষমেষ, ২০০৬ সালের ডিসেম্বরের ২০ তারিখ মানু শর্মাকে যাবৎ-জীবন কারাদ- দেয়া হয়। দ্বিতীয়বার এরকম গণজোয়ার উঠেছিলো অতিসম্প্রতি আন্না হাজারের দুর্নীতি বিরোধী অনশনের সময়, যখন সারা ভারতের আনাচে কানাচে তোড়পাড় উঠেছিল, “লাইভ টেলিকাষ্টে”র মাধ্যমে যার নমুনা বিশ্বব্যাপি লোকজন দেখেছে। এবার দিল্লীর একটি চলন্ত বাসে ডিসেম্বরের ২১ তারিখ ২৩ বছর বয়সী এক মেডিক্যালের ছাত্রীকে গণধর্ষণের প্রতিবাদে এবং দোষীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ভারতে আবার গণবিষ্ফোরণ দেখা যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, মহাত্মা গান্ধী প্রতিবাদ-আন্দোলনের যে অহিংস নীতির সূত্রপাত করেছিলেন, সেটা ভারতের রজনীতিতে বেশিদিন কার্যকর থাকেনি। ফলে, জনসমাবেশ ও গণসমাবেশ আর “অহিংস” দর্শনের ভাবধারায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। কেননা, কম-বেশি সবধরণের গণবিষ্ফোরণগুলো মূলতঃ ঘটেছে রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় নেতৃত্বে এবং সুর্নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজে-া বাস্তবায়ন করার জন্য। এবার যে গণজোয়ার এবং গণবিষ্ফোরণ ঘটেছে, তা কোন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে ঘটেনি কিংবা কোন রাজনৈতিক এজে-া বাস্তবায়নের জন্যও ঘটেনি। সমাজের এ-গণজোয়ার এবং বিষ্ফোরণ অভাবনীয় এবং তীব্রভাবে সমাজকে নাড়া দিয়েছে। তার ঢেউ বাংলাদেশেরও এসে লেগেছে। বাংলাদেশেও ধর্ষণের ঘটনা আশংকাজনক হারে বাড়লেও, এটা নগর-কেন্দ্রীক সুবিধাবাদি-মধ্যবিত্তের কাছে অনেকটা “গা-সওয়া” হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু ভারতের এ ধর্ষণ-বিরোধী আন্দোলনের তীব্রতায় আন্দোলিত হয়ে বাংলাদেশেও বেশ কিছু সংগঠন, কিছুটা দেখানো-গোছের হলেও, মাঠে নেমেছে। যেমন, গত ০৩/০১/১৩ তারিখ ঢাকায় অনেকগুলো অধিকার-কাতর সংগঠন যেমন উদ্যমে উত্তরণে শতকোটি, সাংগাত [দক্ষিণ এশিয়ার নারী আন্দোলন কর্মীদের মোর্চা], আইন ও শালিশ কেন্দ্র, এ্যাকশন এইড, ব্র্যাক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, নিজেরা করি, প্রাগ্রসর, উই ক্যান, অক্সফ্যাম, এশিয়াটিক, নারীপক্ষ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও নারী প্রগতি সংঘ সহ বেশ কিছু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন একটি বানববন্ধ করে “ধর্ষকের ক্ষমা নাই”, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ কর”, “সব ধরণের ধর্ষণের দ্রুত ও ন্যায় বিচার চাই” ইত্যাদি ফেষ্টুন প্রদর্শন করে এক ধরণের প্রতিবাদ করে। এধরণের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সক্রিয়তা এবং কার্যকারিতা সমাজের ইতিবাচক রূপান্তরের জন্য জরুরি। এবং একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু সমাজ ভাবনার সাথে নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর অর্থনৈতিক স্বক্ষমতা, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ, এবং নারীকে মানুষের মর্যদায় আসীন করবার কোন বিকল্প নাই। কিন্তু এ-ধরণের প্রতিরোধ আন্দোলনের একটা বড় সংকট হচ্ছে এটা সমাজের সব স্তরের মানুষের প্রতি সমানভাবে নজর দেয় না। ফলে, এ প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ-আন্দোলন একটা শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে বলেই এর একটি শ্রেণীচরিত্র দাঁড়িয়ে যায়। যেমন, ভারতের এ আন্দোলনের কথাই ধরা যাক।

ধর্ষণের বিচার চেয়ে ভারতে যে আন্দোলন চলছে তাকে আমি সাধুবাদ জানাই। তবে, এ আন্দোলন সমাজের সব-স্তরের অত্যাচার-অনাচারের বিষয়কে সমান-গুরুত্বের সাথে প্রাধান্য দেয় না। সমাজের এ-প্রতিরোধ আন্দোলন সমাজের উচ্চবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত, কিংবা মধ্যবিত্তের জন্য যতোটা গড়ে উঠে, সমাজের নি¤œবিত্তের মানুষের জন্য ততোটা হয়না। এখানেই প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আন্দোলনের একটি শ্রেণী চরিত্র পাওয়া যায়। যে কারণে ধর্ষণ-বিরোধী এ-আন্দোলন চলাকালীন সময়েই সমাজের অন্যস্তরে নতুন নতুন ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে কিন্তু এ ধর্ষিতাদের আত্মচিৎকার দিল্লী পর্যন্ত পৌঁছায় না। ফলে, এ আন্দোলনের প্রতিফল কী? রাষ্ট্রযন্ত্রকে সামান্য নাড়া দেয়া এবং মহান (!) ভারতবাসীর প্রতিবাদি চরিত্রকে গ্লোবাল মার্কেটে হাইরেটে “সেল” করা। যা প্রকারান্তরে গোলকায়নের হাত ধরে ভারতের বিশ্বশক্তি হিসাবে গজিয়ে উঠবার যে বাসনা এবং প্রক্রিয়া, তাতে পেট্রোল জোগায়। তাই, শাসক শ্রেণী এ-আন্দোলনে মূলত: বিগলিত কেননা এ-আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ এবং “ধর্ষণ বিরোধী আইন” করবার জন্য যে তাগিদ এবং দৌঁড়ঝাপ, তার নগদফল আখেরে শাসকশ্রেণীর পকেটেই যায়। রাজনীতির এ ব্যাকরণ বোঝাটা জরুরি। এজন্যই ভারতীয় যৌথ বাহিনী যখন কাউন্টার ইন্সারজেন্সির নামে আদিবাসি মাওবাদিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায় তখন এ-সামাজিক আন্দোলন দানা বাঁধে না। গৌহাটির আদিবাসি নারী লক্ষèী ওরাং-কে যখন পুলিশ রাস্তায় প্রকাশ্য দিবালোকে উলঙ্গ করে অত্যাচার করে, তখন মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়না! তখন আন্দোলন দানা বাঁধে না। চ-িশগড়, জংগলমহল, ত্রিপুরা অথবা লালগড়ে যখন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোকতায় বেসুমার নির্যাতন চলে, তখন সামাজিক আন্দোলন হয়না কিংবা প্রান্তের ঘটনা বলে সেটা কেন্দ্রের কানে যায়না। সেখানেই কেন্দ্র বনাম প্রান্তের অসম ক্ষমতার সম্পর্ক আমরা দেখতে পাই। ২০০১ সালে এ্যামন্যাষ্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দলিত সম্প্রদায়ের-- কিংবা নি¤œবর্গের-- নারীদের মধ্যেই ভারতে সর্বাধিক নারীর-শ্লীলতা হানি এবং ধর্ষণের ঘটনা ঘটে এবং ধর্ষণকারীর মধ্যে অধিকাংশই ভূ-স্বামী, গ্রামের উচ্চ-কায়স্থ বংশের লোক এবং পুলিশ। ফলে, এ্যামন্যাষ্টির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র ৫% ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড হয় এবং রেকর্ডকৃত ঘটনার মধ্যে ৩০% মিথ্যা প্রমাণিত হয় আর ৭০% মামলার পরবর্তীতে কোন হদিস থাকেনা। কিন্তু নি¤œবর্গের মানুষের এ-করুণ চিত্র দিল্লী পর্যন্ত পৌঁছায় না কেননা ভারতের ষ্টাবলিষ্টমেন্টবাদি মিড়িয়ার নজর তখন দিল্লীর বাইরে যায় না। যেমন মণিপুরের শর্মিলা চানু যিনি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে গত বার বছর অনশন করেও মিড়িয়ার “সুনজর” কাড়তে পারেনি। অন্যদিকে আন্না হাজারের অনশনের যেহেতু একটা কর্পোরেট মূল্য আছে, সেটার “লাইভ টেলিকাষ্ট” হয়। আন্নাহাজারেকে মিড়িয়ায় ফোকাস দেয়ার পশ্চাতে যে প্রকারান্তরে দুর্নীতির আখড়া ভারতের দুর্নীতি-বিরোধী একটা ইমেজ তৈরী হয় এবং সেটার যে একটা “আইকনিক” মূল্য আছে, এ প্রতিরোধকারী প্রতিবাদি শ্রেণী সেখানে বুঝে, কিংবা না-বুঝে, প্রণোদনা যোগায়। এরকম একটি ক্রিটিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গির ফ্রেমওয়ার্কে দেখলে, দিল্লী এ-প্রতিরোধ আন্দোলনের যে আসল ও দীর্ঘ মেয়াদি কোন সামাজিক-প্রতিফল নাই, সেটা দিবালোকের মতো সাফ হয়। হয়তো ধর্ষণ-বিরোধী একটা শক্ত আইন হবে কিন্তু “আইন” আর তার “প্রয়োগ” এক বিষয় নয়। তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে, “আইনের চোখে সবাই সমান” বলে শাসক শ্রেণী শত বগল-বাজালেও, আইন ও এর-প্রয়োগ-প্রক্রিয়া যে শ্রেণী-নির্বিশেষ শ্রেণী-নিরপেক্ষ নয়, সেটা সমাজের তলার অধিবাসিরা তাদের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতায় হাড়ে হাড়ে টের পায়। আমরাও এ প্রেমিজের বাইরে নই।

বাংলাদেশেও যে ধর্ষণ-বিরোধী মানববন্ধন করা হয়েছে, সেখানে দীর্ঘদিন আগে সংঘঠিত টাঙ্গাইলের একটি ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদ করা হয়েছে অথচ রাঙামাটিতে যে ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ তুমা সিং মারমাকে তিনজন বাঙালি সেটেলার মিলে গণধর্ষণ করে খুন করেছে, তার জন্য কোন তীব্র প্রতিবাদ দেখা যায়নি। এখানেও, প্রতিবাদের সুর ও স্বরে পাহাড়ি বনাম বাঙালি সাংস্কৃতিক-রাজনীতির ছায়া দেখা যায়। এভাবেই, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আন্দোলন একটি শ্রেণীচরিত্র ধারণ করে, যেখানে সমাজের মূলধারার কিংবা উচ্চবর্গের মানুষের জন্য যতোটা আহাজারি থাকে, সমাজের নি¤œবর্গের মানুষের জন্য অতোটা দরদ থাকেনা। ফলে, এটা সমাজের একটা শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হয় বিধায় এর কোন দীর্ঘমেয়াদি সুফল সমাজের সর্বস্তরের মানুষ পায় না। সামাজিক জোয়ার যদি সমাজের সকল-স্তরের মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কোন সামাজিক পরিবর্তন না-ঘটাতে পারে, তবে সেটা একটি “মৌসুমি আবেগ” ছাড়া আর কিছুই নয়। তথাপি দিল্লীর জোয়ারকে সাধুবাদ জানাই এজন্য যে, এ আন্দোলন একটি দলীয়ভাবে অরাজনৈতিক এজে-ায় সমাজের সকল স্তরের মানুষকে একটি “সামাজিক এজে-ায়” একীভূত করে তীব্রভাবে আলোড়িত করেছে। তাছাড়া দিল্লী’র এ-আন্দোলন একটা ফাও ধন্যবাদ এমনিই পায়, কেননা বাংলাদেশের কনটেক্সটে সামাজিক আন্দোলনে যে ভাটা পড়েছে, এ-আন্দোলন সেখানে কিছুটা হলেও জোয়ারের টোকা দিয়েছে! এখন প্রত্যাশা এই যে, দিল্লীর জোয়ারে তোড়ে বাংলাদেশের সামাজিক আন্দোলনের নিরবতা যেন আর অটুট না-থাকে; যেন শীঘ্রই টুটে যায়!

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রশ্নে নিরপেক্ষতা বলে কিছু নাই!

( দৈনিক মানবকন্ঠ, ৩১/১২/২০১২)

বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের এবং মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতা-বিরোধী অপরাধের যে বিচারের প্রক্রিয়া চলছে তা সময়ের পরিক্রমায় ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের সমকালীন ও নিকট-ভবিষ্যতের রাজনীতির অনুঘটক হয়ে উঠছে। আওয়ামীলীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাটাকে উপস্থাপন করছে যতোটা নির্বাচনী-অঙ্গীকারকে পুরণ করার কাজ হিসাবে, ইতিহাসের দায় হিসাবে ততোটা নয়। এবং এ মানবতা-বিরোধী অপরাধের বিচারের সাঁকু বেয়ে আরেকবার ক্ষমতায় বসবার দাবিদার হয়ে উঠবার রাজনীতি ইতোমধ্যেই প্রতিভাত হচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি যথোপযুক্ত রাজনৈতিক এজে-ার অভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টিকে সামনে এনে আওয়ামীলীগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করবার কৌশল হিসাবে মাঠ গরম রাখতে গিয়ে নিজেরাই ক্রমান্বয়ে জামায়াতে ইসলামের সামিয়ানার নিচে চলে যাচ্ছে। আর জামায়াত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে থেকে বিএনপির সরকার বিরোধী আন্দোলনের ফাঁক দিয়ে যুদ্ধাপরাধী ও মুক্তিযুদ্ধে সংঘঠিত মানবতা-বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বদের মুক্তির দাবি নিয়ে মিছিল মিটিং করছে। বাংলাদেশের রাজনীতির আরেক দল, ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চা, জাতীয় পাটি এখন লেফ্ট রাইট আর লেফ্ট রাইট করছে। কোথায় যাবে, কোন দিকে যাকে, কোন দলে যাবে নাকি কোন্দলে যাবে, দিশাহীন ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফাঁকতালে, জনগণের জন্য হঠাৎ গজে উঠা দরদের ডিলারশীপ নিয়ে ড. কামাল হোসেন এবং ডা: বদরুদ্দৌজা চৌধুরী একাট্টা হয়ে আরেকটি রাজনৈতিক জোট করবার চেষ্টা করছেন। নির্বাচনের আগে এরকম মৌসুমি রাজনৈতিক জোট গঠনের নজির বাংলাদেশের নতুন না। অতএব এখানে নতুনত্বের কিছু নাই। বাম ধারার রাজনৈতিক জোট সবসময় ছিলো, এখনও আছে ্এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। যারা কাজের চেয়ে কতা বেশি বলে; প্রয়োগের চেয়ে তত্ত্ব নিয়ে বেশি ব্যস্ত তাকে! সম্প্রতি ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার দাবিতে বাম মোর্চা একদিন হরতালও পালন করেছে। তবে, এই সরকার-সমর্থিত-হরতাল-এর আদৌ কোন প্রয়োজন ছিলো কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে সবচেয়ে সক্রিয়, বলিষ্ঠ এবং জোরালো অবস্থান রয়েছে এ-বাম মোর্চার। সত্যিকার অর্থে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে আওয়ামীলীগের চেয়েও এ-বাম সংগঠনগুলোকে সব সময় অধিকতর সোচ্চার দেখা গেছে।

সর্বসাকুল্যে, বাংলাদেশের রাজনীতিরর মাঠে যেসব দল সক্রিয়ভাবে বিদ্যমান আছে, তন্মধ্যে বিএনপি এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ছাড়া সবাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে, কম কিংবা বেশি, সোচ্চার। অতএব, রাজনীতির ধারা তাহলে নির্ধারিত হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে এবং বিপক্ষে। বিএনপির নেতৃবৃন্দ অনেকটা চামড়া বাঁচানোর জন্য হরহামেশা বলে থাকেন, “বিএনপিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়, তবে তা হতে হবে আন্তর্জাতিক মানদ-ে” কিংবা “বিএনপিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়, তবে বিচারের নামে যে কাউকে হয়রানি করা না-হয়” কিংবা “বিএনপিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়, তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবতি হয়ে কাউকে যেন শাস্তি দেয়া না-হয়”। এই “তবে”র ফাঁকে বিএনপি যে, জামায়াতের পক্ষে সুনির্দিষ্টভাবে রাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছেন, এটা মোটামুটি পরিষ্কার। সম্প্রতি (গত ২৬ ডিসেম্বর) বিএনপি’র প্রধান বেগম খালেদা জিয়া একটি প্রতিবাদ/পথসভায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে মন্তব্য করে যে সরাসরি পক্ষাবলম্বন করেছেন, তা অত্যন্ত হতাশাজনক। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এ কারণে যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সারাদেশের মানুষের মধ্যে যে একটি স্পষ্ট মতৈক্য রয়েছে তিনি সরাসরি তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। আমরা জানি, বিএনপিতেও মুক্তিযোদ্ধা আছেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমা-ার ছিলেন। তাছাড়া বেগম খালেদা জিয়া দুই দুইবার এদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বর্তমানের মহান জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী। তিনি যখন সুনির্দিষ্টভাবে প্রকাশ্যে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অবস্থান করেন, তখন সেটা অত্যন্ত হতাশা-জনক।

শেষান্তে এসে শুরুর বক্তব্যে ফিরে যাই। সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি যুদ্ধাপরাধীদের এবং মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতা-বিরোধী অপরাধের বিচারের উপর ভিত্তি করেই নতুন রূপ নেবে। সেখানে বিএনপিকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়েই তার অবস্থান নিতে হবে। যে জামায়াতের জন্য বিএনপি’র আজকের এ মাসির দরদ সে জামায়ত কিন্তু ক্রান্তিকালে বিএনপিকে বাঁচাবে না কিংবা বাঁচাতে পারবেনা। মানুষের আবেগ, আশা-আকাক্সক্ষা, চাওয়া-চাহিদা এবং মতৈক্যের সাথে ঐক্যমত্য পোষণ করবার মধ্যে রাজনৈতিক ফায়দা-- এটা বিএনপি নেতৃত্ব যত দ্রুত বুঝতে পারবেন, ততোই দেশ ও দশের লাভ। বিএনপি’র তো বটেই। মনে রাখতে হবে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুতে ‘নিরেপক্ষ’ বলে কোন পক্ষ নেই। তাছাড়া, ন্যায় এবং অন্যায়ের মধ্যে নিরপেক্ষ থাকার অন্য অর্থ হচ্ছে অন্যায়ের পক্ষে থাকা। এটাই ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে নিজের অবস্থানকে সমন্বয় করবার রাজনৈতিক দর্শন।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।