Tuesday, March 19, 2013

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তঃ দেড়-দশকের কীর্তন

[দৈনিক ভোরের কাগজের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী সংখ্যা, ২০/০৩/২০১৩]

“চুক্তি” করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় কিনা তা নিয়ে বিশ্বব্যাপি “শান্তি ও সংঘর্ষ” শাস্ত্রে তুমুল বিতর্ক চলছে। তবে, শান্তিতে জীবন যাপন করবার অধিকার বাঙালিদের একটু বেশি, আর পাহাড়ি আদিবাসীদের একটু কম--এধরনের চিন্তা সুস্থ ও সভ্য সমাজ-ভাবনার সাথে সাংঘর্ষিক। তাই, পার্বত্যচট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা পার্বত্য শান্তিচুক্তি নামে বহুলভাবে পরিচিত, তাকে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। ন্যায্যভাবেই এটা ঐতিহাসিক কেননা যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাংস্কৃতিক ভিন্নতার মানুষগুলোর স্বাধিকার আন্দোলন---রাষ্ট্রের ভাষায় বিচ্ছিন্নতাবাদি আন্দোলন---একটি সাংঘর্ষিক রূপ ধারণ করে রাষ্ট্রীয় শান্তি-শৃংখলার নেতিবাচক ইমেজ তৈরী করছে এবং সে-নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে বৈশ্বিক পরিম-লে একটি জাতিগত দ্বন্দ্বের দেশ হিসাবে উপস্থাপন করছে, সেখানে বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের নিরন্তর-স্বদিচ্ছায় ও পাহাড়ি নেতৃত্বের আন্তরিক সহযোগিতায় একটি সমঝোতার ভিত্তিতে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটা আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনের পরিপ্রেক্ষিতেও ঐতিহাসকি কেননা এ চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বিদ্যমান একটি নিরন্তর সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির--পাহাড়ি বনাম বাঙালি এবং সরকারের মিলিটারি-ফোর্স বনাম পাহাড়িদের গেরিলা-শাখা শান্তিবাহিনী-- ইতি টানবার বাসনা এবং আকাক্সক্ষা বিদ্যমান ছিলো। কাজেই, স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক এ চুক্তি দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিল। স্বাভাবিক কারণেই, শান্তির শ্বেত-কপোত উড়িয়ে উভয় পক্ষ--রাষ্ট্রপক্ষ এবং পাহাড়িদের রাজনৈতিক প্রতিনিধি জনসংহতি সমিতি (যারা জেএসএস নামে পরিচিত)--যে চুক্তি স্বাক্ষর করে, তাতে পার্বত্যচট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি-বাঙালি তে বটেই, এদেশের আপামর জনগণ এবং বৈশ্বিক পরিম-লেও একটি গভীর আশার সঞ্চার করেছিল; এবার বুঝি সবুজ পাহাড়ের বুকে আর গুলা-বারুদের শব্দ শুনা যাবে না, মিলিটারীর অপারেশনে বিরান হবেনা কোন পাহাড়ি গ্রাম, পারষ্পরিক সংঘর্ষে পুড়ে ছাই হবেনা আর কোন আবাসভূমি, শোনা যাবেনা ধর্ষিত কোন পাহাড়ি নারীর আত্মচিৎকার কিংবা কোন বাঙালির রক্তে রঞ্জিত হবে না প্রকৃতির লীলাভূমি-খ্যাত পার্বত্যচট্টগ্রামের সবুজ-প্রান্তর। কিন্তু কথিত এ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার দেড়দশক পরও পার্বত্যচট্টগ্রামের অধিবাসীরা--না পাহাড়ি, না বাঙালি--আদৌ কোন শান্তির সুবাতাস পেয়েছেন কিনা সেটা এক বিরাট জিজ্ঞাসা। এর সাথে সংশ্লিষ্ট এবং আমার গবেষণা সম্পৃক্ত আরো কিছু জিজ্ঞাসা আমি এখানে হাজির করতে চাই। যেখানে পার্বত্যচট্টগ্রামে বসবাসরত অধিকাংশ বাঙালি এখনও পাহাড়িদেরকে বাংলাদেশের নাগরিক বলেই স্বীকার করে না, সেখানে চুক্তি করে কি শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব? যে পার্বত্যচট্টগ্রামের সিভিল এবং মিলিটারি প্রশাসন চিন্তা এবং চেতনায় পাহাড়িদেরকে মানুষ বলেই গণ্য করেনা, সেখানে চুক্তি করে কি শান্তি আনা যাবে? যেখানে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সত্যিকার অর্থে পাহাড়িদেরকে ভোট-ব্যাংক হিসাবে ব্যবহার করার জন্য পাহাড়ে শান্তির-প্রতিষ্ঠা, এবং খোদ শান্তিচুক্তি, নিয়ে রাজনীতি করে সেখানে শান্তি স্থাপন করা কীভাবে সম্ভব? বহুবিধ এবং বহুমাত্রিক রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার কোন সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য এবং সকলে-গ্রাহ্য একটা সন্তোষজনক সমাধান ছাড়া, পার্বত্যচট্টগ্রামে কথিত শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কিংবা শান্তি প্রতিষ্ঠা কি আদৌ সম্ভব? আমি মনে করি, এসকল প্রশ্নগুলোকে সামনে রেখে গভীর (indept) এবং নিবিড় (intensive) গবেষণার মাধ্যমে পার্বত্যচট্টগ্রামে শান্তি-প্রতিষ্ঠার কৌশিল নির্ধারণ করতে হবে। এ জিজ্ঞাসার পরিপ্রেক্ষিতে এ নিবন্ধে দীর্ঘদিনের চর্চিত, এবং মজবুত সামাজিক-ভিত্তিতে প্রস্তরিত, পাহাড়ি ও বাঙালির মধ্যে বিদ্যমান রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং জাতিগত বৈরিতার একটি সবর্জন-গ্রাহ্য সমাধান ব্যাতিরেখে কেবল দ্বি-পাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব কিনা তার সওয়াল-জবাব করা হয়েছে। পাশাপাশি পার্বত্যচট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার কারণ হিসাবে বহুল বিবৃত এবং প-িত-মহল দ্বারা ধারণায়িত উপলব্ধির বিকল্প ভাবনা উপস্থাপন করা।

প্রতিষ্ঠিতি ধারণার গদলতি ধারণ
একথা স্বীকার্য যে, পার্বত্যচট্টগ্রামের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনে (যৎকিঞ্চিতই হোক!) শান্তি আনয়নে ১৯৯৭ সালে সম্পাদিত ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি’র একটি গুরুত্ব রয়েছে- এ কথা অনস্বীকার্য। এ-গুরুত্বের কারণেই পার্বত্যচট্টগ্রামের বিরাজমান সমস্যা এবং সংকটকের পেছনে এ শান্তিচুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন না-হওয়াকে বহুলাংশে প্রধান কারণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। রাজনীতিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং একাডেমিক্সরা তাদের বক্তৃতা, বিবৃতি এবং লেখালেখির মাধ্যমে এ ধারণাকে একটি বিশ্বাসে রূপদান করবার পেছনে পুষ্টি জুগিয়েছে।

কিন্তু আমার চলমান গবেষণায় আমি লক্ষ করেছি পাহাড়িদের মধ্যে ৮০% এরও অধিক পাহাড়ি জানেই না, কথিত শান্তিচুক্তিতে আসলে কী আছে? কতটুকু এর বাস্তবায়ন হয়েছে কিংবা হয়নি। আমি গবেষণা করি খুমি, চাক, খেয়াং, লুসাই, ম্রো এবং পাংখোয়া জাতিগোষ্ঠী নিয়ে যারা পার্বত্যচট্টগ্রামে বসবাসরত ১১টি আদিবাসি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও প্রান্তিক পাহাড়ি। এদের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী পাহাড়ে শান্তি আছে না-কি নাই, এটা তাদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে উপলব্ধি করবার চেষ্টা করে। একজন কারবারির (পাড়া-প্রধান) কাছে ১৯৯৭ সালের আগে এবং পরে সেনাবাহিনীর একজন জোয়ান তার সাথে কীভাবে আচরণ করে, তার ভিত্তিতে সে নির্ধারণ করে পাহাড়ে শান্তি আছে কী নাই। একজন ম্রো ‘চাঁদের গাড়ি’তে চড়ার সময়, গাড়ির হেল্পার তার সাথে কীভাবে আচরণ করে, এর ভেতরে সে পাহাড়ে শান্তিকে সংজ্ঞায়িত করে। একজন লুসাই স্থানীয় বাজারে একজন বাঙালি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দ্বারা কতটুকু ঠকছে বা জিতছে তার ভিত্তিতে সে নির্ধারণ করে ১৯৯৭ সালের আগে এবং পরে পাহাড়ে তার অবস্থান কতটুকু পাল্টেছে কিংবা আদৌ পাল্টেছে কী-না। একজন পাংখোয়া স্থানীয় প্রশাসন তাঁর সাথে কীভাবে আচরণ করছে এর ভিত্তিতে নির্ধারণ করে আদৌ পাহাড়ে কোন শান্তি এসেছে কী-না। এ-যে সাধারণ পাহাড়িদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা এবং এ-নিত্যদিনের অভিজ্ঞতার তারা রাষ্ট্রকে কীভাবে ধারণ করে এবং রাষ্ট্রকে কীভাবে মোকাবেলা (এনকাউন্টার) করে সেটা যথাযথভাবে উপলব্ধি না করা পর্যন্ত পাহাড়ে কেনো ধরণের ‘শান্তি’ আছে কি-না তার সঠিক উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। এ বিষয়গুলো আমাদের একাডেমিক প-িত, সংবাদপত্রের কলামিষ্ট, বুদ্ধিজীবী, এনজিও-কমী, সুশীলসমাজ এবং মিড়িয়া-ব্যক্তিত্বদের বক্তব্যের মধ্যে উনুল্লেখিত এবং অনুচ্চারিত থাকে।

হিতে বিপরীত কিনা?
পার্বত্যচট্টগ্রামের প্রান্তিক পাহাড়িদের মধ্যে বিগত একযুগেরও বেশি সময়-ধরে গবেষণার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, সাধারাণ পাহাড়িরাই পার্বত্যচট্টগ্রামের বিদ্যমান সংঘাত, সংঘর্ষ এবং পারষ্পরিক দ্বন্দ্বের প্রত্যক্ষ ভোক্তা ও ভুক্তভোগী। শান্তিচুক্তি-পূববর্তী সময়ে পাহাড়িদের আঞ্চলিক-রাজনৈতিক সংগঠন জনসংহতি সমিতির নেতৃত্ব ও শান্তিবাহিনীর সদস্যরা সেটেলার বাঙালির অত্যচার এবং মিলিটারী অপারেশনের সরাসরি টার্গেট থাকলেও, সাধারণ পাহাড়িরাই দীর্ঘমেয়াদে এ সংঘাত ও সংঘর্ষের মাসুল দিয়েছে তাদের নিত্যদিনের জীবন-যাপনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। এমনকি চুক্তি পরবর্তী সময়েও সাধারণ পাহাড়িরাই ভোগ করছে পাহাড়ি ও বাঙালির সেই দ্বন্দ্বের উত্তরাধিকার হিসাবে নানান রকমের তিরস্কার, অত্যাচার, অপমান ও নির্যাতন। সেখানে না-থাকে শান্তিচুক্তি, না-থাকে রাষ্ট্র, না-থাকে জেএসএস। সেখানে থাকে সাধারণ পাহাড়ি আর সংঘাতময় উত্তরাধিকার। এ বিষয়গুলোকে বিবেচনায় না-নিয়ে, কেবল চুক্তি করেই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় কিনা--এ ভাবনা থেকেই আমি উপরোক্ত জিজ্ঞাসাগুলো হাজির করেছি।

এখানে উল্লেখ্য যে, এ চুক্তি বাস্তবায়ন কিংবা চুক্তির সাফল্য-ব্যর্থতার মূল সমস্যাটা আসলে রয়েছে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য উপলব্ধিতে এদেশের আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি মার্কা দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মেরুকরণের মধ্যে। আওয়ামী লীগ এ চুক্তির পুরো কৃতিত্ব ভরতে চাইলো তার দলীয় গোলায় এবং অত্যন্ত বোধগম্য কারণেই প্রতিপক্ষ বিএনপি এর বিরোধীতা করলো। কিন্তু যে জরুরি বিষয়টা বেমালুম উপেক্ষিত হয়েছে, তা হলো; এ-চুক্তি কোন দলের সাথে স্বাক্ষরিত হয়নি, বরঞ্চ এ চুক্তি হয়েছে বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের সাথে- এ সহজ সত্যটি আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি মধ্যকার বৈরী রাজনৈতিক মেরুকরণে যথাযথ ভাবে উপলব্ধ হয়নি। ফলে, এ চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নে পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে কোন ধরনের আন্তরিকতা দেখানো হয়নি। যা প্রকারান্তরে পাহাড়িদের কাছে এ রাষ্ট্র একটি বেঈমান রাষ্ট্র হিসাবে পুনরায় উপস্থাপিত হয়। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এ চুক্তি রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণী মহলেও যথাযথ আন্তরিকতার সাথে গৃহীত হয়নি; অন্তত গত দেড়-যুগের অভিজ্ঞতা আমাদের এ প্রেমিজকে বিশ্বাস করবার স্বপক্ষে যুক্তি যোগায়। ফলে, শান্তিচুক্তি এ অঞ্চলে শান্তিতো আনেই-নি, বরঞ্চ জন্ম দিয়েছে নানামাত্রিক অশান্তি ও বিভক্তি। পাহাড়িদের মধ্যে জন্ম দিয়েছে ইউপিডিএফ যা ‘সংহতি সমিতি’র পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বশীলতাকে বিভক্ত করেছে। বাঙ্গালিদের মধ্যে জন্ম দিয়েছে ‘সমঅধিকার আন্দোলন’ নামক শান্তিচুক্তি বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠন যা পাহাড়ি-বাঙালির সুদীর্ঘকালের রাজনৈতিক বৈরিতার জ্বলন্ত আগুনে নিত্য-নতুন ঘি ঢালছে। পার্বত্যচট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি এবং বাঙালি উভয়ের মধ্যেই এনেছে অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা এবং ক্রমবর্ধমান পারষ্পরিক বৈরিতা। এ নিরাপত্তাহীনতা এবং পারষ্পরিক অহি-নকুল সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান বিরাজমানতা পার্বত্যচট্টগ্রামে মিলিটারির উপস্থিতিকে বৈধতা ও ন্যায্যাতা দিচ্ছে, যা প্রকারান্তরে শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নকে আরো কঠিনতার করে তুলছে। ফলে, শান্তিচুক্তি দৃশ্যত পার্বত্যচট্টগ্রামে শান্তির চেয়ে অশান্তিই বেশি এনেছে।

চুক্তি বাস্তবায়নের সাম্প্রতিক অগ্রসরতা
এর মধ্যে কিছু সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছে , তন্মধ্যে রয়েছে একটি বৃগেট, (তাও ১২ বছর পর একটি বৃগেট), ৩ টি ব্যাটেলিয়ান ও ৩৫ টি ক্যাম্প। বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী মেনিফেষ্টোতে পার্বত্যচট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। এবং সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ানের অংশ হিসাবে বর্তমান সরকার, যারা ১৯৯৭ সালে এ চুক্তি সম্পাদন-কালে রাষ্ট্রপক্ষ ছিলো, এ সিদ্ধান্তকে পার্বত্যচট্টগ্রাম থেকে সবচেয়ে বড় সেনা-প্রত্যাহার হিসাবে দাবি করছে এবং কার্যতই গত ১২ বছরে এটাই বড়মাপের সৈন্য প্রত্যাহার। কেননা, এর আগে বিভিন্ন ভাগে বিভিন্ন এলাকা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে ২০০ টি, জনসংহতি সমিতির মতে ১৫০টি, ছোট বড় অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছিলো। এ সৈন্য প্রত্যাহারকে যে মাপের মিডিয়া ফোকাস দেয়া হয়েছে, তাতে কিছুটা অতিরঞ্জন রয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। কেননা পার্বত্য চট্টগ্রাম যে পরিমাণ সেনা মোতায়েন আছে, সে তুলনায় এটা অত্যন্ত নগন্য। গোটা পার্বত্যচট্টগ্রামই মূলত একটি মিনি-ক্যান্টমেন্ট (Amena Mohsin, The Politics of Nationalism, UPL, ২০০২)। সে তুলনায় একটি ব্রিগেড প্রত্যাহার পার্বত্যচট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কতটুকু ভূমিকা রাখবে সেটা গভীরভাবে ভাববার বিষয়। 

সরকার ইতোমধ্যে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে বেশকিছু গুরুত্ব¡পূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে বলে দাবি করছে। বিশেষ করে, জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের পরীক্ষণ ও বাস্তবায়ন কমিটি গঠন, সাংসদ যতীন্দ্রলাল ত্রিপুরাকে চেয়ার করে প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত সমস্যা সমাধানে টাস্কফোর্স গঠন, আদালতী সমস্যার কারণে খাগড়াছড়িকে বাদ দিলে কা শৈ হ্লাকে পার্বত্য বান্দরবান ও নিখিল কুমার চাকমাকে রাঙামাটি জেলাপরিষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়ে ৫ সদস্য বিশিষ্ট জেলা পরিষদ গঠন, হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রধান করে ভূমি কমিশন গঠন, সম্প্রতি ভূমি সংস্কার আইনের সংশোধন প্রভৃতি শান্তিচুক্তি বাস্তাবায়নের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিকভাবেও বাহবা দেয়া হয়েছে। কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাহাবা পাওয়ার চাইতে পাহাড়িদের জীবনে আদৌ শান্তি কতটুকু আসলো সে বিষয়টি বিবেচনা নেয়াটা অধিক জরুরি।

নিত্যদিনের অভিজ্ঞতায় রাষ্ট্র
পাহাড়ে শান্তি কেন আসছেনা তা নিয়ে আমার অভিজ্ঞতাগুলোর সিরিয়াস একাডেমিক বিশ্লেষণ করবার জায়গা এটি নয়। তথাপি আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কিছু খণ্ডাংশ এখানে পেশ করছি, কেননা আমি মনে করি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কিছু সমষ্টিক তাৎপর্য আছে এবং সে অর্থে কিছু রাজনৈতিক গুরুত্বও আছে।

আমি একজন পাহাড়ি ছাত্রকে নিয়ে গাড়িতে করে একদিন বান্দরবানে যাচ্ছিলাম। চট্টগ্রামস্থ কেরাণিহাট দিয়ে বান্দরবানের পথে ঢুকতেই প্রথমে দেখি একটি মিলিটারি চেকপোষ্ট। মিলিটারির একজন জোয়ান গাড়িতে উঠে চেক-করবার আনুষ্ঠানিকতা করলো কিন্তু সে কি চেক করলো বুঝলাম না। দেখলাম শুধু আমার ছাত্রটার বেগটা খুলে তার কিছু বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করলো। প্যান্টের বেল্টের সামনের লোফটা টেনে ভেতরে একটু উঁকি দিয়ে দেখলো কোন অস্ত্র আছে কিনা! আর কাউকে কিছুই বললোনা, কোন চেকও করলোনা। বললো, ‘ক্লিয়ার!’ আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, গাড়িতে আমার ছাত্রটি ছাড়া আর কোন পাহাড়ি সেদিন ছিলোনা। আমি ছাত্রটিকে জিজ্ঞেস করতেই বললো, “স্যার এইসবতো নিত্যদিনের ব্যাপার। গাড়িতে চেক করা মানে পাহাড়িদের চেক করা; আর চেক করার নামে নাজেহাল করা।” এ ঘটনাটিও আমাদের বোঝাবুঝির ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে একটি এথনোগ্রাফিক উপাত্ত। যার ভেতর দিয়ে পাহাড়িদেরকে প্রতিমুহুর্তে বুঝিয়ে দেয়া হয়, এরা এখানে বহিরাগত! আলগা লোক! কিংবা সন্ত্রাসী! সেখানে চুক্তি করে কি এ মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব? আর এ মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া কেবল চুক্তি করে কি পার্বত্যচট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব?

সকলেই জানেন, পার্বত্য অঞ্চলে ‘চাদেঁর গাড়ি’ নামে এক ধরণের গাড়ির প্রচলন আছে, যা পার্বত্যচট্টগ্রামে সড়কপথের একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। সেখানে সামনে চালকের পাশে তিনটি বসার সিট তাকে। সে-সিটে বসে পাহাড়ি-রাস্তায় চলাচল করাটা একটু আরাম দায়ক। আর ভেতরে ‘বাঁদুরঝুলা’ অবস্থা। সামনের সিটগুলাকে বলা হয় ‘ভিআইপি’ সিট। আর এ ‘ভিআইপি’ ক্যাটাগরিতে আছেন মিলিটারি, সিভিল প্রশাসন থেকে শুরু করে পুলিশের সাধারণ সেন্ট্রিও। নিদেনপক্ষে যে কোন বাঙালি (প্যান্ট পরা হলে ভালো; না-হলেও অসুবিধা নাই) কিন্তু কোনভাবেই কোন পাহাড়ি নয়। সেখানে বসা, সিট খালি থাকলেও, পাহাড়িদের জন্য ঘোষিত-ভাবে নিষিদ্ধ। এমনকি, সিট খালি থাকলেও, একজন ‘কারবারি’র (পাহাড়িদের পাড়া-প্রধান) অথবা ‘হেডম্যান’র (মৌজাপ্রধান) জন্য অনিবার্য আসন ‘বাদুঁরঝুলা।’ ‘বনে’ থাকা ‘বান্দর’ (হয়তো যে কারণে বান্দরবান!), গাড়িতে ঝুলেই তো যাবে, বসে যাবে নাকি!--এ-হচ্ছে প্রকৃত মনস্তাত্ত্বিক নির্মিতি। আর হেল্পারদের ভাষা ব্যবহারের রীতি বুঝতে পারলে, মনের সকল তত্ত্ব জানা যায়। পাহাড়িদের জন্য প্রথম, এবং শেষ, সম্বোধন হচ্ছে ‘তুই’ আর অ-পাহাড়িদের জন্য সম্বোধন হচ্ছে ‘আপনি’ আর আপনার লোক হলে বড়োজোর ‘তুমি’। বাপের বয়সি ‘পাহাড়ি’কে ডাকে ‘তুই’ আর পোলার বয়সি ‘বাঙালিরে’ বুলায় ‘আপনি’। এ হচ্ছে পাহাড়ে বিদ্যমান পাহাড়ি-সম্পর্কিত বাঙালি মনস্তত্ত্ব। যেখানে পাহাড়ি সম্পর্কে বাঙালিদের এধরনের মানসিকতা জীবন ও যাপনের সবক্ষেত্রে বিরাজমান, সেখানে চুক্তি করে কি শান্তি আনা সম্ভব? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা জরুরি।

আরো একটা নজির পেশ করি। সাঙ্গু নদীতে চড়ে বান্দবান শহর থেকে রুমা বাজারে নৌকা/বোট যোগে যাওয়ার পথে একটি মিলিটারী ক্যাম্প আছে যাকে মিলিটারি চেকপোষ্টও বলা হয়। প্রত্যেকটা বোট সে চেক পোষ্টে গিয়ে হাজিরা দেয় যাত্রীদের চেক করানোর জন্য। আামি অসংখ্যবার এ নদী দিয়ে যাতায়ত করেছি; তন্মধ্যে একদিনের ঘটনা এখানে প্রাসঙ্গিত বিবেচনায় উল্লেখ করছি। একদিন আমার গবেষণার কাজে রুমা বাজারে যাচ্ছিলাম। নৌকায় কিছু পাহাড়ি মেয়ে, কয়েকজন পাহাড়ি লোক এবং কিছু বাঙালি ক্ষদ্রব্যবসায়ী ছিলেন। সেই ক্যাম্পে পৌঁছতেই, নৌকার সকল যাত্রীদের বাইরে বের করা হলো চেক করার জন্য। খররোদ্রে তপ্ত বালিতে তাদেরকে দাঁড় করিয়ে রাখা হলো। যিনি চেক করবেন, তিনি এখন চা খাচ্ছেন! বাঙালিদেরকে বোটের ভেতরে বসতে বলা হলো (অর্থাৎ এদের চেক না করলেও চলবে), কিন্তু পাহাড়িরা ততক্ষণ রোদ্রেই দাঁড়িয়ে থাকলো। চেক করার লোক যখন আসলো তিনি সবাইকে চেক করলেন। বিশেষ করে পাহাড়ি মেয়েদের শরীর চেক করা হলো বেশ ভালোমতো। তিনি হাত দিয়ে ভালোমতো চেক করে দেখলেন গোপন কোন স্থানে মারাত্মক কোন অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে কিনা! চেক করা শেষে সবাই যখন বোটের ভেতরে প্রবেশ করলো, পাহাড়ি একটা মেয়ে তখন গোপনে কাঁদছিলো আর বহুকষ্টে চোখের পানি লুকানোর চেষ্টা করছিলো। এরকম অসংখ্য মেয়ের চোখে পানি সাঙ্গু নদীর জলের সাথে মিশে আছে। এ লুকানো চোখের পানির অর্থ উপলব্ধি না-করে, কেবল চুক্তি করে কী পার্বত্যচট্টগ্রামে শান্তি আনা সম্ভব?

উপসংহার
এরকম অসংখ্য নজির আমি পেশ করতে পারি, যার ভেতর দিয়ে পাহাড়ি-বাঙালি সম্পর্কের আসল চেহারা উপলব্ধির পাশাপাশি পার্বত্যচট্টগ্রামে বিদ্যমান প্রশাসনের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিচয় পাওয়া যায়। মূলতঃ পাহাড়িদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতায় রাষ্ট্রের বেপরোয়া প্রবেশ- তাদের বুঝিয়ে দেয় তারা ‘মানুষ’ নয়, ‘পাহাড়ি’। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার ভেতর দিয়েই ‘পাহাড়ি’-ইস্যূকে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। পাহাড়ি পলিটিক্যাল এলিটদের সাথে রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠীর যোগাযোগ, দাবি-দাওয়ার যোগ কিংবা বিয়োগ বিশ্লেষণ করে ‘পাহাড়ি’ ইস্যূকে কোনভাবেই উপলব্ধি করা যাবেনা। এটা মনে রাখা জরুরি যে, বহুবিধ এবং বহুমাত্রিক রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার কোন সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য এবং সকলে-গ্রাহ্য একটা সন্তোষজনক সমাধান ছাড়া, পার্বত্যচট্টগ্রামে কথিত শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কিংবা শান্তি প্রতিষ্ঠা আদৌ সম্ভব নয়। আমি মনে করি, শান্তি কেবল ‘চুক্তি’ করে প্রতিষ্ঠা করবার ব্যাপার নয়, পার্বত্যচট্টগ্রামে বসবাসরত সকল পাহাড়ি-বাঙালি, বিদ্যমান সকল প্রশাসনযন্ত্র (সিভিল ও মিলিটারি প্রশাসন), সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি একং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মনস্তাত্ত্বিক, আদর্শিক ও দার্শনিক পরিশোধন ও পরিবর্তন ছাড়া পার্বত্যচট্টগ্রামে শান্তিপ্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তবে, শান্তিচুন্তির যথাযথ ও পূর্ণ বাস্তবায়ন পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে, এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তাই, প্রত্যাশা এতটুকই যে, পুরো শান্তি দূরাগত হলেও তাকে স্বাগত জানানোর জন্য শান্তি-প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া হিসাবে দ্রুততম সময়ে শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। যত দ্রুত এটা সম্ভব তত দ্রুতই পার্বত্যচট্টগ্রামে শান্তির শীতল প্রবাহ ত্বরান্বিত হবে।  

[এ লেখাটি  আরো বর্ধিত কলেবরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠন "অঙ্গন"এর বার্ষিকী লিটলম্যাগ ২০১৩-তে ছাপা হয়েছে]

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

Tuesday, March 12, 2013

পুলিশের শরীরে আসলে ‘মার’ খায় রাষ্ট্র!

[দৈনিক ভোরের কাগজ, ১৩/০৩/২০১৩]

খুলনায় জামায়াতের ছিনিয়ে নেয়া আসামী ধরতে গিয়ে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারের গুলিতে পুলিশ কনষ্টেবল মফিজুল ইসলামের মৃত্যুর মধ্যদিয়ে সম্প্রতি পুলিশের নিয়মিত মৃত্যু ও লাশের সারিতে যুক্ত হয়েছে আরো একটি নতুন লাশ। এর আগে শাহবাগের সিসি ক্যামেরা অপারেটরের লাশসহ বিগত কয়েকদিনের হরতালের সহিংসতায়, হরতালের পূর্বের ঘটনা এবং হরতাল-উত্তর নানান ঘটনা-দুর্ঘটনায় সংবাদপত্রের হিসাব-অনুযায়ী এ পর্যন্ত নয়জন পুলিশের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ যখন সহিংসতা ঠেকানোর জন্য কিংবা সাধারণ নাগরিকের জীবন বাঁচানোর জন্য গুলি করে তখন তাকে আমরা ‘গণহত্যা’ বলে চিৎকার শুরু করি কিন্তু পুলিশ যখন অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যু বরণ করে কিংবা পুলিশকে যখন নির্বিচারে হত্যা করা হয় তখন আমাদের মুখে কোন শব্দ বের হয়না। আমাদের মানবাধিকার সংগঠনগুলো এবং মানবাধিকার কর্মীরা তখন কোন আওয়াজ দেননা। কারণ, তাদের হিসাব-নিকাশে পুলিশ কোন মানুষ না! পুলিশের কোন মানবাধিকার নাই! এটা অত্যন্ত লজ্জার এং পরিতাপের ব্যাপার। কেননা আমরা ভুলে যাই যে, পুলিশও আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো মানুষ। তাদেরও পরিবার, আত্মীয়-পরিজন ও সন্তান-সন্ততি আছে। পুলিশও আমার আপনার মতো সুখে হাসে, দুঃখে কাঁদে এবং আনন্দে উদ্বেলিত হয়। অথচ, এ পুলিশের মৃত্যু কিংবা পুলিশ হত্যা মানবাধিকারের হিসাবের খাতায় স্থান পায়না।

হতে পারে, বাংলাদেশের পুলিশের বিরুদ্ধে এন্তার নালিশ আছে। বিশেষ করে সংবাদপত্রের নিয়মিত প্রতিবেদন, টেলিভিশনের সংবাদ-বিষয় (নিউজ-আইটেম), বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের মাসিক কিংবা বার্ষিক প্রতিবেদন, এ্যামনেষ্টি ইণ্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের প্রতিবেদন এবং মানুষের নিত্যদিনের যাপিত-জীবনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এদেশের পুলিশ সম্পর্কে যে গণ-ধারণা (পাবলিক-পারসেপ্শান) দাঁড়ায়, তা অত্যন্ত নেতিবাচক। এ গণ-ধারণাকে শব্দবন্ধ করলে যা দাঁড়ায়, তা হচ্ছে; পুলিশ হচ্ছে দুনীর্তিবাজ, ঘুষখোর, পুলিশকে বিড়ি দিয়ে বেচা-কেনা করা যায়, আইনের বরখেলাপ-কারী, আইনের প্রয়োগের নামে অপগ্রয়োগকারী, বিচার-বিহর্ভূত হত্যাকারী, আসামী পুলিশের সামনে ঘুরে বেড়ায় আর ফরিয়াদি জান নিয়ে দৌঁড়ায়, বাঘে ছুঁলে নয়-ঘা আর পুলিশ ছুঁলে আঠার-ঘা, পুলিশ হচ্ছে যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তার লাঠিয়াল বাহিনী, পেটোয়াবাহিনী ইত্যাদি। এরকম নানান কিসিমের নালিশের দীর্ঘ তালিকা দিয়ে বলা যায় পুলিশের ‘খারাপের’ কোন সীমা পরিসীমা নাই! সম্প্রতি পুলিশের এ-দীর্ঘ দুর্নামের সাথে সংযুক্ত হয়েছে ‘মরিচের গুড়া’ ও ‘তরল গ্যাস’ ব্যবহারকারী হিসাবে নামক নতুন বিশেষণ। পুলিশ যখন আইন-শৃংখলা রক্ষার নামে সাধারণ মানুষকে নাজেহাল করে বা বিরোধী দলের কিংবা যে কোন ন্যায়-সংগত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আন্দোলনকে মোকাবেলা করবার তরিকা হিসাবে প্রতিবাদকারীদের লাঠি-পেটা করে, দমন-পীড়ন চালায়, জল-কামান কিংবা টিয়ার-গ্যাস ছুঁড়ে প্রতিবাদ-প্রতিরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে কিংবা দাঙ্গা পুলিশ যখন রাস্তায় বেড়দক লাঠিপেটা করে তখন আমার পুলিশের আচরণের ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রের চরিত্রকে উপলব্ধি করবার চেষ্টা করি। পুলিশের আচরণের ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদি, দমনমূলক, আতিপত্যবাদি, জুলুমবাজ এবং পরমত-অসহিঞ্চু একটা চরিত্র খাঁড়া করানোর চেষ্টা করি। এবং এ-পুলিশকে রাষ্ট্রের প্রতীক হিসাবে ধারণায়ন করে পুলিশী নির্যাতনের বিরোধীতা ও সমালোচনা করতে গিয়ে রাষ্ট্রকে ‘এক-হাত’ নিই। ‘রাষ্ট্র’ এবং তার চৌদ্দগোষ্ঠীকে রীতিমত তুলাধুনা করি। সে-তত্ত্ব মোতাবেক চিন্তার-বিপ্রতীপ বিন্দুকে গিয়ে পুলিশকে নির্বিচারে পেটানোর ঘটনাকে যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তবে তার একটি অত্যন্ত গুরুতর অর্থ তৈরী হয়। অর্থাৎ পুলিশ যদি রাষ্ট্রের প্রতীক হয়, তখন ‘পুলিশকে পেটানো’র অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্রকে পেটানো। তাই, তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিত উভয় দিক থেকেই এটার যথাযথ উপলব্ধি অত্যন্ত জরুরি যে, পুলিশকে পেটানোর ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রকে ‘রাম-ধুলাই’ দেবার একটা রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছানো হচ্ছে কিনা। কেননা, শাহবাগের গণআন্দোলন শুরু হওয়ার আগে থেকেই আমরা লক্ষ করেছি, ‘আন্তর্জাতিক ট্রাইবুন্যাল বাতিলের দাবিতে’ এবং যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ‘জাতায়াতের নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে’ জামায়াত-শিবির দেশব্যাপি যে তা-ব চালিয়েছে, তাতে পুলিশকে বেদড়ক বেটানো হয়েছে। এদেশের সংবেদনশীল মানুষ জামায়াত-শিবিরের হাতে পুলিশের এ-মার খাওয়া দেখে আহত হয়েছে, কেননা পুলিশ তো কারো প্রতিপক্ষ নয়। পুলিশ মুলত রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে, পুলিশকে বেদড়ক পেটানো কিংবা পুলিশকে হত্যা করা, রাষ্ট্রকে একধরনের বার্তা দেয়ার সামিল।

যদি আমরা এ তাত্ত্বিক কাঠামোর ভেতর দিয়ে জামায়াত-শিবির কতৃক গত বেশ কিছুদিন ধরে পুলিশের ওপর হামলা, নির্বিচারে রাস্তায় পুলিশকে পেটানো এবং পুলিশ ফাঁড়ি থেকে পুলিশকে বের করে কুপিয়ে হত্যা করা প্রভৃতি ঘটনাকে বিশ্লেষণ করি, তবে এর একটি ভয়ংকর অর্থ দাঁড়ায়। জামায়াত-শিবির যে এজেণ্ডাকে সামনে নিয়ে সহিংস প্রক্রিয়ায় মাঠে নেমেছে এবং ‘ঝি’ কে মেরে ‘বউ’ কে শেখানোর তরিকায় পুলিশকে পিটিয়ে রাষ্ট্রকে যে বার্তা দিচ্ছে সেটা একেবারে দিবালোকের মত পরিষ্কার। তাদের স্বঘোষিত বার্তা হচ্ছে, একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে গ্রেফতার করা জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে যে একটার পর একটা রায় দেয়া হচ্ছে সেটা বাস্তাবায়ন করতে দেয়া হবেনা। মূলত: বাচ্চু রাজাকার, কাদের মোল্লা এবং সাঈদীর রায় হওয়ার পর, অন্যান্য নেতাদের শাস্তি কী হতে পারে তার সম্ভাব্য-অনুমান থেকে জামায়াত-শিবির রীতিমত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র স্বাধীনতার চারদশক পরে একাত্তরে সংঘটিত জঘন্য মানবতা-বিরোধী অপরাধের বিচার করছে এবং এ-বিচারের পক্ষে, জামাত-শিবিরের কতিপয় নেতা-কমী-সমর্থক ছাড়া, এদেশের অধিকাংশ মানুষের সমর্থনে ইতোমধ্যে একটি ব্যাপক জনমত তৈরী হয়েছে। শাহবাগের গণআন্দোলনের দাবির সাথে এদেশের শ্রেণী-নির্বিশেষ মানুষের বিপুল সম্পৃক্ততা, সংহতি এবং সমর্থন সেটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার করে। সেই জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সন্দেহজনক এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আটক করা জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মুক্তির দাবি করা এবং সে দাবি বাস্তাবায়নের অংশ হিসাবে পুলিশকে পিটিয়ে হত্যা করা অর্থাৎ রাষ্ট্রের প্রতীককে আঘাত করা নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর বিষয়। তাই, পুলিশ যখন রাস্তায় মার খায়, সেটা আসলে পুলিশ খায় না, পুলিশের শরীরে উন্মুক্ত রাস্তায় মার খায় ‘রাষ্ট্র’। পুলিশ যখন গুলি খায়, তখন গুলি খায় ‘রাষ্ট্র’। তাও আবার পেঠানোর কিংবা খুনীর ভূমিকায় মুক্তিযদ্ধের বিরোধী শক্তি জামায়াত ও শিবির আর যে আবদারে রাষ্ট্রের গায়ে আঘাত করা হচ্ছে সেটা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের দায়ে আটককৃতদের মুক্তি!!!

রাষ্ট্রকে এভাবে রাস্তায় বেদড়ক মার খেতে কিংবা খুন হতে দেখার মধ্যে ব্যক্তিগত আরাম বোধ করবার সঙ্গত কোন কারণ নাই কিংবা নির্বিবোধ মজা দেখার মধ্যে কোন বাহাদুরী নাই, কেননা এটা এক অর্থে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির সমষ্টিগত মার খাওয়া। রাষ্ট্র যখন নির্যাতন করে তখন আমরা গলা ফাটাই আর রাষ্ট্রকে যখন নির্যাতন করে তখন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাই, এটা তো কোন যুক্তির কথা নয়। এটা মনে রাখা জরুরি যে, সরকার যারই বা যে দলেরই হোক না কেন রাষ্ট্র কিন্তু সকলের। তাই, সকলের রাষ্ট্রকে কতিপয় লোক পেটাবে কিংবা খুন করবে, তাও একটি অন্যায্য, অন্যায়, ধৃষ্টতা-মূলক, অগ্রহণযোগ্য এবং গণবিরোধী দাবিতে, এটা মেনে নেয়া যায় না। তাই, পুলিশ যেমন রাষ্ট্রের পক্ষে আমাদের জানমালের হেফাজতে নিয়োজিত তেমনি জামায়াত-শিবিরের হাত থেকে পুলিশকে বাঁচানোও আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব কেননা এখানে পুলিশকে বাঁচানোর মমার্থ হচ্ছে রাষ্ট্রকে হেফাজত করা।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

Friday, March 8, 2013

'সেক্যুলার' হওয়ার গৌরবের গরিবিয়ানা

[দৈনিক ইত্তেফাক, ০৯/০৩/২০১৩]
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে সহিংস এবং অমানবিক হামলা চালানো হয়েছে এবং মন্দির-উপাসনালয় যেভাবে ভাঙচুর এবং পোড়ানো হয়েছে, তা একটি ‘গণতান্ত্রিক’ দাবিদার রাষ্ট্রের জন্য এবং ‘সভ্য’ দাবিকার সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত লজ্জার এবং অসম্মানের। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা শাহবাগ-কেন্দ্রীক গণআন্দোলন, দেশব্যাপী তার ক্রমবিস্তার, কাদের মোল্লাসহ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত সাঈদীর বিচার, আটটি অভিযোগ সন্দোতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ফাঁসির রায়, প্রতিক্রিয়া হিসাবে দেশব্যাপী জামায়াত-শিবিরের সিরিয়াল সহিংসতা এবং তাণ্ডব-- এগুলো হচ্ছে অতি-সাম্প্রতিক বাংলাদেশে সংঘটিত ঘটনার পরম্পরা। এর কোন’টার সাথেই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সম্প্রদায়গত কোন ধরণের সম্পৃক্ততা নাই। অথচ জামায়াত-শিবিরের তা-বের অন্যতম প্রধান আক্রমণের লক্ষবস্তু হয়েছে এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়; বিশেষ করে হিন্দ্র সম্প্রদায়ের লোকজন। বিভিন্ন বাড়িতে হামলা, আগুন জ্বালিয়ে ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া, হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি লুটপাট, মন্দির ও পেগোড়ায় হামলা, প্রতীমা ভাংচুর ইত্যাদি হেন কোন ঘটনা নাই যা ঘটানো হয় নাই। কিন্তু কেন? যদি যুক্তির খাতিরে ধরেই নিই, শাহবাগের গণআন্দোলনের জোয়ার লেগেছে সারা বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তরে। বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে, জেলায় জেলায় গড়ে উঠেছে গণজাগরণ মঞ্চ। সেখানে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী-পেশা-বয়স-লিঙ্গ নির্বিশেষে মানুষ যোগদান করেছে এবং সংহতি জানিয়েছে। তাই প্রতিশোধ হিসাবে জামায়াত-শিবির তাদের ওপর হামলা করেছে। কিন্তু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন তো একা সংহতি প্রকাশ করেন নাই। তাই, প্রতিপক্ষকে আঘাত করাই যদি জামায়াত শিবিরের সহিংসতা এবং আক্রমণের মূল লক্ষ্য হয়ে থাকে, সেখানে বেছে বেছে ধমীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন, কেন এ-হিংস্্র জামায়াতী সহিংসতার শিকার হবেন? এ আক্রমণ যে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ, সেটাকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বলে। তাছাড়া, যদি তর্কের খাতিরে ধরেই নিই গণজাগরণ মঞ্চে যুদ্ধাপরাধী-বিরোধী আন্দোলনের সামিল হওয়ার কারণে এ হামলা হয়; সেটাও যুক্তির মানদণ্ডে টেকেনা। কেননা, দেশব্যাপী গণজাগরণ মঞ্চের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করবার বিষয়টি এদেশের আর দশজন নাগরিকের মতই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদের ব্যক্তি-স্বাধীনতার বিষয় এবং ব্যক্তি-মানুষের নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যার সাথে সম্প্রদায়গত সম্পৃক্ততার বা অসম্পৃক্ততার কোন সম্পর্ক নাই। অথচ, বেছে বেছে আঘাত করা হয়েছে এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে। এটা ‘সভ্য’ দাবিকারী এ-সমাজের জন্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্যানভাসার তথাকথিত সুশীল সমাজের জন্য, ‘সেক্যুলার’ বলে গলা-ফাটানো রাষ্ট্রের জন্য এবং সর্বোপরি এদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত পরিতাপের ব্যাপার।

সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পর থেকে জামায়াত-শিবির সারাদেশে নজিরবিহীন তা-ব চালাচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজক হচ্ছে, এ তা-বলীলার অন্যতম প্রধান একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ধর্মী সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা। ইতোমধ্যে, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরিশাল, গাজীপুর, গাইবান্ধা, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজার, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, চাপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর, ও জয়পুর হাটের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন হিন্দু বাড়িতে হামলা, অগ্নি সংযোগ, লুটপাট, মন্দির পোড়ানো, এবং প্রতীমা ভাংচুর করা হয়েছে। মূলত: ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখের পর থেকে এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় জামায়াত-শিবিরের তা-বের হিং¯্রতায় এক ধরণের চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিনতিপাত করছে। রায় ঘোষণার পরপরই শিবিরের ক্যাডাররা চট্টগ্রামের বাঁশখালীর দক্ষিণ জলদি পাড়ায় ২০ টি হিন্দু বাড়িতে হামলা করে অগ্নিসংযোগ করে, লুটপাট করে, ১৭ জনকে মারাত্মভাবে আহত করে এবং দুইজনকে হত্যা করে। ঐ একই দিনে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে দুইটি মন্দির ভাংচুর করে এবং বায়ান্নবাড়ি ও নাপিতবাড়ি এলাকার আটটি হিন্দু বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত করে, নগদ টাকা, মূল্যবান জিনিসপত্র এবং স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যায় জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা। কুমিল্লার বাহ্মণপাড়ায় একটি মন্দির ও প্রতীমা ভাংচুর করা হয়। লক্ষীপুরের রায়পুরের হরিচাঁদ ও গুরুচাদ সেবা আশ্রম ও রাধা গোবিন্দ নামের দু’টি মন্দির পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। বাগেরহাটের মেরেলগঞ্জের দু’টি মন্দিরে হামলা করে মন্দিরের প্রতীমা ভাংচুর করা হয়। বরিশালের গৌরনদীতে গত ০২ তারিখ ভোর রাতে মন্দিরে হামলা করে অগ্নিসংযোগ এবং আটটি প্রতীমা ভাংচুর করা হয়। একই তারিখে গভীর রাতে নেত্রকোনার পূর্বধলায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কয়েকটি মন্দির হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতীমা ভাংচুর করা হয়। লক্ষীপুরের রামগতিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকটি বাড়িতে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ১১ টি দোকানে হামলা করে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়। হবিগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর একই রকম হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট মন্দির পোড়ানো, এবং প্রতীমা ভাঙার ঘটনা ঘটেছে। কক্সবাজারের মহেশখালী এবং ফাঁসিয়াখালিতে মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর এবং প্রায় ২০ টি হিন্দু বাড়িতে লুটপাট করে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা। চাপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে মন্দিরে অগ্নি সংযোগ করে জ্বালিয়ে দেয়া হয় আশেপাশের ঘরবাড়ি। জয়পুর হাটে কড়ই-কাদিপুর গ্রামের দুটি হিন্দু বাড়ি পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দেয় জামায়াত-শিবিরের লোকজন। এরকম অসংখ্য হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, মন্দির পোড়ানো এবং প্রতীমা ভাংচুরের ঘনটা গোটা দেশব্যাপি গণহারে চলছে। কিন্ত কেন? এ জিজ্ঞাসার উত্তর জানাটা জরুরি।

এদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এটাই প্রথম নয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদেরকেই তুলনামূলকভাবে বেশি নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। হিন্দু বাড়িতেই বেছে বেছে আক্রমণ করতো রাজাকার আলবদর বাহিনীর লোকেরা। হিন্দু মেয়েদেরকে ধর্ষণ করাটা ছিলো রাজাকার বাহিনীর একটি প্রায়োরিটি লিষ্টের কাজ। হিন্দু বাড়ি লুট করা, হিন্দুদের সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেওয়া, জোর করে কলমা পড়িয়ে ধর্মান্তরিত করা ইত্যাদি হেন কোন অপকর্ম নাই একাত্তরের রাজাকার-আলবদর কাহিনীর নামে জামায়াতের তৎকালীন সদস্যরা করেনি। যদিও পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার আলবদরদের কাছে হিন্দু-মুসলমান কোন ভেদাভেদ ছিলোনা। তাই, একাত্তরেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে অনেক চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। এতোদিন পর এসে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর জামায়াত-শিবিরের নির্বিচার তা-ব দেখে মনে হচ্ছে যেন সেই একাত্তর আবার ফিরে এসেছে। তখন তো ছিলো পাকিস্তান আমল। কায়েম ছিলো পাকিস্তানি শাসন ব্যবস্থা। কিন্তু আজকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশে কেন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদেরকে সেই একাত্তরের অভিজ্ঞাতার ভেতর দিয়ে জীবন যাপন করতে হবে? একটি ‘উদার’, ‘গণতান্ত্রিক’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র দাবিদার রাষ্ট্রে কেন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কেবল ধর্মীয় সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে উগ্র-সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সহিংস ও হিংস্র আক্রমণের শিকার হতে হবে?

এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে ঐ-ঘটনার সঠিক তদন্ত করে সুষ্ঠ বিচার করবেন-- এরকম একটা প্রতিশ্রুতি দিয়ে এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সমর্থন আদায় করে। ২০০৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং সে কমিটি ২০১১ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ খন্ডে লিখিত একটি রিপোর্টও জমা দেয় কিন্তু এরপর সেটা অন্যান্য তদন্ত কমিটির রিপোর্টের মতই রাজনৈতিক হিমাগারের বর্জ্য হয়ে পড়ে আছে। এভাবেই নির্বাচিত হওয়ার পর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের বিচারের বিষয়টিও অন্যান্য আর দশটি ইস্যুর মত ‘রাজনৈতিক বাকোয়াজে’ পরিণত হয়। ফলে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি অধিকতর সংবেদনশীল বলে জনশ্রুত ও উপস্থাপিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর অসংখ্য আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। রামুর বৌদ্ধমন্দিরের নৃসংস হামলা ও ভয়াবহ অগ্নিসংযোগের দাগ এখনও শুকায়নি। বাতাসে এখনও মন্দিরের পোড়া গন্ধ পাওয়া যায়। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং তাদের যথাযথ নিরাপত্তা বিধানের কথা দূরে থাক, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে বহাল রেখে প্রকান্তরে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করেছে। তাই, সাঈদীর ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবিরের তা-বের লক্ষ্যবস্তু হিসাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর যে আক্রমণ হচ্ছে তার দায় ও দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। কেননা, একদিকে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে সকলের জান-মালের সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, অন্যদিকে ধর্মীয় সংখ্যাগুরুর প্রতিনিধিত্বশীল একটি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিধান করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এটা অত্যন্ত দুঃখের এবং লজ্জার যে, স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদের বিশেষ করে হিন্দু সম্পদ্রায়ের লোকদেরকে এখনও সাম্প্রদায়িক হিংস্রতার আগুনে পুড়তে হয়। সত্যিকার অর্থে, সাম্প্রদায়িকতার আগুনে কেবল ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনই পুড়েনা, সাথে সাথে পুড়ে আমাদের ‘সভ্য-সমাজ’ হওয়ার আইডিনটিটি এবং ‘সেক্যুলার’ রাষ্ট্র হওয়ার গৌরববোধ। সত্যিকার অর্থে স্বাধীনতার ৪২ পছর পরেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এ নিরাপত্তাহীনতা সংখ্যাগুরু সম্পদ্রায়ের জন্য একধরনের ‘সংখ্যাগুরুত্বের’ লজ্জা। সম্প্রতি সংঘটিত এ ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা মূলত: আমাদের ‘সেক্যুলার’ হওয়ার যে গৌরব তার গরিবিয়ানাকেই অত্যন্ত নগ্নভাবে উন্মোচিত করে।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।