Tuesday, April 16, 2013

বৈসাবি : বাঙালির এক ‘খিচুড়ি’ প্রত্যয়

[bdnews24.com, ১৫/০৪/২০১৩]
পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে নববর্ষ বরণের যে ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি দীর্ঘদিন থেকে প্রচলিত আছে তা ‘বৈসাবি’ নামে সমাজে জারি আছে। দেশের ছাপা এবং দৃশ্য (ইলেকট্রনিক) মাধ্যমও সে মোতাবেক বিষয়টিকে আংশিক নয়, সম্পূর্ণ রঙিনভাবে রাষ্ট্র করেছে। ফলে, পাহাড়ি আদিবাসীদের বর্ষবরণের সংস্কৃতি ‘বৈসাবি উৎসব’ নামেই বাজার পেয়েছে। কিন্তু ‘বৈসাবি’ নামে পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোনো ধরনের উৎসবই নেই, নববর্ষ বরণ তো দূরের কথা। বৈসাবিকে পাহাড়ের সকল আদিবাসীদের নববর্ষ বরণের উৎসব নামে চালানো হলেও, এটা বাঙালিদের দেওয়া একটা ‘খিচুড়ি’র নাম!

কেননা, রাষ্ট্র কর্তৃক দলিলকৃত জনতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী স্বীকৃত ১১টি, কারও কারও মতে ১৩টি আদিবাসী জনগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করে। এদের কোনোটিরই বর্ষবরণ উৎসবের নাম ‘বৈসাবি’ নয়। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যারা পুরোনো বছর বিদায় ও নতুন বছর বরণ করবার এ-উৎসবকে বলে বিজু উৎসব, মারমারা বলে সাংগ্রাই, ত্রিপুরারা বলে বৈসুক বা বৈসু, খুমি ও ম্রোরা একে বলে চাংক্রাই, খেয়াং ও লুসাইরা বলে শাংগ্রাই। কিন্তু ‘বৈসাবি’ বলে কোনো উৎসবের কথা পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কোনো ধরনের সাংস্কৃতিক উৎসবের ইতিহাসে পাওয়া যাবে না।

এটা মূলত বাঙালির ‘ইমপোজিশন’ (চাপিয়ে দেওয়া তকমা) যা কোনোভাবেই পাহাড়ের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে লালিত পুরোনো বর্ষবিদায় ও নববর্ষ বরণের সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না। অধিকন্তু, বাঙালির আবিষ্কার করা এ খিচুড়ির মধ্যে রয়েছে একধরনের আধিপত্যের রাজনীতি, পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর নিজেদের মধ্যকার অসম ক্ষমতার সম্পর্কের উপস্থাপনা এবং জনতাত্ত্বিক সংখ্যাগুরুত্ব বনাম সংখ্যালঘুত্বের বাঙালি-সৃষ্ট সীমারেখার নিষ্ঠুর ক্যাটেগরাইজেশন (বর্গীকরণ)।

তাই, বৈসাবি-বৈসাবি করে উল্লাস করবার মধ্য দিয়ে, সংবাদ-মাধ্যমের মেধাহীন সম্প্রচারের ভেতর দিয়ে পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে একদিকে যেমন খণ্ডিত ও বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে; অন্যদিকে, এ উপস্থাপনার ভেতর দিয়ে পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার অদৃশ্য ‘এক্সক্লোশন’ (বাদকরণ) এবং ‘ইনক্লোশনের’ (আত্মীকরণ) রাজনীতিকে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। ফলে, এ জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে লালিত বর্ষবরণের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক উৎসবকে ‘বৈসাবি’ নাম দিয়ে ফলাও করে রাষ্ট্র করা হচ্ছে। বাঙালি শহুরে নাগরিক মধ্যবিত্তের বিনোদনের লিষ্টে কেবল কিছু নতুন উপাত্ত সংযোজিত হচ্ছে; কিন্তু আখেরে পাহাড়ি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী কারও কোনো লাভ হচ্ছে না। বরং ক্ষতির তলানি ক্রমান্বয়ে অতল হয়ে উঠছে।

এদেশের সংবাদপত্রে এবং প্রচার মাধ্যমে বাঙালি-সৃষ্ট খিচুড়ি বৈসাবি যেভাবে প্রচারিত হয়, সেটা বেশ রসালো এবং চমকপ্রদ। যেমন ‘পাহাড়ের বৈসাবি উৎসব শুরু’, ‘ফুল ভাসিয়ে পাহাড়ে বৈসাবি উৎসব শুরু’, ‘বৈসাবির রঙে সেজেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম’, ‘পাহাড়ে বৈসাবি উৎসবে মাতোয়ারা’, ‘বৈসাবি উৎসবে ভাসছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা’, ‘তিন পার্বত্য জেলার বৈসাবি উৎসব শুরু’ প্রভৃতি।

এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনে ‘বৈসাবি’ বলে কোনো উৎসব না-থাকলে সব জায়গায় ‘বৈসাবি উৎসব’ লিখে এটাকে রাষ্ট্র করা হয়। যুক্তি হিসেবে দাঁড় করানো হয়, ত্রিপুরাদের বৈসুক বা বৈসু উৎসবের আদ্যক্ষর ‘বৈ’, মারমাদের সাংগ্রাই উৎসবের ‘সা’ এবং চাকমাদের বিজু উৎসবের ‘বি’ নিয়ে এ নামকরণ করা হয়।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, পাহাড়ের আরও অন্যান্য যে আদিবাসী জনগোষ্ঠী আছে তারা কি নববর্ষ বরণ উৎসব করে না? খুমি, ম্রো, খেয়াং, লুসাই, পাঙখোয়া, চাক, বম এবং তঞ্চঙ্গ্যা জাতিগোষ্ঠীর কি কোনো স্বতন্ত্র নববর্ষ উৎযাপনের রীতি-রেওয়াজ-সংস্কৃতি নেই? অবশ্যই আছে; কিন্তু সেটা পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যকার যে জনতাত্ত্বিক কম্পোজিশন বা বিন্যাস এবং সেখানে পাহাড়ি সংখ্যাগুরুত্বের যে আধিপত্য, সেই অসম-সম্পর্কের ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামোয় অন্যান্য পাহাড়ি সংখ্যালঘু আদিবাসী জনগোষ্ঠী আপনা-আপনিই বাদ পড়ে যায়।

তাছাড়া, শহরের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ, শিক্ষার ক্রম-প্রসার, পেশাজীবী শ্রেণির বিকাশ, স্বচ্ছল অর্থনৈতিক-অবস্থা, আঞ্চলিক ও জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে যোগাযোগের মাত্রা, প্রচলিত উন্নয়ন-ডিসকোর্সের কাঠামোয় নিজেদের অবস্থান এবং নিজের কথা নিজের মতো করে বলবার ক্ষমতা কিংবা অক্ষমতার মাপকাঠিতে চাকমা, মারমা এবং ত্রিপুরার তুলনায় পিছিয়ে আছে অন্য পাহাড়ি আদিবাসীরা। এই তথাকথিত ‘বৈসাবি’ উৎসবের ‘বৈসাবি’ শব্দবন্ধে পিছিয়া পড়া জেনগোষ্ঠী তাই আপনা-আপনিই মাইনাস হয়ে যায়।

কিন্তু এ-মাইনাস ফর্মূলা (বাদবাদের সূত্র) যতটা না পাহাড়ের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব, ততোধিক বাঙালিদের চাপিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক কূটনীতি, যাকে একাডেমিক পরিভাষায় বলা হয় ‘পলিটিক্যাল ইম্পেজিশন’।

কীভাবে নতুন বর্ষ বরণ করা হবে, পুরোনো বর্ষকে বিদায় জানানো হবে এবং নতুন বর্ষের কাছে তাদের চাওয়া-চাহিদা এবং আকাক্ষাকে প্রকাশ করবে– পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর প্রত্যেকেরই এর নিজস্ব ধরন ও রীতি রয়েছে। সে মোতাবেক তারা সেটা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে। নিজ নিজ সাংস্কৃতিক ঘরানায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন বর্ষকে উৎযাপন করবার স্বতন্ত্র এই রূপ ও সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত আছে।

সেটা যেহেতু একান্তই তাদের নিজেদের মধ্যে নিজেদের স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনায় পালিত হত সেহেতু সেটার মধ্যে সৌন্দর্য, মাদকতা এবং স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনুরণন ছিল। এমন কী বাঙালি নববর্ষ উদযাপনের বহু আগে থেকেই একান্ত নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঘরানায় পাহাড়িরা বর্ষবরণের উৎসব করে এসেছে।

প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় এখানে উল্লেখ্য যে, মোঘল সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকে বাংলা বর্ষপঞ্জির যাত্রা শুরু; এবং তখন থেকেই বাংলা নববর্ষ পালনের রেওয়াজ চালু হয়। মূলত ভারতবর্ষে মোঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর থেকে হিজরি সন অনুসরণ করে কৃষি-খাজনা আদায়ের সংকট থেকে বাংলা বর্ষপঞ্জি আবিষ্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কেননা হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় কৃষি-ফসলের সঙ্গে তার অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। সে অসামাঞ্জস্য দূর করার জন্য সম্রাটের আদেশে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোর্তিবিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌর সন এবং আরবী হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে একটি ‘ফসলী সন’ হিসাবে বাংলা সনের নিয়ম নির্মাণ করেন।

১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হলেও, এ গণনা পদ্ধতি কার্যকর হয় সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। মূলত সম্রাট আকবরের আমল থেকেই বাংলা নববর্ষ পালনের রীতি শুরু হয় কিন্তু সেটা ছিল প্রধানত হালখাতা খোলার উৎসব যা সময়ের পরিক্রমায় আজকের এ বিপুল রূপ ধারণ করেছে।

আর পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বর্ষবরণের রীতি-রেওয়াজ সর্ম্পূণ ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে উঠে। পাহাড়ি জীবন মূলত ঋতুকেন্দ্রিক, তাই ঋতুর আগমন এবং বিদায় এ মানুষদের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো বছরের বিদায় এবং নতুন বছরের আগমন এবং সে বিদায়-বরণ কেন্দ্র করে নানা ধরনের রিচুয়্যাল বা রীতি-নীতি পাহাড়ি জীবন-ব্যবস্থার অংশ। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ জীবন-ভাবনা, আনন্দ, নতুনকে বরণের আন্তরিক আয়োজন ও সাংস্কৃতিক উৎসব।

কিন্তু বাঙালির নজর পড়ার পর থেকে পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বর্ষবরণের রূপ, রস, গন্ধ, উপস্থাপনা এবং ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবতন ঘটেছে। এখন উৎসবের চেয়ে আয়োজন বেশি, আয়োজনের চেয়ে দেখানোপনা বেশি, আর দেখানোপনার চেয়ে ভোগ-প্রবণতা বেশি। বাংলাদেশের মিড়িয়ার বেপরোয়া বিকাশের সূত্র ধরে আদিবাসীদের বর্ষবরণ উৎসব কেবল এখন আর তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক মাধুর্যে পালন করবার কোনো ঋতুকেন্দ্রিক সংস্কৃতি নয়, এটা এখন বাঙালি শহুরে নাগরিক মধ্যবিত্তের বিনোদনের মাধ্যমও বটে!

শহরের নাগরিক মধ্যবিত্তের মৌসুমি বাঙলা নববর্ষ বরণের সামগ্রিক আয়োজনে পাহাড়ের নববর্ষ বরণের রঙিন উপস্থাপনা তাদের মধ্যে একধরনের আদিমতার গন্ধ সরবরাহ করে। আর এ সরবরাহের মধ্যে একধরনের ‘বুনো’ আস্বাদ পাওয়া যায় বলে মিড়িয়া সেটা বেশ আয়োজন করে প্রচার করে। ফলে, আদিবাসীদের বর্ষবরণের যে সাংস্কৃতিক নিজস্বতা, সেটা আর অটুট নেই। নগরকেন্দ্রিক কর্পোরেট সংস্কৃতির বিকাশের বাহন হিসেবে বাংলাদেশের মিড়িয়া এসব অনুষ্ঠানকে ‘বৈসাবি’ হিসেবে বেশুমার প্রচার করেই চলেছে। বাজার সে মোতাবেক জারি রাখবার বিষয়টি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছে।

এটা সত্য যে, বাঙালি নববর্ষ উৎযাপনের পরিধি, ব্যাপকতা এবং উচ্ছ্বলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকতারও নানা রূপান্তর ঘটেছে। আগমণ ঘটেছে বেনিয়া-গোষ্ঠীর। সর্বগ্রাসী বেনিয়ারা দেশের ইতিহাস, ঐহিত্যকেও ব্যবসার পণ্য বানাবে এটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। শহুরে নাগরিক মধ্যবিত্তের ব্যস্ত জীবন-ব্যবস্থার ফাঁকে এক টুকরো বাঙালিপনার হাতছানি কিংবা মৌসুমি বাঙালি হওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে চলছে নববর্ষ-কেন্দ্রিক ব্যাপক ব্যবসায়িক আয়োজন। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর দ্বারা প্রতিযোগিতামূরকভাবে নববর্ষের অনুষ্ঠানকে তাদের পণ্য প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা ব্যাপক হারে বাড়ছে। ছাপা এবং দৃশ্য মাধ্যমও সমান তালে পাল্লা দিয়ে নববর্ষের আবেগ এবং আয়োজনকে ধারণ করবার প্রতিযোগিতায় নামে।

ফলে, আবেগের চেয়ে আয়োজনের পাল্লাই ভারি হয়ে উঠে। পাহাড়ের বর্ষবরণও এ সর্বগ্রাসী থাবার বাইরে থাকেনি। বহুজাতিক কোম্পানি এখন পাহাড়ের বর্ষবরণের নানা অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক। বাঙালির নজর পড়া কিংবা মিড়িয়ার রসালো উপস্থাপনার পাশাপাশি, বেনিয়ার থাবার কারণেও পাহাড়ের বর্ষবরণের জৌলুস তার নিজস্বতা হারাচ্ছে।

তাছাড়া, পাহাড়ের বর্ষবরণের রীতি ও সংস্কৃতিকে বাঙালির নিজস্ব বর্ষবরণের সঙ্গে মিলিয়ে এবং মিশিয়ে ভাববার এবং উপস্থাপনা করবার প্রবণতা এবং অনুশীলনের মধ্য দিয়ে, এ জনগোষ্ঠীর সার্বজনীন বর্ষবরণ উৎসব খণ্ডিত ‘বৈসাবি’ রূপ ধারণ করেছে। সুতরাং কোনো কিছুই আজ পুঁজি আর পুঁজির থাবার বাইরে নেই।

এখানে মনে রাখা জরুরি যে, বাইরের চাপিয়ে দেওয়া কোনো ডিসকোর্সই নিরপরাধ কিংবা নিঃস্বার্থ নয়। তাছাড়া যাদের ওপর এ ডিসকোর্স চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তারা সেটাকে কীভাবে নিচ্ছে কিংবা এ-প্রক্রিয়ায় তাদের মনোভঙ্গি কী সেটা জানাও জরুরি। সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উৎসবকে নিজের মতো করে উপস্থাপন করা একধরনের রাজনৈতিক কূটিলতা। তেমনি এ জাতিগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রীয় ডিসকোর্সের ভেতর দিয়ে অন্যের বিনোদনের উপাত্ত হিসেবে বাজারে সেল করাও একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা।

এ থেকে আমরা যত দ্রুত বের হয়ে যেতে পারব, তত পাহাড়ি আদিবাসী ও সমলের বাঙালি উভয়ের লাভ। কেননা, ভিন্ন সংস্কৃতিকে যথাযথ সম্মান ও সুরক্ষার মধ্যেই নিজের সংস্কৃতির মাহাত্ম্য নিহিত থাকে।

Saturday, April 13, 2013

রাজনীতির অতি-গতি বনাম সমাজের দুর্গতি

[দৈনিক ইত্তেফাক, ১৪/০৪/২০১৩]
সমাজ ও রাজনীতি পরষ্পরের অনুষঙ্গ। ফলে, সমাজ যেমন রাজনীতির বাইরের কিছু নয়, রাজনীতিও সামাজিক রীতি-নীতি ও বিধি-ব্যবস্থার বিযুক্ত কিছু নয়। তাই, রাজনীতি যেমন সমাজের গুণগত পরিবর্তনে অনুঘটকের কাজ করে, তেমনি সমাজও রাজনীতির চরিত্র, এজে-া এবং প্রক্রিয়া নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। এভাবেই রাজনীতির ভেতর দিয়ে সমাজ এগিয়ে যায় কিংবা পিছিয়ে যায় আবার সমাজের ইতিবাচক বিকাশের ভেতর দিয়ে রাজনীতির উৎকর্ষায়ণ ঘটে। এই পারষ্পরিক মিথষ্ক্রিয়ায় দু’টো দু’টোর চলক এবং চালকের ভূমিকা নিয়ে চালিত হয়। কিন্তু অবস্থা, এজেন্ডা এবং কার্যকারণ ভেদে, একটা অতি গতি অন্যটার দুর্গতিরও কারণ হতে পারে। সম্প্রতি বাংলাদেশে সংঘটিত কিংবা চলমান রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের ভেতর দিয়ে এদেশের সমাজ-জীবনে একটি বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে এবং সেটা অদ্যাবধি জারি আছে। এবার ভূমিকার সদর থেকে আলোচনার অন্দরমহলে যাওয়া যাক।

সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক গতিশীলতার দেশ পৃথিবীতে বিরল। রাজনীতির ময়দানে এজেণ্ডা, খেলোয়াড় এবং দর্শকের চরিত্র, চিন্তা, ভূমিকা ও সমর্থনের র‌্যাডিক্যাল পরিবর্তনের এতো বৈচিত্র নিকট অতীতের সীমানায় দেখা যায় না। ফলে, যেহেতু রাজনীতির আবহাওয়ায় সকাল-বিকাল ঋতু পরিবর্তিত হয়, সেহেতু সাধারণ মানুষের পক্ষে রীতিমত মুশকিল হয়ে উঠে নিজের রাজনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক নিশানা এবং রাজনৈতিক কেবলা ঠিক করা। সকল রাজনৈতিক পক্ষ নিজের স্বপক্ষে জনসমর্থনের দাবি করলেও জনগণ আদৌ কোন পক্ষকে সমর্থন করে কিনা সেটা মাপ-ঝোঁক করবার সর্বজন গ্রাহ্য কোন ব্যারোমিটার বাংলাদেশে অদ্যাবধি ব্যবহৃত হয়নি। মাঝে মাঝে বিভিন্ন সংবাদপত্রের মাধ্যমে জনমত জরিপের একটা হিড়িক পড়ে তাও নির্বাচন-কেন্দ্রীক। যদিও তাতে নানান হিসাব-নিকাশের হেরফের থাকে কিন্তু এসকল জরিপের ভেতর দিয়ে জনমতের একটা আলামত পাওয়া যায়। তাই, রাজনীতির ময়দানের সাম্প্রতিক সময়ের এতো দ্রুত পরিবর্তনের সাথে মানুষ নিজেকে কতোটা খাপ খাওয়াতে পারছে এবং রাজনীতির গতি প্রকৃতির উপলব্দির জায়গা থেকে নিজের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সমর্থন কতোটা চিন্তা-জাত হয়ে নিতে পারছে, সেটা একটি বিরাট জিজ্ঞাসা।

যদিও রাজনীতির সকল পক্ষই জনসমর্থনের দাবিদার কিন্তু বাস্তবতা প্রকৃতার্থে ভিন্ন। যারা সরাসরি দলীয় রাজনীতি করেন, তাদের কথা আলাদা কেননা তাদের সমর্থনের মোহনা এবং রাজনৈতিক অবস্থানের কেবলা “প্রি-ডিফাইন্ড” বা পূর্ব নির্ধারিত। তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সবধরণের ভালোমন্দ বিবেচনাবোধের উর্ধ্বে। নিঃশর্ত দলীয় আনুগত্যই তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ধের মাপকাঠি। কিন্তু যারা কোন দলীয় রাজনীতি করেন না কিংবা রাজনৈতিক সমর্থন এবং কোন রাজনৈতিক ইস্যুতে যাদের অবস্থান পূর্বনির্ধারিত নয় কিন্তু দেশের চলমান রাজনীতির গতিপ্রবাহের ওপর সচেতন মনোযোগ রেখে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ঠিক করেন, তাদের জন্য দেশের রাজনীতির ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে সকাল-বিকাল লেফ্ট-রাইট করা কিছুটা কষ্টকর। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে/বন্ধে জামায়াতের উন্মত্ততা, কাদের মোল্লার অসন্তুষজনক রায়, এদেশের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশের উদ্যোগে ও নেতৃত্বে গণজাগরণ মঞ্চের জন্ম, গোটা দেশব্যাপি সমাজের বিপুল একটা অংশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক জাগরণ, গণজাগরণ মঞ্চকে মোকাবেলা করবার তরিকা হিসাবে আস্তিক-নাস্তিকের বেহুদা বিতর্ক, হেফাজতে ইসলামের ঝড়ো আগমন এবং নির্গমণ, তের দফার নামে কিছু “প্রিমিটিভ ডিমান্ড”, এবং এ তের-দফাকে কেন্দ্র করে সমাজের মধ্যে জেগে উঠা ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরোধ, বিএনপির অর্থহীন গণ-হরতাল, সর্বশেষ মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতার প্রভৃতি হচ্ছে অতি সাম্প্রতিক কালে এদেশে সংঘঠিত রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের পরম্পরা। সব মিলিয়ে ঝড়ের গতিতে প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলো কিংবা সংবাদপত্রের লিড-আইটেম পরিবর্তনের প্রতিযোগিতায় দেশের রাজনৈতিতে তুমুল গতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু রাজনীতির এ অতি-গতিশীলতা যে দেশের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে যে চরম দুর্গতি বয়ে নিয় আসছে, সেটা আমাদের সবকিছুকে অতি রাজনীতিকীকরণের বহুল চর্চিত প্রবণতা কারণে লোকচক্ষুর আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি, উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প-কারখানা, সাধারণ শ্রমজীবী গণমানুষের নিত্যদিনের আয়-রোজগার ও স্বাভাবিক জীবন ব্যবস্থার যে নিয়মিত-গতিশীলতা সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক অতি-গতিশীলতা তাকে ক্রমান্বয়ে মন্থর করে দিচ্ছে। কিন্তু সেদিকে কি কারো নজর আছে? কী সরকারি দল, কী বিরোধী দল! আমাদের কি এখন সেদিকে একটু নজর দেয়া উচিত নয়?

অনেকেই বলে থাকেন, বিগত কয়েক মাসে দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরী হয়েছে, সেটা মূলত গণজাগরণ শঞ্চকে কেন্দ্র করেই। একথার মধ্যে সত্যতা থাকলেও, গণজাগরণ মঞ্চের কারণে রাজনৈতিক নৈরাজ্য ও অস্তিরতা তৈরী হয়েছে, একথা সত্য নয়। কোন কিছুকে “কেন্দ্র” করে হওয়া আর “কারণে” হওয়া এক কথা নয়। এটা উদোর পিন্ডি বুঁদোর ঘাড়ে চাপানো চেষ্টা। একথা সত্য যে, একাত্তরের একটি অমীমাংসিত বিষয়ের ফয়সালার অংশ হিসাবে এদেশের এক বিপুল জনগোষ্ঠীর সমর্থন নিয়ে গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষ থেকে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করা হয়েছে, ইতিহাসের দায়মুক্তির প্রশ্নে সেটার যথেষ্ট ন্যায্যতা রয়েছে। কিন্তু অবশ্যই সেটা স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হতে হবে এবং সে প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চকে মোকাবেলা করবার নানান রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে বিগত কিছুদিন ধরে দেশে যে একটি অস্বাভাবিক অবস্থা তৈরী করা হয়েছে, সেটা অত্যন্ত অনাকাক্সিক্ষত। কেননা, সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে দেশ ও দশের নিরাপদ জীবন-যাপনের যে স্বাভাবিক গতিশীলতা সেটাকে অটুট রাখবার চিন্তা সংযুক্ত থাকা বাঞ্চনীয়। কিন্তু সেটা ঘটেনি। সারাদেশে একটা রাজনীতি রাজনীতি খেলা শুরু হয়ে গেছে। এদেশের সাধারণ মানুষের জীবন-যাপন ব্যবস্থার নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে কারও কোন ধরনের উদ্বেগ নাই। তাই, রাজনীতির মাঠের সকল খেলোয়াড়রা এবার রাজনীতি রাজনীতি খেলা বন্ধ করেন। গণজাগরণ মঞ্চ শুরু থেকেই নানা সৃজনশীল কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের আন্দোলনের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখছিলো এবং একটা পর্যায়ে সেটা অনিয়মিত করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চালিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলো। কিন্তু নানান রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে গনজাগরণ মঞ্চকে মোকাবেলা করবার চেষ্টার প্রতিক্রিয়া হিসাবে গণজাগরণ মঞ্চও নতুন কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত হয়। সেটাও অনেকের কাছে অনাকাক্সিক্ষতই ছিলো। তাই, গণজাগরণ মঞ্চকে দলীয় রাজনীতির ফ্রেইমওয়ার্কে ভোটের রাজনীতির সাথে মিশিয়ে, পক্ষে কিংবা বিপক্ষে, আর খিঁচুড়ি না-পাকানোতেই সবার মঙ্গল। গণজাগরণ মঞ্চের রাজনীতি মহান মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতি। একাত্তরের চেতনার পুনরুদ্ধারের রাজনীতি। এটাকে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপির কিংবা চৌদ্দ বনাম আঠার দলের ভোটের রাজনীতির মারপ্যাচেঁ ফেলে আর টানাটানি না-করার মধ্যেই রাজনীতি এবং সমাজ উভয়ের জন্যই কল্যাণকর। গণজাগরণ মঞ্চকে তার স্বতন্ত্র চরিত্র নিয়ে নিজের মতো চলতে দেন। গণজাগরণ মঞ্চ যদি নিজের মতো করে চলতে পারে, সমাজের স্বাভাবিক গতিশীলতার কোন ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা না। রাজনীতিবিদরা বরঞ্চ সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন করে কীভাবে গতিশীলতা আনা যায় তা নিয়ে নতুন কোন রাজনীতি শুরু করেন। কেননা, অতি রাজনীতির অতি গতিশীলতা সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্গতির পরিবৃদ্ধি ঘটায়। কারণ বাংলাদেশের মতো দেশে রাজনীতির অতি-গতি আর সমাজের দুর্গতি “চলে যুগলে, বগলে বগলে”।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

ইতিহাসের অভিজ্ঞতা নতুন ইতিহাস সৃষ্টির জন্য জরুরি

[দৈনিক ভোরের কাগজ, ১২/০৪/২০১৩]
বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির ক্যানভাস বেশ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের নানান উপসর্গ, অনুসর্গ, অনুঘটক, ক্রীড়নক এবং নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা, গুরুত্ব, দাপট এবং আধিপত্য অতিদ্রুত এক কোর্ট থেকে অন্য কোর্টে চালান হচ্ছে। ফলে, রাজনীতি যেহেতু অর্থনীতি ও সমাজ-জীবনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে, সেহেতু রাজনীতির এ-দ্রুত পরিবর্তন-প্রবণতা সমাজের নানান অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানুগুলোতেও এক ধরনের টেনশন তৈরী করছে। সব মিলিয়ে বেশ, ডাইনামিক সময়ের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ তার দিন গুজার করছে।
তবে, কয়েকজন ব্লগারদেরকে গ্রেফতারের সূত্র ধরে সাইবার-দুনিয়ার প্রতিক্রিয়া, হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ/সমাবেশ, তার সাথে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির একাত্মতা প্রকাশ, হেফাজতের তের দফা দাবিনামা, এবং বর্তমান সরকারের ক্রমপরিবর্তনশীল আচরণ সব মিলিয়ে এই রাজনৈতিক ‘ডাইনামিজমের’ জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, হেফাজতের আন্দোলনকে সামাল দিতে গিয়ে শাহবাগ আন্দোলনের ব্যাপারে সরকারের বিপ্রতীপ ভূমিকার কারণে, শাহবাগের আন্দোলনকারী এবং তাদের নিঃশর্ত সমর্থনকারীরা নানান কর্ণার থেকে নানা মুখী তীর্যক বাক্যবাণে আক্রান্ত ও জর্জরিত হচ্ছে। সেটা খুব অস্বাভাবিকও কিছু নয়। কেননা, শাহবাগ আন্দোলনের শুরু থেকেই বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের নিঃশর্ত সমর্থন কারও কারও মনে এমন সন্দেহের উঁকি দিয়েছিলো যে, শাহবাগ আন্দোলন মনে হয় সরকারের প্রত্যক্ষ ইঙ্গিতে চলছে। বিএনপি তো রীতিমতো রুটিন করে বলতে শরু করেছিল যে, ‘শাহবাগের গণআন্দোলন মূলতঃ আওয়ামী লীগের সাজানো নাটক।’ কিন্তু হঠাৎ করে সরকারের এ “সখি থেকে সতিন” হয়ে উঠ্বার উপসর্গ ও অনুসর্গ স্বাভাবিক হিসাব-নিকাশের নিক্তিকে মাপা না-যাওয়ায় নানান কথা বলা শুরু হয়ে গেছে। এমন কী, যারা শাহবাগের শুভাকাক্সক্ষী এবং শাহবাগের আবেগের সাথে শুরু থেকে ছিলেন, তারাও নানা অষ্পষ্টতার এবং আশাহতের বেদনা দিয়ে দিনতিপাত করছেন। আর যারা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেও যারা শাহবাগের আন্দোলন এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা নানা সমালোচনায় লিপ্ত ছিলেন, তাদের যেন মেঘ না-চাইতেই জল পাওয়ার মত অবস্থা। “বলেছিলাম না, আওয়ামী লীগের কোন চরিত্র নাই। জামায়াতের সাথে তলে তলে লাইন মারে। শাহবাগীদের সমর্থনের কলা দেখিয়ে নির্বাচনী বৈতরনী পার হওয়ার ধান্দা করেছিলো। শাহবাগীদেরকেও আওয়ামীলীগ ভোট ব্যাংক হিসাবে আমলে নিয়েছিলো। আসলে, আওয়ামী লীগ সমর্থন দেয় নাই, সুযোগ নিয়েছিলো। এখন নিশ্চয় মোহ ভেঙেছে।”- এ জাতীয় বক্তব্য এখন ফেইসবুকে, টুইটারে আর বিভিন্ন ব্লগের অসংখ্য ষ্ট্যাটাসে পাওয়া যাবে। অনেকে বলছেন “শাহবাগীরা এখন কী পেলেন। মাঝখান দিয়ে কিছু ব্লগারের জেল আর বাকী অনেকে জেলে যাওয়ার সম্ভাবনা দিয়ে দিনতিপাত করছেন। শাহবাগীদের কী দিলো এ সরকার। ধোঁকা।”

কিন্তু আমি বলবো, শাহবাগের সংগঠক এবং তাদের নিঃস্বার্থ সমর্থনকারীরা কোন কিছু প্রাপ্তির প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে নামেন নাই। দেশকে অকৃত্রিম ভালোবাসার টানে ইতিহাসের দায় মুক্তির ডাকে যুগের যন্ত্রণা বুকে ধারণ করে তারা রাস্তায় নেমেছে এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমবেত হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে। ক্ষমতার হালুয়া-রুটির ভাগ-বাটোয়ার হিস্যা নিতে নয়। তাই, যেহেতু সরকারের কাছে কোন কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা ছিলো না সেহেতু না-পাওয়ার বেদনাও নাই। তাই বলে, সরকারের সাম্প্রতিক ভূমিকায় বিলাপ করবারও কিছু নাই। কেননা, বুর্জোয়া রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় শাসক শ্রেণী কখনই জনগণের আবেগ এবং আকাক্সক্ষার পাশে থাকেনা। তাছাড়া, “রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ” কিংবা “রাষ্ট্র হচ্ছে জনগণের” এসব ভাববাদি দার্শনিকতা কাগজের কথা কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে রাষ্ট্র সবসময় জনগণের বিপক্ষের শক্তি। যুগে যুগে সাধারণ গণমানুষের আন্দোলনের ইতিহাস সে স্বাক্ষ্য বহন করে। কেননা ক্ষমতার কেন্দ্রী-করণের ভেতর দিয়ে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং একবিংশ শতাব্দীর চলমান সময়ে রাষ্ট্র কেবল শাসক শ্রেণীর স্বার্থকে রক্ষার জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে। তাছাড়া, রাষ্ট্র নিজ থেকেই জনগণকে মুখে তুলে কিছু খাইয়ে দেয়না। ইতিহাসের কোন কালে রাষ্ট্র জনগণের পাশে কিংবা জন-আকাঙ্ক্ষার পাশে স্ব-উদ্যোগে এসে দাঁড়িয়েছে, সে রকম কোন নজির নাই। জনগণই তার বিপ্লব-বিদ্রোহ কিংবা প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আন্দোলনের ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রকে তার করণীয় করতে বাধ্য করেছে। শাহবাগ রাষ্ট্র এবং জনগণের এ দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের ব্যকরণে জনগণের পক্ষের শক্তি হিসাবে কালের একটি বিশেষ সময়ে হাজির হয়েছে। এবং আমরা যারা দেশকে অন্তরের গভীর থেকে ভালোবাসি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মতাদর্শের অঙ্গ হিসাবে লালন করি এবং একটি ধর্ম-নিরপেক্ষ-সাম্যবাদি সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি, তারা শাহবাগ আন্দোলনের ভেতরে নিজের অন্তরের অকথিক বক্তব্যের অনুরণন দেখতে পেয়েছি। তাই, আমরা শাহবাগের সাথে সর্বান্তকরণে শামিল হয়েছি এবং শাহবাগকে অন্তরের গভীর মমতায় ধারণ করেছি। সুতরাং সরকারের হঠাৎ করে উল্টে যাওয়ার সাথে সাথে শাহবাগের আন্দোলন নিয়ে হা-হুতাশ করে বিলাপ করবার ন্যায্য কোন কারণ নাই। বরঞ্চ এখানে দু’টি বিষয় ষ্পষ্ট হয়েছে যা হওয়াটা জরুরি ছিলো। প্রথমত বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থায় জন-আকাক্সক্ষা যে সব-সময় রাষ্ট্র কতৃক অনাদৃত হয়, সেই ঐতিহাসিক ও দার্শনিক সত্যটি ‘শাহবাগ গণআন্দোল ও সরকারের আচরণের ভেতর দিয়ে’ নতুন করে আমাদের সামনে এসে হাজির হয়েছে। দ্বিতীয়ত মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি হিসাবে জারি থাকা আওয়ামী লীগ যে প্রয়োজনে নিজের অস্তিত্বের সাথে আপস করতে পারে, ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নেও দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থের উর্ধ্বে উঠতে পারেনা, সেটা নতুন করে প্রমাণিত হয়েছে। গণজাগরণের সাথে, এদেশের প্রগতিশীল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লালিত নতুন প্রজন্মের আবেগকে অসম্মান করবার ফল যে ভালো হয়না, সেটা অনাগত ইতিহাসের বিলাপে ভেতর দিয়ে লিখিত হবে। কিন্তু সমস্যা এখানেই যে, যখন উপলব্ধির সময় হাজির হবে, তখন ইতিহাসের সময় পার হয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের দুঃখটা এখানেই যে, তিরিশ লক্ষ শহীদের দীর্ঘশ্বাস এবং দু’লক্ষ মা-বোনের বেদনাময় আত্মচিৎকারের অভিশাপ আমাদের আরো অনেকটা সময় বয়ে বেড়াতে হবে।
এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যে শক্তি এবং সে শক্তি কীভাবে একটি স্বতস্ফুর্ত গণআন্দোলন জন্ম দিতে পারে, সেটা শাহবাগ আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ইতিহাসে ইতোমধ্যে উজ্জ্বল উদাহারণ হিসাবে দাপটের সাথে জায়গা করে নিয়েছে। শাহবাগের জন্ম, শাহবাগের গণআন্দোলনের বিস্তার, হেফাজতের ইসলামের আবির্ভাব এবং শাহবাগ ও হেফাজতের ইসলামকে হ্যান্ডেল করবার বিষয়ে সরকারের ‘ইউ-টার্ন’ পলিসি ইতিহাসের বিশেষ বাঁকে এসে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্দীপ্ত এদেশের নতুন প্রজন্মের ভাবনা ও বিশ্বাসের রাজনৈতিক পরিশুদ্ধির জন্য জরুরি ছিলো। সমাজের গণমানুষের আকাঙ্কা বাস্তবায়নের লড়াইয়ের প্রধান এবং প্রাথমিক কাজ হচ্ছে শত্রু-মিত্র নির্ধারণ করা। অতিসাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনা-প্রবাহের ভেতর দিয়ে মূলতঃ নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা, একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা, নারীর ক্ষমতায়ন ও একটি প্রাগ্রসর সমাজ-ভাবনার শত্রু ও মিত্রের ভেদ রেখা নতুন করে উন্মোচিত হয়েছে। এটা আগামীর যে কোন গণআন্দোলনের জন্য পুঁজি হিসাবে জমা থাক। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা নতুন ইতিহাস সৃষ্টির জন্য একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাত্ত।  

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।