Saturday, May 11, 2013

ব্যক্তির শাস্তিই যথেষ্ট নয়, চাই ব্যবস্থার রূপান্তর

[দৈনিক ইত্তেফাক, ০৪/০৫/২০১৩]

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তৈরী পোশাক শিল্পের বিপুল বিকাশ মূলতঃ শ্রমিক শ্রেণীর লাশ এবং রক্তের উপর ভর করেই গড়ে উঠেছে। ফলে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, তৈরী পোশাক শিল্পের পরিবৃদ্ধি এবং শ্রমিকের লাশের সংখ্যাতাত্ত্বিক প্রবৃদ্ধি কার্যত সমান্তরালে বেড়ে উঠেছে। পোশাক কারখানার ভেতরে আগুণে পোড়া লাশ, বিদ্যুতের শর্ট সার্কিটে আটকে যাওয়া লাশ, কারখানার ভবন ধ্বসে পড়া দেয়ালের নিচে চাপা পড়া লাশ, হুড়োহুড়ি করে জীবন বাঁচাতে গিয়ে পায়ে তলায় দলিত হওয়া লাশ, জীবন-বাচাঁনোর চেষ্টায় চ্যাপ্টা হওয়া লাশ, বন্ধ শেকলের ভেতরে দম-বন্ধ হওয়া লাশ, কিংবা পেটের দায়ে রাস্তায় নেমে পুলিশের গুলি খাওয়া লাশ। এভাবেই লাশের মিছিলে যুক্ত হয়েছে নতুন লাশ, আর তৈরী পোষাক শিল্পের ক্রমান্বয়ে বিকাশ ঘটে! মালিক শ্রেণীর বিকাশ ঘটছে। পোশাক কারখানার সংখ্যা বেড়েছে। সাথে সাথে বেড়েছে শ্রমিকের লাশের সংখ্যা। সম্প্রতি রানা-প্লাজা ধ্বসে পড়ায় সেখানে অবস্থিত পাঁচটি গার্মেন্টেসের শত শত শ্রমিকের মৃত্যু তৈরী পোশাক শিল্পের উত্তর উত্তর সমৃদ্ধি ও বিকাশের কুৎসিত রূপকে আমাদের সামনে আরে একবার নতুন করে উন্মোচিত করেছে। দেয়ালের নিছে চাপা পড়ে মুত্যু-যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে লাশের নিথর দেহ হয়ে বের হয়ে এসেছে এককের পর এক লাশ। দশ, বিশ, পঞ্চাশ, একশ, পাঁচ শত, এক হাজার (নিখোঁজ সহ) লাশ। আরো হাজার শ্রমিক আহত। শত শ্রমিক পুঙ্গু। হাত নাই, পা নাই। জীবন, প্রাণ, হাত, পা সব খেয়ে নিয়েছে তৈরী পোশাক শিল্পের রাক্ষুসে উন্নয়ন। লাশের পর লাশ যখন সাভারের অধরচন্দ্র্র হাইস্কুল মাঠে প্রদর্শিত হচ্ছিল, আমাদের তৈরী পোষাক শিল্প তখন বিকাশের জয়গান করছিল! কত শত শ্রমিকের লাশের ওপর দিয়ে ফুলে ফেঁপে উঠেছে এ তৈরী পোষাক শিল্প, ‘রানা প্লাজার’ ঘটনা আমাদের আরো একবার সেটা চোখে আঙুল দিয়ে মনে করিয়ে দেয়। এদেশের কত কোটিপতির কত অট্টলিকা কত শ্রমিকের লাশের-কংক্রিটে বানানো, কত শ্রমিকের রক্তের সিমেন্টে বানাবো; তার কোন হিসাব নাই। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ তৈরী পোষাক শিল্প রপ্তানি-কারক দেশ হিসাবে যখন বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হয়, এবং দ্বিতীয় হওয়ার কৃতিত্বে এদেশের নেতা-নেতৃরা যখন গৌরবের ঁেঢকুর তোলেন, কিংবা বিজিএমইএ-এর কর্তাব্যক্তিরা যখন পাঁচতারকা হোটেলে বসে সেটা উৎযাপন করেন, তখন এ-পোষাক শিল্পের শ্রমিকদের লাশের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। রাষ্ট্র তখন ‘ক্ষতি পুরণের’ সেই বহু পুরোনো কীর্তন গায়। একের পর এক গার্মেন্ট্সে আগুণ লাগছে, একের এক মানুষ পুড়ে কয়লা হচ্ছে, একের পর এক ভবন ধ্বসে পড়ছে, শ্রমিকের জীবন চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে, লাশের পাশে শুয়ে পড়ছে নতুন লাশ আর ‘ক্ষতিপুরণ’ দিয়ে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব সারছে। এদিকে আমরা, এদেশের জনগণ, ইলেক্সট্রনিক্স মিড়িয়ার লাইভ-টেলিকাষ্ট দেখি আর সুবিধাবাদি মধ্যবিত্তীয় হা-হুতাশ ছেড়ে কিংবা দীর্ঘশ্বাসের নিঃশ্বাস চেড়ে নিজেদের ধান্দায় মনোনিবেশ করি। ফলে, ‘সাহায্য, সহযোগিতা, ক্ষতিপূরণ’ প্রভৃতির মাধ্যমে শ্রমিকের লাশ-ব্যবস্থাপনার এ রাষ্ট্রীয় ‘ডিসকোর্স’ তখন সামাজিক ন্যায্যতা পায়। আর এ রাষ্ট্রীয় ডিসকোর্স ন্যায্যতা পায় বলেই, তাজরিন ফ্যাশনের পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া ১১২ শ্রমিকের লাশের গন্ধ বাতাস থেকে সরে যাওয়ার আগেই আশুলিয়ায় ‘স্মার্ট’ গার্মেন্ট্সের সাত শ্রমিকের লাশ নতুন করে সামিল হয়। আর স্মার্ট গার্মেন্টেসের লাশের গন্ধ বাতাস থেকে সরে না-যাওয়ার আগেই রানা প্লাজার ধ্বসের ঘটনায় চ্যাপ্টা হয়ে যায় এদেশের শত শত শ্রমিকের জীবন, স্বপ্ন ও সংসার। ‘স্মার্ট’ গার্মেন্ট্সের আগে তাজরিন ফ্যাশন, তারও আগে হামীম গার্মেন্ট্স, তার আগে ‘গরিব এ- গরিব’ গার্মেন্ট্স, তার আগে কেটিএস... কিংবা তারও আগে...। এভাবে, লাশের মিছিলে অব্যাহতভাবে অদূর ভবিষ্যতে যুক্ত হবে হয়তো নতুন কোন পোশাক কারখানার নতুন কোন লাশ। এভাবেই চলছে আর এভাবেই চলবে। কেননা এ রাষ্ট্র হচ্ছে মালিকের। আর শ্রমিকের লাশের মধ্যেই মালিকের উত্থান। শ্রমিকের লাশের স্তুপের উপরই বেড়ে উঠে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। শ্রমিকের লাশের মধ্যেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ভা-ার সমৃদ্ধ হয়। জয় তৈরী পোশাক শিল্প! জয় মালিক শ্রেণী! জয় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি!

রানা প্লাজার মালিক রানাকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে চতুর্দিকে। সরকার তাকে গ্রেফতার করেছে, ফলে দাবির জোর কমজোর হয়ে উঠেছে। কিন্তু রানা প্লাজার রানাকে গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তির দাবি করবার মধ্য দিয়ে মূলতঃ পুরো বিষয়টিকে একটি হালকা ‘দাবি-দাওয়ার রাজনীতি’তে ফেলে দেয়া হয়েছে। কেননা, ব্যক্তির শাস্তির দাবির মধ্য দিয়ে মূলতঃ ব্যবস্থার অপরাধ, কাঠামোগত-গাফিলতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়-দায়িত্বকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। কেননা, একজন রানার শাস্তি হওয়ার ভেতর দিয়ে শ্রমিকের জীবনের কোন নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়না। তাই, জোর দাবি তুলতে হবে গোটা তৈরী পোশাক-শিল্প ব্যবস্থা, উৎপাদন, উৎপাদন-সম্পর্ক, উৎপাদন কাঠামো এবং ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে। সে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যে ব্যবস্থা মালিকের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষা দেয় কিন্তু শ্রমিকের জীবনের নূন্যতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনা। দাবি তুলতে হবে সে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যে ব্যবস্থায় মালিককে লাখপতি থেকে কোটিপতি করে তোলে কিন্তু শ্রমিকের জীবন ক্রমান্বয়ে দুর্বিসহ করে তোলে। দাবি তুলতে হবে সে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা মালিককে শ্রম শোষণের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় কিন্তু শ্রমিকের জন্য তার ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করেনা। তাই, রানা প্লাজার এ ভয়াবহ ধ্বসের মধ্য দিয়ে তৈরী পোশাক শিল্পের গোটা ব্যবস্থা, ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিকের জীবনের যে করুণ চিত্র আমাদের সামনে নতুন করে অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং করুণভাবে উন্মোচিত হয়েছে, তার সূত্র ধরে পুরো পোষাক শিল্পের একটা গুণগত পরিবর্তনের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কার্যকরভাবে সামনে নিয়ে আসতে হবে। একটা সত্যিকার শ্রমিক-বান্ধব তৈরী পোশাক শিল্পের জন্য বিদ্যমান ব্যবস্থার একটা রূপান্তর দরকার। কেননা, এত শত শ্রমিকের মৃত্যু পুরো তৈরী পোশাক শিল্পকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর নতুন তাগিদ সৃষ্টি করেছে। গোটা ব্যবস্থার এমন রূপান্তরের দাবি তুলেতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোন শ্রমিককে লাশ হতে না-হয়। যাতে আর কোন শ্রমিককে আগুনে পোড়ে কয়লা হতে না-হয়। যাতে আর কোন শ্রমিককে দেয়াল চাপায় পিষ্ট হতে না-হয়।

নিহত এবং আহতদের পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কেবল সরকারী সাহায্য-সহযোগিতার ভেতর দিয়ে বেঁচে যাওয়া শ্রমিকের জীবনের কোন গুণগত পরিবর্তন হয়না। কিছুদিন হয়তো পেটে-ভাতে চলা যায় কিন্তু সত্যিকার দীর্ঘমেয়াদি কোন সমাধানে পৌঁছানো যায় না। তাই, গোটা সমাজকে আজ শ্রমিকের পাশে দাঁড়াতে হবে। শ্রমিকদের সাথে সবাইকে সমস্বয়ে আওয়াজ দিতে হতে তৈরী পোশাক শিল্পের গোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। অন্যথায়, আজকের আহত শ্রমিক তার জীবনের ঘানি টানতে পরিবারের নতুন কোন সদস্যকে আবার তৈরী পোষাক শিল্পে পাঠাবে। আবার, মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে। সে হয়তো অন্য কোনদিন লাশ হয়ে ফিরবে! এভাবেই লাশের মিছিলে যুক্ত হবে নতুন লাশ, আর রাষ্ট্রর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিবৃদ্ধি ঘটবে। লাশের মিছিলে যুক্ত হবে নতুন লাশ, আর তৈরী পোষাক রপ্তানি-কারক দেশ হিসাব বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় থেকে প্রথমের দিকে ধাবিত হবে। লাশের পরে যুক্ত হবে নতুন লাশ, আর এদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বার অবারিত ও উন্মুক্ত হবে। রাষ্ট্র মালিক শ্রেণী স্বার্থ দেখবে কেননা রাষ্ট্র খোদ নিজেই মালিকের চরিত্র ধারণ করেছে। সুতরাং রাষ্ট্র হয়ে যাবে মালিকের আর শ্রমিক নিয়মিত পরিণত হবে লাশে, এটা আর চলতে দেয়া যায় না। তাই, আজ সকলের সমন্বিত প্রতিরোধের মুখে তৈরী পোশাক শিল্পের পুরো ব্যবস্থাটিকেই পাল্টাতে রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে হবে। তবেই, রাষ্ট্র মালিকের না-হয়ে শ্রমিকের হয়ে উঠবে। আর রাষ্ট্র যদি সত্যিই শ্রমিক-বান্ধব হয়, তবেই ব্যবস্থার রূপান্তর ঘটবে। তখন মালিকও জনগণের কাতারে এসে শামিল হবে। তখনই, শ্রমিকের জীবনের সত্যিকার নিরাপত্তা বিধান করা সম্ভব হবে।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।

রাষ্ট্রের সাথে বোঁঝাপড়াটা জরুরি!

[দৈনিক যুগান্তর, ০৩/০৫/২০১৩]

রাষ্ট্রের সাথে একটা হিসাব-নিকাশ জরুরি হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র আসলে কার? রাষ্ট্রের দায়িত্ব কী? রাষ্ট্রের করণীয় কী? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব ও এর প্রয়োগ দু’টোর মুখোমুখি রাষ্ট্রকে একবার দাঁড় করানো দরকার। কিংবা সব ধরনের তাত্ত্বিকতা এবং দার্শনিকতার বাইরে মানুষের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রকে কিছু সাধারণ জিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করানো জরুরি। সাভারের রানা প্লাজা ধ্বসে পড়ার ঘটনায় রাষ্ট্রের ভূমিকা কী? কিংবা রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হওয়া উচিত ছিল? বা ঘটনার ‘প্রাক’ এবং ‘উত্তর’ উভয়কালে রাষ্ট্রে দায়িত্ব কী ছিল? রাষ্ট্র সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে কিনা? ইত্যাকার নানান জিজ্ঞাসার সওয়াল-জবাব জরুরি। এবং তার একটা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য ফয়সালা হওয়াটাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এভাবে একের পর এক পোশাক কারখানা ধ্বসে পড়বে, একের পর এক পোশাক কারখানায় আগুন লাগবে, আর শ্রমিকের পর শ্রমিক জীবন দেবে, শ্রমিকের পর শ্রমিক লাশ হবে, লাশের সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে কিন্তু তার কোন দৃশ্যমান, গ্রহণযোগ্য এবং যথাযথ বিচার হবেনা। এভাবে তো চলতে পারেনা। একথা স্বীকার্য যে, দেশের সামগ্রিক উন্নতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য শিল্পায়ন জরুরি। তৈরী পোষাক শিল্প দেশের অর্থনীতিতে একটি বিরাট ভূমিকা রাখছে। রপ্তানি আয় বৃদ্ধিকে ব্যাপকভাবে সহায়তা করছে। কিন্তু সেটা নিশ্চয় শ্রমিকের লাশের বিনিময়ে নয়। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চয় মানুষের লাশের বিপরীতে নয়। তাই, এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রকে ঠিক করতে হবে রাষ্ট্র কার পাশে দাঁড়াবে। পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া লাশের পাশে নাকি শ্রমিক-শোষনের মেশিন লোটেরা পুঁজিপতির পাশে। দেয়ালে চাপা পড়া শ্রমিকের লাশের কাতারে নাকি চাপা দেয়া মালিকের কাতারে। এ বোঝাপড়াটা খুবই জরুরি হয়ে উঠেছে।

সাভারের রানা প্লাজা ধ্বসের ধ্বংসাবশেষ থেকে জীবিত কিংবা মৃত শ্রমিককে উদ্ধার করবার অপারেশনের প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে। যাবতীয় উদ্ধারকার্যে রাষ্ট্রের কৃতিত্ব কতটুকু সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তবে, আমরা দেখেছি রাষ্ট্রের সাথে সমাজ সমান্তরালে পাল্লা দিয়ে উদ্ধারকার্যে যোগ দিয়েছে। রাষ্ট্র যা কিছু করেছে তার স্বীয় কর্তব্য ও দায়িত্ব থেকে করেছে আর সমাজ এগিয়ে এসেছে তার সামাজিক ও মানবিক তাগিদ থেকে। সামগ্রিক উদ্ধারকার্যে রাষ্ট্র এবং সমাজের অংশীদারিত্ব এবং দায়িত্ব-তাগিদের ফারাক উপলব্ধি করাটাও এখানে জরুরি। উদ্ধারকার্যের প্রথম পর্যায় শেষে, এখন ভারি যন্ত্রপাতি দিয়ে ‘প্রাণে’র চেয়ে মূলত ‘লাশ’ খোঁজার পর্ব শুরু হয়েছে। ডগ-স্কোয়ার্ড নামানো হয়েছে। গন্ধ শুকে শুকে লাশ বের করছে ডগ-স্কোয়ার্ড। বিদেশী ‘ডগ’ এখন দেশী লাশ খোঁজার কাজে নেমেছে। কেননা, এখন আর জীবিত কোন মানুষ রানা প্লাজা থেকে বের হচ্ছেনা। এবং একেবারে অলৌকিক কিছু না-ঘটলে নতুন প্রাণ বের হওয়ার সম্ভাবনাও তেমন দেখা যাচ্ছেনা। এর মধ্য দিয়ে মূলত জীবিত-মানুষের জন্য উৎগ্রীবতার পাশাপাশি লাশের সংখ্যা গুণার কাজও শেষ হয়ে যাচ্ছে। কত মানুষ এখনো মিসিং আছে তা নিয়ে সংখ্যার রাজনীতি চলছে। দোষা-দোষীর খেলা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। তবে, সংবাদপত্রের পাতায় কিংবা টেলিভিশনের পর্যায় লাশ গুণার কাজ করতে করতে যারা নিজের প্রেসার উঠা-নামার ব্যবস্থা করছিলেন আপাতত তাদের প্রেসার স্থিতিশীল হয়েছে। কিন্তু লাশ গুণার কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আমাদের যুগপৎ মধ্যবিত্তীয় নাগরিক হা-হুতাশ এবং সুশীল কিংবা প্রগতিশীলতার দায়িত্ব দুটোই শেষ হয়েছে--এটা মনে করবার কোন কারণ নাই। তাজরিন ফ্যাশনের হিসাব নিকাশ এখনো শেষ হয়নি। স্মার্ট গার্মেন্টেসের লাশের গন্ধ এখনও বাতাসে ঘোরপাক খাচ্ছে। তারও আগের অসংখ্য শ্রমিকের লাশের কোন বোঁঝাপড়াই এখনও শেষ হয় নাই। তাই, রানা প্লাজার হিসাব-নিকাশ এখনো পুরোটাই বাকি আছে। প্রতিটি লাশের, প্রত্যেক শ্রমিকের জীবনের, কেটে যাওয়া প্রতিটি হাতের, লটকে যাওয়া প্রতিটি পায়ের, প্রতি ফোটা রক্তের হিসাব-নিকাশ বাকি আছে। যে শ্রমিকের লাশ ও রক্তের উপর দাঁড়িয়ে এদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ঘটে, সে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আদায় করবার সময় এখন। যে শ্রমিকের লাশের উপর দাঁড়িয়ে এদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ে, তার ন্যায্য দেনা-পাওনার হিসাব-নিকাশ জরুরি। রাষ্ট্র কিংবা সমাজের ওপর তলার মানুষ এদেশের শ্রমজীবি কিংবা নিচতলার মানুষকে বিপদের সময় সাহায্য, সমবেদনা কিংবা দান-খয়রাত করে। আমরা তাতেই বিগলিত হই। কিন্তু এ দান-খয়রাতের ভেতর দিয়ে শ্রমিকের নিয়মিত লাশ হয়ে যাওয়ার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়না। প্রকারান্তরে, এ দান-খয়রাতের ভেতর দিয়ে খোদ রাষ্ট্র, তথাকথিত সুশীল এবং মালিক শ্রেণী নিজেদের মহতিপনার প্রবৃদ্ধি ঘটায়, দানবীর-অবতার হয়ে উঠবার পপুলার-পুঁজি তৈরী করে নির্বাচনী ক্যানভাসে রঙ লাগায় কিংবা মেকি-মানবতাবাদিতার প্রজেকশন করে দিলদার হিসাবে আইকন হওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু শ্রমিকের ন্যায্য দাবিকে তারা কখনও আমলে নেননা। তাই, এখন সময় এসেছে, শ্রমিকের আবেগ, আকাক্সক্ষা ও দাবি-দাওয়ার পাশে দাঁড়ানোর। প্রতিটি লাশের, রক্তের প্রতিটি ফোটার হিসাব-নিকাশ কড়য়-গ-ায় বুঝে নেয়া সময় এসেছে। এখন সমাজের দায়িত্ব হচ্ছে শ্রমিকের পাশে অবস্থান নিয়ে রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়ানো যাতে রাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘদিনের বকেয়া বোঁঝাপড়া সেরে নেয়া যায়।

সাহায্য ও সহযোগিতার নামে রাষ্ট্রও মূলত দান-খয়রাতের খুবই সাধারণ সূত্র অনুরসণ করে। অতীত ইতিহাস এ স্বাক্ষ্য দেয় যে, রাষ্ট্র এসব সাহায্য ও সহযোগিতার নামে মালিক শ্রেণীকে আড়াল করবার একধরনের আনুষ্ঠানিকতা করে। অতীত ইতিহাস এবং আমাদের অভিজ্ঞাতা বলে শেষ বিচারে রাষ্ট্র শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষ না-নিয়ে মালিকেরই পক্ষাবলম্বন করে। কেননা, রাষ্ট্র নিজেই একটা মালিকের চরিত্র ধারণ করেছে। রাষ্ট্রযন্ত্র যারা চালায় তারা মালিক শ্রেণীর প্রতিনিধি কিংবা খোদ মালিক শ্রেণী। রাষ্ট্রের যাবতীয় সিদ্ধান্ত যেখানে নেয়া হয়, সেখানে মালিক শ্রেণীর আধিপত্য, দাপট এবং প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। কারখানার যন্ত্র শ্রমিক চালায় কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র চালায় মালিক শ্রেণী। তাই, লাশের মিছিলে যুক্ত হয় নতুন লাশ। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় লাশের মাছিল। কিন্তু মালিক শ্রেণী থাকে বহাল তবিয়তে। তাই, রাষ্ট্রের সাথে বোঁঝাপড়াটা জরুরি। আর যদি, এ বোঁঝাপড়া সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য সমঝোতার ভিত্তিতে ফয়সালা না-হয়, তাহলে কারখানার শ্রমিকের পোষাক তৈরী-যন্ত্র চালানোর হাত যে রাষ্ট্রযন্ত্রও চালাতে জানে, সেটা প্রমাণ করবার সময় এবং ইতিহাস দুটোয় এখন সামনে এসে হাজির হয়ে। শ্রমিক কতৃক রাষ্ট্রযন্ত্র চালানো বিষয়টি ইতিহাসে গৌরবান্বিত নজির হিসাবে হাজির আছে। অতএব, রাষ্ট্রকে তার অবস্থান সাফ করতে হবে। অন্যথায়, মজদুর শ্রেণী একদিন রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেবে। এ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে, মনে রাখতে হবে সেদিন বেশি দুরে নয়। কেননা সমাজের এবং ইতিহাসের রূপান্তরের শেষ ধাপ হচ্ছে শ্রমজীবি মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন: সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।