Monday, October 14, 2013

গণতন্ত্র, নির্বাচন ও রাজনীতি

[দৈনিক ইত্তেফাক ১২/১০/২০১৩]
শাসনব্যবস্থার অধিকতর গ্রহণযোগ্য মডেল হিসাবে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে ন্যায্যতা পেলেও, বাংলাদেশের রাজনীতির গেড়াকলে পড়ে 'গণতন্ত্র' একটা বিকট রূপ ধারণ করেছে। গণতন্ত্রের নানান তাত্ত্বিক অর্থ এবং একাডেমিক ব্যাখ্যা থাকা সত্ত্বেও গণতন্ত্র সাধারণ গণমানুষের নিত্যদিনের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে পরিস্থিতি এবং পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে নিজেই নিজের অর্থ উত্পাদন করে। আমজনতার বোঝাবুঝিতে গণতন্ত্রের মমার্থ হচ্ছে জনগণের শাসন। জনগণ আবার শাসক হয় কীভাবে? জনগণ তো সবসময়ই শাসিত শ্রেণি? অন্যের দ্বারা শাসিত হওয়াই জনগণের নিয়তি। কিন্তু এটাই গণতন্ত্রের আসল মমার্থ যে, জনগণ নিজেই নিজের শাসক আবার নিজেই নিজের অধীনে শাসিত। গণতন্ত্রের এ ঐতিহাসিক সৌন্দর্য, মাধুর্য এবং ব্যবস্থাপনা হিসেবে এর যে ফলপ্রসূ প্রয়োগ তা সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় গণমানুষের বৃহত্তর কল্যাণ সাধন করে বলেই, গণতন্ত্র এখনও পৃথিবীর দেশে দেশে একটি সফল রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসাবে আরাধ্য। কেননা, একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণই নিজেদের মধ্য থেকে তাকে শাসন করবার জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন করে এবং সে নির্বাচিত প্রতিনিধিকে জনগণের সেবা করবার সুযোগ দেয় এ শর্তে যে জনগণ তার কথা শুনবে এবং তাকে মানবে। আর জনগণের প্রতিনিধি জনগণকে শাসন করবার ক্ষমতা পেয়ে জনগণের সেবা করবে এ কৃতজ্ঞতায় যে, জনগণই তাকে নির্বাচন করেছে এবং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছে, জনগণের সেবা করবার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। জনগণের প্রতিনিধি এ দর্শনের ফ্রেমওয়ার্কে জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা আবদ্ধ থাকেন যে, সে জনগণের একজন হয়েও জনগণকে শাসন করবার ক্ষমতা পায় জনগণেরই দয়ায়। তাই, গণতন্ত্র এক অর্থে নিজেই নিজেকে শাসন করা এবং তাই গণতন্ত্রের বিশ্বজনীন রূপ হচ্ছে 'গণমানুষের শাসন'। একই কারণেই গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের মোহ এবং আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত তীব্র। একটি গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাই মানুষের সকল প্রকার সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা যে গণতন্ত্রের চর্চা করি, যে গণতন্ত্রের স্বরূপ দেখি এবং যে কিসিমের গণতন্ত্র দেখি, সেটা গণতন্ত্রের যে সার্বজনীন এবং বিশ্বজনীন ধারণা, তার অনেকটা বিপ্রতীপ বিন্দুতে অবস্থান করে।

বিগত দুই দশকের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র আর পাঁচ বছর পর পর একটি জাতীয় নির্বাচন প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে। অবস্থা এমন একটা পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে, নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র আর গণতন্ত্র মানেই নির্বাচন। এদেশের রাজনীতিবিদ, দলীয় বুদ্ধিজীবী এবং তথাকথিত সুশীল সমাজের লোকজন পাবলিককে মোটামুটি এটা গিলিয়ে ছেড়েছে যে, 'গণতন্ত্র মানে হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর নির্বাচন'। আর আমরা পাবলিকরা এ গণতান্ত্রিক বড়ি খেয়ে মোটামুটি হজম করে নিয়েছি এবং সে মোতাবেক গণতন্ত্রের একটা অর্থ সামনে এনে খাড়া করেছি। আমরা এখন বুঝি, পাঁচ বছর পর পর শাসক শ্রেণির লোকদের হাতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করবার নাম হচ্ছে গণতন্ত্র। আমরা পাবলিকরা রাজনীতিবিদদের এ গণতান্ত্রিক দাওয়াই খেয়ে এবং দলীয় বুদ্ধিজীবী অবিরাম লেকচারের ভেতর দিয়ে বেশ শিক্ষিত হয়ে উঠেছি কেননা আমরা এখন সত্যিকার অর্থেই জানি গণতন্ত্র মানে কী! পাঁচ বছর পর পর একটা করে ভোট দিয়ে একটি নির্দিষ্ট দলকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা হচ্ছে গণতন্ত্র এবং প্রয়োজনে পাঁচ বছর পর আরেক দলকে ক্ষমতায় বসাবো কেননা জনগণই সকল ক্ষমতার উত্স; ক্ষমতা হাতে থাক বা না থাক সংবিধানে তো আছে! রাষ্ট্রের মালিক জনগণ! সুতরাং এ রাষ্ট্রকে লুটপাট করবার দায়িত্ব কাকে দেবে সেটা জনগণ ঠিক করবে! পাবলিক ভোট দিয়ে রাষ্ট্রকে একটি রাজনৈতিক দলকে পাঁচ বছরের জন্য তালুক দেবে আর আগামী পাঁচ বছর জীবনের ঘানি টানতে টানতে হা-পিত্তেস করে করে অপেক্ষা করবে যাতে মেয়াদান্তে আরেকটা ভোট দিতে পারে এবং যাতে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে! গণতন্ত্রের নামে এর চেয়ে নির্মম তামাশা আর হতে পারে না! 

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে 'নির্বাচন একটি পিরিয়ডিক এলিট গেইম'। অর্থাত্ পাঁচ বছর অন্তর অন্তর এদেশের রাজনীতিবিদদের হাতে ক্ষমতার বদল অথবা ক্ষমতা নবায়নের একটা ভোট ভোট খেলার নাম হচ্ছে নির্বাচন। সমাজের অভিজাত শ্রেণির লোকজন সে খেলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং তাদের সমশ্রেণি থেকেই একজন বিজয়ী হন। আমরা পাবলিকরা "আমার ভাই, তোমার ভাই" বলে গলা ফাটাই এবং নানান উত্তেজনায় মগ্ন থেকে সে খেলায় অংশ নিই কিন্তু কখনও জিততে পারি না। কেননা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রনৈতিক পরিকাঠামোয় 'নির্বাচন' নামের এ পিরিয়ডিক গেইমে পাবলিক কেবল অংশ নিতে পারে কিন্তু কখনই জিততে পারে না। সব সময় জিতবে সমাজের অভিজাত শ্রেণির লোকরা। রাজনীতির পরিভাষায় যাদেরকে সমাজের শাসকশ্রেণি নামে ডাকা হয়। তাই, স্বাধীনতার ৪২ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের পার্লামেন্টে কোন রিকশাওয়ালা, কোন কৃষক, কোন কারখানা শ্রমিক, কোন মুচি, কোন কামার, কোন কুমার, কোন জেলে কিংবা কোন পিওন, দারোয়ান, সুইপার নির্বাচিত হয়ে যেতে পারেন নাই কেননা এরা হচ্ছেন 'পাবলিক'। পাবলিক কেবল এলিটদের খেলায় অংশ নেবে কিন্তু কখনও জিততে পারবে না। তাই মহান জাতীয় সংসদের আসন বরাদ্দ আছে এদেশের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত আমলা, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, এনজিওলা, সুশীল সমাজ কিংবা বড়জোর কোন পপুলার নায়ক-নায়িকা বা গায়ক-গায়িকা; মোদ্দাকথা সমাজের উপরতলার মানুষ। সুতরাং 'নির্বাচন' নামে আমাদের যা খাওয়ানো হচ্ছে তা হচ্ছে সমাজের অভিজাত শ্রেণির 'এলিট গেইম' যার মাধ্যমে পাবলিককে শাসন করবার ক্ষমতাকে এক ধরনের আইনগত বৈধতা দেয়া হয় কিংবা ব্যাপক বিনোদনের মাধ্যমে আইনগত বৈধতা নেয়া হয়। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন জাতীয় সংসদের নির্বাচনকে সামনে নিয়ে সরকারি এবং বিরোধী দলের কার্যক্রম দেখলে মনে হয়, এদেশের গণতন্ত্র রক্ষায় দুইদল যেন যুদ্ধে নেমেছে। গণতন্ত্র রক্ষায় বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের অক্লান্ত আহাজারি দেখে মনে হয়, 'গণতন্ত্র' এবার আর পালাবার পথ পাবে না! এ হাস্যকর প্রতিযোগিতা রাজনীতি এবং গণতন্ত্র উভয়কেই প্রকারান্তরে পাবলিকের কাছে একটি যন্ত্রণাময় বিষয়ে পরিণত করেছে। 

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা এখন আর রাজনীতিতে নেই, আছে নির্বাচনে। আওয়ামী লীগ আছে 'নির্বাচন যে কোনভাবেই হোক করতে হবে' আর বিএনপি আছে 'যে কোন মূল্যেই নির্বাচন ঠেকাতে হবে'। তাই, 'নির্বাচনই এখন রাজনীতি' অথবা 'রাজনীতি মানেই নির্বাচন' যেটা গণতন্ত্র রক্ষার নামে বাজারে জারি রাখা হয়েছে। আর নির্বাচনের রাজনীতি মানেই স্রেফ ক্ষমতায় যাওয়া আর না যাওয়ার প্রতিযোগিতা। এখানে গণতন্ত্রের আদৌ কিছু আছে কিনা আমার গুরুতর সন্দেহ আছে অন্তত বাংলাদেশি ব্রান্ডের রাজনীতির বিবেচনায়। এ নির্বাচনের রাজনীতি থেকে গণতন্ত্র কবে যে মুক্তি পাবে?-এখন সেটাই দেখার বিষয়। নির্বাচনের রাজনীতির নামে পাঁচবছরান্তের এলিট-গেইমের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি দিয়ে আর যাই হোক অন্তত 'গণতন্ত্র' হয় না। জনগণের জীবন-মানের সত্যিকার কোন রূপান্তর ঘটে না। তাই, গণতন্ত্র রক্ষার নামে রাজনীতিবিদরা আমাদের প্রতিদিনই হাইকোর্ট দেখাচ্ছে। হাইকোর্ট দেখতে দেখতে পাবলিক এখন ক্লান্ত!

লেখক:সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসাবে জার্মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন

Saturday, October 5, 2013

বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবিতার সংকট

[বিডিনিউজ২৪.কম, ২১/০৯/২০১৩]
“One task of the intellectual is the effort to break down the stereotypes and reductive categories that are so limiting to human thought and communication.”

— Edward Said (1996: XI)

এডওয়ার্ড সাঈদের চিন্তায় বুদ্ধিজীবীদের একটি কাজ হচ্ছে সমাজের সনাতন এবং (বর্গীকৃত) জগদ্দল বেদীমূল ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া/চেষ্টা করা, কেননা তা মানুষের চিন্তা ও যোগাযোগের সক্ষমতা সঙ্কুচিত করে। তিনি নিজে পুঁজিবাদী বিশ্বের মোড়ল হিসেবে বিবেচিত মার্কিন মুল্লুকে বাস করেও, সাম্রাজ্যবাদী মোড়লত্বকে নিত্য চ্যালেঞ্জ করে পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে বাদবাকি বিশ্বের শোষণ, নির্যাতন ও বঞ্চনার প্রতিনিধিত্বমূলক কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন বলেই, বুদ্ধিজীবী এবং বুদ্ধিজীবিতার একটা দার্শনিক এবং ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা আমাদের সামনে এনে হাজির করেছেন।

সত্যিই, এলেম এবং আলমের এক বিরল মেলবন্ধন সাঈদ। তাই তিনি যা উপলব্ধি করেছেন ও বিশ্বাস করেছেন, সে মোতাবেক বুদ্ধির ময়দানে যুদ্ধ করেছেন। আর ঠিক এ কারণেই, তামাম দুনিয়া তাঁকে বুদ্ধিজীবী বলে জানে এবং মানে। বুদ্ধিজীবিতার আলোচনা তাই সাঈদ ছাড়া জমে না। তবে আমরা সাঈদের পাশাপাশি ভ. ই. লেনিন, আন্তনিও গ্রামসি, মিশেল ফুকো এবং নোয়াম চমস্কিকেও ‘বুজুর্গ’ মানব বুদ্ধিজীবী কে, বুদ্ধিজীবিতা কী এবং এর রকমফের বোঝাবুঝির একটা বৌদ্ধিক ডায়ালগের স্পেস তৈরি করবার বুদ্ধিবৃত্তিক বাসনায়। অতঃপর, বাংলাদেশে সমকালীন বুদ্ধিজীবিতার যে দশা তার বাছ-বিচার কিংবা তাকে নিয়ে কিঞ্চিত বাতচিৎ করব।

বুদ্ধিজীবিতার সংকট আলোচনায় স্বাভাবিকভাবেই ‘বুদ্ধিজীবী’ কাকে বলে এবং ‘বুদ্ধিজীবিতা’ বলতে কী বোঝায় ইত্যকার প্রপঞ্চগুলোর একটি কার্যকর সংজ্ঞা প্রদান দায় হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য নানা রথী-মহারথীর উদ্ধৃতি, আলোচনা, সংজ্ঞা এবং বক্তব্য টিকা ও টিপ্পনি আকারে হাজির করা যায়, যাতে করে একদিকে যেমন নিজের বুদ্ধিজীবিতা জাহির করা যায় (!), তেমনি পাঠকের বোঝাবুঝির জায়গাও খানিকটা সাফ হয়। এ গালি খাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়েই আমি লেনিন, সাঈদ, গ্রামসি এবং ফুকোর যৎসামান্য মৌলিক ধারণা কর্জ করবার ঝুঁকি নেব। কেননা বুদ্ধিজীবী এবং বুদ্ধিজীবিতার আলোচনা এঁদের টিকা বা টুকি ছাড়া ঠিক টিকে না। তবে বুদ্ধিজীবিতার সংকট বলতে আমি কী বুঝি ও কী বোঝাতে চেয়েছি তাকে কেন্দ্র করেই একটি আলোচনা খাড়া করানোর চেষ্টা করব; এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত এবং ক্রিটিক্যাল ডায়ালগ তৈরি করবার একটা দীর্ঘমেয়াদী বাসনা সামনে রেখে। পাশাপাশি বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবিতার বিদ্যমান এবং ক্রমবর্ধমান যে সংকট এবং তা যে আরও নানান কিসিমের সংকটের জন্ম দিচ্ছে– তার কিছু ভয়াবহ ক্ষতির কিনারা, ইশারা ও নিশানা শনাক্ত করার চেষ্টা করব।

মানুষ যেদিন থেকে সমাজবদ্ধভাবে জীবনযাপন করতে শুরু করে, সেদিন থেকে মানুষের সামাজিক জীবনযাপনের অভিযাত্রায় বিবর্তমান সমাজ, সংস্কৃতি ও চিন্তার বিকাশের কোন পর্যায়ে এসে মানুষ একটা বিশেষ শ্রেণিকে ‘বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে শনাক্ত করতে শুরু করে তার কোনো সঠিক ইতিহাস নেই। অন্তত আমার জানা নেই! তবে খৃষ্টপূর্বকালে সোফিষ্টদের সমকালীন মানুষ ‘বিশেষ জ্ঞানী-শ্রেণি’ হিসেবে বিবেচনা করত। পরবর্তীতে গ্রিক দার্শনিকরা সমকালের গণ্ডিতে ‘পণ্ডিত’ হিসেবে বিবেচিত হতেন। কিন্তু আজকে আমরা যে অর্থে ‘বুদ্ধিজীবী’ ধারণার ব্যবহার করি, সে অর্থে সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটলকে বুদ্ধিজীবী হিসেবে বর্গীকরণ করা হত না। যদিও সমকালীন সাধারণ্যে তাদের পাণ্ডিত্যের কদর ছিল, কিন্তু তারা ঠিক বুদ্ধিজীবী হিসেবে সমাজে বিবেচিত হতেন কিনা জ্ঞানের ইতিহাসে তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। পরবর্তীতে পাবলিক পারসেপশনে বুদ্ধিজীবিতার অনুপস্থিতির আরও একটা কারণ আছে। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা গেছে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, জ্ঞানের চর্চা হয়েছে শাসকশ্রেণির প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায়। ফলে সাহিত্য, নন্দনতত্ত্ব, দার্শনিকতা এবং সমাজচিন্তার নানান বিষয় নিয়ে নতুন নতুন চিন্তার উদ্ভব ঘটেছে বটে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে, কিন্তু সেটা বুদ্ধিজীবিতার পর্যায় হিসেবে ইতিহাসের কোনো খেরোখাতায় লিপিবদ্ধ হয়নি। জন মিডলটন (২০০৯ [১৯২০]) উনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশের ব্যবহৃত একটি শব্দবন্ধ ‘man of letters’-কে ‘বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে বিবেচনার প্রথম ধারণার জন্ম বলে দাবি করেন। এখানে লেখা বাহুল্য যে, কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেই তাকে বুদ্ধিজীবী ভাবা হত না, তাকে হতে হত শিক্ষিত চিন্তাবিদ বা ‘educated thinker’ (Middleton, 2009[1920]:27), এভাবেই সমাজে বুদ্ধিজীবী শ্রেণি এবং বুদ্ধিজীবিতার সামাজিক শনাক্তকরণ শুরু হয়। প্রাচ্যে বুদ্ধিজীবী এবং পাণ্ডিত্যের ধারণা মূলত ব্রাহ্মণদের প্রথাগত সামাজিক অবস্থান থেকে বিবেচনা করা হত। তাদের কাজ, কাজের প্রকার ও ধরনের কারণেই ব্রাহ্মণরা সমাজে বুদ্ধিজীবীর মর্যাদা পেতেন; তবে সেটা ঠিক বুদ্ধিজীবী নয় অনেকটা ‘বুদ্ধিদাতা’ গোছের। প্রাচ্যে বুদ্ধিজীবিতার ধারণার সঙ্গে চাইনিজ দার্শনিক কনফুসিয়াসের নানান চিন্তাকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হয়।

প্রাচ্যে বুদ্ধিজীবিতার প্রারম্ভনা, বিকাশ ও বিস্তার বিষয়ে আরেকটি সবিস্তার রচনা তৈরি করছি, যা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে। কেননা এখানে এর চেয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই।
এটা সত্য যে, ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে এবং বিভিন্ন স্থানে কীভাবে বুদ্ধিজীবী এবং বুদ্ধিজীবিতার চর্চা ও বিকাশ হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আধুনিককালে (সেটা কবে থেকে শুরু হয়েছে, তাও তর্কাতীত নয়!) বুদ্ধিজীবী এবং বুদ্ধিজীবিতার আলোচনা মূলত লেনিন, গ্রামসি, ফুকো এবং সাঈদের ধারণার কাঠামোই ব্যাখ্যা করা হয়। লেনিন মাক্সিম গোর্কিকে লেখা এক চিঠিতে মূলত ‘ওয়ার্কিং ক্লাস বুদ্ধিজীবিতা’র কথা বলেছেন যাদের ‘ক্রমবর্ধমান শক্তি’, লেনিনের মতে, “সমাজের বুর্জোয়া শ্রেণিকে উৎখাত করতে সক্ষম হবে।” তিনি আরও বলেন, “বুর্জোয়ার শ্রেণি পদলেহী শিক্ষিত শ্রেণি, যারা নিজেদেরকে জাতির মগজ মনে করেন তারা আসলে পুঁজির পা-চাটা (শ্রেণি), যারা মূলত মগজ নয়, জাতির বিষ্ঠা।”(Lenin, 1915:01) (“The intellectual forces of the workers and peasants are growing and getting stronger in their fight to overthrow the bourgeoisie and their accomplices, the educated classes, the lackeys of capital, who consider themselves the brains of the nation. In fact they are not its brains but its shit.”)। অন্যদিকে ফুকো অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্তভাবে বুদ্ধিজীবী শ্রেণির বর্গীকরণ করেছেন। ফুকো তাঁর ‘‘Truth and Power” (Foucault & Gordon, 1980)–এর আলোচনায় বলার চেষ্টা করেছেন, বুদ্ধিজীবী দুই প্রকার; সর্বজনীন (ইউনিভার্সাল) বুদ্ধিজীবী এবং বিশেষ (স্পেসিফিক) বুদ্ধিজীবী। তিনি মূলত তাঁর বিখ্যাত ‘ক্ষমতা এবং জ্ঞানে’র সম্পর্কের ফ্রেইমওয়ার্কের ভেতর দিয়ে বুদ্ধিজীবীর চরিত্র এবং প্রকার উপলব্ধি করবার চেষ্টা করেছেন ‘ডিসকোর্স’ নির্মাণ কিংবা বিনির্মাণের রাজনীতির ভেতর দিয়ে। অর্থাৎ ‘ডিসকোর্স’ উৎপাদন কিংবা নিমার্ণে বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা কী তার ভেতর দিয়েই ফুকো সর্বজনীন ও বিশেষ বুদ্ধিজীবীর চরিত্র উপলব্ধির পরামর্শ দিয়েছেন (Foucault, 2002)। অন্যদিকে গ্রামসি আরও র‌্যাডিক্যাল প্রস্তাবনার ভেতর দিয়ে বুদ্ধিজীবী শনাক্তকরণের ফর্মূলা দিয়েছেন। গ্রামসির ভাবনায় “সকল মানুষই বুদ্ধিজীবী এবং সকল মানুষের মধ্যেই বুদ্ধিজীবীর বীজ আছে; তবে সকল মানুষের বুদ্ধিজীবিতার সামাজিক কোনো কার্যকারিতা নেই।” (Gramsci, 1982:9)। গ্রামসির মতে বুদ্ধিজীবী হচ্ছেন প্রধানত দুই প্রকার; এক. সনাতন বুদ্ধিজীবী (যারা বিদ্যমান সামাজিক রীতিতে সমাজকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন এবং নিজেরা একটা বিশেষ শ্রেণিভুক্ত বলে নিজেদেরকে সমাজের বিচ্ছিন্ন একটি ‘এলিট ক্লাস’ বলে মনে করেন। যেমন, স্যামুয়েল হান্টিংটন কিংবা ফ্রান্সিস ফুকায়ামা)। দুই. অর্গানিক বুদ্ধিজীবী (যারা সমাজের বিরাজমান ব্যবস্থাকে নিজেদের কিংবা আম-জনতার নিত্যদিনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বিশ্লেষণ করে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেন। পাশাপাশি সমাজের ওয়ার্কিং-ক্লাস-ইনটেলেকচুয়ালিটির বিস্তারে ভাষার সংস্কৃতি, শিক্ষার কাঠামো এবং র‌্যাডিক্যাল সমাজ-ভাবনা প্রমোট করেন। যেমন; ফ্রান্স ফানো কিংবা চিদি অদিংকালো)। 

তাত্ত্বিক আলোচনার বাইরে সাধারণত তিন ক্যাটেগরির মানুষকে বুদ্ধিজীবী হিসেবে বিবেচনা হয়; (১) যারা জ্ঞানচর্চায় নিবেদিত, সমাজ ও সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে তত্ত্ব ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ প্রদান করে থাকেন, (২) যারা পেশাগতভাবে নতুন চিন্তা-ভাবনা এবং নতুন জ্ঞান উৎপাদন এবং বিপণনে নিয়োজিত, এবং (৩) যারা সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্ম করেন যা ‘পাবলিক ডিসকোর্স’ নির্মাণে মৌলিক ভূমিকা পালন করে। এখানে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি যে, এ তিন প্রকারের বাইরেও নানান প্রকার থাকতে পারে এবং স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সে প্রকারের প্রকোপে প্রতিষ্ঠিত ক্যাটেগরিও পরিবর্তিত হতে পারে। কাঠামোবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে বুদ্ধিজীবিতার আবার দু’টি ক্যাটেগরি হতে পারে; প্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিজীবী এবং জনতার বুদ্ধিজীবী (যাকে বলা হয় ‘পাবলিক ইনটেলেকচুয়াল’)।

এখানে মনে রাখা জরুরি যে, সকল প্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিজীবী জনতার বুদ্ধিজীবী নন (যেমন গায়ত্রি স্পিভাক কিংবা হুমি ভাভা); আবার সকল জনতার বুদ্ধিজীবী প্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিজীবী নন (যেমন অরুন্ধতি রায় কিংবা তারিক আলি); অন্যদিকে একই ব্যক্তি একাধারে প্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিজীবী আবার জনতার বুদ্ধিজীবীও হতে পারেন (যেমন এডওয়ার্ড সাঈদ কিংবা নোয়াম চমস্কি)।

লেনিন, গ্রামসি, ফুকো এবং সাঈদের ধারণার কাঠামোতেই বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণি এবং এর বুদ্ধিজীবিতার চর্চার বিষয়টি এবার বিশ্লেষণ করা যাক। এন্তার হিসাব-নিকাশের বাইরে গিয়ে সামগ্রিক বিবেচনায় মোটা দাগে বলা যায়, সমকালীন বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবিতার একটা বিরাট সংকট চলছে। এখানে মনে রাখা জরুরি সংকটটা বুদ্ধিজীবীর নয়, বরঞ্চ বুদ্ধিজীবিতার। কেননা, বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা নিতান্তই কম নয়; সেটা সনাতন হোক, অর্গানিক হোক, সর্বজনীন হোক বা বিশেষ হোক, কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক হোক বা জনগণের বুদ্ধিজীবী হোক। তবে, একথা বলা যায় যে বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবিতার রয়েছে এক বিরাট সংকট। এ সংকট যেমন একদিকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পরিসীমায় নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে নতুন সংকট উৎপাদন করছে, অন্যদিকে তেমনি সত্যিকার বুদ্ধিজীবী হয়ে উঠবার একটা বিরাট সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। আবার বুদ্ধিজীবিতার সংকটের কালে বুদ্ধিজীবী-কেন্দ্রিক নতুন শব্দভাণ্ডার আমাদের নিত্যদিনের পঠন-পাঠনে যুক্ত হচ্ছে, যেমন: দলীয় বুদ্ধিজীবী, দলকানা বুদ্ধিজীবী, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, বুদ্ধিব্যবসায়ী কিংবা বুদ্ধিবেশ্যা ইত্যাদি। এগুলো কোনো কোনো সময় যেমন বিরুদ্ধ বুদ্ধিবলয়ের বিরুদ্ধে গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তেমনি বুদ্ধিজীবিতার নিরপেক্ষতার আড়ালে কেউ কেউ কোনো বিশেষ দলের কিংবা বিশেষ মহলের বিশেষ কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবার ‘বুদ্ধিজীবিতা’ চর্চা করেন। এ কারণে সাধারণ মানুষের কাছে এসব শব্দবন্ধের জনপ্রিয়তা ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা পায়। 

বুদ্ধিজীবী বলতে বাংলাদেশে সাধারণত কিছু সুর্নিদিষ্ট পেশাজীবী শ্রেণিকে বোঝানো হয়ে থাকে যা তত্ত্বগত, ভূমিকাগত এবং প্রভাবগত জায়গা থেকে বড় ধরনের ভুল ও বেশ বিপজ্জনক। যেমন, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ, লেখক, সাহিত্যিক, আইনজীবী, উন্নয়ন-ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও এনজিওর কর্মকর্তা। এরাই প্রধানত পেশাজীবী শ্রেণি বা প্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিজীবী, যারা একটি নির্দিষ্ট পেশায় নিয়োজিত এবং (হয়তো-বা) পেশাগত কারণেই ‘বুদ্ধি’ উৎপাদন করা এবং বিনিয়োগ করা তাদের পেশা কিংবা পেশাগত কারণেই তাদের চিন্তা-ভাবনা প্রকাশ করতে হয়। কিন্তু তাই বলে তাদের পাইকারি হারে বুদ্ধিজীবী বলা যাবে কিনা তা নিয়ে আমার গুরুতর সন্দেহ আছে। কেননা, আমি মনে করি ‘বুদ্ধিজীবী’-কে তার চরিত্রগত, ভূমিকাগত এবং দায়িত্বগত কারণে পেশা-নিরপেক্ষ হওয়ার প্রয়োজন আছে, যা এডওয়ার্ড সাঈদ বলার চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ পেশার সঙ্গে বুদ্ধিজীবী হওয়া বা না হওয়ার কোনো সম্পর্ক থাকা কোনো বিবেচনাতেই বাধ্যতামূলক নয়। অনেকে আবার যারা ‘বুদ্ধি’ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তাদের বুদ্ধিজীবী বলে থাকেন। এটা হচ্ছে বুদ্ধিজীবীর সংজ্ঞায়নের অত্যন্ত তরল এবং পাতলা সাধারণীকরণ। কেননা, প্রায় সব পেশার লোকই কোনো-না-কোনোভাবে ‘বুদ্ধি’ দিয়ে তার পেশার সর্বোচ্চ উৎকর্ষ সাধন করেন। যেমন, একজন নাপিত তার ‘বুদ্ধি’ খাটিয়ে চুলকাটার সুন্দর ফিনিশিং দেন বলেই আমরা চুলের কাটের নানান ভাব নিতে পারি। কিংবা ঢাকা শহরের নিত্য ট্রাফিক জ্যামের ভেতর কীভাবে ফাঁক-ফোকর দিয়ে রাস্তা বের করে দ্রুততম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়, সেটা চিন্তা করে এবং সে মোতাবেক কার্য হাসিল করা– অতএব সেটাও একটা বিরাট বুদ্ধির ব্যাপার– তাহলে ঢাকা শহরের সব রিকশাওয়ালা একেকজন বিরাট বুদ্ধিজীবী! অবশ্যই একজন রিক্সাওয়ালাও বুদ্ধিজীবী হতে পারেন যদি তিনি সমাজ, রাষ্ট্র ও সামাজিক মিথষ্ক্রিয়াকে নিজের উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতার আয়নায় বিশ্লেষণ করে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। কিন্তু তিনি সেটা কোথায় কীভাবে প্রকাশ ও প্রচার করবেন, সেটা একটা মুশকিলের বিষয় বটে! আবার কেবল প্রকাশের মধ্যেই বুদ্ধিজীবিতা নিহিত আছে কিনা তা নিয়েও নানান প্রশ্ন খাড়া করবার অবকাশ আছে। কেননা নিজে নিজে চিন্তা করে নিজের মধ্যে অপ্রকাশিত রেখে দিলে কিংবা অন্যকে নিজের ভাবনায় সম্পৃক্ত না করে নিজের মধ্যে যদি বুদ্ধি ঘুরপাক খায়, তবে সেটাকে বুদ্ধিজীবিতা বলা যাবে না। তাই বুদ্ধিজীবিতার সঙ্গে চিন্তা প্রকাশ করবার বিষয়টি জড়িত, কেননা একের চিন্তা অন্যকে আন্দোলিত না করলে কিংবা ব্যক্তিক চিন্তার সামষ্টিক রিফ্লেকশন না হলে, সেটা সমাজের বিদ্যমান ব্যবস্থার রূপান্তরে– গ্রামসির অর্গানিক বুদ্ধিজীবীর হিসেব অনুযায়ী– কোনো ধরনের প্রভাব রাখতে পারে না। তবে চিন্তা প্রকাশ করবার সঙ্গে বুদ্ধিজীবিতার সম্পর্ক আছে বা ব্যক্তির স্বকীয় চিন্তাকে প্রকাশ করার মধ্যেই বুদ্ধিজীবিতা নিহিত– এ ধরনের আপাত-অনুসিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা এগোতে পারে। কিন্তু প্রকাশ করবার বিষয়টিকে যদি বুদ্ধিজীবিতার বাধ্যবাধকতা হিসেবে বিবেচনায় নিই, তাহলে বলতে হয় এ ব্যাপারটিও একটা বিপজ্জনক বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে বাংলাদেশে। কেননা, যাদের প্রকাশের সুযোগ নেই কিন্তু যারা সমাজ, দেশ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, সমাজের গতিপ্রকৃতি প্রভৃতি বিষয় নিয়ে মৌলিক চিন্তা করেন, সমাজ ও রাষ্ট্রের বর্তমান ঘটনা বিশ্লেষণ করেন এবং ভবিষ্যতের করণীয় বিষয়ে সুর্নিদিষ্ট মতামত দেন, তারাও বুদ্ধিজীবী হিসাবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখেন। আর প্রকাশের বিষয়টি বিপজ্জনক এ কারণে যে, মিডিয়াকে প্রকাশ ও প্রচারমাধ্যম হিসেবে যদি বিবেচনা করি– মিডিয়ার নিজেরও একটা রাজনীতি আছে– নানান রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশ আছে এবং সমাজে জারি থাকা শ্রেণিকাঠামোয় নিজস্ব একটি শ্রেণিচরিত্র আছে। সম্পাদক কিংবা প্রকাশকেরও কোনো না কোনো রাজনৈতিক তিলক আছে। অনেকে নিরপেক্ষতার দাবি করেন কিন্তু নিরপেক্ষতারও একটা পক্ষ আছে।
তাই, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে মিডিয়া যতটা না সমাজের বিদ্যমান ব্যবস্থা জারি রাখবার জন্য কাজ করে, সমাজের গুণগত রূপান্তরের জন্য ততটা র‌্যাডিকাল ভূমিকা পালন করে না। ফলে মিডিয়া তার তথাকথিত সম্পাদকীয় নীতির ভেতর থেকে বুদ্ধিজীবিতা প্রকাশ করবার বিষয়টি একাধারে চিন্তার মুক্ততা, উন্মুক্ততা এবং স্বকীয়তাকে যেমন নিয়ন্ত্রণ করে, অন্যধারে মুক্তচিন্তা করবার সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা নিরুৎসাহিত করে। তাতে বুদ্ধিজীবিতার সংকট আরও ত্বরান্বিত হয়।

সামগ্রিক বিবেচনায়, আমার মতে, বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবিতার সংকট মোটাদাগে তিন রকমের: এক. রাজনৈতিক (বুদ্ধিজীবীদের দলবাজি), দুই. জ্ঞানতাত্ত্বিক (সমাজ ও রাষ্ট্রের বিদ্যমান ব্যবস্থা যথাযথভাবে উপলব্ধি করবার জন্য যে মাত্রার পঠন-পাঠন এবং একটি সর্বজনীন ও বিশ্বজনীন ভিউ বা দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন সেটার প্রতি অনীহা অর্থাৎ মৌলিক জ্ঞান অর্জন এবং বিতরণের অক্ষমতা কিংবা অনীহা) এবং তিন. মিডিয়ার (ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার) রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি। আমার অভিজ্ঞতা ও ধারণা অনেকের (সবার সঙ্গে অবশ্যই নয় এবং সেটা স্বাভাবিকও নয়) অভিজ্ঞতার সঙ্গেই মিলে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। চলুন, প্রত্যেক সংকটের মূল জায়গাটা ধরার চেষ্টা করি। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থার সর্বস্তরে রাজনীতিকরণের মাত্রা এমন একটা পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, গোটা সমাজ যেন কোনো-না-কোনো দলীয় রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি তাতে বস্তুনিষ্ঠতা হারায়। কেননা একটি নির্দিষ্ট দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কিছু দেখলে, সেটা দলকানা দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিণত হয়। দলীয় দ্বিধাবিভক্ত সামাজিক বিভাজনের কূপে ছিন্নভিন্ন বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ। ফলে বুদ্ধিজীবীর যে জ্ঞান ও বুদ্ধিজীবিতা সেটাও একটি বিশেষ দলের রাজনৈতিক মতাদর্শের ফ্রেমওয়ার্কে বিশ্লেষিত হয় এবং তাই এ বিশ্লেষণের বস্তুনিষ্ঠতা খর্ব হয়। তাছাড়া দলীয় বুদ্ধিজীবিতা যেহেতু ইহজাগতিক সুযোগ-সুবিধার হাতছানি দেয়, বুদ্ধিজীবিতা কোনো কোনো সময় দলীয় এজেন্ডার প্রচারণায় পরিণত হয়। এটা বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবিতার সবচেয়ে বড় সংকট। তবে এটাও স্বীকার্য যে, দ্বিধাবিভক্ত দলীয় বুদ্ধিজীবীদের বাইরেও এক ধরনের সত্যিকার প্রো-পিপল অর্গানিক বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশে আছেন, যার সংখ্যায় নিতান্তই নগণ্য এবং তাই সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তনে এবং সামাজের অনুঘটক প্রতিষ্ঠানগুলোর গুণগত রূপান্তরে তারা কোনো সুদূরপ্রসারী প্রভাব-বিস্তারকারী ভূমিকা পালন করতে পারেন না। 

জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকট হচ্ছে সবচেয়ে বড় সংকট। কেননা, বাংলাদেশের গড়পড়তা বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশের জ্ঞানের প্রধান উৎস সংবাদপত্র, টেলিভিশনের সংবাদ এবং টকশো। মিডিয়া-কেন্দ্রিক জ্ঞানভাণ্ডার বুদ্ধিজীবীদের জ্ঞানের গভীরতা যেমন একদিকে পাতলা করে দেয়, তেমনি কোনো ঘটনা কিংবা প্রপঞ্চ ব্যাখ্যা করবার বিশ্লেষণী ক্ষমতাও তরল করে দেয়। মৌলিক জ্ঞানভিত্তিক একটি বিশ্লেষণ খাড়া করাবার জন্য যে বিস্তর পঠন-পাঠন প্রয়োজন, সেটার বিরাট ঘাটতি বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিজীবিতাকে রীতিমত বুদ্ধিহীন বাচালতায় পরিণত করে। 

বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবিতার বিরাট একটি ঘাটতি হচ্ছে বুদ্ধিজীবীদের ইতিহাস, দর্শন, সমাজচিন্তা এবং ধ্রুপদি ও সমসাময়িক রাষ্ট্রচিন্তা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো ধারণা এবং পঠন-পাঠন না থাকা।
এখানে মনে রাখা জরুরি, আমার আলোচনায় আমি কখনওই সাধারণীকরণ করি না। এ সংকটের মধ্যেও অনেকে আছেন যারা সত্যিকার জ্ঞানী, পঠন-পাঠনে বেশ আপডেটেট এবং বিশ্লেষণে বেশ গভীর, যা সত্যিকার অর্থে মানুষকে বৌদ্ধিক নিশানা বাতলে দিতে সক্ষম। কিন্তু তাদের সংখ্যা বাংলাদেশের সমাজে নিতান্তই কম।

তৃতীয়ত, মিডিয়ার ভূমিকা এবং এর দলীয়করণ বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবিতার আরেকটি অনতম সংকট। বাংলাদেশে মিডিয়ার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু সর্বগ্রাসী রাজনীতিকরণের আগ্রাসী প্রভাবে মিডিয়াও নানান হিসেব-নিকেশের ফ্রেমওয়ার্কে দলীয় রাজনীতির মতাদর্শের প্রচারপত্র কিংবা প্রচারযন্ত্র হয়ে উঠেছে। তাই বাংলাদেশের মিডিয়াকে অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যম না বলে প্রচার-মাধ্যম বলা হয়। যেহেতু, বুদ্ধিজীবীদের সুচিন্তিত মতামত মিডিয়া হয়ে রাষ্ট্রের কানে কিংবা জনগণের কাছে পৌঁছায়, সেখানে মিডিয়া যখন কোনো-না-কোনো দলীয় রাজনৈতিক ভাবাদর্শে দীক্ষিত এবং সে মোতাবেক পরিচালিত হয়, তবে সত্যিকার জনগণকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবিতা বা পাবলিক ইনটেলেকচুয়ালিটির জায়গাটা তখন ক্রমান্বয়ে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। তাই মিডিয়ার দলীয় রাজনৈতিক ফিল্টারিং প্রো-পিপল বুদ্ধিজীবিতার– গ্রামসির ধারণায়নে অর্গানিক বুদ্ধিজীবিতা– একটি বড় অন্তরায়, যা বাংলাদেশের বুদ্ধিজীববিতার সংকট আরও ত্বরান্বিত করছে। তবে মিডিয়ার ক্ষেত্রেও কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে, সেটা নিঃসন্দেহে স্বীকার্য।

পরিশেষে, আহমদ ছফাকে হাজির করব। কেননা বাংলাদেশের ‘বুদ্ধিজীবী’ এবং ‘বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা’ নিয়ে আহমদ ছফার একটি বাক্য বেশুমার উচ্চারিত হয়। ১৯৭২ সালে তিনি বলেছিলেন, “একাত্তরে বুদ্ধিজীবীরা যা বলেছিলেন, তা শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হত না। আর এখন যা বলেন তা শুনতে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে পারবে না।’’

স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছর পর এ বাক্যের বা ভবিষ্যৎবাণীর সত্যতা কতটুকু তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে কিন্ত আমি এ বাক্যের মূল ষ্পিরিটের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। কেননা, কোনো দেশকে সত্যিকার অর্থে আগাতে হলে, গণমানুষের জীবনে সমৃদ্ধি আনতে হলে, দেশের মানুষের জীবনে সামগ্রিক সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক মুক্তি আনতে হলে, বুদ্ধিজীবীদের কথা শুনতে হবে। কেননা, সত্যিকার বুদ্ধিজীবীরাই অতীতের সঠিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বর্তমানকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। আর বর্তমানকে যথাযথভাবে বুঝতে পারেন বলেই, ভবিষ্যতকেও কীভাবে যথাযথভাবে নির্মাণ করতে হবে, তার সহি ইশারা দিতে পারেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সেই বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশে আছেন কিনা যারা দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণ মতাদর্শের উর্ধ্বে উঠে, বুদ্ধিব্যবসার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে, গভীর পাণ্ডিত্য নিয়ে, সত্যিকার অর্গানিক বুদ্ধিজীবী হিসেবে জনগণের আবেগ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে উপলব্ধি করে সমাজকে আলোর দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ বাতলে দিতে পারেন! এটাই এখন সবচেয়ে বড় জিজ্ঞাসা!

তথ্যসূত্র:
Chomsky, Noam. 1967,`The Responsibility of Intellectuals’, The New York Review of Books, February, 23.
Foucault, Michel. 2002, `Archaeology of Knowledge’, London and New York: Routledge. `
Foucault, Michel, & Gordon, Colin. 1980, `Power/knowledge: Selected Interviews and Other Writings’, 1972-1977 (1st American ed.). New York: Pantheon Books.
Gramsci, Antonio. 2001. Selection from the Prison’s Notebook. London: Electronic Book Company.
Lenin, V. E. 1915. `A Letter from Lenin to Gorky’ (September, 15). Source: Library of Congress. Source: http://www.loc.gov/exhibits/archives/g2aleks.html (Access on 16.09.2013)
Murray, John Middleton. 2009 [1920]. `The Evolution of the Intellectuals’, New York: Kissinger Pub Co.
Said, Edward. 1996, `Representations of the Intellectual’, New York: Vintage Books.