Saturday, November 9, 2013

ফর্মুলা নাকি পলিটিক্স?


[দৈনিক যুগান্তর, ২৫/১০/২০১৩]
প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সরকারের ফর্মুলা দেয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই বিরোধীদলীয় নেতা পাল্টা ফর্মুলা দেন। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ফর্মুলা দুটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতা দিয়েছেন বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হলেও, আসলে ফর্মুলা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী এবং বিএনপির সভানেত্রী। কেননা, এ ফর্মুলার মধ্যে যতটা দলীয় স্বার্থ রক্ষার চিন্তা নিহিত আছে, দেশের এবং মানুষের মঙ্গলচিন্তা ততটা নেই। গণতন্ত্র এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য যৎকিঞ্চিত যে চিন্তা এর মধ্যে রয়েছে, তা মূলত দলীয় এজেন্ডাকে বাজারজাত করার জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে। তাই, এ ফর্মুলা কোনো বিবেচনাতেই দেশের প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধীদলীয় নেতার নয়। ঘটনাক্রমে তারা দুজন দুটি বিশেষ রাষ্ট্রীয় এবং সাংবিধানিক পদে আসীন এবং দুর্ঘটনাক্রমে দুজন দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচনী জোটের প্রধান। কিন্তু তাদের ফর্মুলা বাজারে আসার পর থেকেই পাবলিক এখন ফর্মুলার মুলা নিয়ে ব্যস্ত। পাবলিক এখন চিন্তায় মশগুল এই সুখানুভূতি নিয়ে যে, যে মুলা আমাদের ধরিয়ে দেয়া হয়েছে, এর ভেতর থেকে নিশ্চয় কিছু একটা বেরিয়ে আসবে এবং গণতন্ত্র এ যাত্রায় মনে হয় প্রাণে বেঁচে যাবে! পাবলিককে টেনশনে রেখে এরই মধ্যে একজন আরেকজনকে চিঠি দিয়ে (মির্জা ফখরুল) এবং ফোন করে (সৈয়দ আশরাফ) মধুর আলাপও সেরে নিয়েছেন। হয়তো দ্রুত সংলাপেও বসবেন এবং (একদল) ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কিংবা (আরেক দল) নতুন করে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নতুন কোনো ফর্মুলা বের করবেন। আর পাবলিককে নতুন ফর্মুলার নতুন মুলা ধরিয়ে দিয়ে বলা হবে, জনগণ সব ক্ষমতার উৎস! অদ্ভুত এক গণতান্ত্রিক দেশ বাংলাদেশ! আর পাবলিক সারা জীবন এ মুলা নিয়ে ঝুলে থাকে বলেই হয়তো এর নাম গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ!

আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর ফর্মুলার মধ্যে নতুন কিছু তেমন নেই। সর্বদলীয় সরকারের ফতোয়া তিনি অনেক আগেই দিয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপির তো অল্পতে পেট ভরে না, তাই একটু বেশি খেতে চেয়েছিল বলেই আওয়ামী লীগ চুপ করে মজা দেখেছে এবং সময়মতো এসে সেই পুরনো ফর্মুলা নতুন করে মাঠে ছেড়ে দিয়েছে। আর দলীয় ঘরানার বুদ্ধিজীবী মহল এ পুরনো থিসিসেই নতুন গন্ধ খোঁজার নিরলস চেষ্টা করে সে গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে দেয়ার কাজে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যস্ত আছেন। একটি সর্বদলীয় সরকার গঠনের জন্য আওয়ামী লীগ (সরকারি দল) বিএনপির (বিরোধী দলের) কাছ থেকে নাম চেয়েছে রাজনৈতিক পাশা খেলার একটা চাল হিসেবে এবং বিএনপি সে চালে ধরা না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে, বিএনপি আওয়ামী লীগের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু কেবল প্রত্যাখ্যান করেই হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। বিরাট আয়োজন করে বিএনপি নেত্রী নতুন ফর্মুলা হাজির করেছেন। তা নিয়ে এখন চতুর্দিকে মাতম উঠেছে। একই তরিকায় দলীয় ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা বিএনপি সভানেত্রীর ফর্মুলাকে যুগান্তকারী, ঐতিহাসিক এবং অভূতপূর্ব প্রভৃতি বিশেষণে বিশেষিত করে এ ফর্মুলার প্রচারে এবং বিস্তারে মাঠে নেমে পড়েছেন। পাবলিকের জায়গা থেকে এ দুই দলের বুদ্ধিজীবীদের এ বুদ্ধিবৃত্তিক কসরত দেখাটা বেশ বিনোদনের। তবে আরও বিনোদনের হচ্ছে, যারা নির্দলীয় বুদ্ধিজীবী হিসেবে বাজারে চালু আছেন, তাদের অবিরাম চেষ্টা দেখা যাচ্ছে যেন তারা কোনো দিকে হেলে না-পড়েন। পাছে তাদের নিরপেক্ষতার বাজারদর পড়ে যায়। ফলে এসব ফর্মুলা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ কোনো বিশ্লেষণ দাঁড়াচ্ছে না।

যেমন ধরা যাক, বেগম খালেদা জিয়ার পোস্ট-ফর্মুলা রিঅ্যাকশন। গত ২১ অক্টোবর খালেদা জিয়া ফর্মুলা দিলেন বিগত ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে আওয়ামী লীগ পাঁচজন এবং বিএনপি পাঁচজনের নাম প্রস্তাব করুক। এ দশজন নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হবে এবং এ দশজনের মতামতের ভিত্তিতে একজন সম্মানিত এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে এ সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হবে। অন্য আরও অনেক বিষয় আছে যা আপাতত বিশ্লেষণের সুবিধার্থে বাদ দিলাম। খালেদা জিয়ার এ ফর্মুলা জারি হওয়ার পর থেকেই মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক-গণকরা অভাবনীয় এবং অভিনব সক্রিয়তায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য দশজন সদস্য খোঁজার কাজে নেমে পড়লেন। বহু চেষ্টা করেও তারা দশজন উপদেষ্টা খুঁজে পাচ্ছেন না। কয়জন মৃত, কয়জন জীবিত, কয়জন শারীরিকভাবে সক্ষম আর কয়জন অক্ষম তার নানা পাটিগণিত করে কোনোভাবেই দশজনকে পাওয়া যাচ্ছে না। বিশজন থেকে কতজন মারা গেলে এবং কতজন শারীরিকভাবে অক্ষম হলে দশজনের কম হয় ইত্যাকার ঐকিক নিয়মের নানা সূত্র দিয়ে কোনোভাবেই দশজন মিলছে না! জীবিত দুয়েকজনকে মেরে ফেলে হলেও জীবিত ও সক্ষম দশজনের হিসাব-নিকাশ মিলানো যাচ্ছে না। আবার যারা জীবিত আছেন তাদের কয়েকজনকে বেলতলায় দুবার না-যাওয়ার কথা মুখ দিয়ে মিডিয়া রীতিমতো বলিয়ে নিয়েছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দশজন পাওয়া গেলেই সব লেটা চুকে যায়। যারা এ পাটিগণিতের প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে খালেদা জিয়ার ফর্মুলাকে অগ্রহণযোগ্য প্রমাণের বেসুমার চেষ্টা করছেন, তারা কিন্তু প্রকারান্তরে নিজের অজান্তেই খালেদা জিয়ার ফর্মুলাকেই গ্রহণ করে নিচ্ছেন। আমার কাছে কসরতটাকেই বেশ হালকা, মগজহীন এবং হুজুগে মনে হয়েছে। এ ফর্মুলাটা সমকালীন রাজনীতির ফ্রেমওয়ার্কে আদৌ বাস্তবসম্মত কিনা, সাংবিধানিকভাবে কম্প­ায়েন্ট কিনা এবং আদৌ এ ধরনের ফর্মুলা বাস্তবায়নযোগ্য কি-না তা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ কোনো আলোচনা কেউ খাড়া করাতে পারছে না। দ্বি-দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে, একটি প্রো-পিপল পার্সপেক্টিভ থেকে যুক্তিসিদ্ধ কোনো বিশ্লেষণ দাঁড় করানোতে কারও কোনো মগজ-খরচের চেষ্টা নেই। ফলে আমরা কেবল একটি অবুদ্ধিবৃত্তিক অচলায়তনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি।

কী ধরনের বিশ্লেষণ জরুরি সেটা উপলব্ধির জন্য একটা বিশ্লেষণের উদাহরণ দাঁড় করানো যাক, কেননা সংবাদপত্রের কলামের কলেবরে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। খালেদা জিয়ার থিসিস অনুযায়ী ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে পাঁচজনের নাম আওয়ামী লীগ ঠিক করবে আর পাঁচজনের নাম দেবে বিএনপি। তারপর গঠিত হবে দশজনের উপদেষ্টা পরিষদ। আমি কূলকিনারা পাচ্ছি না এটা ভেবে যে, এ রকম একটি পাতলা প্রস্তাব কীভাবে বিএনপি হাজির করল? কে এ বুদ্ধি দিয়েছে? যদি তর্কের খাতিরে ধরেই নিই যে, পাঁচজন করে সাবেক উপদেষ্টারা রাজি হয়েছেন এবং দুই দলের মনোনয়ন নিয়ে দশজনের একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হল; তাহলে তো, এটা আর নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকার হল না। এটা হয়ে যাবে দল-মনোনীত দ্বি-দলীয় সরকার। মাঝখান দিয়ে এ দশজনের যে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি ছিল বা আছে সেটার বারোটা বেজে যাবে। তাদের কপালে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির দলীয় তিলক লেগে যাবে। মিডিয়া বলবে, প্রতিপক্ষের রাজনীতিকরা বলবে, পাবলিক বলবে, সবাই বলবে, আওয়ামী লীগ মনোনীত উপদেষ্টা কিংবা বিএনপি মনোনীত উপদেষ্টা। আমার তো মনে হয় না, সাবেক কোনো উপদেষ্টা এ বয়সে এসে আত্মাহুতি দেয়ার জন্য রাজি হবেন। তাই প্রশ্ন এসে যায়, এটা কি আদৌ কোনো ফর্মুলা নাকি পলিটিক্স? এ রকম নানা বিশ্লেষণ দাঁড় করানো জরুরি। সবাইকে এ চিন্তার সঙ্গে একমত হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। ভিন্নমতেরও প্রয়োজন আছে কেননা ভিন্নমত মত-এর যৌক্তিকতা, সত্যতা এবং বাস্তবিকতাকে ন্যায্যতা দেয়। তবে সেটা আবেগ ও বিবেক নিরেপক্ষ হওয়া বাঞ্ছনীয়!

আসলে শুরুতেই আমাদের কিছু জায়গা সাফ করতে হবে। দেশটা কি কেবল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির? দেশে কি আর কোনো রাজনৈতিক দল নেই? দেশের মানুষের কি কোনো চাওয়া-চাহিদা নেই? তাদের কি কোনো মতামত নেই? এ-দুই দল পাঁচজন দিয়ে দশজনের একটা আপৎকালীন সরকার বানাবে, আপৎকালীন সরকারের কাঁধে ভর করে নিজেরা আপদ থেকে উদ্ধার হবেন আর পাঁচ বছরের জন্য দেশটাকে নিজেদের তালুক হিসেবে ইজারা নেবেন। আর আমরা পাবলিকরা ছাগলের তিন নম্বর ছানার মতো লাফ দেব আর বগল বাজাব! আমার ভাই, তোমার ভাই! আহা কী আনন্দ!! এটার নাম কি গণতন্ত্র? এ প্রশ্নগুলোকে সামনের কাতারে এনে শামিল করতে হবে। তাহলেই প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় বা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সভানেত্রীর ফর্মুলার আসল মাজেজা উপলব্ধি করা সম্ভব হবে। অন্যথায়, এখন পাবলিকের যে কাহিল অবস্থা সেটা ক্রমান্বয়ে কাহিলতর হবে। অন্তত নিকট ইতিহাস সেই শিক্ষাই দেয়! তাই এসব অত্যন্ত মৌলিক জিজ্ঞাসার মুখোমুখি প্রথমে নিজেদেরই দাঁড় করাতে হবে। এসব প্রশ্ন এড়িয়ে সামনে আগানো যাবে না। একটা যেনতেন নির্বাচন করলেই গণতন্ত্র সুরক্ষিত হয় না, এ ধারণাটাকে প্রতিষ্ঠিত করা দরকার। সত্যিকার প্রজাদের-তন্ত্র বা পাবলিকের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য নাগরিক হিসেবে আমাদের রাষ্ট্রনৈতিক, সাংবিধানিক এবং সত্যিকার গণতন্ত্রায়ণের প্রশ্নকে সামনে আনতে হবে। রাষ্ট্রটা কেবল রাজনীতিবিদদের নয়। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের মালিক পাবলিক বা জনগণ, কেননা সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশে হচ্ছে পিপলস রিপাবলিক। তাই এটাই মালিকানা দাবি করার উপযুক্ত সময়।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন : সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে হুমবোল্ট ভিজিটিং ফেলো হিসেবে জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।